যেভাবে প্রশান্তি ছড়িয়ে দিতেন নবী (ছাঃ) (২য় কিস্তি)

আসাদুল্লাহ আল-গালিব 31 বার পঠিত

(১১) আবু দাহদাহরকে জান্নাতে খেজুর গাছের সুসংবাদ : ধন-সম্পদ মানব জীবনের সৌন্দর্য। সম্পদের আকর্ষণ মানুষকে মোহগ্রস্থ করে রাখে। যখন কেউ আল্লাহর ভালবাসায় নিজের প্রিয় সম্পদ বিলিয়ে দেয়, তখন মনের মধ্যে সাময়িক শূন্যতা তৈরী হয়, হৃদয় একটুখানি হাহাকার করে ওঠে। ঠিক এমনই একমুহূর্তে নবী করীম (ছাঃ) আবু দাহদাহর জন্য জান্নাতে খেজুর গাছের সুসংবাদ দিলেন। একটি সংবাদ যেন হৃদয়ের ক্ষতে প্রশান্তির প্রলেপ মাখিয়ে দিলেন। বিশ্বাস এমন দৃঢ় হ’ল যে, আল্লাহ কখনো দানশীলদের ক্ষতিগ্রস্ত করেন না।

আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, এক ইয়াতীম ছেলে নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! অমুক ব্যক্তির একটি খেজুরগাছ আছে, যা আমার বাগানের প্রাচীরের ভেতরে পড়ে গেছে। আমি যখন দেয়াল তুলতে যাই, গাছটি বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আপনি কি অনুগ্রহ করে তাকে বলবেন, যেন গাছটি আমাকে দিয়ে দেয়, যাতে আমি আমার দেয়ালটি সম্পূর্ণ করতে পারি? রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, ‘তুমি যদি এই গাছটি ওকে দিয়ে দাও, তবে জান্নাতে তোমার জন্য একটি খেজুরগাছ থাকবে’। কিন্তু সেই ব্যক্তি গাছটি ছাড়তে রাযী হ’ল না। এ কথা শুনে আবু দাহদাহ (রাঃ) এগিয়ে এলেন। তিনি সেই ব্যক্তির কাছে গিয়ে বললেন, তুমি কি তোমার ঐ একটি খেজুরগাছ আমার পুরো বাগানের বিনিময়ে বিক্রি করবে? লোকটি রাযী হ’ল। এরপর আবু দাহদাহ (রাঃ) নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার পুরো বাগান দিয়ে ঐ খেজুরগাছটি কিনে নিয়েছি। নবী করীম (ছাঃ) আনন্দে বললেন, তাহ’লে সেটি ঐ ইয়াতীম ছেলেটিকে জন্য দান করে দাও। আমি তা তাকে দিয়ে দিয়েছি। এরপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বারবার বলতে লাগলেন, ‘আবু দাহদাহর জন্য জান্নাতে কত যে বিশাল-সুসমৃদ্ধ খেজুরগাছ অপেক্ষা করছে’!

এরপর আবু দাহদাহ (রাঃ) নিজের ঘরে ফিরে এসে স্ত্রীকে বললেন, হে উম্মু দাহদাহ! বাগান থেকে বেরিয়ে আস। আমি বাগানটি বিক্রি করে দিয়েছি, জান্নাতে একটি খেজুরগাছের বিনিময়ে। স্ত্রী তখন উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললেন, অভিনন্দন! তুমি তো চমৎকার একটি বাণিজ্য করেছ! কত লাভজনক এই ক্রয়-বিক্রয়!।[1]

যখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আবু দাহদাহ (রাঃ)-এর নিঃস্বার্থ ত্যাগ, আন্তরিকতা আর আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দ্রুত সাড়া দেওয়ার দৃশ্য দেখলেন, তিনি তৎক্ষণাৎ তার হৃদয়কে জুড়িয়ে দিলেন এমন এক অমর বাণীতে, যা যুগে যুগে ত্যাগীদের হৃদয়ে সান্তনার সুধা ঢেলে দেয়,كَمْ مِنْ عَذْقٍ رَدَاحٍ لأَبِى الدَّحْدَاحِ فِى الْجَنَّةِ ‘আবু দাহদাহের জন্য জান্নাতে কত যে বিশাল-সুসমৃদ্ধ খেজুরগাছ অপেক্ষা করছে! এই এক বাক্যেই নবী করীম (ছাঃ) যেন তার হৃদয়ের সমস্ত ক্লান্তি মুছে দিলেন, ত্যাগের আগুনে দগ্ধ আত্মায় ঢেলে দিলেন প্রশান্তির স্নিগ্ধ ছায়া। তিনি যেন বললেন, ‘তুমি যে ত্যাগ করেছ, তা বৃথা যাবে না; আল্লাহর কাছে তোমার এই দান অমূল্য, এর বিনিময় জান্নাতের বাগান।

শিক্ষা : যখন আপনার অন্তর আল্লাহর পথে কিছু ত্যাগ করতে চায়, তখন মনে রাখবেন, আপনি কিছু হারান নি; বরং আপনি জান্নাতের বীজ বপন করছেন। যার ফল একদিন পাবেন এমন বাগানে, যেখানে দুঃখ নেই, ভয় নেই, শুধু শান্তি। আর আল্লাহর সন্তুষ্টির ছায়া। আল্লাহ নিজেই বলেছেন,وَمَا أَنْفَقْتُمْ مِنْ شَيْءٍ فَهُوَ يُخْلِفُهُ وَهُوَ خَيْرُ الرَّازِقِينَ ‘আর তোমরা যা কিছু (তাঁর পথে) ব্যয় করবে, তিনি তার প্রতিদান দিবেন। আর তিনিই শ্রেষ্ঠ রূযীদাতা’ (সাবা ৩৪/৩৯)

হে দানশীল হৃদয়! মনে রেখ আল্লাহর পথে দেওয়া প্রতিটি রক্তকণাই জান্নাতের চিরস্থায়ী বাগানে একেকটি চারা। আর তার মালিকানায় আবু দাহদাহর অনুসারী হিসাবে তোমার নাম লেখা।

১২. হাতেব ইবনু আবী বালতা‘আহর প্রতি সহমর্মিতা : নবী করীম (ছাঃ) কখনো এক মুহূর্তের ভুলকে পুরো জীবনের আমল ও ঈমানের ইতিহাসের সঙ্গে এক করে দেখেননি। তিনি হাতেব বিন আবু বালতা‘আহর (রাঃ)-এর পূর্বের ত্যাগ ও বদরের অংশগ্রহণকে ভুলে যাননি; বরং সেটিকেই করলেন তার সুফারিশের পাল্লা। তিনি শিখিয়ে দিলেন, ন্যায়বিচার মানে শুধু অপরাধ দেখা নয়, বরং তার পেছনের ঈমান ও ইতিহাসও বিবেচনা করা।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আলী, যুবায়ের ও মিক্বদাদ (রাঃ)-কে রওযাতু খাক নামক স্থানে পাঠালেন, যেখানে এক নারী মক্কার মুশরিকদের কাছে গোপনে একটি চিঠি নিয়ে যাচ্ছিল। ছাহাবীগণ তাকে চিঠি দিতে বললে সে অস্বীকার করে। পরে চুলের ভাঁজে লুকানো চিঠিটি বের করে। এতে ছিল মুশরিকদের কাছে মুসলিমদের পরিকল্পনার খবর জানিয়ে হাতেব ইবনু আবী বালতা‘আর লেখা পত্র। নবী করীম (ছাঃ) তাকে কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, আমি কুরায়েশদের লোক নই; তবে মক্কায় আমার পরিবার-সম্পত্তি রয়েছে। তাদের অত্যাচার থেকে এগুলো রক্ষার আশায় আমি এটি করেছি। কিন্তু কোনোরূপ কুফর, বিশ্বাসহীনতা বা ইসলাম ত্যাগের উদ্দেশ্যে নয়। নবী করীম (ছাঃ) বললেন, সে সত্য বলেছে। তখন ওমর (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে অনুমতি দিন, আমি এই মুনাফিকের গর্দান উড়িয়ে দিই। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, সে তো বদরের যোদ্ধা। আর তুমি কী জানো না, আল্লাহ বদরের সহযোদ্ধাদের সম্পর্কে কি বলেছেন, اعْمَلُوا مَا شِئْتُمْ فَقَدْ وَجَبَتْ لَكُمُ الْجَنَّةُ ‘তোমরা যা ইচ্ছা করো, তোমাদের জন্য জান্নাত অবশ্যই নিশ্চিত করে দেওয়া হয়েছে’।[2]

এই কথায় মুহূর্তেই পরিবেশ নরম হয়ে গেল। তিনি শিখিয়ে দিলেন, মানুষের এক মুহূর্তের ভুল তার সারা জীবনের ঈমানী ত্যাগকে মুছে দিতে পারে না। যে হৃদয় একদিন বদরের ময়দানে প্রাণের বিনিময়ে ঈমান রক্ষা করেছিল, তার দুর্বলতাকেও আল্লাহ দয়া ও ক্ষমার চাদরে ঢেকে রাখেন।

হাতেব বিন আবু বালতা‘আহর একটি ভুল তার অতীতের সব অবদান ঢেকে দিতে পারত। কিন্তু নবীর একটিমাত্র করুণাময় বাক্যই ফিরিয়ে দিল তার মর্যাদা, মুছে দিল কলঙ্কের ছায়া। ফলত, তিনি রইলেন সেই সৌভাগ্যবানদের কাতারে, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ নিজেই ঘোষণা করেছেন ক্ষমা ও সন্তুষ্টির।

শিক্ষা : যদি কোনো দিন আপনার প্রিয় ব্যক্তি বা বন্ধুটি ভুল করে বসে, অথবা আপনার স্নেহাষ্পদ বা অধীনস্থ কেউ, এর ফলে তার অতীতকে ভেঙে চূর্ণ করে দিবেন না। বরং মনে করুন, একদিন সে ভালো কিছু করেছিল। শুধুমাত্র আপনার জন্য তার জীবনে কোনো এক ‘বদর’ ছিল, যার জন্য সে ক্ষমার যোগ্য। কারণ আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই থাকে এক ‘বদর’। যে ত্যাগ বা সৎকাজের কারণে আল্লাহ আমাদের ওপর দয়া করেন, এবং বলেন, قَدْ غَفَرْتُ لَكُمْ ‘আমি তোমাকে ক্ষমা করেছি’ (বুখারী হা/৩৯৮৩)

১৩. গোলাম আনাসের সাথে রাসূল (ছাঃ)-এর আচরণ : রাসূল (ছাঃ) হৃদয় স্পর্শী কোমলতাপূর্ণ এমন আচরণের অধিকারী ছিলেন, যা কোনো যবরদস্তি বা কঠোর শাসনের চেয়ে অনেক গভীর প্রভাব ফেলত। আনাস (রাঃ) তখন কেবল এক শিশু, কিন্তু রাসূল (ছাঃ)-এর কোমল শিক্ষা তার হৃদয়ে চিরস্থায়ীভাবে দাগ কেটেছিল। সেই মুহূর্ত, যখন রাসূল (ছাঃ) তার কাঁধে হাত রাখলেন এবং হাসতে হাসতে তাকে প্রশ্ন করলেন। তা একটি অমলান শিক্ষা হয়ে রইল। একটি চিরন্তন উদাহরণ, যা শেখায় কিভাবে মমতা, ধৈর্য ও ভালবাসা মানুষের হৃদয় জয় করে।

আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ছিলেন সবচেয়ে উত্তম চরিত্রের অধিকারী। একদা তিনি আমাকে একটি কাজে যাওয়ার আদেশ করলেন, তখন আমি বললাম, আল্লাহর শপথ আমি যাব না; কিন্তু আমার মনে এ বিশ্বাস ছিল, যে কাজে তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমি সে কাজে যাব। অতঃপর আমি বের হয়ে এমন কিছু বালকদের কাছে এসে পৌঁছলাম, যারা বাজারের মধ্যে খেলাধুলা করছিল। এমন সময় হঠাৎ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) গিয়ে পিছন হ’তে আমার ঘাড়ে হাত রাখলেন। আনাস (রাঃ) বলেন, আমি তার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, তিনি হাসছেন। তখন তিনি স্নেহের সুরে বললেন, হে উনায়েস! যে কাজের জন্য আমি তোমাকে আদেশ করেছিলাম, সেখানে কি তুমি গিয়েছিলে? উত্তরে আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! এই তো আমি এক্ষুণি যাচ্ছি’।[3]

নবী করীম (ছাঃ) তাকে কোন ধমক দেননি, উচ্চস্বরে কখনো তিরস্কারও করেননি। বরং কোমলতা ও হাসির সঙ্গে এগিয়ে এসে বললেন, يَا أُنَيْسُ أَذَهَبْتَ حَيْثُ أَمَرْتُكَ ‘হে উনায়েস! যে কাজের জন্য আমি তোমাকে আদেশ করেছিলাম, সেখানে কি তুমি গিয়েছিলে?

শিক্ষা : শিশুদের শিক্ষা দিন ভালোবাসা ও কোমলতার মাধ্যমে, চিৎকার বা তিরস্কারের মাধ্যমে নয়। কোমল ভাষা, ধীর ধৈর্য ও সহানুভূতি আত্মবিশ্বাস জন্মায়, হৃদয়কে নিরাপদ করে এবং ভালো আচরণের বীজ বুনে। আর চিৎকার বা যবরদস্তি কেবল ভাঙে, হারিয়ে দেয়, আর কোনো স্থায়ী শিক্ষা দেয় না। বরং ঘৃণা ও দূরত্ব তৈরী করে।

১৪. মু‘আবিয়াহ-এর সাথে রাসূল (ছাঃ)-এর কোমলতা : মসজিদে ছালাত চলাকালীন সময় মু‘আবিয়াহ ইবনু হাকাম (রাঃ)-এর একটি ভুল করেছিলেন। কিন্তু রাসূল (ছাঃ) তার সঙ্গে কঠোর ছিলেন না; তিনি তিরস্কারও করলেন না। ছালাতের পর ধীরে ধীরে এক বাবার মতো কোমলভাবে তাকে সংশোধন করলেন। এটি আমাদের শেখায়, শিক্ষায় কোমলতাই সর্বোচ্চ, কঠোরতাপূর্ণ শাসন নয়।

মু‘আবিয়াহ বিন হাকাম (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, একদিন আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সঙ্গে ছালাত আদায় করি। যখন মুছল্লীদের মাঝে একজন হাঁচি দিল, তখন আমি ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বললাম। ফলে লোকজন আমার প্রতি দৃষ্টি ক্ষেপন করল। আমি বললাম, তোমাদের মা সন্তানহারা শোকাহত হৌক। তোমাদের কি হ’ল যে, তোমরা আমার দিকে এমন করে তাকাচ্ছ? মুছল্লীরা আমাকে চুপ করানোর জন্য নিজ নিজ রানের উপর হাত দিয়ে মারতে লাগল। আমি যখন লক্ষ্য করলাম, তারা আমাকে চুপ থাকতে বলছে। তখন আমি চুপ হয়ে গেলাম। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ছালাত শেষ করলেন। আমার মাতা-পিতা তাঁর জন্য উৎসর্গ হৌক। শিক্ষাদানে তার চেয়ে এত চমৎকার কোন শিক্ষক তার পরবর্তীকালে বা তার পূর্ববর্তীকালে আমি দেখিনি। তিনি আমাকে না ধমক দিলেন, না মারলেন, না বকলেন। তিনি শুধু এতটুকু বললেন, এ ছালাতে মানবীয় কথাবার্তা বলা উপযুক্ত নয়। ছালাত হ’ল তাসবীহ, তাকবীর ও কুরআন পড়ার নাম’। [4]

এই ঘটনাটি মু‘আবিয়া (রাঃ)-এর মনে গভীর ছাপ ফেলে। তিনি সারাজীবন স্মরণ করেন এবং বলেন,مَا رَأَيْتُ مُعَلِّمًا قَبْلَهُ وَلَا بَعْدَهُ أَحْسَنَ تَعْلِيمًا مِنْهُ ‘তার পূবে বা পরে কোন শিক্ষককে আমি তার চেয়ে উত্তম রূপে শিক্ষা দিতে দেখিনি’। এই কোমল ও সংযমী শিক্ষার পদ্ধতিতে ছাহাবায়ে কেরাম বড় হয়েছেন, ভয়ের মধ্যে নয়।

শিক্ষা : যখন আপনি কাউকে অজ্ঞতা বা ভুল করতে দেখেন, ধৈর্য ও কোমলতার সঙ্গে তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন। কখনো উচ্চস্বরে তিরস্কার করবেন না, কারণ মন মানুষকে সেই দিকে টানে, যারা তাদের সৎভাবে বুঝায়। আর তাদের থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, যারা লজ্জা দেয় বা ঘৃণা সৃষ্টি করে।

এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মন্দ কথা বা আচরণ কিংবা কোনো তিরস্কার মানুষের অন্তর ভেঙে দিতে পারে। কোমলতা, সদয় ও সহানুভূতি হ’ল সেই শক্তি, যা হৃদয়কে জীবন্ত রাখে। আপনি যে মানুষদের সম্মান দিয়ে আলোকিত করবেন, তারা সজীব ও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। আর তাদের মধ্যে আপনার প্রতি ভালোবাসার বীজ অঙ্কুরিত হবে।

১৫. মসজিদে পেশাবকারী বেদুঈনের সাথে রাসূলের আচরণ : নবী করীম (ছাঃ) দুইবার অজ্ঞ এক বেদুঈনের সঙ্গে আচরণ করেছিলেন পরম কোমলতা ও মমতার সঙ্গে। প্রথমবার, যখন তার দো‘আ বা বক্তব্যে ভুল হয়েছিল, নবী (ছাঃ) অবমাননা বা কটাক্ষ করলেন না; বরং ধীরে ধীরে, বিনয় ও কোমলতার সঙ্গে তা সংশোধন করলেন। দ্বিতীয়বার, যখন সে মসজিদে ভুল করল, নবী করীম (ছাঃ) কাউকেই তার প্রতি অবমাননা করতে দেননি। বরং কোমলতার সঙ্গে ভুলটি ঠিক করলেন, যেন তার হৃদয় ভেঙে না যায়।

আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, এক বেদুঈন এসে মসজিদে (নববীতে) প্রবেশ করল। নবী করীম (ছাঃ) তখন (ঐ স্থানে) বসা ছিলেন। লোকটি ছালাত আদায় করল। তারপর সে ছালাত শেষে বলল, হে আল্লাহ! তুমি আমার উপর ও মুহাম্মাদের উপর অনুগ্রহ কর; আমাদের সাথে আর কাউকে অনুগ্রহ করো না। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তুমি প্রশস্ত রহমতকে সংকীর্ণ করে দিলে। লোকটি কিছুক্ষণের মধ্যে মসজিদে পেশাব করে দিল। লোকেরা দ্রুত তার দিকে এগিয়ে গেল (আক্রমণ করার জন্য)। তখন নবী করীম (ছাঃ) বললেন, তার পেশাবের উপর এক বালতি পানি ঢেলে দাও। তিনি বললেন,إِنَّمَا بُعِثْتُمْ مُيَسِّرِينَ وَلَمْ تُبْعَثُوا مُعَسِّرِينَ- ‘তোমাদেরকে সহজ পথ অবলম্বনকারী করে পাঠানো হয়েছে; কঠোরতা করার জন্য পাঠানো হয়নি’।[5]

এই অজ্ঞ বেদুঈন মসজিদ থেকে বের হ’ল সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থায়। সে ভুল করার পরও নবী করীম (ছাঃ) তাকে বুঝিয়ে দিলেন, ভুল করলেও মর্যাদা হারিয়ে যায় না। মসজিদ শিক্ষার স্থান, ভয় বা তিরস্কারের নয়। এভাবে তিনি দেখালেন, মানুষের হৃদয় জয় করার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হ’ল দয়া, সদয় আচরণ এবং কোমল ভাষা। আর এজন্য আল্লাহ সুবহানাহু তা‘আলা নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে উদ্দেশ্যে করে বলেন,فَبِمَا رَحْمَةٍ مِنَ اللهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ، ‘বস্ত্তত আল্লাহর অনুগ্রহের কারণেই তুমি তাদের প্রতি কোমলহৃদয় হয়েছ। যদি তুমি রূঢ়ভাষী ও কঠিন হৃদয়ের হ’তে, তাহ’লে তারা তোমার পাশ থেকে সরে যেত’ (আলে ইমরান ৩/১৫৯)

শিক্ষা : যখন আমরা নতুন বা অজ্ঞ মানুষকে দেখি, তাদের প্রতি কখনো কঠোরতা দেখাবো না। বরং কোমলতা, মমতা ও সহানুভূতির মাধ্যমে তাদের অন্তর জেতার চেষ্টা করব। কোমলতা ও ভালবাসা আত্মবিশ্বাস জন্মায় এবং নৈতিক পথের প্রতি আগ্রহ বাড়ায়। কঠোরতা শুধু ঘৃণা ও দূরত্ব সৃষ্টি করে।

১৭. ছোট্ট আবু উমায়েরের প্রতি রাসূলের স্নেহ :

আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) সবচেয়ে অধিক সদাচারী ছিলেন। আমার এক ভাই ছিল তাকে আবু উমায়ের বলে ডাকা হ’ত। আমার ধারণা যে, সে তখন মায়ের দুধ খেত না। যখনই সে তাঁর নিকট আসত, তিনি বলতেন, হে আবু উমায়ের! কী করছে তোমার নুগায়ের? সে নুগায়ের পাখিটা নিয়ে খেলত। আর যখন ছালাতের সময় হ’ত, আর তিনি ঐসময় আমাদের ঘরে থাকতেন, তখন তার নীচে যে বিছানা থাকত, তাতে একটু পানি ছিটিয়ে ঝেড়ে দেয়ার জন্য আমাদের আদেশ দিতেন। তারপর তিনি ছালাতের জন্য দাঁড়াতেন এবং আমরাও তার পেছনে দাঁড়াতাম। আর তিনি আমাদের নিয়ে ছালাত আদায় করতেন’।[6]

একটি ছোট শিশু তার পাখিটি হারিয়ে খুবই দুঃখিত ছিল। কিন্তু নবী করীম (ছাঃ) তাকে অগ্রাহ্য করলেন না; বরং তিনি তার অনুভূতিতে ভাগীদার হলেন, কোমলতায় ও স্নেহভরা প্রশ্নের মাধ্যমে শিশুর ছোট্ট হৃদয়কে সান্তনা দিলেন। কেননা কখনও কখনও হালকা হাস্যরসও দুঃখকে ভুলিয়ে দিতে সাহায্য করে।

নবী করীম (ছাঃ)-এর এই শব্দগুলো কেবল দয়ালু কথা নয়; এটি ছিল শিক্ষামূলক সান্তনা, এমনভাবে যে শিশুটি তা সহজেই বুঝতে পারে। তিনি তার গুরুত্ব ও মর্যাদা অনুভব করলেন।

(ক্রমশঃ)

[কেন্দ্রীয় অর্থ সম্পাদক, বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ]


[1]. আহমাদ হা/১২৫০৪ সনদ ছহীহ-শু‘আইব আরনাউত্ব।

[2]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৬২১৬।

[3]. মুসলিম হা/২৩১০; মিশকাত হা/৫৮০২।

[4]. মুসলিম হা/৫৩৭; মিশকাত হা/৯৭৮।

[5]. তিরমিযী হা/১৪৭।

[6]. বুখারী হা/৬২০৩।



আরও