আনুগত্যের মর্যাদা ও অবাধ্যতার পরিণতি

ইহসান ইলাহী যহীর 684 বার পঠিত

উপস্থাপনা : আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে সঠিক পথে পরিচালনার জন্য যুগে যুগে কালে কালে সর্বোত্তম মানুষদের মধ্যে মধ্য হ’তে নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। সৃষ্টিজীবকে সৃষ্টিকর্তার বিধাননানুযায়ী পরিচালনার জন্য আসমানী বার্তাসমূহ প্রেরণ করেছেন। ইলাহী বিধান অনুসরণের জন্য সবিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। সাথে সাথে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের খালেছ অনুসারীদের জন্য পুরস্কার ও ফাসেকদের জন্য তিরস্কারের বন্দোবস্ত রেখেছেন। নিম্নে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের গুরুত্ব ও ফযীলত এবং অবাধ্যদের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক মন্দ পরিণতি সম্পর্কে আলোকপাতের প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ।

সন্দেহাতীতভাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনা : ঈমান বা দৃঢ় বিশ্বাস মুমিনের জীবনে এক অমূল্য সম্পদ। দৃঢ় বিশ্বাস ও সর্বোচ্চ ত্যাগ ব্যতীত ইবাদত ও আনুগত্যে পূর্ণতা আসে না। যেমন একটা প্রশিক্ষিত তেজী ঘোড়া তার মালিকের নির্দেশ পালনার্থে ঊর্ধ্বশ্বাসে সম্মুখে ধাবমান হয়। সে ক্ষুরাঘাতে অগ্নি বিচ্ছুরণ করে। বিশ্রামের সময় প্রভাতকালেও নির্দেশ পাওয়া মাত্রই বীর বিক্রমে আক্রমণকারী হয়ে উঠে। সে ধূলি উৎক্ষেপণ করে ক্ষীপ্র বেগে শত্রুদলের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে তার নিজের জীবন বাজি রেখে। সেকারণ আশরাফুল মাখলূক্বাত হিসাবে সন্দেহাতীতভাবে দৃঢ় বিশ্বাস ও সর্বোচ্চ ত্যাগের চরম পরাকাষ্ঠ প্রদর্শন করে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনা আমাদের জন্য আবশ্যিক কর্তব্য। যেমন আল্লাহ বলেন,إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا وَجَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللهِ أُولَئِكَ هُمُ الصَّادِقُونَ- ‘তারা ব্যতীত মুমিন নয়, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে। অতঃপর তাতে সন্দেহ পোষণ করেনা এবং আল্লাহর পথে তাদের মাল ও জান দিয়ে জিহাদ করে। তারাই হ’ল (ঈমানের দাবীতে) সত্যবাদী’ (হুজুরাত ৪৯/১৫)। আর রাসূল (ছাঃ)-এর জীবন চরিতে রয়েছে উত্তম আদর্শ। যেমন আল্লাহ বলেন,لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَنْ كَانَ يَرْجُو اللهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللهَ كَثِيرًا- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূলের মধ্যে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ নিহিত রয়েছে, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসকে কামনা করে ও অধিকহারে আল্লাহকে স্মরণ করে’ (আহযাব ৩৩/২১)। তিনি বলেন,وَأَطِيعُوا اللهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ فَإِنْ تَوَلَّيْتُمْ فَإِنَّمَا عَلَى رَسُولِنَا الْبَلاَغُ الْمُبِينُ- ‘তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর। অতঃপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তাহ’লে আমাদের রাসূলের দায়িত্ব কেবল স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া’ (তাগাবুন ৬৪/১২)। সুতরাং পূর্ণ মুমিন হ’তে গেলে আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করতে হবে। 

রাসূল (ছাঃ) মুমিনদের জন্য আল্লাহর বিশেষ এক অনুগ্রহ : পৃথিবীর প্রথম মানব ও নবী হযরত আদম (আঃ) থেকে শুরু করে শেষনবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) পর্যন্ত যুগে যুগে আল্লাহ মানবমন্ডলীর হেদায়াতের জন্য তাদেরই মধ্য হ’তে অসংখ্য নবী ও রাসূল প্রেরণ করে মানব জাতিকে ধন্য করেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন,لَقَدْ مَنَّ اللهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولاً مِّنْ أَنْفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلاَلٍ مُّبِينٍ- ‘বিশ্বাসীদের উপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন যখন তিনি তাদের নিকট তাদের মধ্য থেকে একজনকে রাসূল হিসাবে প্রেরণ করেছেন। যিনি তাদের নিকট তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন ও তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত (কুরআন ও সুন্নাহ) শিক্ষা দেন। যদিও তারা ইতিপূর্বে স্পষ্ট ভ্রান্তির মধ্যে ছিল’ (আলে-ইমরান ৩/১৬৪)

মুমিনগণ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনয়নকারী : আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনয়ন আদর্শ ব্যক্তিত্বের পরিচয়ক। সেকারণ প্রকৃত মুমিনগণ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনয়নকারী। উক্ত ঈমানের দাবি বাস্তবায়ন করে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি সর্বোচ্চ আনুগত্য করা যরূরী। আর এ জন্যই যেমন আল্লাহ বলেন, وَأَطِيعُوا اللهَ وَرَسُولَهُ إِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِينَ- ‘আর তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাক’ (আনফাল ৮/১)

অহি ব্যতীত রাসূল (ছাঃ) কোন কিছুই বলেন না : বিশ্ব মানবতার মুক্তির দিশারী আরবের মরু দুলাল হযরত মুহাম্মাদ (ছাঃ) মহান আল্লাহর একান্তই আজ্ঞাবহ ছিলেন। তিনি আল্লাহর পক্ষ হ’তে অহি নাযিল না হওয়া পর্যন্ত নিজের তরফে কোন কথাই বলতেন না। বরং যা কিছু তিনি বলতেন, সব অহি-র আলোকেই বলতেন। যেমন আল্লাহ বলেন,وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى، إِنْ هُوَ إِلاَّ وَحْيٌ يُّوحَى- ‘তিনি নিজ খেয়াল-খুশীমত কোন কথা বলেন না’। ‘(যা বলেন) সেটি অহি ব্যতীত নয়, যা তার নিকট প্রত্যাদেশ করা হয়’ (নাজ্ম ৫৩/৩-৪)

রাসূল (ছাঃ)-এর আনুগত্য ব্যতীত কোন গত্যন্তর নেই : রাসূল (ছাঃ)-এর আনুগত্য করা ফরয। যা উপেক্ষা করা নিষিদ্ধ। ইসলাম আগমনের পর পৃথিবীর অন্যান্য সকল ধর্মের অনুসরণ বাতিলযোগ্য। যেমন হাদীছে এসেছে, ‘একদিন যখন ওমর (রাঃ) রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট এসে বললেন, إِنَّا نَسْمَعُ أَحَادِيثَ مِنْ يَهُودَ تُعْجِبُنَا أَفْتَرَى أَنْ نَكْتُبَ بَعْضَهَا؟ فَقَالَ : أَمُتَهَوِّكُونَ أَنْتُمْ كَمَا تَهَوَّكَتِ الْيَهُوْدُ وَالنَّصَارَى؟ لَقَدْ جِئْتُكُمْ بِهَا بَيْضَاءَ نَقِيَّةً وَلَوْ كَانَ مُوسَى حَيًّا مَا وَسِعَهُ إِلاَّ إِتِّبَاعِيْ- আমরা ইহূদীদের নিকটে তাদের অনেক পুরাতন ধর্মীয় কাহিনী শুনি, যা আমাদের নিকটে চমৎকার বোধ হয়, অতএব সেগুলির কিছু কিছু লিখে রাখার জন্য আপনি আমাদের অনুমতি দিবেন কি? তখন জবাবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, তোমরা কি দিকভ্রান্ত হয়েছ, যেমন ইহূদী-নাছারারা দিকভ্রান্ত হয়েছে? অথচ আমি তোমাদের কাছে এসেছি উজ্জ্বল ও পরিচ্ছন্ন দ্বীন নিয়ে। যদি আজকে মূসা (আঃ)-ও বেঁচে থাকতেন, তাহ’লে তাঁর পক্ষেও আমার অনুসরণ ব্যতীত কোনই গত্যন্তর থাকত না’।[1] উল্লেখিত হাদীছ থেকে প্রতীয়মান হ’ল যে, রাসূল (ছাঃ)-এর আনুগত্য করা ফরয। তাঁর আনুগত্য ব্যতীত পরকালে মুক্তির কোন গত্যন্তর নেই।

আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের মর্যাদা

এক্ষণে আমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের মর্যাদা এবং এর ইহলৌকিক ও পারলৌকিক উত্তম ফলাফল সম্পর্কে আলোকপাতের প্রয়াস পাব। যেমন আল্লাহ বলেন,مَن يُّطِعِ الرَّسُوْلَ فَقَدْ أَطَاعَ اللهَ، وَمَنْ تَوَلَّى فَمَآ أَرْسَلْنَاكَ عَلَيْهِمْ حَفِيْظًا- ‘যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করে, সে আল্লাহর আনুগত্য করে। আর যে ব্যক্তি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাদের উপর আমরা তোমাকে তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে প্রেরণ করিনি’ (নিসা ৪/৮০)। বর্ণিত আয়াতে কারীমাতে রাসূল (ছাঃ)-এর যথাযথ আনুগত্যের ভিত্তিমূলে আল্লাহর আনুগত্য পোষণের শর্তাধীন করা হয়েছে। ফলে প্রত্যেক মুমিনের সার্বিক জীবন হবে আনুগত্যপূর্ণ। আর এই আনুগত্যের মর্যাদা নিম্নে তুলে ধরা হ’ল।-

১. হেদায়াত প্রাপ্ত ও ছিরাতে মুস্তাক্বীমের অনুগামী : বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহ রাববুল আলামীন মানবজাতির কল্যাণে বিভিন্ন নিয়ম-কানূন জারী করেছেন। হালাল ও হারামের সীমারেখা বাৎলে দিয়েছেন। নির্ধারণ করেছেন হেদায়াত ও গোমরাহীর সীমানা। সুতরাং আল্লাহর বিধান মেনে নিয়ে তাঁর রাসূলের পূর্ণাঙ্গ আনুগত্যকারীগণ হেদায়াত প্রাপ্ত ও ছিরাতে মুস্তাক্বীমের অনুগামী হবেন। যেমন আল্লাহ বলেন,قُلْ يَآأَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا... فَآمِنُوا بِاللهِ وَرَسُولِهِ النَّبِيِّ الْأُمِّيِّ الَّذِي يُؤْمِنُ بِاللهِ وَكَلِمَاتِهِ وَاتَّبِعُوهُ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ- ‘তুমি বল, হে মানবজাতি! আমি তোমাদের সকলের প্রতি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল... অতএব তোমরা বিশ্বাস স্থাপন কর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর, যিনি নিরক্ষর নবী। যিনি বিশ্বাস স্থাপন করেছেন আল্লাহ ও তার বাণী সমূহের উপর। তোমরা তার অনুসরণ কর যাতে তোমরা সুপথপ্রাপ্ত হ’তে পার’ (আ‘রাফ ৭/১৫৮)। আল্লাহ রাসূল (ছাঃ)-কে উদ্দেশ্য করে বলেন,وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ- ‘আর নিশ্চয়ই তুমি প্রদর্শন করে থাক সরল পথ’ (শূরা ৪২/৫২)। উপরোল্লিখিত আয়াতগুলিতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যকারীগণ হেদায়াত প্রাপ্ত ও ছিরাতে মুস্তাক্বীমের অনুগামী হিসাবে বিবৃত হয়েছে।

২. রাসূল (ছাঃ)-এর আনুগত্যেই আল্লাহর আনুগত্য : হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,مَنْ أَطَاعَنِى فَقَدْ أَطَاعَ اللهَ، وَمَنْ عَصَانِى فَقَدْ عَصَى اللهَ، ‘যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করল সে আল্লাহর আনুগত্য করল। আর যে আমার অবাধ্যতা করল, সে আল্লাহর অবাধ্যতা করল’।[2] অত্র হাদীছ থেকে বুঝা গেল যে, রাসূল (ছাঃ)-এর আনুগত্যেই আল্লাহর আনুগত্য সম্পন্ন হয়ে থাকে।

৩. অবিনশ্বর ও অক্ষুণ্ণ আমল : একনিষ্ঠ অনুসারীদের বদলা অনুসৃত নীতিমালার আলোকে অবিনশ্বর ও অক্ষুণ্ণ থাকে। কারণ তারা এমন এক মহামহিম প্রতিপালকের নির্দেশক্রমে তাঁরই মনোনীত এক মহামানবের অনুসরণ করে, যা জিব্রীল আমীন মারফত প্রাপ্ত মহাসত্য ইলাহী বিধান। আল্লাহ বলেন,وَإِنْ تُطِيعُوا اللهَ وَرَسُولَهُ لاَ يَلِتْكُمْ مِّنْ أَعْمَالِكُمْ شَيْئًا- ‘যদি তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্য কর, তাতে তোমাদের কর্মফলে কোন কমতি করা হবেনা। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়াবান’ (হুজুরাত ৪৯/১৪)

৪. আল্লাহর অনুগ্রহ প্রাপ্তি : মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পরিপূর্ণ আনুগত্য করতে পারা এক মহান এলাহী তাওফীক। যারা এই মহতী কর্মে ধন্য হবে তাদেরই উপর আল্লাহ রববুল আলামীনের এক বিশেষ দয়া থাকে। যেমন আল্লাহ বলেন, وَيُطِيعُونَ اللهَ وَرَسُولَهُ أُولَئِكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللهُ إِنَّ اللهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ- ‘আর তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। এসব লোকের প্রতি আল্লাহ অবশ্যই অনুগ্রহ বর্ষণ করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাপরাক্রান্ত ও প্রজ্ঞাময়’ (তওবা ৯/৭১)

৫. সুন্দরতম পরিণাম : যেকোন অমীমাংসিত ও বিবাদীয় বিষয় কুরআন ও হাদীছের মূলনীতির দিকে প্রত্যাবর্তিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। এতে সুন্দরতম পরিণাম বয়ে নিয়ে আসবে। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর এবং আনুগত্য কর রাসূলের ও তোমাদের নেতৃবৃন্দের। অতঃপর যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিতন্ডা কর, তাহ’লে তোমরা বিষয়টিকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও। সেটাই হবে উত্তম ও পরিণামের দিক দিয়ে সুন্দরতম’ (নিসা ৪/৫৯)। অতএব আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের উপহার হিসাবে দুনিয়া ও আখিরাতে সুন্দরতম পরিণাম রয়েছে।

৬. প্রকৃত ঈমানের স্বাদ আস্বাদন : আল্লাহ রববুল আলামীনকে রব, মালিক, খালেক, হুকুমদাতা ও নবী করীম (ছাঃ)-কে তাঁর স্বার্থক অনুসারী ও আমাদের জন্য অনুসরণীয়-অনুকরণীয় হিসাবে মান্য করা প্রকৃত ঈমানের পরিচায়ক। সেকারণ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কারীগণ প্রকৃত ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করে থাকেন। যেমন রাসূল (ছাঃ) বলেন,ذَاقَ طَعْمَ الْإِيمَانِ مَنْ رَّضِيَ بِاللهِ رَبًّا وَّبِالْإِسْلاَمِ دِينًا وَّبِمُحَمَّدٍ رَّسُولاً- ‘সে ব্যক্তিই ঈমানের প্রকৃত স্বাদ পেয়েছে, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ‘রব’ হিসাবে, ইসলামকে ‘দ্বীন’ হিসাবে এবং মুহাম্মাদকে ‘রাসূল’ হিসাবে পেয়ে সন্তুষ্ট হয়েছে’।[3]

৭. যাবতীয় পাপ মোচন : ফেরেশতাগণ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যকারীদের যাবতীয় পাপ মোচনের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘যারা আরশ বহন করে এবং যারা তার চারপাশে আছে, তারা তাদের পালনকর্তার প্রশংসাসহ পবিত্রতা বর্ণনা করে ও তাঁর প্রতি ঈমান রাখে। আর তারা মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! তোমার অনুগ্রহ ও জ্ঞান সবকিছুতে পরিব্যাপ্ত। অতএব যারা তওবা করে ও তোমার রাস্তায় চলে তাদেরকে তুমি ক্ষমা করো এবং জাহান্নামের শাস্তি থেকে তাদের রক্ষা কর!’ (মুমিন/গাফের ৪০/৭)

৮. ঈমানী শক্তি বৃদ্ধি ও চূড়ান্ত সাফল্যের পথ : ঈমানের পরিপূর্ণতা ও হৃদয়ের জীবন্ততা নিহিত রয়েছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর আনুগত্যের মধ্যে। যখন মানুষ আল্লাহ ও রাসূলের আহবানে সাড়া দেয়, তখন তার অন্তর জেগে ওঠে জীবনের আসল অর্থে আল্লাহর আনুগত্যে। আল্লাহ বলেন, يَآأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَجِيبُوا لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আহবানে সাড়া দাও, যখন তিনি তোমাদের আহবান করেন সেই বিষয়ের দিকে যা তোমাদেরকে জীবন দান করে’ (আনফাল ৮/২৪)

এই জীবনদানের অর্থ কেবল দেহের প্রাণ নয়, বরং ঈমানের আলোকিত প্রাণ, যা মানুষকে পাপ, বিভ্রান্তি ও হতাশা থেকে মুক্ত করে সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করে। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশ মেনে চলে, তাঁর ভয়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে ও গুনাহ থেকে বিরত থাকে, সে-ই প্রকৃত সফল। আল্লাহ বলেন,وَمَنْ يُطِعِ اللهَ وَرَسُولَهُ وَيَخْشَ اللهَ وَيَتَّقْهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ- ‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে ও তাঁর অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাকে, তারাই সফলকাম’ (নূর ২৪/৫২)

আনুগত্যের এই চেতনা শুধু মুখের কথা নয়; তা প্রকাশ পায় কথায়, কর্মে ও চরিত্রে। তাই আল্লাহ নির্দেশ দেন,يَآأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَقُولُوا قَوْلاً سَدِيدًا، يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَالَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ- ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল। তিনি তোমাদের কর্মসমূহকে সংশোধন করবেন ও তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন’ (আহযাব ৩৩/৭০-৭১)। অতএব ঈমানের দৃঢ়তা ও সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হ’ল আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর নির্দেশ মেনে জীবন গঠন করা।

৯. সুপথ প্রাপ্তি : আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর আনুগত্যে সঠিক পথের সন্ধান পাওয়া যায়। পাওয়া যায় রাহে জান্নাতের সঠিক দিশা। যেমন আল্লাহ বলেন,قُلْ أَطِيعُوا اللهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنَّمَا عَلَيْهِ مَا حُمِّلَ وَعَلَيْكُمْ مَا حُمِّلْتُمْ وَإِنْ تُطِيعُوهُ تَهْتَدُوا وَمَا عَلَى الرَّسُولِ إِلاَّ الْبَلاَغُ الْمُبِينُ- ‘বল, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর ও রাসূলের আনুগত্য কর। অতঃপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তাহ’লে রাসূলের দায়িত্বের জন্য তিনি দায়ী হবেন এবং তোমাদের দায়িত্বের জন্য তোমরা দায়ী হবে। আর যদি তোমরা তার আনুগত্য কর, তাহ’লে তোমরা সুপথ প্রাপ্ত হবে। বস্ত্তত রাসূলের উপর দায়িত্ব হ’ল সুস্পষ্টভাবে কেবল আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেওয়া’ (নূর ২৪/৫৪) (ক্রমশঃ)

-ড. ইহসান ইলাহী যহীর

[প্রিন্সিপ্যাল, জামে‘আ দারুত তাওহীদ, দহুলিয়া, পালাখাল, কচুয়া, চাঁদপুর]

 

[1]. আহমাদ হা/১৫১৫৭; বায়হাক্বী, শু‘আবুল ঈমান হা/১৭৪; মিশকাত হা/১৭৭, সনদ হাসান।

[2]. বুখারী হা/২৯৫৭; মুসলিম হা/১৮৩৫; মিশকাত হা/৩৬৬১।

[3]. মুসলিম হা/৩৪; মিশকাত হা/৯।



বিষয়সমূহ: বিধি-বিধান
আরও