সাক্ষাৎকার (মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুস সাত্তার জিহাদী)

তাওহীদের ডাক ডেস্ক 198 বার পঠিত

[মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুস সাত্তার জিহাদী (৬৮) একজন হক্বপন্থী ও নিবেদিতপ্রাণ মানুষ, যিনি ১৯৯৪ সাল থেকে অদ্যবধি নওগাঁ যেলা ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ’-এর সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তাঁর জীববঘনিষ্ঠ সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ‘তাওহীদের ডাক’ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক আসাদুল্লাহ আল-গালিব]

তাওহীদের ডাক : আপনার জন্ম এবং পরিবার সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন?

আব্দুস সাত্তার জিহাদী : আমার জন্ম নওগাঁ যেলার মান্দা থানাধীন সতীহাট, গনেশপুর গ্রামে, আনুমানিক ১৯৫৭ সালে। প্রথম অবস্থায় আমার পরিবার মাযহাবী ছিল। পরবর্তীতে আমি ও আমার পরিবারের সকলেই আহলেহাদীছ হয়েছে। বর্তমানে আমি সপরিবারে আমার শ্বশুরবাড়ির এলাকা মান্দা থাকার চক জামদই, বৈদ্যপুরে বসবাস করছি। আমার ১ ছেলে এবং ২ মেয়ে।

তাওহীদের ডাক : আপনার শিক্ষাজীবন কীভাবে শুরু ও শেষ হয়েছিল?

আব্দুস সাত্তার জিহাদী : আমার শিক্ষার হাতেখড়ি হয় গ্রামের মক্তবে। সাথে সাথে আমার ফুফা মফিযুদ্দীনের নিকট আরবী শিখি এবং তাঁর কাছেই ফিক্বহে মুহাম্মাদী পড়ি। এরপর পারইল রহমানিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হই। পরবর্তীতে মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডের অধীনে ময়মনসিংহের ইসলামপুর ইসলামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা হ’তে ১৯৭৮ সালে দাখিল পাশ করি। এরপর নওগাঁ যেলার অন্তর্গত ইসলামিয়া ফাযিল মাদ্রাসায় ভর্তি হই। কিন্তু মাযহাবী প্রতিষ্ঠান হওয়ায় আমি সেখানে বেশী দিন থাকতে পারিনি। সেখান থেকে জয়পুরহাট যেলার বানিয়াপাড়া ফাযিল মাদ্রাসায় ভর্তি হই। আমি স্পষ্টবাদী হওয়ায় সেখানেও একই অবস্থা হয়। অবশেষে বগুড়া যেলার গাবতলীতে অবস্থিত সন্ধ্যাবাড়ী দারুল হাদীছ রহমানিয়া ও হাফেযিয়া ইয়াতীমখানা ক্বওমী মাদ্রাসায় ভর্তি হই এবং সেখানে হাদীছের কিতাবগুলো অধ্যয়ন করি এবং শেষ পর্যন্ত ক্বওমী ধারায় ১৯৯২ সালে দাওরায়ে হাদীছ সম্পন্ন করি।

তাওহীদের ডাক : আপনার কর্মজীবন কীভাবে শুরু হয়েছিল?

আব্দুস সাত্তার জিহাদী : আর্থিক অনটন থাকায় শিক্ষার্থী থাকাবস্থায় সন্ধ্যাবাড়ী দারুল হাদীছ রহমানিয়া ও হাফেযিয়া মাদ্রাসায় মক্তব এবং আদনা আলিফ শ্রেণীতে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে স্বল্প পরিসরে আমার কর্মজীবন শুরু হয়েছিল। সাথে সাথে বেশ ওয়ায-মাহফিলও করতাম। দুঃখজনক বিষয় হ’ল, সেসময় বগুড়ার আশে-পাশে প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব স্যারের প্রোগ্রামগুলিতে উপস্থিত হওয়ায় মুনাফিক খেতাব প্রাপ্ত হই ও মুনাজাত না করার কারণে সেখান থেকে চলে আসতে বাধ্য হই। পরে বাড়ীতে এসে একটি মসজিদে ইমামতি ও বাকী সময় সাংগঠনিক দাওয়াতী ময়দানে নিজেকে আত্মনিয়োগ করি।

তাওহীদের ডাক : আপনার নামের শেষে জিহাদী আছে। জিহাদী শব্দটি যুক্ত হওয়ার প্রেক্ষাপট কী?

আব্দুস সাত্তার জিহাদী : আমি ছাত্রজীবন থেকে স্পষ্টভাষী ছিলাম। আমার ফুফার নিকট ফিক্বহে মুহাম্মাদী পড়ার সময় থেকেই হক গ্রহণে তৎপর ছিলাম। ইসলাম বিরোধী কোনো কাজ দেখলে তাতে সরাসরি বিরোধিতা করতাম। কখনও কাজের মাধ্যমে, কখনও কথার মাধ্যমে। এতে বন্ধু এবং শুভাকাঙ্খীগণ আমাকে জিহাদী বলে ডাকা শুরু করে। এক সময় আমার এক বন্ধুবর ভাই এই নামটি একটি ইসলামী জালসার ব্যানারে ব্যবহার করে। তারপর থেকে এই নামটি ব্যবহার হয়ে আসছে। বাস্তবে এই নামটি আমার পিতা-মাতার বা নিজের দেওয়া কোনো নাম নয়।

তাওহীদের ডাক : শুনেছি আপনি আব্দুল্লাহ বিন ফযলের বক্তব্য মিস করতেন না। তার সম্পর্কে কিছু স্মৃতিচারণ করুন।

আব্দুস সাত্তার জিহাদী : আব্দুল্লাহ বিন ফযল তদানীন্তন সময়ে বাংলাদেশের একজন হক্কানী আলেম ছিলেন। তাঁর বক্তৃতা শুনলে যেমন হৃদয় বিগলিত হ’ত, তেমন বাতিলকে মুকাবিলার নির্ভিক শক্তি সঞ্চারিত হ’ত। তার বক্তব্যের কলা-কৌশল ছিল খুবই উচ্চ মাপের। একবার সন্ধ্যাবাড়ী মাদ্রাসায় তিনি একটানা ৫ ঘন্টার বেশী বক্তব্য প্রদান করেন। এতে তার প্রতি আমার আন্তরিক ভালবাসা তৈরী হয়। এজন্য তার বক্তব্য মিস করতাম না।

তাওহীদের ডাক : ‘যুবসংঘে’র সাথে আপনি কখন সম্পৃক্ত হয়েছিলেন?

আব্দুস সাত্তার জিহাদী : মূলত ১৯৯১ সালে নওদাপাড়ায় ‘বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ’-এর ১ম জাতীয় সম্মেলনে এসে আমীরে জামা‘আতের সাথে সাক্ষাৎ করি এবং ‘যুবসংঘে’র সাথে সাংগঠনিকভাবে পরিচিত হই। ফিরে যাওয়ার পর নওগাঁর বিভিন্ন এলাকায় শাখা গঠন শুরু করি। ১৯৯২ সালে আমি ১১ জনকে নিয়ে নওদাপাড়ার জাতীয় সম্মেলনে যাই। এই সম্মেলনে আমি বক্তব্য রাখার সুযোগ পাই এবং সূরা ফাতিরের ২৮ নং আয়াত উদ্ধৃত করে জোরালো বক্তৃতা দিই। এ সম্মেলনের পর আমাকে সভাপতি করে ‘যুবসংঘে’র যেলা কমিটি গঠন করা হয়। অতঃপর ১৯৯৪ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর ‘আন্দোলন’-এর যাত্রা শুরু হ’লে আমি নওগাঁ যেলার সভাপতি নিযুক্ত হই এবং অদ্যাবধি এই গুরু দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি।

তাওহীদের ডাক : ‘যুবসংঘে’র প্রথম দিকের দাওয়াতী কাজ সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন।

আব্দুস সাত্তার জিহাদী : আমরা যখন ‘যুবসংঘে’ যোগদান করি, তখন নওগাঁ যেলার বেশিরভাগ অঞ্চল মাযহাবী ও রাফাদানী বিদ‘আতীদের কব্জাগত ছিল। যেহেতু কর্মজীবনে আমি একজন বক্তা হিসাবে পরিচিত ছিলাম, তাই বক্তৃতায় কৌশলে আহলেহাদীছের দাওয়াত উপস্থাপন শুরু করি। দক্ষতা ও কৌশলের মাধ্যমে বন্ধু-বান্ধব এবং আত্মীয়-স্বজনদের কাছে আহলেহাদীছ বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হই। এতে কাজের গতি বৃদ্ধি পায়। সমাজকে সংস্কার করতে হবে, শিরক-বিদআ‘ত উৎখাত করতে হবে-এটাই ছিল আমাদের নিত্য ভাবনা। তখন ঈমানী তেজই ছিল ‘যুবসংঘে’র কাজের মূল প্রাণশক্তি।

তাওহীদের ডাক : আপনার জন্মস্থান ছেড়ে কেন শ্বশুরালয়ে স্থায়ী হলেন?

আব্দুস সাত্তার জিহাদী : আমার নিজ এলাকায় দাওয়াতী কাজ করতে গিয়ে বহু বাধার সম্মুখিন হই। দাওয়াতের তেজস্বীতার কারণে নিজ জন্মস্থান ছেড়ে শ্বশুরালয়ে হিজরত করতে বাধ্য হতে হয়। এই হিজরতই ছিল আমার জীবনের বড় এক অধ্যায়। আমার শ্বশুরের প্রায় ৩৫০ বিঘা জায়গা-জমি ও বংশীয় প্রভাব ছিল। ফলে আমি এখানে তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তির সাপোর্ট পাই। যা আমাকে আরও নির্বিঘ্নে দাওয়াতী কাজ চালিয়ে যেতে সামর্থ্য যোগায়। আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ আমাকে আহলেহাদীছ হিসেবে টিকিয়ে রেখেছেন। এই ‘আন্দোলনে’র প্রতি আমার অন্তরের গভীর থেকে ভালবাসা ও দায়বদ্ধতা রয়ে গেছে। এ পথই আমার জীবনের পরম শান্তির জায়গা।

তাওহীদের ডাক : আপনার জন্মস্থানের পরবর্তী পরিস্থিতি কি?

আব্দুস সাত্তার জিহাদী : আলহামদুলিল্লাহ! আমার দাওয়াতে ও আল্লাহর রহমতে আমার পিতা-চাচাসহ গ্রামের সবাই আহলেহাদীছ হয়ে যান। মজার ব্যাপার হ’ল, যাদের কারণে আমি হিজরত করতে বাধ্য হয়েছিলাম, ২০১৫ সালে তাদের খরচ দিয়েই আমাকে হজ্জে নিয়ে যায়। তারা আমাকে ছাড়া হজ্জে যেতে রাযী ছিল না। ফালিল্লাহিল হামদ!

তাওহীদের ডাক : দাওয়াতী মাঠে আপনার পদচারণা কখন থেকে শুরু হয়েছিল?

আব্দুস সাত্তার জিহাদী : ছাত্র থাকাবস্থায় আমি বক্তা হিসাবে পরিচিতি পাই। সেসময় থেকেই আশেপাশের বিভিন্ন গ্রাম মহল্লায় অনুষ্ঠান হ’লেই আমার ডাক পড়ত। আমি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দাওয়াতী সফর করেছি। যদিও এই পথচলা সহজ ছিল না। তবে পরিপূর্ণ ছিল ত্যাগ, বিশ্বাস আর আল্লাহর ওপর নির্ভরতা। এমনকি সাতক্ষীরার দুর্গম এলাকা ঝাউডাঙ্গা পর্যন্ত পৌঁছেছি। বর্তমানে আমি শুধুমাত্র সাংগঠনিক

দাওয়াতী প্রোগ্রামেই আমার জীবন ব্যয় করতে পারছি।

তাওহীদের ডাক : হকের দাওয়াত দিতে গিয়ে আপনি কি কখনও যুলুমের সম্মুখীন হয়েছেন?

আব্দুস সাত্তার জিহাদী : সত্যের পথে থাকা এ পৃথিবীতে সবচেয়ে কঠিন কাজ। এর চাইতেও কঠিন কাজ সত্যের পথে মানুষকে ডাকা। হকের পথে দাওয়াত দিতে গিয়ে অসংখ্যবার যুলুমের শিকার হয়েছি। তন্মধ্যে একটি তুলে ধরলাম। নববই দশকের শেষের দিকে পার্শ্ববর্তী গ্রাম মদনচকে হকের দাওয়াত নিয়ে গেলে সেখানে আমাকে হত্যার চক্রান্ত হয়। তখন পোড়া মাটির বদনা ব্যবহার করা হ’ত। এমনকি তারা ঐ বদনায় পানি তুলে আমি এবং আমার সাথীদের দিকে ছুড়ে মারতে শুরু করে। এক পর্যায়ে পাশের এক বাড়ীতে আশ্রয় নিই। পরবর্তীতে গ্রাম্য চৌকিদার এবং বাপ-চাচাদের মাধ্যমে বাসায় ফিরে আসি। সে সময় হকের দাওয়াত পরিচালনা করা খুবই কঠিন ছিল।

তাওহীদের ডাক : বক্তৃতার জগৎ থেকে আপনি কেন নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন?

আব্দুস সাত্তার জিহাদী : প্রকৃত হক বুঝে তা দুনিয়াবী স্বার্থে ছেড়ে দিব, এই হীন মানসিকতা আমার নেই। আমি সন্ধ্যাবাড়ী মাদ্রাসায় ছাত্র থাকাবস্থায় আমীরে জামা‘আত বগুড়ার যেখানেই প্রোগ্রাম করতেন, সেখানেই উপস্থিত হ’তাম। এজন্য শিক্ষকদের নিকট থেকে মুনাফিক ট্যাগও পেয়েছিলাম। ফরয ছালাতান্তের বিদ‘আতী মুনাজাত ছাড়াও অন্যান্য বিদ‘আতী কর্মকান্ডে নিজেকে জড়াতাম না। বরং এর বিরোধিতা করতাম। এজন্য উস্তাদদের অনেকেই আমার দাওয়াতী চিন্তা ও অবস্থানের কারণে বিরোধিতা করেছিলেন। ফলে মাদ্রাসা থেকে চলে আসি। সেখানে থাকলে হয়তো আর্থিকভাবে সফল হতাম, কিন্তু আখিরাত হারিয়ে ফেলতাম। উল্লেখ্য যে, আমি আদায় করতে ভাল পারতাম। কিন্তু বাধা হ’ল সে সময় অনেক মাহফিলে বিদ‘আতী দো‘আর আবেদন থাকত। এছাড়াও অতিরঞ্জিত কথা না বললে শ্রোতাদের মনতুষ্টি হ’ত না। ফলে ওয়ায-মাহফিলকে কখনই জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করিনি। এভাবে আস্তে আস্তে পরকালীন স্বার্থে শুধুমাত্র সাংগঠনিক দাওয়াতকেই জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হিসাবে গ্রহণ করি।

তাওহীদের ডাক : আপনি সব সময় সাদা কাপড় পরিধান করেন। এর কারণ কি?

আব্দুস সাত্তার জিহাদী : এক সময় আমার সবচেয়ে পসন্দের পোষাক ছিল কালো জুববা ও কালো পাগড়ি। একদিন আমীরে জামা‘আত আমাকে বললেন যে, সাদা হ’ল সর্বোত্তম পোষাক। আর আমীরে জামা‘আতকে দীর্ঘদিন এক সাদা পোষাকই পরিধান করতে দেখছি। তখন থেকে অদ্যাবধি আর কখনো সাদা পোষাক ছাড়িনি।

তাওহীদের ডাক : ২০০৫ সালে আমীরে জামা‘আত মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার পরবর্তী আপনাদের কর্মকান্ড কী ছিল?

আব্দুস সাত্তার জিহাদী : আমীরে জামা‘আতের গ্রেফতার পরবর্তী সময় আমাদের জন্য ছিল খুবই কষ্টের এবং উৎকণ্ঠার। কেননা সে সময় ব্যক্তিগত বিরোধের কারণেও অনেককে ফাঁসানো হয়েছিল। সাধ্যমত আমীরে জামা‘আতের খোঁজ-খবর রাখার চেষ্টা করতাম এবং দাওয়াতী কাজ চালিয়ে যেতাম। এমনকি ঢাকা ও আশেপাশের যেলাগুলিতে যতগুলি সম্মেলন হয়েছে, তার প্রায় প্রত্যেকটিতে আমি গিয়েছিলাম।

তাওহীদের ডাক : আমীরে জামা‘আত নওগাঁ কারাগারে থাকাকালীন স্যারের সাথে আপনারা কীভাবে সাক্ষাৎ করতেন?

আব্দুস সাত্তার জিহাদী : নওগাঁ কারাগারে যখন কেন্দ্রীয় মেহমানগণ আমীরে জামা‘আতের সাথে সাক্ষাৎ করতে আসতেন, তখন আমি এবং আমার সাথীরা তাদের সাথে সাক্ষাৎ করতাম। বিশেষ করে কেসের দিনগুলি সবকিছু ছেড়ে এক পলক সরাসরি স্যারকে দেখার জন্য আদালত প্রাঙ্গনে ছুটে যেতাম।

তাওহীদের ডাক : আপনার জীবনের বিশেষ স্মরণীয় কোন স্মৃতি মনে পড়ে কী?

আব্দুস সাত্তার জিহাদী : (১) একবার আমাদের এলাকায় ছয় তাকবীর ও বার তাকবীর নিয়ে এক মুনাযারা উপলক্ষ্যে অত্র অঞ্চলের বরেণ্য আলেম আমার শিক্ষক দিল্লী ফারেগ মাওলানা হযরতুল্লাহ রহমানী, করাচী ফারেগ মাওলানা মাছিরুদ্দীন রহমানী ও মাওলানা ওয়াসীমুদ্দীন আমাকে ডেকে তৎকালীন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. আব্দুল বারী স্যারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পাঠালেন। গণেশপুর থেকে সান্তাহার হয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় রেলস্টেশনে পৌঁছি। বিশ্ববিদ্যালয় গেটে প্রবেশ করতেই পুলিশ আমার পরিচয় জানতে চায়। অতঃপর তারা আমাকে রিকশায় করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসির বাসায় নিয়ে যায়। তিনি অসুস্থ থাকায় টেলিফোনে পুলিশদের বললেন, ছেলেটিকে আফতাব আহমাদ রহমানীর বাসায় নিয়ে যাও। ফলে পুলিশরা আমাকে রহমানী স্যারের বাসায় পৌঁছে দেয়।

রাত তখন প্রায় ১২-টা। তিনি চিঠি অনুবাদের কাজ করছিলেন। ঐ গভীর রাতে তিনি আমার খাওয়া ও বিশ্রামের ব্যবস্থা করলেন। পরদিন তিনি আমাকে ড. আব্দুল বারী স্যারের বাসায় নিয়ে গেলেন। তখনও তিনি অসুস্থ থাকায় টেলিফোনেই রহমানী স্যারকে বললেন, ছেলেটি বাড়ী ফিরে গিয়ে অপর পক্ষকে যেন বলে, আমরা সাত দিন ব্যাপী একটি কনফারেন্স করব। উভয় পক্ষই তাদের যুক্তি তুলে ধরবে। অতঃপর তারা যদি হেরে যায় তাহ’লে কনফারেন্সের সমস্ত খরচ দিবে ও আহলেহাদীছ হয়ে যেতে হবে। তবে ফিরে যাওয়ার সময় রহমানী স্যার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দু’জন ছাত্রকে আমার সঙ্গে পাঠালেন।

পরের দিন সতীহাটে মুহাররমের বিদ‘আতী কর্মকান্ড বন্ধের উদ্যোগ নেই। এই বিদ‘আতী কর্মকান্ড বেশ কিছু মাযহাবী ভাইদেরও বুঝাতে সক্ষম হই। ফলে আল্লাহর রহমতে স্থানীয় কিছু সদস্য আমার পাশে দাঁড়ান। অনেক মানুষ নিয়ে অনুষ্ঠিত তাদের মঞ্চে আমি উপস্থিত হই ও তাদের চ্যালেঞ্জ জানাই। ফলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হ’লে স্থানীয় চেয়ারম্যানসহ গণ্যমান্য অনেক এলাকাবাসী উপস্থিত হয়। আমি তাদের উদ্দেশ্যে কয়েক মিনিট জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিই। সাথে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা দু’জন ছাত্রও এত চমৎকারভাবে আলোচনা করেন যে, চেয়ারম্যান ছাহেব সকলের উদ্দেশ্যে বলেন, আব্দুস সাত্তার ১২ তাকবীরেই ঈদের ছালাত আদায় করবে, কেউ তাকে বাধা দিবে না। এভাবেই বৃহৎ কোন অনুষ্ঠান ও মুনাযারা ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান হয়ে যায়। ফলে বউমারী ঈদগাহে ১২ তাকবীরে ঈদের জামা‘আত শুরু করি। যেখানে প্রায় আড়াই থেকে তিন হাযার মুছল্লী অংশগ্রহণ করেন।

(২) ১৯৯২ সালে নওদাপাড়ায় জাতীয় সম্মেলন আমাকে অভ্যন্তরীণভাবে আলোড়িত করে তোলে। আমি সিদ্ধান্ত নিই আমীরে জামা‘আত মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব ছাহেবকে আমাদের এলাকায় নিয়ে আসব। বাড়ী ফিরে এসে গ্রামে গ্রামে প্রচারাভিযানে নেমে পড়ি। গণেশপুর, পরানপুর, পারইল সব জায়গায় আমি পৌঁছাই। কিন্তু ‘জমঈয়ত’ নেতৃবৃন্দ কর্তৃক বাধা। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছে যাই মান্দা থানার প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ফায়যুর রহমান মাস্টার ছাহেবের কাছে, যিনি পাইলট হাইস্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন। তাঁকে সম্মেলন করার প্রস্তাব দিলে তিনি আমার একটি কঠিন পরীক্ষা নেন। তিনি আমাকে একমাস তার বাসায় থাকার প্রস্তাব দেন। এ সময় বহু প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও আমি শ্বশুরবাড়ি থেকে রাতেই মাস্টার ছাহেবের বাড়ীতে এসে রাত্রি যাপন করতাম। অতঃপর ফজর ছালাতান্তে তাঁর সাথে কথাবার্তা বলে ফিরে আসতাম।

কয়েকদিন পর তিনি রাযী হলেন। তাঁর উৎসাহে আমি ১৯৯৩ সালে দুই-দিনব্যাপী বিশাল সম্মেলনের আয়োজন করি বাগডোব স্কুল মাঠে ও এক দিনব্যাপী মহাদেবপুরের পারকালকাপুরে। মাস্টার ছাহেব নিজে ৪৬,০০০ টাকা সংগ্রহ করেন। বিপরীতে মহাদেবপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ৩০০ টাকা সংগ্রহ করেন এবং আমার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন রিপোর্ট আমীরে জামা‘আতকে দেন। তখন আমীরে জামা‘আতকে জানালাম, তিনি ৩০০ টাকা আদায় করে হোন্ডার তেল বাবদ ১৭৫ টাকা খরচ করেন। আমি তাকে কিসের হিসাব দিব।

যাইহোক এই সম্মেলনে ৩০-৩৫ জন আলেম উপস্থিত ছিলেন। ফলে আশেপাশের অঞ্চলে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। অনেকেই সম্মেলন বানচাল করার জন্য ষড়যন্ত্র করতে থাকে। প্রথম দিনে খুলনার মাওলানা আব্দুর রঊফ ছাহেবের মুনাজাতের বিরুদ্ধে বক্তৃতার কারণে সম্মেলন চলাকালীন তা বন্ধের পায়তারা শুরু করে। তবে ফায়যুর রহমান মাস্টার ছাহেব মঞ্চে উঠে বলেন, দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলন বানচাল করতে যারা ষড়যন্ত্র করছে, আমি তাদের চিনি এবং জানি। আমার আমন্ত্রিত মেহমানদের এক তিল পরিমাণও মান ক্ষুণ্ণ

হলে, কাউকে ছাড়বো না। এতে পরিস্থিতি ঠান্ডা হয়ে যায়।

নওগাঁতে অনুষ্ঠিত সেই সম্মেলনটি এক ইতিহাস সৃষ্টি করে। আয়োজনে শক্তি ও সাহস ছিল। এক কথায় বলা যায়, সে সময়কার অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ হাযার মানুষ সম্মেলনের স্থানে উপস্থিত ছিলেন, এমনকি গাছের আড়ালেও দাঁড়িয়ে ছিলেন। বিরোধীরা যে পরিমাণ প্রচারণা চালিয়েছিল, তারা নিজেরাই পরে মঞ্চে এসেছিল। সেই সময় ‘জমঈয়তে আহলেহাদীসে’র যেলা পরিষদ সদস্য ছিলেন প্রফেসর মুযযাম্মিল হক। তাকে ‘জমঈয়তে’র কেন্দ্রীয় উর্ধ্বতন দায়িত্বশীল টেলিফোন করে বলেন, যেন গালিব ছাহেবকে নওগাঁতে আসতে না দেওয়া হয়।

তবে মুযযাম্মিল ছাহেব ছাফ জানিয়ে দেন, উনি আসবেন, হাদীছ ভিত্তিক কথা বলবেন। তাকে বাধা দেওয়া অনৈতিক তো বটে, বরং গোনাহের কাজ’। তিনি আমাকে বলেছিলেন, আব্দুস সাত্তার! তুমি আন্দোলন চালিয়ে যাও। আমীরে জামা‘আত সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বারী ছাহেব আমাদের মুকুট, আর গালিব ছাহেব আমাদের নেতা’।

উল্লেখ্য যে, সম্মেলনের দিন আমি বেশ ব্যস্ত ছিলাম। মাঝে মাঝে দৌড়ে আমন্ত্রিত আলেম-ওলামাদের নিকটে যাচ্ছি, আবার মঞ্চে ছুটছি। একবার দেখি একজন যুবকের হাতে একটি ব্যাগ। আমার সন্দেহ হয়, ব্যাগে কিছু আছে। তার কাছ থেকে ব্যাগটা কেড়ে নিই। পরক্ষণেই সে ব্যাগটি ছিনিয়ে নিয়ে দৌড় দেয়। পরে জানা গেল, ব্যাগটিতে তিনটি-চারটি হাতবোমা ছিল! সে আমীরে জামা‘আতকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল। আল্লাহর অশেষ শুকরিয়া যে তিনি আমার আমীরকে বাঁচিয়েছেন! তবে সেদিন আমীরে জামা‘আতের তিন ঘণ্টার বক্তব্যই ছিল সম্মেলনের আসল শক্তি। আরবী, উর্দু, ফারসী, ইংরেজীতে উদ্ধৃতি ও শের। কী যে মনমুগ্ধকর বক্তৃতা! শেষ পর্যন্ত সবাই চাতক পাখির মত মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনেছে।

এই সম্মেলনের মাধ্যমে আমার জীবনে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা হয়। সেই সম্মেলনে উপস্থিত মানুষের ঢল আর আহলেহাদীছ আদর্শের প্রতি তাদের আগ্রহ আমাকে আন্দোলনের প্লাটফর্মে পথচলায় নতুন করে অনুপ্রাণিত করে। উক্ত সম্মেলনের পর নওগাঁ যেলায় আহলেহাদীছ আন্দোলনের প্রচার ও প্রসার ব্যাপকহারে বিস্তৃতি লাভ করে।

(৩) মারকাযের হিফয বিভাগের শিক্ষক হাফেয ইঊনুস ও গাইবান্ধার আহসান হাবীব মটরসাইকেল যোগে আমার বাড়ীতে এসে বললেন, গালিব স্যার আপনাকে ডেকেছেন। আমি চলে আসলাম। অতঃপর তিনি আমাকে ৬টি মসজিদের দায়িত্ব দেন। তা হ’ল চকশিবরামপুর, জামদই, পারশিমলা, সদরপুর, পাজরভাঙ্গা ও সিরাজপুর। এখনো সে মসজিদগুলিতে ‘আন্দোলন’ ও ‘যুবসংঘে’র দাওয়াতী প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

(৪) ১৯৯৭ সালের নভেম্বরে ‘আন্দোলন’-এর নেতাকর্মীদের নিয়ে আমীরে জামা‘আতের সাথে সুন্দরবন ও কুয়াকাটাসহ দক্ষিণবঙ্গ শিক্ষা সফরে গিয়েছিলাম। সাথে ছিল তিনটি মাইক্রো। পূর্বে দেওয়া প্রোগ্রাম মোতাবেক বিরাট কাফেলা সোহাগদলে পৌঁছে। নদীর ওপারে গাড়িগুলো রেখে আমরা নৌকায় করে শ্লোগান দিতে দিতে সোহাগদল আহলেহাদীছ জামে মসজিদের কিনারে গিয়ে নৌকা থেকে নামলাম। উনারা ঢাকার বড় ব্যবসায়ী স্থানীয় শাহ আলম বাহাদুরের আলীশান দ্বিতল বাড়ীতে আমীরে জামা‘আতের থাকার ব্যবস্থা করেন। তিনি বাড়ীতে প্রবেশের পূর্বে লক্ষ্য করেন যে, কার্নিশে টিভি এ্যন্টিনা। তিনি বারান্দায় উঠেই নেমে এলেন। অতঃপর যেলা সংগঠনের অর্থ সম্পাদক স্থানীয় হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক জনাব আযীযুল ইসলামের সাধারণ বাড়ীতে রাত্রি যাপন করেন।

একই সফরে আমরা যখন সুন্দরবনে প্রবেশ করলাম, তখন আমাদের ট্রলারে আরো অনেক মানুষ ছিল। তাদের মধ্যে দু’জন ব্যক্তি ট্রলার থেকে নেমে হরিণ শিকারে বেরিয়ে পড়ল। যদিও সেসময় হরিণ শিকার সরকারীভাবে নিষিদ্ধ ছিল। ঐ দু’জন ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসল। তখন এক মধ্য বয়স্ক ব্যক্তি বললেন, আমার সাথে একজন আসো। তিনি বেরিয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পরেই আমরা দু’টি গুলির আওয়ায পেলাম। পরক্ষণেই লোকটি দু’টি হরিণ নিয়ে উপস্থিত। রান্না হ’ল। আমরা সবাই হরিণের গোশত প্রথম খেলাম। কিন্তু আমীরে জামা‘আত খেলেন না।

তাওহীদের ডাক : সংগঠন বিমুখ ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে আপনি কী বলবেন?

আব্দুস সাত্তার জিহাদী : সমাজ পরিবর্তন করতে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য-উদ্দেশ্য প্রয়োজন। তাছাড়া সফলতা অসম্ভব। যারা সংগঠন করে না, তাদের কোন লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নেই। অথচ আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ ও তার অঙ্গ সংগঠনগুলো একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং বাংলার যমীনে যদি কোন দিন ইসলামী বিপ্লব আসে, তবে ইনশাআল্লাহ এমন সংগঠনের মাধ্যমেই সংঘটিত হবে বলে বিশ্বাস রাখি। কেননা আমাদের রাজনীতি ইমারত ও খেলাফত। অতএব সংগঠনের বিরোধিতা না করে, ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠায় জামা‘আতবদ্ধ জীবন-যাপন করুন।

তাওহীদের ডাক : সংগঠনকে বেগবান করার জন্য আপনার পরামর্শ কী

আব্দুস সাত্তার জিহাদী : এজন্য সাংগঠনিক বই-পুস্তক বেশী বেশী পড়তে হবে। বিশেষ করে আমীরে জামা‘আতের কালজয়ী আহলেহাদীছের উপর করা পিএইচডি থিসিস, সীরাতুর রাসূল (ছাঃ), ছালাতুর রাসূল (ছাঃ), তাফসীর ইত্যাদি মনযোগসহ অধ্যয়ন করতে হবে এবং সেই আলোকে দাওয়াত দিতে হবে। সাথে সাথে আমীরে জামা‘আতের জুম‘আর খুৎবা নিয়মিত শুনতে হবে। তাহ’লে সাংগঠনিক আপডেট জানতে পারা যাবে।

তাওহীদের ডাক : সাংগঠনিক সম্প্রীতি বৃদ্ধির জন্য করণীয় সম্পর্কে বলুন।

আব্দুস সাত্তার জিহাদী : প্রথমত সংগঠনকে মন থেকে পরকালীন স্বার্থে ভালবাসতে হবে এবং সেই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। ‘আন্দোলন’-এর দায়িত্বশীলরা ‘যুবসংঘ’কে গুরুত্ব দিবে। কেননা তিনি মারা গেলে তাঁর খাটিয়াটা তারাই ধরবে। আবার সোনামণিদেরও গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা তারা আগামীর যুবসংঘ। পরক্ষণেই অধস্তন দায়িত্বশীলরাও উর্ধ্বতন দায়িত্বশীলদের পূর্ণ সম্মান করবে ও চেইন অফ কমান্ড মেনে চলবে। তবেই সাংগঠনিক সম্প্রতি বৃদ্ধি পাবে।

তাওহীদের ডাক : সফল কর্মী হওয়ার উপায় সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন?

আব্দুস সাত্তার জিহাদী : একজন হিন্দু ‘পন্ডিত চামুপতি লাল’ ছদ্মনামে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-কে ব্যঙ্গ করে ‘রঙ্গিলা রাসূল’ নামে একটি বই লিখে। লাহোরের এক প্রকাশক রাজপাল ১৯২৩ সালে বইটি প্রকাশ করে। সারা ভারতের মুসলিমদের মধ্যে বইটি চাঞ্চল্য তৈরী হয়। এরপর এই ব্যাপারটিকে মুসলিমরা আদালতে নিয়ে যায়। আদালত রাজ্যপালকে দোষী সাব্যস্ত করে। পরবর্তীতে আপিল করা হলে জজকোর্ট এই বিচারকে সমর্থন জানায়। রাজ্যপাল এরপর হাইকোর্টে যায়। দীর্ঘ ৬ বছর পর হাইকোর্ট তাকে নির্দোষ ঘোষণা দেয়। হিন্দুদের দ্বারা প্রভাবিত ইংরেজ সরকার এটাকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হিসাবে উল্লেখ করে। হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্ত মুসলিমদেরকে গভীরভাবে ক্ষুব্ধ করে।

১৯ বছর বয়সী কাঠমিস্ত্রীর ছেলে ইলমুদ্দীন তার বন্ধুদের সাথে লাহোরের মসজিদে ওয়াযির খানে ছালাত পড়ছিলেন। ছালাত শেষে মসজিদে এই বিষয়ে ভাষণ শোনেন। যেখানে ইসলামের নবীকে অমর্যাদাকারী ধর্মদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানানো হচ্ছিল। এরপর সে লাহোরের উর্দু বাজারে রাজ্যপালের দোকানে যায় এবং রাজ্যপালকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। হত্যার পর ইলমুদ্দীন পালিয়ে যাবার কোনো চেষ্টাই করেনি। পুলিশ তাকে তৎক্ষণাৎ গ্রেফতার করে এবং মিয়াওয়ালী কারাগারে পাঠিয়ে দেয়।

ইলমুদ্দীনের উকিল হিসাবে মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহ আদালতে বলেন, নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর অসম্মান করা এবং জনসাধারণের মধ্যে ধর্মীয় দ্রোহের আগুন উস্কে দেওয়া ১৩৫ ধারার আলোকে দন্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রকাশক রাজ্যপালের বিরুদ্ধে কোনো আইনী ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আইনের এই নিস্তব্ধতাই ইলমুদ্দীনকে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে অনুপ্রাণিত করেছে। তাই ইলমুদ্দীনের অপরাধকে ৩০২ ধারায় মার্ডার নির্দেশ না করে, ৩০৮ ধারায় এজিটেশন কিলিং গণ্য করা উচিত। যার শাস্তি সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদন্ড হ’তে পারে। কিন্তু হাইকোর্টের জাস্টিস শাদিলাল এসব তথ্যের কোন তোয়াক্কা না করে আপিল বাতিল করে দেন। সর্বশেষ আইনজীবী মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহ ইলমুদ্দীনকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, ‘তুমি একজন অল্প বয়সী যুবক। মহামান্য আদালতকে বল, এ কাজ করার সময় আমি মানসিক স্থিরতাসম্পন্ন ছিলাম না। কিন্তু ইলমুদ্দীন তা অস্বীকার করে বলে, ‘আমার আমলনামায় রাসূলের দুশমনকে হত্যা করা ব্যতীত আর কোন আমল নেই’।

ইলমুদ্দীনের মত আমাদেরকে দ্বীনী কাজে ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা নিয়ে আত্মনিয়োগ করতে হবে। লক্ষ্যপাণে অবিচল থাকতে হবে। কোনভাবে লক্ষ্যচ্যুত হওয়া যাবে না। তবেই একজন সফল কর্মী হওয়া সম্ভব।

তাওহীদের ডাক : সংগঠনের এই কাফেলায় সুদীর্ঘকাল আপনার পথ চলা। বিশেষ কিছু কী বলার আছে?

আব্দুস সাত্তার জিহাদী : আমি সংগঠনের প্রচার-প্রসারে বহু কষ্ট করেছি। খালি পায়ে হেঁটে নওগাঁ শহর, রাণীনগর, আত্রাই, মান্দা, সাপাহার, ধামইরহাটসহ অনেক এলাকায় গিয়েছি। এখন সেসব রাস্তা পিচঢালা রাস্তা হয়ে গেছে। অনেক এলাকায় সম্মেলন করেছি, কখনও রমনার মিলনায়তনে, কখনও মুক্তাঙ্গনে। পল্টন ময়দানে উপস্থিত হয়েছি। আজও যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, আহলেহাদীছ আন্দোলনের প্রতি আপনার ভালবাসা কেমন? আমি বলব, আমি রক্ত দিয়েছি, ঘাম দিয়েছি, এই রাস্তা থেকে ফিরে যাওয়া আমার জন্য অসম্ভব। কোটি টাকা দিলেও নয়।

জীবনে বহু প্রলোভন এসেছে। একটি ইসলামী দলের পক্ষ থেকে তিনবার গাড়ি পাঠিয়ে আমাকে যোগদানের আহবান জানানো হয়েছে। শুধু বললেই হয় ‘আমি আহলেহাদীছ আন্দোলন’ ছেড়ে এই দলে যোগ দিলাম’, তাতেই মাইক্রো দেওয়া হবে। কিন্তু আমি কোনদিন রাযী হইনি। বলেছি আল্লাহর কসম, আমি আমার আদর্শ, আমার নৈতিকতা থেকে বিন্দুমাত্র পিছু হটব না। আল্লাহর রহমতে আজ আমার জমি-জমা না থাকলেও আমি গর্ব করে বলতে পারি, ‘আমি আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ’-এর একজন কর্মী। এই পথ ও মতের উপর আমার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে চাই। আমীরে জামা‘আতের নিকট কৃত বায়‘আত যেন আমৃত্যু ধরে রাখতি পারি, সেই দো‘আই সকলের নিকট কাম্য।

তাওহীদের ডাক : তাওহীদের ডাকের পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।

আব্দুস সাত্তার জিহাদী : নিয়মিত অধ্যয়ন করুন এবং দৈনন্দিন আল্লাহর জন্য কিছু সময় ব্যয় করুন। ইসলামী জ্ঞানার্জনে কী যে প্রশান্তি, তা অধিক অধ্যয়ন না করলে বুঝা যাবে না। আমার এমনও হয়েছে যে, পড়তে পড়তে ফজরের আযান হয়ে গেছে। কখনও কখনও তাহাজ্জুদের সময় হয়ে গেলে, তাহাজ্জুদ ও ফজরের ছালাত জামা‘আতে পড়েই ঘুমাই। আপনাদের কথাগুলো শুধু অনুপ্রেরণার জন্য বললাম। 

তাওহীদের ডাক : আপনার মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি?

আব্দুস সাত্তার জিহাদী : আল্লাহর নিকট আমীরে জামা‘আতের সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি এবং ক্বিয়ামত পর্যন্ত হকের উপর বিজয়ী দল হিসাবে ‘যুবসংঘ’কে টিকে থাকার জন্য নির্বিঘ্নে এগিয়ে যাওয়ার আহবান জানাচ্ছি। আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর দ্বীনের জন্য কবুল করুন।-আমীন!

মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুস সাত্তার জিহাদী (নওগাঁ)

[সভাপতি, বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ, দিনাজপুর-পূর্ব সাংগঠনিক যেলা]



আরও