ছালাতে রাসূল (ছাঃ)-এর রাফ‘উল ইয়াদায়েন (শেষ কিস্তি)
আশরাফুল ইসলাম
মুহাম্মাদ আরাফাত যামান 741 বার পঠিত
ভূমিকা : যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর জন্য। ছালাত ও সালাম বর্ষিত হৌক নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর উপর। যিনি ছিলেন মানবজাতির জন্য রহমত স্বরূপ। যিনি মানবজাতির হেদায়াত ও উম্মতের নাজাতের জন্য সবসময় চিন্তিত থাকতেন। আল্লাহ বলেন,فَلَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَفْسَكَ عَلَى آثَارِهِمْ إِنْ لَمْ يُؤْمِنُوا بِهَذَا الْحَدِيثِ أَسَفًا- ‘তারা যদি এই বাণীতে বিশ্বাস স্থাপন না করে, তাহ’লে তাদের পিছনে ঘুরে মনে হয় তুমি দুঃখে তোমার জীবন শেষ করে ফেলবে’ (কাহ্ফ ১৮/৬)। উক্ত আয়াতে উম্মতের প্রতি মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর দরদ বুঝা যায়। কিন্তু এই রাসূলই যখন কারো সম্পর্কে বলেন, ‘সে আমাদের উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়!’ সে কতই না হতভাগা।
ليس منا অর্থ : হাফেয ইবনু হাযার (রহঃ) বলেন, এর অর্থ সে আমাদের সুন্নাহ ও আমাদের পথের অন্তর্ভুক্ত নয়। এর দ্বারা তাকে দ্বীন থেকে বের করে দেওয়া বুঝানো হয়নি; বরং এ ধরনের ভাষা বলার উদ্দেশ্য হ’ল ঐ কাজ থেকে বিরত রাখার ক্ষেত্রে কঠোরতা প্রকাশ করা। যেমন, একজন মানুষ তার ছেলেকে ভৎর্সনা করার সময় বলে, لَسْتُ مِنْكَ وَلَسْتَ مِنِّي ‘তুমি আমার পথের উপর নেই’। সুফিয়ান ছাওরী (রাঃ)-এর ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করতে অপসন্দ করতেন এবং বলতেন, ‘এ বিষয়ে চুপ থাকা উচিত, যাতে এটি মানুষের অন্তরে বেশি প্রভাব ফেলে এবং অধিকতর নিরুৎসাহিত না করে’। এর ব্যাখ্যায় ইবনুল আরাবী বলেন, ‘সে আমাদের পূর্ণাঙ্গ দ্বীনের উপর নেই; অর্থাৎ সে দ্বীনের কোন একটি শাখা থেকে বেরিয়ে গেছে, যদিও তার মূল দ্বীন রয়ে গেছে’।[1] সম্মানিত পাঠক! হাদীছের কিতাবগুলো অধ্যয়ন করলে এমন অনেক হাদীছ পাব, যেখানে রাসূল (ছাঃ) কিছু মন্দ বৈশিষ্ট্যের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, ‘সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়’। অত্র প্রবন্ধে আমরা সেগুলো তুলে ধরব ইনশাআল্লাহ।
(১) স্বামী স্ত্রীর মাঝে দ্বন্দ সৃষ্টিকারী : আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,لَيْسَ مِنَّا مَنْ خَبَّبَ امْرَأَةً عَلَى زَوْجِهَا، أَوْ عَبْدًا عَلَى سَيِّدِهِ ‘যে ব্যক্তি কোন স্ত্রীকে তার স্বামীর বিরুদ্ধে অথবা দাসকে তার মনিবের বিরুদ্ধে প্ররোচিত করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়’।[2] কেননা ইবলীস শয়তান সবচেয়ে বেশী খুশী হয় স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ফাটল সৃষ্টি হ’লে। অতএব যে এই কাজে লিপ্ত হ’ল, সে শয়তানের অনুসরণ করল।
(২) ছোটদের স্নেহ ও বড়দের সম্মান না করা : আব্দুল্লাহ বিন ‘আমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন,مَنْ لَمْ يَرْحَمْ صَغِيرَنَا وَيَعْرِفْ حَقَّ كَبِيرِنَا فَلَيْسَ مِنَّا- ‘যে আমাদের ছোটদের স্নেহ করে না ও বড়দের হক বুঝে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়’।[3] অন্য বর্ণনায় এসেছে,لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يَرْحَمْ صَغِيرَنَا وَيَعْرِفْ شَرَفَ كَبِيرِنَا- ‘সে আমাদের দলভুক্ত নয়, যে আমাদের ছোটদের স্নেহ করে না ও বড়দের মর্যাদা বুঝে না’।[4] সুতরাং বড়দের সম্মান প্রদর্শন ও ছোটদের স্নেহ করা একজন মুসলিমের নৈতিক দায়িত্ব।
(৩) সুন্দর আওয়াজে কুরআন তেলাওয়াত না করা : আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সুন্দর আওয়াজে কুরআন পড়ে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়’।[5] সকল মুসলিমের উচিত তাজবীদ ও তারতীলসহ কুরআন তেলাওয়াতের আপ্রাণ চেষ্টা করা।
(৪) মুসলিমদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা : আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, مَنْ حَمَلَ عَلَيْنَا السِّلاَحَ فَلَيْسَ مِنَّا- ‘যে ব্যক্তি আমাদের (মুসলিমদের) বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করবে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়’।[6] এমনকি অপর ভাইয়ের দিকে মন্দ বাক্য বলা থেকেও বিরত থাকতে হবে।
(৫) গোঁফধারী ব্যক্তি : যায়েদ ইবনু আরকাম (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,مَنْ لَمْ يَأْخُذْ ‘যে ব্যক্তি গোঁফ খাটো করে না, সে আমাদের (অন্তর্ভুক্ত নয়’।[7] কেননা গোঁফ রাখা বিজাতীয়দের নিদর্শন।
(৬) শোকে অনিয়ন্ত্রিত মাতমকারী : আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,لَيْسَ مِنَّا مَنْ ضَرَبَ الْخُدُودَ، وَشَقَّ الْجُيُوبَ، وَدَعَا بِدَعْوَى الْجَاهِلِيَّةِ ‘যারা শোকে গালে চাপড়ায়, জামার বুক ছিঁড়ে ফেলে ও জাহেলী যুগের ন্যায় চিৎকার দেয়, তারা আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়’।[8] বিশেষত মহিলাদের মাঝে এই বৈশিষ্ট্যগুলো বেশি পাওয়া যায়। নবী করীম (ছাঃ) মহিলাদের কাছ থেকে বিশেষত এমন মাতম না করার বায়‘আত নিতেন। আবু মূসা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, لَيْسَ مِنَّا مَنْ حَلَقَ وَمَنْ سَلَقَ وَمَنْ خَرَقَ ‘(শোক প্রকাশে) যে মহিলা মাথা মুড়িয়ে বিলাপ করে কাঁদে এবং কাপড় ছিঁড়ে ফেলে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়’।[9]
(৭) বিপরীত লিঙ্গের বেশ ধারণকারী : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,لَيْسَ مِنَّا مَنْ تَشَبَّهَ بِالرِّجَالِ مِنَ النِّسَاءِ وَلاَ مَنْ تَشَبَّهَ بِالنِّسَاءِ مِنَ الرِّجَالِ ‘পুরুষের সাদৃশ্য অবলম্বনকারী মহিলা ও মহিলাদের সাদৃশ্য অবলম্বনকারী পুরুষ আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়’।[10] এই সাদৃশ্য বাহ্যিক এবং আভ্যন্তরীণ দুই ভাবেই হ’তে পারে যেমনটি বর্তমানে আধুনিক যুগে দেখা যাচ্ছে। এটিতে সৃষ্টির বিকৃতি করার পাপও শামিল রয়েছে।
(৮) বিজাতীয়দের অনুসরণকারী : ‘আমর ইবন শু‘আইব তার পিতার মাধ্যমে তার দাদা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, لَيْسَ مِنَّا مِنْ تَشَبَّهَ بِغَيْرِنَا ‘যে ব্যক্তি আমাদের ছাড়া বিজাতীয়দের (ইহূদী ও নাছারাদের) অনুসরণ করে সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়’।[11] বর্তমান সময়ে আমরা আমাদের অজান্তেই ইহূদী ও নাছারাদের বিভিন্ন মতবাদসমূহের অনুসরণ করার মাধ্যমে তাদের অনুসারী হয়ে যাচ্ছি। যেমন- সূদ ও পুঁজিবাদী অর্থনীতি, ধর্মনিরেপক্ষতাবাদ ও গণতন্ত্রাতিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা ইত্যাদি। অনেকেই হয়তো ইহূদী পণ্য বয়কট করেন। কিন্তু তাদের মতবাদগুলো বয়কট না করে, তাদের অনুসারী হয়ে যাচ্ছে।
(৯) নিজের নয় এমন কিছুকে নিজের বলে দাবী করা : আবু যার (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছেন, ‘যে ব্যক্তি জেনে-শুনে নিজ পিতার পরিবর্তে অন্য কাউকে পিতা বলে, সে কুফুরী করল। আর যে ব্যক্তি এমন কিছুর দাবী করে যা তার নয়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়’।[12] কেননা পুত্র তার পিতার বংশের পরম্পরা চালিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু পিতা নয় এমন কাউকে আপন পিতার পরিচয় দিলে, বংশীয় পরিচয়ে সংশয় প্রবেশ করে। এজন্য এটি মারাত্মক পর্যায়ের গোনাহ।
(১০) সাপ হত্যা না করা : আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যেদিন থেকে সাপের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ শুরু হয়েছে, সেদিন থেকে ঐগুলোর সঙ্গে আমরা শান্তিচুক্তি করিনি। অতএব যে ব্যক্তি ভয়ে সেগুলোকে (হত্যা না করে) ছেড়ে দিবে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়’।[13]
অন্য বর্ণনায় পাওয়া যায়,نَهَى رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَنْ قَتْلِ الْجِنَّانِ الَّتِي تَكُونُ فِي الْبُيُوتِ، إِلَّا أَنْ يَكُونَ ذَا الطُّفْيَتَيْنِ، وَالْأَبْتَرَ، فَإِنَّهُمَا يَخْطِفَانِ الْبَصَرَ، وَيَطْرَحَانِ مَا فِي بُطُونِ النِّسَاءِ ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ঘরে বসবাসরত সাপ মারতে নিষেধ করেছেন, তবে ডোরাবিশিষ্ট এবং লেজকাটাগুলো নয়। কারণ এগুলো দৃষ্টিশক্তি নষ্ট করে এবং নারীদের গর্ভপাত ঘটায়’।[14] লক্ষণীয় যে, বাড়ীতে অবস্থানরত কোন সাপ মারার পূর্বে, তিনবার সর্তক করার পর তাকে আঘাত করতে হবে।
(১১) মুরজিয়া ও ক্বাদারিয়াগণ : আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,صِنْفَانِ مِنْ هَذِهِ الأُمَّةِ لَيْسَ لَهُمَا فِي الإِسْلاَمِ نَصِيبٌ الْمُرْجِئَةُ وَالْقَدَرِيَّةُ ‘এ উম্মাতের দু’টি শ্রেণীর জন্য ইসলামে কোন অংশ নেই- মুরজিয়া ও ক্বাদারিয়া সম্প্রদায়’।[15] যদিও হাদীছটি দুর্বল সনদে বর্ণিত হয়েছে। তবুও মুরজিয়া ও ক্বাদারিয়াদের ক্ষেত্রে এই বাক্যগুলো প্রযোজ্য।
(১২) ছিনতাইকারী : ইমরান ইবনু হোসাইন (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,مَنِ انْتَهَبَ نُهْبَةً فَلَيْسَ مِنَّا ‘যে ব্যক্তি অন্যের মাল ছিনতাই করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়’।[16] বর্তমানে মুসলিম ঘরে জন্ম নেওয়া অনেক তরুণ-যুবকদের দেখা যায় তারা তাদের সামান্য দুনিয়াবী চাহিদা মিটানোর জন্য এই মন্দ কাজে লিপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
(১৩) খারেজী : আলী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, يَخْرُجُ قَوْمٌ مِنْ أُمَّتِي يَقْرَءُونَ الْقُرْآنَ لَيْسَتْ قِرَاءَتُكُمْ إِلَى قِرَاءَتِهِمْ شَيْئًا، وَلَا صَلَاتُكُمْ إِلَى صَلَاتِهِمْ شَيْئًا، وَلَا صِيَامُكُمْ إِلَى صِيَامِهِمْ شَيْئًا، يَقْرَءُونَ الْقُرْآنَ يَحْسِبُونَ أَنَّهُ لَهُمْ وَهُوَ عَلَيْهِمْ، لَا تُجَاوِزُ صَلَاتُهُمْ تَرَاقِيَهُمْ، يَمْرُقُونَ مِنَ الْإِسْلَامِ كَمَا يَمْرُقُ السَّهْمُ مِنَ الرَّمِيَّةِ ‘আমার উম্মাতের মধ্য থেকে এমন একটি গোত্রের আত্মপ্রকাশ ঘটবে যাদের কুরআন পাঠের সামনে তোমাদের তেলাওয়াত কিছুই নয়, তোমাদের ছালাত তাদের ছালাতের তুলনায় কিছুই নয় এবং তোমাদের ছিয়াম তাদের ছিয়ামের তুলনায় কিছুই নয়। তারা কুরআন পড়বে নেকী লাভের আশায়। কিন্তু পরিণতি হবে তার বিপরীত। তাদের ছালাত তাদের কণ্ঠনালী অতিক্রম করবে না। তীর যেভাবে ধনুক থেকে বেরিয়ে যায়, তারাও ঠিক সেভাবে ইসলাম থেকে দূরে সরে যাবে’।[17] যদিও উক্ত হাদীছটিতে ‘লায়সা মিন্না’ আরবী বাক্যটি নেই, তবুও তা আমাদের বিষয়বস্ত্তর সাথে প্রাসঙ্গিক।
(১৪) প্রতারণাকারী : আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, لَيْسَ مِنَّا مَنْ غَش ‘যে ব্যক্তি প্রতারণা করে আমাদের দলভুক্ত নয়’।[18] বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের জন্য এতে স্পষ্ট সতর্কবার্তা রয়েছে।
(১৫) গণক ও যাদুকর : ইমরান ইবনু হোসাইন (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেন,لَيْسَ مِنَّا مَنْ تَطَيَّرَ وَلا تُطُيِّرَ لَهُ، وَلا تَكَهَّنَ وَلا تُكُهِّنَ لَهُ أَوْ سَحَرَ أَوْ سُحِرَ لَهُ ‘সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়, যে ব্যক্তি (কোন বস্ত্ত, ব্যক্তি কর্ম বা কালকে) অশুভ লক্ষণ বলে মানে অথবা যার জন্য অশুভ লক্ষণ দেখা (পরীক্ষা) করা হয়, যে ব্যক্তি (ভাগ্য) গণনা করে অথবা যার জন্য (ভাগ্য) গণনা করা হয়। আর যে ব্যক্তি যাদু করে অথবা যার জন্য (বা আদেশে) যাদু করা হয়’।[19] কেননা তিনটি কাজই আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী।
(১৬) শাসকের অন্যায় কাজে সাহায্যকারী : কা‘ব ইবনু ‘উজরাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদের নিকট আগমন করলেন, তখন আমরা ছিলাম নয়জন। তিনি বললেন,إِنَّهُ سَتَكُونُ بَعْدِي أُمَرَاءُ مَنْ صَدَّقَهُمْ بِكَذِبِهِمْ وَأَعَانَهُمْ عَلَى ظُلْمِهِمْ فَلَيْسَ مِنِّي وَلَسْتُ مِنْهُ- ‘অচিরেই আমার পর এমন শাসক আসবে, যে তাদের মিথ্যাকে স্বীকার করবে ও অন্যায় কাজে তাদের সাহায্য করবে, সে আমার দলভুক্ত নয় এবং আমার সাথে তার কোন সম্পর্ক থাকবে না’।[20] শাসকের ভুল সংশোধনে সামর্থ্য থাকলে প্রতিহত করবে, না হয় প্রতিবাদ করবে, না হয় ঘৃণা করবে।
(১৭) মুশরিকদের সাথে বসবাসকারী : সামুরা ইবনু জুনদুব (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,لَا تُسَاكِنُوا الْمُشْرِكِينَ وَلَا تُجَامِعُوهُمْ فَمَنْ سَاكَنَهُمْ أَوْ جَامَعَهُمْ فَهُوَ مِثْلُهُم ‘মুশরিকদের সাথে তোমরা একত্রে বসবাস কর না, তাদের সংসর্গেও যেও না। যে তাদের সাথে বসবাস করবে অথবা তাদের সংসর্গে থাকবে, সে তাদের অনুরূপ বলে বিবেচিত হবে’।[21] অর্থাৎ তাদের সাথে মিলে একাকার না হয়ে যাওয়া। মুসলিমদের মাঝে মুশরিক প্রতিবেশি থাকাতে সমস্যা নেই কিন্তু মুশরিকদের মাঝে কোন একক মুসলিম বসবাস করা উচিত নয়। বিশেষত তাদের সকল কৃষ্টি কালচার গ্রহণ করে তাদের মতোই হয়ে গেলে সেটা হবে রাসূল (ছা.)-এর আদর্শের বিপরীত। মুসলিম আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত দ্বীন ব্যতীত অন্য কোন দ্বীনের কৃষ্টি কালচার গ্রহণ করে না।
(১৮) তীরন্দাজী শিখার পর ভুলে যাওয়া : উক্ববা বিন ‘আমের (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি,مَنْ علِمَ الرَّميَ ثمَّ تَرَكَهُ فَلَيْسَ مِنَّا أَوْ قَدْ عَصَى ‘যে ব্যক্তি তীরন্দাজী শিক্ষা গ্রহণ করে তা পরিহার (চর্চা না) করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়’।[22] এর দ্বারা মুসলিমদের শক্তি সঞ্চার করার মাধ্যমগুলো আয়ত্ত্ব করতে বলা হচ্ছে এবং তা অনুশীলনের কমতিতে ভুলে না যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করা হচ্ছে। শক্তি সঞ্চারের মাধ্যমগুলো যুগ অনুযায়ী পরিবর্তন হ’তে পারে। আল্লাহু আ‘লাম।
(১৯) সক্ষমতা সত্ত্বেও বিবাহ না করা : বিবাহ করা নবী-রাসূলগণের সুন্নাত। হাদীছে বিবাহকে ‘দ্বীনের অর্ধাংশ’ বলা হয়েছে।[23] আল্লাহ বিবাহ বন্ধনকে তাঁর অন্যতম নিদর্শন হিসাবে বর্ণনা করেছেন। তথাপি সক্ষম কোন ব্যক্তি বিবাহ না করলে তার সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,اَلنِّكَاحُ مِنْ سُنَّتِى فَمَنْ لَّمْ يَعْمَلْ بِسُنَّتِى فَلَيْسَ مِنِّى- ‘বিবাহ করা আমার সুন্নাত। যে ব্যক্তি (উপেক্ষাচ্ছলে) তা সম্পাদন করল না, সে আমার তরীকার অন্তর্ভুক্ত নয়’।[24]
আল্লাহ আমাদের উক্ত মন্দ আমলগুলো থেকে বিরত থেকে পরিপূর্ণ উম্মত হয়ে হাওযে কাউসারের নিকট তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর সামনে পরিপূর্ণ দ্বীনের উপর অটল থাকার তাওফীক দান করুন।-আমীন!
আরাফাত যামান
[কেন্দ্রীয় দফতর সম্পাদক, বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ]
[1]. ফাৎহুল বারী ৩/১৬৩।
[2]. আবুদাঊদ হা/২১৭৫; ছহীহ।
[3]. আবুদাঊদ হা/৪৯৪৩; ছহীহাহ হা/২১৯৬।
[4]. তিরমিযী হা/১৯২০।
[5]. বুখারী হা/৭৫২৭।
[6]. মুসলিম হা/১০১।
[7]. তিরমিযী হা/২৭৬১; ছহীহ।
[8]. বুখারী হা/২৭৬১।
[9]. আবুদাঊদ হা/৩১৩০।
[10]. আহমাদ হা/৭০৫৪;ليس منا من تشبه بالرجال من النساء، ولا من تشبه بالنساء من الرجال।
[11]. তিরমিযী হা/২৬৯৫; হাসান।
[12]. মুসলিম হা/৬১।
[13]. আবুদাঊদ হা/৫২৪৮; হাসান ছহীহ।
[14]. আবুদাঊদ হা/৫২৫৩; ছহীহ।
[15].ইবনে মাজাহ হা/৬২; দুর্বল।
[16]. তিরমিযী হা/১২৩।
[17]. আবুদাঊদ হা/৪৭৬৮; ছহীহ।
[18]. আবুদাঊদ হা/৩৪৫২।
[19]. ত্বাবারাণী হা/১৪৭৭০, ছহীহুল জামে হা/৫৪৩৫।
[20]. নাসাঈ হা/৪২০৮।
[21]. তিরমিযী হা/১৬০৫।
[22]. মুসলিম হা/১৯১৯।
[23]. ত্বাবারাণী হা/৭৬৪৭; শু‘আব হা/৫৪৮৬; মিশকাত হা/৩০৯৬।
[24]. ইবনু মাজাহ হা/১৮৪৬; ছহীহাহ হা/২৩৮৩।