আনুগত্যের মর্যাদা ও অবাধ্যতার পরিণতি (শেষ কিস্তি)

ইহসান ইলাহী যহীর 33 বার পঠিত

(শেষ কিস্তি)

১০. আল্লাহর রহমত প্রাপ্তি : আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর আনুগত্যে আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহ পাওয়া যায়। আল্লাহ বলেন,وَأَطِيْعُوْا اللهَ وَالرَّسُوْلَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُوْنَ- ‘তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য কর, যাতে তোমরা অনুগ্রহ প্রাপ্ত হ’তে পার’ (আলে ইমরান ৩/১৩২)। অন্যত্র তিনি বলেন,وَأَقِيْمُوْا الصَّلاَةَ وَآتُوْا الزَّكَاةَ وَأَطِيْعُوْا الرَّسُوْلَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُوْنَ- ‘তোমরা ছালাত কায়েম কর, যাকাত আদায় কর এবং (আল্লাহর) রাসূলের আনুগত্য কর। যাতে তোমরা অনুগ্রহ প্রাপ্ত হ’তে পার’ (নূর ২৪/৫৬)

তিনি বলেন,وَالْمُؤْمِنُوْنَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَآءُ بَعْضٍ يَأْمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُقِيْمُوْنَ الصَّلاَةَ وَيُؤْتُوْنَ الزَّكَاةَ وَيُطِيْعُوْنَ اللهَ وَرَسُوْلَهُ أُوْلَئِكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللهُ إِنَّ اللهَ عَزِيْزٌ حَكِيْمٌ- ‘আর মুমিন পুরুষ ও নারীগণ পরস্পরের বন্ধু। তারা সৎকাজের আদেশ দেয় ও অসৎ কাজে নিষেধ করে। তারা ছালাত কায়েম করে ও যাকাত আদায় করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। এসব লোকের প্রতি আল্লাহ অবশ্যই অনুগ্রহ বর্ষণ করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাপরাক্রান্ত ও প্রজ্ঞাময়’ (তওবা ৯/৭১)। সুতরাং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর আনুগত্যে আমাদের সার্বিক জীবন অবিচল থাকতে পারে, তবে উভয়জগতে আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহ পাওয়া যাবে। 

১১. আল্লাহর ভালোবাসা ও গোনাহ মাফের নিশ্চয়তা : আল্লাহর ভালোবাসার সাথে রাসূল (ছাঃ)-এর পূর্ণ আনুগত্য ও অনুসরণ শর্তযুক্ত। অতএব রাসূল (ছাঃ)-এর পূর্ণ আনুগত্য ও অনুসরণেই আল্লাহর ভালোবাসা প্রাপ্তি ও গোনাহ মাফের গ্যারান্টি রয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেন,قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّوْنَ اللهَ فَاتَّبِعُوْنِيْ يُحْبِبْكُمُ اللهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوْبَكُمْ وَاللهُ غَفُوْرٌ رَّحِيْمٌ- ‘বলে দাও, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তবে আমার অনুসরণ কর। তাহ’লে আল্লাহ তোমাদের ভালবাসবেন ও তোমাদের গোনাহ সমূহ মাফ করে দিবেন। বস্ত্তত আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়াবান’ (আলে ইমরান ৩/৩১)

১২. রাসূল (ছাঃ)-এর অনুসারীগণ সফলকাম : যারা রাসূল (ছাঃ)-এর উপরে পূর্ণভাবে বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং সুন্নাহর পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ করেছে তারাই চূড়ান্ত সফলকাম।

আল্লাহ বলেন,اَلَّذِيْنَ يَتَّبِعُوْنَ الرَّسُوْلَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِيْ يَجِدُوْنَهُ مَكْتُوْبًا عِنْدَهُمْ فِيْ التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيْلِ، يَأْمُرُهُمْ بِالْمَعْرُوْفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَآئِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلاَلَ الَّتِيْ كَانَتْ عَلَيْهِمْ، فَالَّذِيْنَ آمَنُوْا بِهِ وَعَزَّرُوْهُ وَنَصَرُوْهُ وَاتَّبَعُوْآ آلنُّوْرَ الَّذِيْ أُنْزِلَ مَعَهُ أُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ- ‘যারা এই রাসূলের আনুগত্য করে যিনি নিরক্ষর নবী, যার বিষয়ে তারা তাদের কিতাব তাওরাত ও ইনজীলে লিখিত পেয়েছে। যিনি তাদেরকে সৎকাজের আদেশ দেন ও অসৎকাজে নিষেধ করেন। যিনি তাদের জন্য পবিত্র বস্ত্ত সমূহ হালাল করেন ও অপবিত্র বস্ত্ত সমূহ হারাম করেন এবং তাদের উপর থেকে বোঝা ও বন্ধন সমূহ নামিয়ে দেন যা তাদের উপরে ছিল। অতএব যারা তার উপরে বিশ্বাস স্থাপন করেছে, তাকে শত্রু থেকে প্রতিরোধ করেছে ও তাকে সাহায্য করেছে এবং সেই জ্যোতির (সুন্নাহর) অনুসরণ করেছে যা তার (কুরআনের) সাথে নাযিল হয়েছে, তারাই হ’ল সফলকাম’ (আ‘রাফ ৭/১৫৭)। তিনি বলেন,إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِيْنَ إِذَا دُعُوْآ إِلَى اللهِ وَرَسُوْلِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَنْ يَّقُوْلُوْا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ- ‘মুমিনদের কথা তো কেবল এটাই হ’তে পারে যে, যখন তাদেরকে আল্লাহ ও তার রাসূলের দিকে আহবান করা হয় তাদের মধ্যে ফায়ছালা করে দেওয়ার জন্য, তখন তারা বলবে আমরা শুনলাম ও মান্য করলাম। আর এরাই হ’ল সফলকাম’ (নূর ২৪/৫১)

১৩. নবী, ছিদ্দীক ও সৎকর্মশীলদের সাথে জান্নাতে অবস্থান : আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর সর্বোচ্চ আনুগত্য করা এক মহা সৌভাগ্যের ব্যাপার। সবার ভাগ্যে এটা জুটে না। ধৈর্যের সাথে যারা দুনিয়ায় আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর আনুগত্য করবে, তারা পরকালে নবী, ছিদ্দীক ও সৎকর্মশীলদের সাথে জান্নাতে অবস্থান করবে। যেমন আল্লাহ বলেন,وَمَنْ يُطِعِ اللهَ وَالرَّسُوْلَ فَأُوْلَئِكَ مَعَ الَّذِيْنَ أَنْعَمَ اللهُ عَلَيْهِمْ مِنَ النَّبِيِّيْنَ وَالصِّدِّيقِيْنَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِيْنَ وَحَسُنَ أُوْلَئِكَ رَفِيْقًا، ذَلِكَ الْفَضْلُ مِنَ اللهِ وَكَفَى بِاللهِ عَلِيْمًا- ‘বস্ত্ততঃ যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, তারা নবী, ছিদ্দীক, শহীদ ও সৎকর্মশীল ব্যক্তিদের সাথী হবে, যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন। আর তারা কতই না সুন্দর সাথী!’ ‘উক্ত অনুগ্রহ হ’ল আল্লাহর পক্ষ হ’তে। আর সর্বজ্ঞ হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট’ (নিসা ৪/৬৯-৭০)। অতএব আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করলে নবী, ছিদ্দীক ও সৎকর্মশীলদের সাথে জান্নাতে অবস্থান করা নিশ্চিত হয়।

অবাধ্যতার পরিণতি

আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতাকারীরা মুনাফিক : শঠতা ও কপটতা নিন্দনীয় জঘন্যতম অপরাধ। আর আল্লাহদ্রোহীরা এতে সবিশেষ পারঙ্গম। কুরআন ও ছহীহ হাদীছ প্রত্যাখ্যান করে কেবল মুনাফিকরা। যেমন আল্লাহ বলেন,وَإِذَا قِيْلَ لَهُمْ تَعَالَوْا إِلَى مَآ أَنْزَلَ اللهُ وَإِلَى الرَّسُوْلِ رَأَيْتَ الْمُنَافِقِيْنَ يَصُدُّوْنَ عَنْكَ صُدُوْدًا- ‘আর যখন তাদেরকে বলা হয়, এসো আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তার দিকে এবং রাসূলের দিকে, তখন তুমি মুনাফিকদের দেখবে যে, তারা তোমার থেকে (লোকদের) পুরোপুরি বাধা দিবে’ (নিসা ৪/৬১)। তিনি বলেন,يَحْلِفُونَ بِاللهِ لَكُمْ لِيُرْضُوكُمْ وَاللهُ وَرَسُولُهُ أَحَقُّ أَنْ يُّرْضُوهُ إِنْ كَانُوا مُؤْمِنِينَ- ‘তারা তোমাদের কাছে এসে আল্লাহর নামে শপথ করে তোমাদের খুশী করার জন্য। অথচ খুশী করার জন্য আল্লাহ ও তার রাসূলই ছিলেন বেশী হকদার, যদি তারা সত্যিকারের মুমিন হ’ত’ (তওবা ৯/৬২)। সুতরাং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতাকারীরা মুনাফিক হিসাবে তারা নিন্দিত ও ধিকৃত হয়।

রাসূলের আনুগত্য না করায় বিপর্যয় : ওহোদ যুদ্ধে শত্রুসেনারা যাতে পিছন দিক থেকে হামলা করতে না পারে, সেজন্য রাসূল (ছাঃ) দক্ষিণ-পূর্বে প্রায় ১৫০ মিটার দূরে সংকীর্ণ ও স্বল্পোচ্চ গিরিপথে আউস গোত্রের বদরী ছাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনু জুবায়ের আনছারীর নেতৃত্বে ৫০ জনের একটি তীরন্দায দলকে নিযুক্ত করেনতাদেরকে বলে দেওয়া হয় যে, জয় বা পরাজয় যাই-ই হৌক, তারা যেন পরবর্তী নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত ঐ স্থান ত্যাগ না করে এবং শত্রুপক্ষ যেন কোনভাবেই এপথ দিয়ে প্রবেশ করতে না পারে। তিনি বলেন,إِنْ رَأَيْتُمُونَا تَخْطَفُنَا الطَّيْرُ، فَلاَ تَبْرَحُوا مَكَانَكُمْ هَذَا حَتَّى أُرْسِلَ إِلَيْكُمْ، وَإِنْ رَأَيْتُمُونَا هَزَمْنَا الْقَوْمَ وَأَوْطَأْنَاهُمْ فَلاَ تَبْرَحُوا حَتَّى أُرْسِلَ إِلَيْكُمْ ‘এমনকি তোমরা যদি আমাদের মৃত লাশে পক্ষীকুলকে ছোঁ মারতে দেখ, তথাপি আমি তোমাদের কাছে কাউকে না পাঠানো পর্যন্ত তোমরা উক্ত স্থান ছেড়ে আসবে না। যদি তোমরা দেখ যে, আমরা তাদেরকে পরাজিত করেছি এবং তাদের পদদলিত করছি, তথাপি তোমরা উক্ত স্থান ছেড়ে আসবে না। যতক্ষণ না আমি তোমাদের কাছে কাউকে পাঠাই’।[1] কেননা শত্রুপক্ষ পরাজিত হ’লে কেবলমাত্র এপথেই তাদের পুনরায় হামলা করার আশংকা ছিল। দূরদর্শী সেনানায়ক রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সেটা বুঝতে পেরেই তাদেরকে এমন কঠোর হুঁশিয়ারী প্রদান করেন।

ওহোদ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী প্রথম দিকে বিজয়ী হয় এবং শত্রুবাহিনী ময়দান ছেড়ে পালিয়ে যায়। সেসময় অধিকাংশ তীরন্দায রাসূল (ছাঃ) ও দলনেতা আব্দুল্লাহ ইবনু জুবায়রের আদেশ অমান্য করে ময়দানে ছুটে যায়। তীরন্দাযগণের এই মারাত্মক ভুলের কারণে অরক্ষিত গিরিসংকট দিয়ে শত্রুবাহিনী অতর্কিতে ময়দানে ঢুকে পড়ে। যাতে মুসলিম বাহিনী চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিজে আহত হন। তাঁর দান্দান মুবারক শহীদ হয়। এছাড়া মুসলিম বাহিনীর সর্বমোট ৭০ জন শাহাদাত বরণ করেন।[2]

আনুগত্য না করলে ঈমান ভঙ্গ হয় : আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুগত্য করা ফরয। কুরআন ও ছহীহ হাদীছ থেকে জেনে-বুঝে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া কুফরী। যেমন আল্লাহ বলেন, وَيَقُولُونَ آمَنَّا بِاللهِ وَبِالرَّسُولِ وَأَطَعْنَا ثُمَّ يَتَوَلَّى فَرِيقٌ مِّنْهُمْ مِنْم بَعْدِ ذَالِكَ وَمَآ أُولَئِكَ بِالْمُؤْمِنِينَ- ‘আর তারা বলে, আমরা আল্লাহ ও রাসূলের উপর ঈমান এনেছি ও তাদের আনুগত্য করি। অতঃপর তাদের একদল মুখ ফিরিয়ে নেয়। বস্ত্ততঃ ওরা মুমিন নয়’ (নূর ২৪/৪৭)। বর্ণিত আয়াতে ‘ওরা মুমিন নয়’ বলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুগত্য না করলে ঈমান ভঙ্গ হওয়ার দলীল রয়েছে।

রাসূল (ছাঃ)-এর বিরোধিতাকারীদের আমল বরবাদ হয় : আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যকারীদের আমল জারী থাকে। পক্ষান্তরে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের কাজের বিনিময় তারা পরকালে পাবে না। বরং তাদের আমল বরবাদ হবে। যেমন আল্লাহ বলেন,يَآأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَلاَ تُبْطِلُوآ أَعْمَالَكُمْ- ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর ও আনুগত্য কর তার রাসূলের। আর তোমরা তোমাদের আমলগুলিকে বিনষ্ট করোনা’ (মুহাম্মাদ ৪৭/৩৩)

অন্যত্র আল্লাহ বলেন,إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا وَصَدُّوا عَنْ سَبِيلِ اللهِ وَشَآقُّوا الرَّسُولَ مِنْم بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمُ الْهُدَى لَنْ يَّضُرُّوا اللهَ شَيْئًا وَّسَيُحْبِطُ أَعْمَالَهُمْ- ‘নিশ্চয়ই যারা কুফরী করে ও মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিরত রাখে এবং তাদের নিকট হেদায়াত স্পষ্ট হয়ে যাবার পরেও রাসূলের বিরোধিতা করে, তারা কখনোই আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আর আল্লাহ সত্বর তাদের সকল কর্ম নিষ্ফল করে দিবেন’ (মুহাম্মাদ ৪৭/৩২)। তিনি বলেন,يَآأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لاَ تَرْفَعُوآ أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ وَلاَ تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَنْ تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنْتُمْ لاَ تَشْعُرُونَ- ‘হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের উপর তোমাদের কণ্ঠস্বরকে উঁচু করো না এবং তোমরা পরস্পরে যেভাবে উঁচুস্বরে কথা বল, তার সাথে সেরূপ উঁচুস্বরে কথা বলো না। এতে তোমাদের কর্মফল সমূহ বিনষ্ট হবে। অথচ তোমরা বুঝতে পারবে না’ (হুজুরাত ৪৯/২)। উপরোক্ত আয়াতসমূহ থেকে আমরা জানতে পারলাম যে, রাসূল (ছাঃ)-এর বিরোধিতাকারীদের আমল ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যায় এবং পরকালে তাদের কর্মসমূহ বরবাদ হয়ে যাবে।

ফিৎনা ও আযাবে নিপতিত হওয়া : চুপিসারে ও অজ্ঞাতসারে কুরআন-হাদীছের বিধান লঙ্ঘন করা যাবে না। এতে আল্লাহর রহমত-বরকত উঠে যায় এবং ফিৎনা ও আযাব নিপতিত হয়। যেমন আল্লাহ বলেন,لاَ تَجْعَلُوا دُعَآءَ الرَّسُولِ بَيْنَكُمْ كَدُعَآءِ بَعْضِكُمْ بَعْضًا قَدْ يَعْلَمُ اللهُ الَّذِينَ يَتَسَلَّلُونَ مِنْكُمْ لِوَاذًا فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ- ‘তোমরা রাসূলের আহবানকে তোমাদের পরস্পরের প্রতি আহবানের ন্যায় গণ্য করো না। আল্লাহ তাদেরকে জানেন যারা তোমাদের মধ্য থেকে চুপিসারে চলে যায়। অতএব যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা এ বিষয়ে সাবধান হৌক যে, ফিৎনা তাদেরকে গ্রাস করবে অথবা মর্মন্তুদ শাস্তি তাদের উপর আপতিত হবে’ (নূর ২৪/৬৩)। তিনি আরও বলেন, وَمَآ آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا وَاتَّقُوا اللهَ إِنَّ اللهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ- ‘আর রাসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত হও। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ কঠিন শাস্তিদাতা’ (হাশর ৫৯/৭)

পথভ্রষ্টতা : রাসূল (ছাঃ)-এর বিরোধিতা করার কোন সুযোগ মুমিনের নেই। যদি কোন মুমিন রাসূল (ছাঃ)-এর বিরোধিতা করে, তবে সে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে নিপতিত হবে। আল্লাহ বলেন,وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَّلاَ مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَّكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَّعْصِ اللهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلاَلاً مُّبِينًا- ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোন বিষয়ে ফায়ছালা দিলে কোন মুমিন পুরুষ বা নারীর সে বিষয়ে নিজস্ব কোন ফায়ছালা দেওয়ার এখতিয়ার নেই। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্যতা করবে, সে ব্যক্তি স্পষ্ট ভ্রান্তিতে নিপতিত হবে’ (আহযাব ৩৩/৩৬)

রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘আমার এবং যেসব বিষয় নিয়ে আল্লাহ আমাকে পাঠিয়েছেন তার উদাহরণ হ’ল, যেমন এক ব্যক্তি তার কওমের নিকটে এসে বলল, হে আমার কওম! আমি আমার এই দুই চোখ দিয়ে শত্রুসৈন্য দেখে এসেছি এবং আমি হচ্ছি তোমাদের জন্য ‘দুর্বার সতর্ককারী’। অতএব বাঁচার জন্য জলদি কর, জলদি কর! কওমের একদল লোক তার কথা মেনে নিয়ে রাতেই চলে গেল। তাতে তারা ধীরে সুস্থে যেতে পারল এবং বেঁচে গেল। পক্ষান্তরে যারা তার কথা মিথ্যা মনে করল, তারা ভোর পর্যন্ত নিজেদের স্থানেই রইল। ফলে ভোরেই শত্রু তাদের উপরে আক্রমণ করল এবং তাদেরকে ধ্বংস করল ও সমূলে উৎখাত করল। এটি হ’ল সেই ব্যক্তির উদাহরণ, যে আমার বাধ্যতা অবলম্বন করেছে ও আমি যা এনেছি তার অনুসরণ করেছে এবং সেই ব্যক্তির উদাহরণ, যে আমার অবাধ্য হয়েছে ও আমি যে সত্য তার নিকটে এনেছি, তাকে মিথ্যা বলে গণ্য করেছে’।[3]

তিনি বলেন, ‘আমার উদাহরণ সেই ব্যক্তির ন্যায় যে আগুন জ্বালালো। অতঃপর যখন আগুন তার চারিদিক আলোকিত করল, তখন পতঙ্গ সমূহ এবং ঐসকল কীট যারা আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তারা দলে দলে উক্ত আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল, আর সে তাদের বাধা দিতে লাগল। কিন্তু তারা তাকে পরাজিত করে তাতে ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল, আর সে তাদের বাধা দিতে লাগল। কিন্তু তারা তাকে পরাজিত করে তাতে ঝাঁপিয়ে পড়তে থাকল। সেইরূপ (হে মানবজাতি) আমিও তোমাদের কোমর ধরে টানছি আগুন হ’তে, আর তোমরা তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ছ’। এটি হ’ল ইমাম বুখারীর বর্ণনা। ইমাম মুসলিম অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। তবে তিনি শেষের দিকে বর্ধিতভাবে বর্ণনা করেছেন যে, ‘অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, এটিই হ’ল আমার ও তোমাদের মধ্যকার উদাহরণ। আমি তোমাদের কোমর ধরে তোমাদেরকে আগুন হ’তে টানছি এবং বলছি, ‘আমার দিকে এসো আগুন হ’তে দূরে থাক! আমার দিকে এসো- আগুন হ’তে দূরে থাক! কিন্তু তোমরা আমাকে পরাস্ত করে আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ছ’।[4] উক্ত আয়াত ও হাদীছ থেকে আমরা জানতে পারলাম যে, রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছের বিরোধিতা করার কিংবা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ মুমিনের নেই। যদি কেউ তা করে, তবে সে পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে।

চিরস্থায়ী জাহান্নামের হীনকর শাস্তি : অবাধ্য, হঠকারী, অকৃতজ্ঞরা চিরকালই কৃমি-কীটের ন্যায় জঘন্য। নিকৃষ্ট মন-মানসিকতা তাদের মজ্জাগত স্বভাব। সেকারণ তারা আনুগত্যহীন ও স্বেচ্ছাচারী হয়ে থাকে। তাদের পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,وَمَنْ يَّعْصِ اللهَ وَرَسُولَهُ وَيَتَعَدَّ حُدُودَهُ يُدْخِلْهُ نَارًا خَالِدًا فِيهَا وَلَهُ عَذَابٌ مُّهِينٌ- ‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্যতা করবে এবং তাঁর নির্ধারিত সীমা সমূহ লংঘন করবে, তিনি তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন। সেখানে সে চিরকাল থাকবে। আর তার জন্য রয়েছে হীনকর শাস্তি’ (নিসা ৪/১৪)। তিনি বলেন,وَمَنْ يَّتَوَلَّ يُعَذِّبْهُ عَذَابًا أَلِيمًا- ‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য হ’তে পিঠ ফিরিয়ে নিবে, তিনি তাকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দিবেন’ (ফাৎহ ৪৮/১৭)

যেমন আল্লাহ বলেন,وَمَنْ يَّعْصِ اللهَ وَرَسُولَهُ فَإِنَّ لَهُ نَارَ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَآ أَبَدًا- ‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্যতা করল, তার জন্য জাহান্নাম নির্ধারিত হ’ল। সেখানে সে চিরকাল থাকবে’ (জিন ৭২/২৩)। অন্যত্র তিনি বলেন, يَوْمَئِذٍ يَّوَدُّ الَّذِينَ كَفَرُوا وَعَصَوُا الرَّسُولَ لَوْ تُسَوَّى بِهِمُ الْأَرْضُ وَلاَ يَكْتُمُونَ اللهَ حَدِيثًا- ‘যেদিন অবিশ্বাসীরা ও রাসূলের অবাধ্যরা কামনা করবে, যদি মাটি তাদেরকে নিয়ে সমতল হয়ে যেত! অথচ তারা আল্লাহর নিকট কোন কথাই লুকাতে পারবে না’ (নিসা ৪/৪২)। অন্যত্র তিনি আরও বলেন,إِنَّ الَّذِينَ يُحَآدُّونَ اللهَ وَرَسُولَهُ أُولَئِكَ فِي الْأَذَلِّينَ- ‘নিশ্চয়ই যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা লাঞ্ছিতদের অন্তর্ভুক্ত’ (মুজাদালাহ ৫৮/২০)

আল্লাহ বলেন,أَلَمْ يَعْلَمُوآ أَنَّهُ مَنْ يُّحَادِدِ اللهَ وَرَسُولَهُ فَأَنَّ لَهُ نَارَ جَهَنَّمَ خَالِدًا فِيهَا ذَالِكَ الْخِزْيُ الْعَظِيمُ- ‘তারা কি জানে না, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে, তার জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন, যেখানে সে চিরকাল থাকবে? আর এটাই হ’ল তার জন্য চূড়ান্ত লাঞ্ছনা’ (তওবা ৯/৬৩)। তিনি বলেন,يَوْمَ تُقَلَّبُ وُجُوهُهُمْ فِي النَّارِ يَقُولُونَ يَالَيْتَنَآ أَطَعْنَا اللهَ وَأَطَعْنَا الرَّسُولاَ، وَقَالُوا رَبَّنَآ إِنَّآ أَطَعْنَا سَادَتَنَا وَكُبَرَآءَنَا فَأَضَلُّونَا السَّبِيلاً، رَبَّنَا آتِهِمْ ضِعْفَيْنِ مِنَ الْعَذَابِ وَالْعَنْهُمْ لَعْنًا كَبِيرًا- ‘যেদিন তাদেরকে উপুড়মুখী করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, সেদিন তারা বলবে, হায়! যদি আমরা আল্লাহর আনুগত্য করতাম ও রাসূলের আনুগত্য করতাম!’। ‘আর তারা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আমাদের নেতাদের ও বড়দের আনুগত্য করতাম। ফলে তারাই আমাদের পথভ্রষ্ট করেছিল’ (আহযাব ৩৩/৬৬-৬৮)। উপরোক্ত আলোচনা থেকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্যদের জন্য চিরস্থায়ী জাহান্নামের হীনকর শাস্তির দুঃসংবাদ রয়েছে। আল্লাহ আমাদের হেফাযত করুন- আমীন!

সারকথা : কুরআন ও ছহীহ হাদীছকে পাশ কেটে যাওয়া, ছহীহ হাদীছকে অবজ্ঞা করা, তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা, বাপ-দাদা, সামাজিকতা ও মাযহাবের দোহাই দিয়ে কুরআন-হাদীছের বিধান অমান্য করা কুফরীর শামিল। বরং জেনে-বুঝে ঈমান আনয়ন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পরিপূর্ণ আনুগত্য করা যরূরী। যেমন আল্লাহ বলেন,يَآأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوآ أَطِيعُوا اللهَ وَرَسُولَهُ وَلاَ تَوَلَّوْا عَنْهُ وَأَنْتُمْ تَسْمَعُونَ- ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর এবং তোমরা জেনেশুনে তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না’ (আনফাল ৮/২০)

উপসংহার : একটা নির্বাক প্রাণী তার মনীবের প্রতি সর্বোচ্চ আনুগত্যশীল হয়। প্রশিক্ষিত ঘোড়া মনীবের নির্দেশ পালনার্থে তার জীবন বাজি রেখে শত্রুদলের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে। সুতরাং আশরাফুল মাখলূক্বাত হিসাবে আল্লাহর নির্দেশাবলী পালন করা ও রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর জীবনের সকল দিক ও বিভাগের জীবনাদর্শ বাস্তবায়ন করা আমাদের আবশ্যিক কর্তব্য। আমরা যেন আমাদের সার্বিক জীবনে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পূর্ণাঙ্গ আনুগত্য করতে পারি। মহান আল্লাহ যেন আমাদেরকে সার্বিক জীবনে পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের সকল হুকুম-আহকাম যথাসাধ্য বাস্তবায়নের তাওফীক দান করেন- আমীন!

ড. ইহসান ইলাহী যহীর

[সভাপতি, ‘যুবসংঘ’ ঢাকা-দক্ষিণ ও প্রিন্সিপ্যাল, জামে‘আ দারুত তাওহীদ, দহুলিয়া, পালাখাল, কচুয়া, চাঁদপুর]


[1]. বুখারী হা/৩০৩৯, ‘জিহাদ’ অধ্যায় ১/৪২৬; ফাৎহুল বারী ৭/৪০৩।

[2] . বিস্তারিত দ্র. ‘সীরাতুর রাসূল (ছাঃ), লেখক প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব।

[3]. বুখারী হা/৬৪৮২; মুসলিম হা/২২৮৩; মিশকাত হা/১৪৮।

[4]. বুখারী হা/৬৪৮৩; মুসলিম হা/২২৮৪; মিশকাত হা/১৪৯।



বিষয়সমূহ: বিবিধ
আরও