আশূরায়ে মুহাররম : একটি পর্যালোচনা
মুহাম্মাদ শহীদুল্লাহ
কামাল হোসাইন 38 বার পঠিত
উত্তরণের উপায়
মহান আল্লাহ মানব মনের এই জটিল অনুভূতিগুলোকে অবহেলা করেননি। বরং এমন দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, যা হতাশা ও নিরাশার অন্ধকার দূর করে হৃদয়ে আশার দীপ্তি ছড়িয়ে দেয় এবং অন্তরে নব উদ্যম, আত্মবিশ্বাস ও প্রত্যয় সঞ্চার করে। এভাবে মানুষকে নতুন জীবন-শক্তি দান করে ও জীবনে আশাবাদের আলো জ্বালিয়ে দেয়।
(১) আল্লাহর নির্দেশসমূহ মান্য করা : আমাদের জীবনের পথপ্রদর্শক আল-কুরআন। এতে রয়েছে আদেশ ও নিষেধ, যা মেনে চলা মানুষের কল্যাণের জন্য আবশ্যক। আল্লাহ যা আদেশ করেন, তা সর্বদা মানুষের জন্য উপকারী, আর যা তিনি নিষিদ্ধ করেছেন, তা ক্ষতি ও বিপদ থেকে রক্ষা করার জন্য। আল্লাহ বলেন,وَهَذَاكِتَابٌأَنْزَلْنَاهُمُبَارَكٌفَاتَّبِعُوْهُوَاتَّقُوْالَعَلَّكُمْتُرْحَمُوْنَ- ‘বস্ত্তত এই কিতাব (কুরআন) আমরা নাযিল করেছি, যা বরকতমন্ডিত। সুতরাং তোমরা এটির অনুসরণ কর। আর আল্লাহকে ভয় কর যাতে তোমরা অনুগ্রহ প্রাপ্ত হ’তে পার (আন‘আম ৬/১৫৫)।
আল্লাহ আরও বলেন,قُلْ يَاعِبَادِيَ الَّذِيْنَ أَسْرَفُوْا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوْا مِنْ رَحْمَةِ اللهِ إِنَّ اللهَ يَغْفِرُ الذُّنُوْبَ جَمِيْعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُوْرُ الرَّحِيْمُ- ‘বল, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের উপর যুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিবেন। নিশ্চয় তিনিই তো ক্ষমাশীল ও দয়াবান’ (যুমার ৩৯/৫৩)।
এ আয়াত স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে, কোনো বান্দার গুনাহ যত বড়ই হোক, হতাশা থেকে আল্লাহর রহমতের আশা হারানো কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। ইয়াকূব (আঃ) তার সন্তানদের শিক্ষা দেন,يَابَنِيَّاذْهَبُوْافَتَحَسَّسُوْامِنْيُوْسُفَوَأَخِيْهِوَلَاتَيْأَسُوْامِنْرَوْحِاللَّهِإِنَّهُلَايَيْأَسُمِنْرَوْحِاللَّهِإِلَّاالْقَوْمُالْكَافِرُوْنَ- ‘হে আমার পুত্রগণ! যাও ইউসুফ ও তার ভাইকে ভালভাবে সন্ধান কর এবং আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহর রহমত থেকে কেউ নিরাশ হয় না অবিশ্বাসী সম্প্রদায় ব্যতীত’ (ইউসুফ ১২/৮৭)।
ইয়াকূব (আঃ) আমাদের শিক্ষা দেন যে, যতই বিপদ, কষ্ট বা দুঃখ আসুক, আল্লাহর সাহায্য ও মুক্তির আশা কখনো হারানো উচিত নয়। আল্লাহ আরও সতর্ক করেছেন,وَلَاتُلْقُوْابِأَيْدِيْكُمْإِلَىالتَّهْلُكَةِ ‘আর তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসে নিক্ষেপ করো না’ (বাক্বারাহ ২/১৯৫)। ইবনু জারীর আত-তাবারী এ আয়াতের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন,الْآئِسَ مِنْ رَحْمَةِ اللهِ ِ لِذَنْبٍ سَلَفَ مِنْهُ، مُلْقٍ بِيَدَيْهِ إِلَى التَّهْلُكَةِ، ‘পূর্ববর্তী গুনাহের কারণে আল্লাহর রহমত থেকে হতাশ হয়ে নিজেকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাওয়া’।[1] হতাশা ও নিরাশা এমন একটি বিপজ্জনক মানসিক অবস্থা, যা দুনিয়া ও আখিরাতে ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তাই যদি কেউ হতাশার প্রভাবে হার না মেনে, নিজেকে আল্লাহর আদেশ ও নিষেধের দিকে উদ্দীপিত করে তা মেনে চলে, তাহ’লে তার জন্য বিপদ দূরীভূত হয়ে কল্যাণ আসবে। যখন হতাশা ও নিরাশা প্রভাব বিস্তার করে, তখন আল্লাহর রহমতের অসীম বিস্তার মনে রাখলে আশা ও ধৈর্য ফিরে আসে, মনোবল শক্তিশালী হয় এবং জীবন এগিয়ে যায়।
(২) আল্লাহর অসীম রহমতের উপর বিশ্বাস রাখা : আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে অসংখ্য আয়াতে তাঁর অসীম ও ব্যাপক রহমতের কথা ঘোষণা করেছেন, যা দিয়ে তিনি সৃষ্টি জগৎকে আচ্ছাদিত করে রেখেছেন। তিনি বলেন,وَرَحْمَتِيوَسِعَتْكُلَّشَيْءٍ ‘আর আমার অনুগ্রহ সবকিছুতে পরিব্যাপ্ত’ (আ‘রাফ ৭/১৫৬)। এই আয়াত রহমতের বিস্তৃতি ও সার্বভৌমত্বের চমৎকার নিদর্শন। যদি কোনো মানুষ দুনিয়াতে কোনো লক্ষ্য পূরণের আকাংখা রাখে, কিন্তু সময়ের দীর্ঘতায় তা অর্জন করতে না পারে এবং হতাশার দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন তাকে মনে রাখতে হবে যে, আসমান ও যমীনের মালিক আল্লাহ নিজে তাঁর বান্দাদের প্রতি অগাধ রহমত প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেন,قُلْلِمَنْمَافِيالسَّمَاوَاتِوَالْأَرْضِقُلْلِلَّهِكَتَبَعَلَىنَفْسِهِالرَّحْمَةَ- ‘তুমি বল, নভোমন্ডলে ও ভূমন্ডলে যা কিছু আছে, তার মালিকানা কার? বলে দাও, আল্লাহর। তিনি দয়াকে নিজের উপর বিধিবদ্ধ করে নিয়েছেন’ (আন‘আম ৬/১২)।
যে ব্যক্তি আল্লাহর রহমত থেকে হতাশ হয়, বিশেষ করে যখন সে গুনাহের সাগরে নিজেকে ডুবিয়ে ফেলে, এই আয়াত তার হৃদয়ে আশার দীপ্তি জ্বালায়। আল্লাহ বলেন, كَتَبَرَبُّكُمْعَلَىنَفْسِهِالرَّحْمَةَأَنَّهُمَنْعَمِلَمِنْكُمْسُوءًابِجَهَالَةٍثُمَّتَابَمِنْبَعْدِهِوَأَصْلَحَفَأَنَّهُغَفُورٌرَحِيمٌ ‘তোমাদের প্রতিপালক দয়াশীলতাকে তার নিজের উপর বিধিবদ্ধ করে নিয়েছেন যে, তোমাদের মধ্যে যদি কেউ অজ্ঞতাবশে কোন মন্দকাজ করে, অতঃপর যদি সে তওবা করে ও নিজেকে সংশোধন করে নেয়, তাহ’লে তিনি (তার ব্যাপারে) ক্ষমাশীল ও দয়াবান’ (আন‘আম ৬/৫৪)।
এটি বান্দাদের প্রতি আল্লাহর কোমল আহবান, যে কেউ ফিরে আসে, তাকে আল্লাহ গ্রহণ করবেন; শাস্তি ত্বরান্বিত করবেন না, বরং অসীম রহমত প্রদর্শন করবেন।
নবী আইয়ূব (আঃ)-এর জীবনের দিকে তাকালে আল্লাহর রহমত আরও স্পষ্ট হয়। তিনি আইয়ূব (আঃ)-কে সম্পদ, সন্তান ও শরীরিক কষ্ট দিয়ে পরীক্ষা করেছিলেন। দীর্ঘদিন ধৈর্য ধারণের পর আইয়ূব (আঃ) আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন, নিজেকে দুর্বল ও অসহায় হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং আল্লাহকে সর্বাধিক দয়ালু হিসেবে সম্বোধন করেন। আল্লাহ তার প্রার্থনা কবুল করেন, বিপদ ও কষ্ট দূর করেন, এবং তাকে অনুগ্রহ ও সাফল্য দ্বারা পুনর্গঠন করেন। আল্লাহ বলেন,وَأَيُّوبَإِذْنَادَىرَبَّهُأَنِّيمَسَّنِيَالضُّرُّوَأَنْتَأَرْحَمُالرَّاحِمِينَ- فَاسْتَجَبْنَالَهُفَكَشَفْنَامَابِهِمِنْضُرٍّوَآتَيْنَاهُأَهْلَهُوَمِثْلَهُمْمَعَهُمْرَحْمَةًمِنْعِنْدِنَاوَذِكْرَىلِلْعَابِدِينَ- ‘আর (স্মরণ কর) আইয়ূবের কথা। যখন সে তার প্রতিপালককে আহবান করে বলেছিল, আমি কষ্টে পড়েছি। আর তুমি দয়ালুদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ’। ‘তখন আমরা তার ডাকে সাড়া দিলাম। অতঃপর তার কষ্ট দূর করে দিলাম। আর তার পরিবার-পরিজনকে তার নিকটে ফিরিয়ে দিলাম এবং তাদের সাথে তাদের সমপরিমাণ আরও দিলাম আমাদের পক্ষ হ’তে দয়াপরবশে। আর তাকে করলাম ইবাদতকারীদের জন্য দৃষ্টান্ত স্বরূপ’ (আম্বিয়া ২১/৮৩-৮৪)।
এই মহিমান্বিত আয়াতগুলো মনে-প্রাণে বিশ্বাস করলে, মুমিন কোনো পরিস্থিতিতেই হতাশ হয় না। এমনকি যারা গুনাহে লিপ্ত, তারা তওবা ও দো‘আ করে আল্লাহর বিস্তৃত রহমত উপলব্ধি করতে পারে এবং অন্তরে নতুন আশা ও উদ্যম জন্মায়।
(৩) বারবার তওবা ও ইস্তেগফার করা : আল্লাহ জানেন যে, শয়তান তাঁর বান্দাদের পথভ্রষ্ট করতে চায়। ফলে মানুষ কখনো কখনো ভুলের পথে চলে। কিন্তু মহান আল্লাহ, যিনি তাঁর বান্দাদের কল্যাণ চান, কখনো তাদের অন্ধকারে ফেলে রাখেন না। তিনি চান তাদের মুক্তি, সাফল্য ও শান্তি। এজন্য কুরআনের বহু আয়াতে বান্দাদের তওবা ও ইস্তেগফারের দিকে আহবান জানানো হয়েছে।
আল্লাহ বলেন,وَمَنْيَعْمَلْسُوءًاأَوْيَظْلِمْنَفْسَهُثُمَّيَسْتَغْفِرِاللهَيَجِدِاللهَغَفُورًارَحِيمًا- ‘যে কেউ মন্দকর্ম করে অথবা নিজের উপর যুলুম করে, অতঃপর আল্লাহর নিকট ক্ষমাপ্রার্থী হয়, সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল ও দয়ালু হিসাবে পাবে’ (নিসা ৪/১১০)।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘আল্লাহ বলেন, আমি আমার বান্দার প্রতি তদ্রূপ, যেরূপ সে আমার প্রতি ধারণা রাখে। আমি বান্দার সঙ্গে থাকি, যখন সে আমাকে স্মরণ করে। যদি সে মনে মনে আমাকে স্মরণ করে; আমিও তাকে স্মরণ করি। আর যদি সে জন-সমাবেশে আমাকে স্মরণ করে, তবে আমিও তদপেক্ষা উত্তম সমাবেশে তাকে স্মরণ করি। যদি সে আমার দিকে এক বিঘত এগিয়ে আসে, তবে আমি তার দিকে এক হাত এগিয়ে যাই। যদি সে আমার দিকে এক হাত অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে দু’হাত এগিয়ে যাই। আর সে যদি আমার দিকে হেঁটে আসে, আমি তার দিকে দৌড়ে যাই’।[2]
অন্য হাদীছে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা বলেন, হে আদম সন্তান! তুমি যতক্ষণ পর্যন্ত আমাকে ডাকবে ও আমার নিকট ক্ষমার আশা পোষণ করবে, তোমার অবস্থা যাই হোক না কেন, আমি কারো পরোয়া করি না, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেবো। হে আদম সন্তান! তোমার গুনাহ যদি আকাশ পর্যন্তও পৌঁছে, আর তুমি আমার কাছে ক্ষমা চাও, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিব, আমি কারো পরোয়া করি না। হে আদম সন্তান! তুমি যদি পৃথিবীসম গুনাহ নিয়েও আমার সাথে সাক্ষাৎ করো এবং আমার সাথে কাউকে শারীক না করে সাক্ষাৎ করো, আমি পৃথিবীসম ক্ষমা নিয়ে তোমার কাছে উপস্থিত হব’।[3]
ইস্তেগফার হ’ল সেই শক্তিশালী মাধ্যম যা আল্লাহর ক্ষমা, সন্তুষ্টি এবং অসীম রহমতের সঙ্গে বান্দাকে সংযুক্ত করে। এটি মনকে শান্তি দেয় এবং অন্তরে আশা জাগায়। আল্লাহ আরও বলেন,وَهُوَالَّذِييَقْبَلُالتَّوْبَةَعَنْعِبَادِهِوَيَعْفُوعَنِالسَّيِّئَاتِوَيَعْلَمُمَاتَفْعَلُونَ- ‘তিনিই তার বান্দাদের তওবা কবুল করেন ও পাপ সমূহ মার্জনা করেন। আর তিনি জানেন যা তোমরা করে থাক’ (শূরা ৪২/২৫)।
এমনকি কুরআন কাফেরদেরও জানায়, যদি তারা তাদের কুফরের পথ ত্যাগ করে, ইসলাম গ্রহণ করে এবং আল্লাহর আজ্ঞা মেনে চলে, তাদের পূর্ববর্তী সকল পাপ ক্ষমা করা হবে। সুতরাং কোন সন্দেহ নেই যে, বিশ্বাসী বান্দার তওবা আল্লাহ অবশ্যই গ্রহণ করবেন।
তবে বিশেষ সতর্কতা হ’ল, মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে হঠাৎ তওবা করা গ্রহণযোগ্য নয়। যারা দীর্ঘদিন গুনাহে লিপ্ত থেকে মৃত্যুশয্যায় তওবা করে ফিরে আসে, তাদের তওবা গ্রহণযোগ্য হবে না। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তওবা কবুল করেন কেবল ঐসব ব্যক্তিদের যারা অজ্ঞতাবশে মন্দ কর্ম করে। অতঃপর অনতিবিলম্বে তওবা করে। আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করে থাকেন। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়’। ‘আর ঐসব লোকদের কোন তওবা নেই, যারা মন্দকর্ম করতেই থাকে, যতক্ষণ না তাদের মৃত্যু উপস্থিত হয় এবং বলে যে, আমি এখন তওবা করছি। আর তওবা কবুল হয় না ঐসব লোকের, যারা মৃত্যুবরণ করে কাফের অবস্থায়। আমরা তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রস্ত্তত করে রেখেছি’ (নিসা ৪/১৭-১৮)।
এই আয়াত আমাদের সতর্ক করে, তওবার আসল অর্থ হ’ল, বান্দা আল্লাহর কাছে ফিরে আসে, অতীতের ভুল ও গুনাহের জন্য সত্যিই অনুতপ্ত হয়। সেগুলো ত্যাগ করে এবং দৃঢ় সংকল্প করে কখনো পুনরায় ফিরে যাবেন না।
যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, প্রতিটি গুনাহের পর ইস্তেগফার করে, বিনম্র হৃদয়ে আল্লাহর ক্ষমা ও দয়ার আশা রাখে, সে হতাশার কবল থেকে মুক্ত থাকবে। বরং অন্তরে আশা ও ভরসা জন্মায়, হৃদয় শক্ত হয় এবং আল্লাহর প্রতি ভালো ধারণা ও মযবূত বিশ্বাস জন্মে।
(৪) আল্লাহর প্রতি সুন্দর ধারণা ও অবিচল আশা রাখা : হতাশা হ’ল আশা হারানো, আর হতাশার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব হ’ল আল্লাহর প্রতি খারাপ ধারণা ও বিশ্বাসহীনতা। তাই এর প্রতিকার হ’ল, আল্লাহর প্রতি সুন্দর ধারণা ও অকৃত্রিম আশা রাখা। আল্লাহর প্রতি সুন্দর ধারণা মানে হ’ল পূর্ণ ভরসা রাখা, সমস্ত কাজ ও সিদ্ধান্ত আল্লাহর হাতে ছড়িয়ে দেওয়া, এবং জীবনের প্রতিটি বিষয়ে তাঁর উপর নির্ভর করা। এই মনোভাব হতাশা ও নিরাশার চক্র ভেঙ্গে দেয়, অন্তরে দৃঢ়তা, ধৈর্য ও বিশ্বাসের সঞ্চার ঘটায়। যেসব মানুষ পাপ ও ভুলের পথে চলে, আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বলেন, إِنَّرَبَّكَوَاسِعُالْمَغْفِرَةِ ‘তোমার প্রতিপালক প্রশস্ত ক্ষমার অধিকারী’ (নাজম ৫৩/৩২)।
এই মহাশক্তির আশ্বাসে বিশ্বাসীদের হৃদয়ে আশা ও ভরসা জন্মায়, তারা আল্লাহর প্রতি সুন্দর ধারণা রাখে এবং তাঁর প্রতিশ্রুতিতে ভরসা স্থাপন করে, যদি তারা ক্ষমা ও মুক্তির জন্য তাঁর কাছে ফিরে আসে। আসলে, হতাশা থেকে বিরত থাকার নির্দেশই আশা ও ভরসার আহবান বহন করে।
এই আয়াত আমাদের মনে আশা ও ভরসা জাগিয়ে তোলে, আল্লাহর প্রতি সুন্দর ধারণা বৃদ্ধি করে, সঙ্গে সতর্ক করে তাঁর শাস্তি ও বিচার থেকে। তাই বান্দার হৃদয় আশা ও ভয়ের মধ্যে, আকাংখা ও ভয়ের মধ্যে সমন্বিত থাকা উচিত। দুনিয়ার কষ্ট ও বিপর্যয়ে যারা নিপতিত, তাদের জন্যও আল্লাহ আশা রাখার পথ দেখান। তিনি বলেন,سَيَجْعَلُاللهُبَعْدَعُسْرٍيُسْرًا- ‘সত্বর আল্লাহ কষ্টের পর সহজ করে দিবেন’ (তালাক ৬৫/৭)।
এটি এক নিখুঁত প্রতিশ্রুতি, যা কখনো ব্যর্থ হয় না। তিনি আরও বলেন, فَإِنَّمَعَالْعُسْرِيُسْرًا- إِنَّمَعَالْعُسْرِيُسْرًا- ‘অতঃপর নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে’। ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে’ (শরহ ৯৪/৫-৬)। এই পুনরাবৃত্তি হৃদয়ে আশা জাগায়, বিশ্বাস দৃঢ় করে, এবং বোঝায় প্রতিটি কষ্টের সঙ্গে আল্লাহর পক্ষ থেকে মুক্তি ও সহায়তা রয়েছে।
(৫) আল্লাহর উপর ভরসা ও তাঁর মহিমা উপলব্ধি : আল্লাহর উপর প্রকৃত ভরসা বা তাওয়াক্কুল একজন হতাশ বান্দাকে শক্তি দেয় এবং তার হৃদয়ে আশা ফিরিয়ে আনে। যখন বান্দা আল্লাহর মহত্ব ও অসীম ক্ষমতা উপলব্ধি করে, তখন তার হতাশা ক্ষীণ হয়ে যায় এবং আত্মবিশ্বাস ও মানসিক শান্তি ফিরে আসে।
যে ব্যক্তি ধর্মীয় ও দুনিয়াবী প্রতিটি কাজ আল্লাহর ওপর ভর করে এবং সত্যিকারের বিশ্বাস রাখে, আল্লাহ তার বিষয়সমূহ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করেন। কুরআন এতে নির্দেশ দেয়,وَمَنْيَتَوَكَّلْعَلَىاللهِفَهُوَحَسْبُهُ ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে, তিনি তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান’ (তালাক ৬৫/৩)। অতীতের জীবন ও ঘটনার দিকে মনোযোগ দিলে সহজেই দেখা যায়, আল্লাহর উপর ভরসা করা কিভাবে বিপদ ও কষ্টের সময়ে হৃদয়কে স্থিরতা দেয়। কুরআনের অসংখ্য আয়াত মুমিনদের তাওয়াক্কুলের প্রতি আহবান জানায়। যেমন আল্লাহ বলেন, اللهُلَاإِلَهَإِلَّاهُوَوَعَلَىاللهِفَلْيَتَوَكَّلِالْمُؤْمِنُونَ ‘আল্লাহ, তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। অতএব আল্লাহর উপরেই বিশ্বাসীদের ভরসা করা উচিৎ’ (তাগাবুন ৬৪/১৩)।
সত্যিকারের তাওয়াক্কুল তখনই পূর্ণ হয় যখন বান্দা আল্লাহকে চেনে, তাঁর গুণাবলী ও ক্ষমতা উপলব্ধি করে। আল্লাহ হ’লেন চিরস্থায়ী, সবকিছুর স্রষ্টা, এবং আকাশ-পাতাল ও সৃষ্টির প্রতিটি জিনিসে তাঁর মহিমা প্রতিফলিত হয়। আল্লাহ বলেন, وَتَوَكَّلْعَلَىالْحَيِّالَّذِيلَايَمُوتُوَسَبِّحْبِحَمْدِهِوَكَفَىبِهِبِذُنُوبِعِبَادِهِخَبِيرًا- الَّذِيخَلَقَالسَّمَاوَاتِوَالْأَرْضَوَمَابَيْنَهُمَافِيسِتَّةِأَيَّامٍثُمَّاسْتَوَىعَلَىالْعَرْشِالرَّحْمَنُفَاسْأَلْبِهِخَبِيرًا- ‘আর তুমি ভরসা কর সেই চিরঞ্জীব সত্তার উপর, যাঁর মৃত্যু নেই। তুমি তাঁর প্রশংসাসহ পবিত্রতা বর্ণনা কর। বস্ত্তত স্বীয় বান্দাদের পাপসমূহের খবর রাখার ব্যাপারে তিনিই যথেষ্ট’। ‘তিনি নভোমন্ডল, ভূমন্ডল এবং এ দু’য়ের মধ্যবর্তী সবকিছুকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর আরশে উন্নীত হয়েছেন। তিনি দয়াময়। অতএব এ বিষয়ে তুমি বিজ্ঞ ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস কর’ (ফুরক্বান ২৫/৫৮-৫৯)।
আল্লাহর ক্ষমতা জানার ফলে বান্দার হৃদয় শান্ত হয়, হতাশা দূর হয়। তিনি সকল গুনাহ ক্ষমা করতে, ধর্মের সুরক্ষা দিতে, নিপীড়িতদের সহায়তা করতে, বিপদ দূর করতে এবং প্রত্যাশিত কল্যাণ আনতে সক্ষম। কুরআনে বলা হয়েছে, وَإِنْيَمْسَسْكَاللهُبِضُرٍّفَلَاكَاشِفَلَهُإِلَّاهُوَوَإِنْيَمْسَسْكَبِخَيْرٍفَهُوَعَلَىكُلِّشَيْءٍقَدِيرٌ- ‘আর যদি আল্লাহ তোমাকে কোন কষ্ট দেন, তবে তিনি ব্যতীত তা দূর করার কেউ নেই। আর যদি তিনি তোমার কোন মঙ্গল করেন, তবে তিনি সকল কিছুর উপরে সর্বশক্তিমান’ (আন‘আম ৬/১৭)।
আল্লাহর উপর নির্ভরশীলতা জন্ম দেয় ধৈর্য, সন্তুষ্টি এবং ভাগ্যের প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ। এভাবেই একজন বান্দা হতাশা ও অপ্রত্যাশা থেকে মুক্তি পায়, আশা ও বিশ্বাসে ভরে ওঠে এবং প্রতিটি পরিস্থিতিতে আল্লাহর উপর ভরসা রাখতে শেখে।
ধৈর্যধারণ ও তাক্বদীরের প্রতি সন্তুষ্টি : পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে, তা সবই আল্লাহর পরিকল্পনা অনুযায়ী। আল্লাহ কোন কিছু সৃষ্টি করতে কেবল বলেন, ‘হও’ আর তা মুহূর্তেই হয়ে যায়। কুরআনে বলা হয়েছে,بَدِيعُالسَّمَاوَاتِوَالْأَرْضِوَإِذَاقَضَىأَمْرًافَإِنَّمَايَقُولُلَهُكُنْفَيَكُونُ- ‘তিনিই নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের উদ্ভাবক। যখন তিনি কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাকে বলেন, হও! অতঃপর তা হয়ে যায়’ (বাক্বারাহ ২/১১৭)।
আল্লাহর পরিকল্পনার অংশ হলো মানুষের উপর বিপদ, কষ্ট ও পরীক্ষার ঘটনা। এগুলো পূর্বনির্ধারিত এবং আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া কিছু ঘটে না। কুরআনে আরও উল্লেখ আছে,مَاأَصَابَمِنْمُصِيبَةٍفِيالْأَرْضِوَلَافِيأَنْفُسِكُمْإِلَّافِيكِتَابٍمِنْقَبْلِأَنْنَبْرَأَهَاإِنَّذَلِكَعَلَىاللهِيَسِيرٌ ‘ পৃথিবীতে বা তোমাদের জীবনে এমন কোন বিপদ আসে না, যা তা সৃষ্টির পূর্বে আমরা কিতাবে লিপিবদ্ধ করিনি। নিশ্চয়ই এটা আল্লাহর জন্য সহজ’ (হাদীদ ৫৭/২২)।
আল্লাহ আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন যে, মানুষকে বিপদ ও পরীক্ষার মধ্যদিয়ে পরীক্ষা করা হবে, যাতে তাদের ধৈর্য শক্তিশালী হয় এবং বিপদ সহজ মনে হয়। বিপদের সময়ে করণীয় হ’ল সবর, আত্মসমর্পণ ও আল্লাহর প্রতি ভরসা। কুরআন এ সম্পর্কে বলেন, ‘অবশ্যই আমরা তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল, জান ও ফল-ফসলের ক্ষতি দ্বারা। আর তুমি সুসংবাদ দাও ধৈর্যশীলদের’। ‘যাদের উপর কোন বিপদ আসলে তারা বলে, নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তার দিকেই ফিরে যাব’। ‘তাদের উপর তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হ’তে রয়েছে অফুরন্ত দয়া ও করুণা এবং তারাই হ’ল সুপথপ্রাপ্ত’ (বাক্বারাহ ২/১৫৫-১৫৭)।
মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি অনুযায়ী বিপদ ও কষ্টই হতাশার মূল কারণ। কিন্তু যে মুমিন আল্লাহর নির্দেশ মেনে বিপদে ধৈর্য ধারণ করে এবং সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে, তার হৃদয়ে হতাশার স্থান থাকে না।
যখন একজন বিশ্বাসী দৃঢ়ভাবে বুঝে যে, আল্লাহর প্রতিটি সিদ্ধান্তই কল্যাণ ও দয়া পূর্ণ এবং তিনি বান্দার জন্য খারাপ সম্পূর্ণভাবে চান না। তখন সে ধৈর্যের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এই অবস্থায় হতাশা সম্পূর্ণভাবে দূর হয়। ধৈর্য ও সন্তুষ্টি হৃদয়ে শান্তি, স্থিরতা ও আস্থা স্থাপন করে। যার হৃদয় সন্তুষ্টি ও সমর্পণে পূর্ণ, আল্লাহ তাকে মানসিক শান্তি, আনন্দ, তৃপ্তি ও সমৃদ্ধি প্রদান করেন।
বেশী বেশী দো‘আ করা : দো‘আ মুমিনের অব্যর্থ অস্ত্র। মানুষ সমস্ত বুদ্ধি ও শক্তি প্রয়োগ করে যা অর্জন করতে পারে না, কেবল একটি দো‘আর কারণে আল্লাহ তা দান করেন। এজন্য রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) জীবনের সকল চাওয়া-পাওয়া, আশা-আকাংখা ও বিপদাপদে দো‘আ শিক্ষা দিয়েছেন। বিশেষ করে নিম্নোক্ত দো‘আটি পাঠ করা আমাদের কর্তব্য।
আবদুল্লাহ ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে বেশি চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে, সে যেন বলে, ‘আল্লা-হুম্মা ইন্নী ‘আবদুকা, ওয়াবনু ‘আবদিকা ইবনু আমাতিকা, না-ছিয়াতী বিয়াদিকা মা-যিন ফিইয়া হুকমুকা ‘আদলুন ফিইয়া ক্বযা-উকা আসআলুকা বিকুল্লি ইসমিন হুওয়া লাকা সাম্মায়তা বিহী নাফসাকা, আও আনযালতাহূ ফী কিতা-বিকা, আও আল্লামতাহূ আহাদাম মিন খলক্বিকা, আও ইসতা’ছারতা বিহী ফী ইলমিল গয়বি ইনদাকা আন তাজ‘আলাল কুরআ-না রবী‘আ ক্বলবী ওয়া নূরা ছদরী ওয়া জালা-আ হুযনী ওয়া যিহাবা হাম্মী’ (হে আল্লাহ! আমি তোমার বান্দা, তোমার বান্দার পুত্র, তোমার দাসীর পুত্র। আমি তোমার হাতের মুঠে, আমার অদৃষ্ট তোমার হাতে। তোমার হুকুম আমার ওপর কার্যকর, তোমার আদেশ আমার পক্ষে ন্যায়। আমি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি তোমার সেসব নামের ওয়াসীলায় যাতে তুমি নিজেকে অভিহিত করেছো, অথবা তুমি তোমার কিতাবে নাযিল করেছো অথবা তুমি তোমার সৃষ্টির কাউকেও তা শিক্ষা দিয়েছো, অথবা তুমি তোমার বান্দাদের ওপর ইলহাম করেছো অথবা তুমি গায়বের পর্দায় তা তোমার কাছে অদৃশ্য রেখেছো- তুমি কুরআনকে আমার অন্তরের বসন্তকাল স্বরূপ চিন্তা-ফিকির দূর করার উপায় স্বরূপ গঠন করো)। যে বান্দা যখনই তা পড়বে আল্লাহ তার চিন্তা-ভাবনা দূর করে দেবেন এবং তার পরিবর্তে মনে নিশ্চিন্ততা (প্রশান্তি) দান করবেন’।[4]
উপসংহার : হতাশা হ’ল সাধারণভাবে প্রত্যাশার ছিন্ন হওয়া ও বিশেষভাবে কল্যাণময় জিনিসের প্রত্যাশায় আশা হারানো। এটির মূল কারণ হ’ল আল্লাহর প্রতি অবিশ্বাস, পাপাচার ও অতিরিক্ত ভয়, বিপদ ও পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়া এবং কাংখিত ফল না পাওয়া। এর ফলে আল্লাহর প্রতি সন্দেহ, পাপচর্চা, ইবাদতে উদাসীনতা, দুশ্চিন্তা ও হতাশা, এবং উদ্যোগের অভাব দেখা দেয়। এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কুরআনের নির্দেশ অনুসরণ করা, আল্লাহর দয়া স্মরণ, তওবা ও ক্ষমাপ্রার্থনা, ভালো ধারণা ও ভরসা রাখা, ধৈর্য্য ও সন্তুষ্টি যরূরী। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সহায় হৌন।-আমীন!
-কামাল হোসাইন
[সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ, রাজশাহী-পশ্চিম সাংগঠনিক যেলা]
[1]. তাফসীর ত্বাবারী ৩/৫৯৩।
[2]. বুখারী হা/৭৪০৫, মুসলিম হা/১৬৭৫।
[3]. তিরমিযী হা/৩৫৪০; মিশকাত হা/২৩৩৬।
[4]. ছহীহ আত-তারগীব, হা/১৮২২।