মুহাম্মাদ আনোয়ারুল হক (লালমণিরহাট) (শেষ কিস্তি)

তাওহীদের ডাক ডেস্ক 24 বার পঠিত

[মুহাম্মাদ আনোয়ারুল হক (৬৩) ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ’-এর কেন্দ্রীয় অফিস সহকারী। প্রায় ৩০ বছর যাবৎ সাধ্যানুযায়ী তিনি এই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। ১৯৯৩-১৯৯৫ সেশনে তিনি ‘যুবসংঘে’র কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ছিলেন। তাঁর জীবন ঘনিষ্ট এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ‘তাওহীদের ডাক’ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক আসাদুল্লাহ আল-গালিব]

তাওহীদের ডাক : ২০০৫ সালে স্যারের গ্রেফতারের পর তাঁর বাসার খোঁজ-খবর কীভাবে নিতেন?

মুহাম্মাদ আনোয়ারুল হক : আন্দোলনের কেন্দ্রীয় অফিস স্যারের বাসার নীচ তলায় হওয়ায় অফিস সহকারী হিসাবে আমি নিয়মিত এসেছি। অফিসে এসেই স্যারের ৩ সন্তান আহমাদ আব্দুল্লাহ ছাকিব, আহমাদ আব্দুল্লাহ নাজীব ও আহমাদ আব্দুল্লাহ শাকিরের মাধ্যমে খোঁজ-খবর নিতাম। তখন ওরা ছোট ছিল। সে সময় প্রায়শই স্যারের বাসার বাজার করে দিতাম। এছাড়া আমার স্ত্রীও স্যারের বাসায় প্রায়ই যেতেন। এভাবে আমরা যতটুকু স্যারের বাসার খোঁজ-খবর নিতে পেরেছি, তার চেয়ে বেশী তাঁরা আমাদের খোঁজ-খবর নিয়েছেন। যেমন-

(১) সেই সময়টা ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। দীর্ঘদিন বেতন-ভাতা বকেয়া পড়ে যায়। বহু সমস্যার মধ্যেও আল্লাহর উপর ভরসা রেখে ধৈর্যের সঙ্গে কেন্দ্রীয় অফিসের দায়িত্ব পালন করছিলাম এবং সন্তানদের নিয়ে আল্লাহর রহমতে টিকে ছিলাম। একদিন আমীরে জামা‘আতের সহধর্মিণী আমাদের বাসার খোঁজ-খবর নিলেন। অতঃপর আমার স্ত্রীকে মাসিক আত-তাহরীক বর্তমান অফিসের জায়গা দেখিয়ে বলেন, তোমরা এই জায়গাতে ঘর করে থাকো। তাহ’লে তোমাদের ভাড়া লাগবে না। খাওয়া-দাওয়ার খরচ আল্লাহ চালিয়ে নিবেন ইনশাআল্লাহ। সেসময় স্যারের বড় ছেলে আহমাদ আব্দুল্লাহ ছাকিব বলেছিল, চাচা এখানে কীভাবে থাকবেন? তখন তিনি বলেছিলেন, ‘সাপ-বিচ্ছুর সাথেই তোমার চাচা থাকবে। আর আল্লাহ্ই তাদের রক্ষা করবেন’। তাঁরই পরামর্শে ঐ জায়গায় ঘর করে থাকার সুযোগ পাই। অতঃপর সেখানে টানা ১৩ বছর আমরা বসবাস করি। ফালিল্লাহিল হামদ।

(২) ২০০৬ সালে আমার ছোট মেয়ের জন্ম হয়। এক বছর পার হলেও পুষ্টির ঘাটতির কারণে সে দাঁড়াতে পারছিল না। এবিষয়টি যখন স্যারের পরিবারের নযরে আসে। তখন আমীরে জামা‘আতের পরিবারের জন্য দৈনিক গাভীর যে দুধ নিতেন, সেখান থেকে একটা অংশ আমার মেয়ের জন্য বরাদ্দ করলেন, এই দুধ খাওয়ার পর কিছুদিনের মধ্যেই আল্লাহর অনুগ্রহে আমার মেয়ের হাঁটা স্বাভাবিক হ’ল। আমার সেই মেয়ে ২০২৩ সালের দাখিল পরীক্ষায় গোল্ডেন A+ এবং ২০২৫ সালের আলিম পরীক্ষায় A+ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। আলহাম্দুলিল্লাহ

(৩) ২০০৬ সালেই আমার ছোট ভাই আব্দুর রঊফের বিয়ে ঠিক হ’ল। একমাত্র উপার্জনক্ষম বড় ভাই হিসাবে বিয়ের আনুষ্ঠানিক খরচের দায়িত্ব আমার কাঁধেই ছিল। কিন্তু ঐ সময় আমরা খুবই কষ্টে দিনাতিপাত করছিলাম। বিষয়টি আহমাদ আব্দুল্লাহ নাজীবের সঙ্গে আলোচনা করলে সে তার বাসায় জানাল। ফলে তিনি বিয়ের খরচ হিসাবে ১০,০০০ টাকা দিলেন। স্যারের কারামুক্তির পর সেই টাকার কথা স্যারকে জানালে তিনি বললেন, ঐ টাকা দিতে হবে না। এভাবে স্যার ও স্যারের পরিবারের আন্তরিকতা ও অবদানের কথা বলে শেষ করা যাবে না। এজন্য আমি আমার অন্তরের অন্ত:স্থল থেকে আমীরে জামা‘আত ও তাঁর পরিবারে জন্য দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ কামনা করি, আল্লাহ যেন তাঁদের উত্তম পারিতোষিক দান করেন। আমীন!

তাওহীদের ডাক : ২০০৫ সালে প্রশাসনিক পরিস্থিতি কেমন ছিল?

মুহাম্মাদ আনোয়ারুল হক : ২০০৫ সালে আমাদের নেতা-কর্মীদের মধ্যে প্রশাসনিক একটা আতংক ছিল। কেননা ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারী থেকে আগস্টের মধ্যে আমীরে জামা‘আতসহ কেন্দ্রের ও বিভিন্ন যেলার প্রায় ৪০জন নেতা-কর্মী গ্রেফতার হয়েছিলেন। সেকারণ অবস্থা এমন হয়েছিল যে, অনেকেই ঐ সময় প্রশাসনের ভয়ে স্যারের লেখা বই ও পত্রিকা পুড়িয়ে ফেলেন। কেউ মাটিতে পুঁতে রাখেন, কেউ নদীতে ভাসিয়ে দেন। কিন্তু আমরা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে স্যারের বই-পত্র সরবরাহ করে বলতাম, আপনারা পড়ুন, দেখুন, আমাদের কর্মসূচী সম্পর্কে জানুন। বিশেষ করে, ‘ইক্বামতে দ্বীন পথ ও পদ্ধতি’ বইয়ের অমুক অমুক পৃষ্ঠায় জঙ্গিবিরোধী স্পষ্ট লেখা আছে দেখুন। প্রশাসন নেতিবাচক কোনো কিছু পায়নি।

উল্লেখ্য যে, ঐসময় একদিন পত্রিকায় দেখি, প্রথম পৃষ্ঠায় ‘আন্দোলনে’র সাবেক কেন্দ্রীয় সমাজকল্যাণ সম্পাদক মুহাম্মাদ গোলাম মুক্তাদির বাবু ভাইয়ের ছবি ছাপা হয়েছে। তাঁর চোখ বাঁধা, হাতে হ্যান্ডকাফ লাগানো অবস্থায় পুলিশ তাকে নিয়ে যাচ্ছে! এই স্থির দৃশ্য দেখে খুবই কষ্ট পেলাম। তিনি তো চোর-ডাকাত বা সন্ত্রাসী-দুর্নীতিবাজও নন। তারপরও এ অবস্থা!

তাওহীদের ডাক : আমীরে জামা‘আত কেন গ্রেফতার হয়েছিলেন?

মুহাম্মাদ আনোয়ারুল হক : সাময়িক ক্ষমতার অহংকারে কথিত ইসলামী মূল্যবোধের সরকার দুনিয়াবী স্বার্থ হাছিলের উদ্দেশ্যে হাতিয়ার বানিয়েছিলেন নিজেদের অপরাধ লুকানোর জন্য। বিভিন্ন মাযহাব, মতবাদ ও তরীকার বেড়াজাল ছিন্ন করে যখন মানুষ ছুটলো ইসলামের আদিরূপের সন্ধানে জান্নাতুল ফেরদৌসের সুগন্ধি পেয়ে, তখনই কুচক্রীরা তাদের শেষ অস্ত্র নিক্ষেপ করলো আমীরে জামা‘আতের উপরে। যাতে করে এই সংগঠন শেষ হয়ে যায়। আমেরিকার তরফ থেকে একটা রিপোর্ট আমরা পরবর্তীতে জেনেছি যে, সরকারের উদ্দেশ্য ছিল, অন্তত ১৪ বছর ড. গালিবকে জেলে রেখে ‘এ আন্দোলন’কে পৃথিবী থেকে উৎখাত করবে। আর এজন্য আমীরে জামা‘আতকে বিনা অপরাধে ৩ বছর ৬ মাস ৬ দিন কারাগারে থাকতে হয়েছে। এছাড়াও স্যারের মূল্যবান সময় থেকে ৮ বছর ৮ মাস ২৮ দিন মিথ্যা মামলার বোঝা টানতে হয়েছে।

তবে তাদের চক্রান্ত ব্যর্থ হয়েছে। ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহ.) ৮ বার কারা নির্যাতিত হলেও তার ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে যেমন তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন, তেমনি আমাদের আমীরে জামা‘আত তাঁর কারাজীবনের কালজয়ী সাহিত্যকর্ম নবীদের কাহিনী ১, ২, সীরাতুর রাসূল (ছাঃ), তাফসীর ও মিশকাতের অনুবাদসহ অন্যান্য প্রবন্ধ-নিবন্ধ, দরস ও সম্পাদকীয় সমূহ লিখনীর মাধ্যমে আহলেহাদীছ আন্দোলনের ইতিহাসে স্থায়ী অবদান রেখেছেন। যা তাঁকে ক্বিয়ামত পর্যন্ত ছওয়াব প্রাপ্তির মাধ্যম ও দো‘আ লাভের জন্য স্মরণীয় করে রাখবে। যা ছিল সম্পূর্ণ আল্লাহর গায়েবী মদদ। ফালিল্লাহিল হামদ!

তাওহীদের ডাক : স্যারের গ্রেফতারের পর কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান মারকাযের অবস্থা কী ছিল?

মুহাম্মাদ আনোয়ারুল হক : স্যার গ্রেফতারের পর মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে যায়। আমরা কয়েকজন পরামর্শ করে সিদ্ধান্তে উপনীত হই যে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হ’ল জাতীয় সম্পদ। তাই দীর্ঘদিন বন্ধ রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। পরামর্শ অনুযায়ী আমরা মাদ্রাসা পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নেই। কয়েকদিন পর শনিবার মাদ্রাসা খুলে দেওয়া হ’ল। প্রথম দিন পাঁচজন শিক্ষক নিয়ে ক্লাস পরিচালনা করি। (১) মাওলানা বদীউযযামান, (২) মুহাম্মাদ আফযাল হোসাইন, (৩) আবুল কাসেম চেয়ারম্যান, (৪) মুহাম্মাদ আলাল হোসাইন এবং (৫) আমি মুহাম্মাদ আনোয়ারুল হক।

প্রথম দিন যথানিয়মে পাঠদান অনুষ্ঠিত হয়। পরের দিন থেকেই সকল শিক্ষক ও ছাত্র নিয়মিত ক্লাসে যোগ দিতে থাকে এবং মাদ্রাসা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।

তাওহীদের ডাক : শিক্ষকতাকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন? আর মারকাযে কতদিন শিক্ষক হিসাবে ছিলেন?

মুহাম্মাদ আনোয়ারুল হক : মারকাযে সেই একদিনই শিক্ষক হিসাবে কাজ করি। পরে আল্লাহর রহমতে যখন আমাদের প্রিয় আমীরে জামা‘আত জেল থেকে মুক্ত হলেন এবং আব্দুর রাযযাক ছাহেব মারকাযের প্রিন্সিপাল নিযুক্ত হলেন। তখন মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির বৈঠকে আমাকে সহকারী শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন প্রিন্সিপাল ছাহেব তা অনুমোদন করলেন না।

তবে আজও মাদ্রাসার দিকে তাকিয়ে আমার মনে হয়, আমাদের প্রিয় কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফীতে আমি যদিও মাত্র একদিনের জন্য শিক্ষকতার সুযোগ পেয়েছিলাম, তবুও সেটি আমার জীবনের এক অমূল্য অর্জন। গর্বের সাথে বলতে পারি, এই মহান প্রতিষ্ঠানের আমিও একজন সাবেক শিক্ষক।

উল্লেখ্য যে, ১৯৫৮ সালে আমাদের গ্রামে এলাকার মানুষদের উদ্যোগে কওমী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে আশির দশকে প্রতিষ্ঠানটি আলিয়া মাদ্রাসায় রূপান্তরিত হয়। আমি আলিম পাশ করলে আমাকে ইবতেদায়ী বিভাগের প্রধান শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু আমি দশম শ্রেণী পর্যন্ত কুরআন, হাদীছ, আরবী সাহিত্য এবং কুদূরী পড়াতাম। যদিও তখনো আমার দাওরায়ে হাদীছ শেষ হয়নি। তাই দীর্ঘ ছুটি নিয়ে দাওরায়ে হাদীছ শেষ করার উদ্দেশ্যে গাইবান্ধার ফুলবাড়ী মাদ্রাসায় ফিরে যাই। কিন্তু কমিটির ক্রমাগত চাপে আমাকে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগপত্র দিতে হয়েছিল।

সবশেষে বলতে হয়, এটি আল্লাহর ফায়ছালা ও আমার তাকদীর ছাড়া কিছুই নয়। মানুষের ইচ্ছা থাকলেও সবকিছু ভাগ্যের লিখন অনুযায়ী ঘটে। তাই ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষকতায় ফেরা আমার ভাগ্যে ছিল না।

তাওহীদের ডাক : আমীরে জামা‘আত কারাগারে থাকাকালীন স্যারের সাথে আপনারা কীভাবে সাক্ষাৎ করতেন?

মুহাম্মাদ আনোয়ারুল হক : আমীরে জামা‘আতের সন্তানদের সঙ্গে আমি অনেকবার জেলখানায় গিয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেছি। আমি প্রথম স্যারের মেজ ছেলে আহমাদ আব্দুল্লাহ নাজীবের সাথে নওগাঁ কারাগারে যাই। সেদিন স্যার ভিতরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আর আমরা বাইরে। মাঝখানে দেয়াল, জানালায় লোহার শিক ও নেট। জানালার এক কোণে মাত্র ছয় ইঞ্চির মতো ফাঁকা জায়গা। সেখান দিয়েই কোনোমতে হাত বাড়ানো সম্ভব।

স্যার যখন আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। গায়ে পরিষ্কার সাদা পাঞ্জাবি, মাথার চুল সুন্দর করে আচড়ানো, চেহারায় বিন্দুমাত্র ক্লান্তি নেই। বরং হাসিখুশি ও প্রশান্ত মন নিয়ে আমাদের অভ্যর্থনা করলেন। কথা-বার্তার এক পর্যায়ে স্যার জানালার ফাঁক দিয়ে হাত বাড়ালেন, আমরা মুছাফাহা করলাম। সেই মুহূর্তে স্যারকে দেখতে পারায় অন্তরে এক ধরনের শান্তি অনুভব করলেও চোখের কোনে পানি জমেছিল।

তবে মনে পড়ে, স্যারের গ্রেফতারের পর এক দুঃসহ সময় কাটিয়েছি। নওগাঁ থেকে তাঁকে বগুড়ার দিকে নেওয়ার পর টানা চবিবশ দিন কোনো খোঁজ-খবর ছিল না। কোথায় আছেন, কেমন আছেন, আদৌ বেঁচে আছেন কি না। এই অজানা আশংকায় আমরা ভীষণ উৎকণ্ঠিত ছিলাম। পরে জানতে পারলাম, তাঁকে গাইবান্ধা কারাগারে আনা হবে। নির্ধারিত দিন সকালে আমি ও স্যারের মেজ ছেলে আহমাদ আব্দুল্লাহ নাজীব সেখানে পৌঁছে গেলাম। সেদিন দুই পুলিশ স্যারকে দুই পাশে ধরে কোর্টে নিয়ে যাচ্ছিল। ঐ সময় স্যারের হাতে হ্যান্ডকাফসহ লম্বা দড়ি দিয়ে বাঁধা। দৃশ্যটি দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না। স্যারের থাকার কথা কোথায়! আর এখানে তাঁর সাথে কি আচরণ করা হচ্ছে? সংক্ষিপ্ত কথোপকথনের পর যখন স্যারকে আদালতের এজলাসে নেওয়া হ’ল। বগুড়ার আব্দুর রহীম ভাই ও শামসুল ভাই সেদিন ছিলেন। শত শত মানুষ ভিড় জমালো তাঁকে এক নযর দেখার জন্য। ভিড়ের চাপে পড়ে গিয়ে একজনের পা পর্যন্ত ভেঙে গেল। পরে বগুড়া কারাগারেও স্যারের সঙ্গে বেশ কয়েকবার সাক্ষাৎ করেছি।

তাওহীদের ডাক : আহলেহাদীছ সমাজের জন্য স্যারের খেদমত সম্পর্কে কিছু বলুন?

মুহাম্মাদ আনোয়ারুল হক : মুহতারাম আমীরে জামা‘আতের লেখা ছালাতুর রাসূল (ছাঃ) প্রকাশিত হওয়ার পর বাংলাভাষী লক্ষ লক্ষ মানুষের চাহিদা পূরণ হয়েছে। ফালিল্লাহিল হামদ! হজ্জের সময় স্যারের ‘হজ্জ ও ওমরাহ’ এবং ‘ছালাতুর রাসূল (ছাঃ)’-এর শত শত কপি বাঙালী হাজীদের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়। বাংলা ভাষীদের জন্য সীরাতুর রাসূল (ছাঃ) ও বিভিন্ন অনুবাদ গ্রন্থ, বিদ‘আতী মৌসুমে লোকদের মধ্যে হাযার হাযার ফ্রী লিফলেট বিতরণ করা হয়। ইক্বামতে দ্বীন বইয়ের মাধ্যমে তিনি দেশের জনগণ ও আলেম সমাজকে গভীরভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন ইক্বামতে দ্বীন কাকে বলে। যা আজও অন্য কেউ স্পষ্টভাবে লিখতে পারেননি। এ সকল কাজের জন্য আমরা স্যারকে বর্তমান ইসলামী জগতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক, গবেষক ও আন্তর্জাতিক মানের আলেম হিসাবে বিবেচনা করি। আমরা দো‘আ করি স্যারের ইলম আরও প্রসারিত হোক। আল্লাহ তাঁকে হায়াতে ত্বাইয়েবা দান করুন এবং ইসলামের খেদমত ও দাওয়াতী ময়দানে জাতির জন্য আরও স্থায়ী অবদান রাখার তাওফীক দিন। আল্লাহুম্মা আমীন!

তাওহীদের ডাক : আমীরে জামা‘আতের সাথে আপনার আর কোন স্মৃতিচারণ আছে কি?

মুহাম্মাদ আনোয়ারুল হক : একটি স্মরণীয় ঘটনা মনে পড়ে। স্যার তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবী বিভাগের চেয়ারম্যান। মাঝে মাঝে আমি স্যারের সঙ্গে মটরসাইকেলে যাতায়াত করতাম। একদিন স্যার আমাকে ডেকেছিলেন, ছুটির পর মটরসাইকেলে চলে আসার জন্য। আমি বেলা ১২টার দিকে ভার্সিটিতে পৌঁছাই। তখন ছুটি শেষ হয়ে স্যার বের হচ্ছিলেন। হঠাৎ ভূমিকম্প শুরু হয়। তিনতলা থেকে নামার জন্য শত শত ছাত্র দৌড়াতে থাকল। কিন্তু স্যার স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, ধীরস্থিরভাবে হাঁটছেন। আর আমি তাঁর পিছনে পিছনে হাঁটছি। স্যারকে ছেড়ে আমি কখনো দৌঁড়াতে পারব না। ঐ দিন দেখলাম, স্যারের আল্লাহ তা‘আলার ওপর তাওয়াক্কুল অনেক মযবূত। এ যেন মূসা (আঃ) আল্লাহর নির্দেশে বনু ইস্রাঈলের সঙ্গে দেশ ছাড়ার ঘটনা মনে করিয়ে দেয়। সমনে নদী, পিছনে ফেরাউনের বাহিনী। বনু ইস্রাঈলরা বলল, হে মুসা, আমরা ধরা পড়ে গেছি। মূসা (আঃ) বললেন, কখনো না! আল্লাহ আমাদের রক্ষা করবেন। এটাই হ’ল তাওয়াক্কুল আলাল্লাহ।

তাওহীদের ডাক : দাওয়াতী জীবনে আপনার এমন কোন অভিজ্ঞতা বা স্মৃতিচারণ আছে কি যা আমাদের অনুপ্রাণিত করবে?

মুহাম্মাদ আনোয়ারুল হক : ১৯৯৩ সালের কথা। সাংগঠনিক কাজে রাজশাহীতে এসেছিলাম। তখন রাণীবাজার ছিল ‘যুবসংঘে’র কেন্দ্রীয় অফিস। কাজকর্ম শেষে পরের দিন সকালে ফার্স্ট ট্রিপের বাসে উঠলাম। একজন ভদ্রলোক আমার পাশের সিটে বসলেন। আমার বয়স তখন প্রায় ত্রিশ, আর তাঁর বয়স হয়তো চল্লিশের কোঠায়। কথা শুরু হ’ল। একপর্যায়ে তিনি বললেন, ‘আমি বগুড়া আযীযুল হক সরকারী কলেজের প্রিন্সিপাল। আপনি কোন কলেজে পড়ান? আমি বললাম, আমি কোনো কলেজে পড়াই না। আমি একটি সংগঠন করি। সাংগঠনিক কাজে রাজশাহী এসেছি। কাজ শেষ করে বাড়ী ফিরছি। লালমণিরহাট আমার বাড়ী। তিনি জানতে চাইলেন, কোন সংগঠন করেন? আমি তখন যুবক। গলার স্বর বলিষ্ঠ, কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস। আমি সংগঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, পাঁচটি মূলনীতি এবং চার দফা কর্মসূচী সব ব্যাখ্যা করে বললাম।

তিনি শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। বগুড়া পর্যন্ত আমার সঙ্গে থাকলেও আর কোনো কথা বলেননি। সত্যি বলতে, যদি আমি সেই মুহূর্তে ‘যুবসংঘে’র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, মূলনীতি ও কর্মসূচী ব্যাখ্যা করতে না পারতাম, হয়তো তিনি আরো প্রশ্ন করতেন বা সন্দেহ প্রকাশ করতেন। সেই দিনটির কথা মনে হলে বিশ্বাস জন্মে যে, কীভাবে বিশ্বাসের শক্তি এক মুহূর্তেই অন্য মানুষকে স্তব্ধ করে দিতে পারে।

আমাদের কর্মীদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, মূলনীতি সমূহ ও চার দফা কর্মসূচী যদি মুখস্থ না থাকে, তাহ’লে অন্যদের নিকট আমরা দাওয়াত পেশ করতে পারব না। তাই আমাদের সকল কর্মীর সাংগঠনিক পরিচিতি কন্ঠস্থ করতে হবে এবং সে সাথে এই বইগুলো ভালো করে পড়তে হবে, ১. আহলেহাদীছ আন্দোলন কি ও কেন? ২. আহলেহাদীছ আন্দোলন কি চায় কেন চায় ও কিভাবে চায়? ৩. ইসলামী খেলাফত ও নেতৃত্ব নির্বাচন। ৪. সমাজ পরিবর্তনের স্থায়ী কর্মসূচী। ৫. কর্ম পদ্ধতি। ৬. তিনটি মতবাদ। ৭. ইক্বামতে দ্বীন : পথ ও পদ্ধতি ইত্যাদি।

তাওহীদের ডাক : আপনার মতে সাংগঠনিক জীবনে সফলতা লাভের উপায়গুলো কী কী?

মুহাম্মাদ আনোয়ারুল হক : পরকালে মুক্তি পাওয়া মানেই আমাদের সাংগঠনিক জীবনের সাফল্য অর্জন করা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে পরকালে মুক্তির জন্য শর্ত হ’ল চারটি। (ক) ঈমান, (খ) আমল, (গ) দাওয়াত ও (ঘ) ছবর (সূরা আছর)। প্রথম দু’টি হ’ল ব্যক্তিগত। তবে আমল কবুল হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত পূরণ করতে হয় (ক) ছহীহ আক্বীদা, (খ) ছহীহ তরীকা, (গ) ইখলাছে আমল। এই ব্যক্তিগত কার্যক্রম সঠিকভাবে সম্পন্ন করলে একজন ব্যক্তি কেবলমাত্র অর্ধেক মুক্তি অর্জন করতে পারে। অবশিষ্ট দু’টি দাওয়াত ও ছবর হ’ল সমাজগত। এই অংশে সঠিকভাবে জামা‘আতবদ্ধ জীবন বা সাংগঠনিকভাবে জীবন যাপন করতে পারলেই পূর্ণ মুক্তি বা সম্পূর্ণ সাফল্য অর্জন করা সম্ভব।

মানবতার মুক্তির দূত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেছেন, আমি তোমাদেরকে পাঁচটি বিষয়ে নির্দেশ দিচ্ছি, আল্লাহ আমাকে এ নির্দেশ দিয়েছেন, (১) জামা‘আতবদ্ধ জীবন যাপন করা (২) আমীরের আদেশ শ্রবণ করা (৩) তাঁর আনুগত্য করা (৪) প্রয়োজনে হিজরত করা (৫) আল্লাহর পথে জিহাদ করা। অতঃপর ঐ হাদীছে বলা হয়েছে, যদি কেউ জামা‘আতবদ্ধ জীবন যাপন থেকে বেরিয়ে যায় বা সম্পার্ক ছিন্ন করে, তাহ’লে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে গেল এবং জাহেলিয়াতের জীবন যাপন শুরু করল, যতক্ষণ না সে ফিরে আসে’ (তিরমিযী হা/২৮৬৩; আহমাদ হা/১৭৮১৩; ছহীহুল জামে‘ হা/১৭২৪)

হযরত আবু উমামা বাহেলী (রাঃ) বলেন, বিদায় হজ্জের ভাষণে আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় কর (২) পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আদায় কর (৩) রামাযান মাসের ছিয়াম পালন কর (৪) তোমাদের সম্পদের যাকাত প্রদান কর এবং (৫) তোমাদের আমীরের আনুগত্য কর; তোমাদের প্রভুর জান্নাতে প্রবেশ কর’ (আহমাদ, মিশকাত হা/৫৭১)

অত্র হাদীছে আমীরের আনুগত্যকে ছালাত, ছিয়াম, যাকাত ইত্যাদি ফরয ইবাদতের সাথে যুক্ত করে বলা হয়েছে এবং একে জান্নাতে প্রবেশের অন্যতম মাধ্যম হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। অতএব জামা‘আতবদ্ধ জীবন যাপন করলেই সাংগঠনিক জীবনে সফলতা অর্জন সম্ভব ইনশাআল্লাহ। আর ইসলামী জামা‘আত বা সংগঠনের মূল স্তম্ভ চারটি। যথা- (১) আমীর (২) মা’মূর (৩) বায়‘আত (৪) এত্বা‘আত। এই চারটি স্তম্ভের উপর শক্ত ভিত্তি গড়ে উঠলে সংগঠন সমন্বিতভাবে সফল হবে এবং ইহকালে ও পরকালে সফলতা অর্জন করবে।

তাওহীদের ডাক : সংগঠন বিমুখ ব্যক্তিদের সংগঠনে আসার ব্যাপারে কি বলবেন?

মুহাম্মাদ আনোয়ারুল হক : পরকালের বিষয় গভীরভাবে বিবেচনা করলে এবং জামা‘আতবদ্ধ জীবন যাপনের বিষয়ে হাদীছগুলোর দিকে তাকালে কোনো জ্ঞানী ব্যক্তি কখনোই সংগঠন বিমুখ থাকতে পারে না। কারণ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন জামা‘আতবদ্ধ জীবন বা সাংগঠনিক জীবন যাপন করতে। আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশ ও রাসূল (ছাঃ)-এর নির্দেশ একত্রে বিবেচনা করলে আর কোনো বিকল্প পথ থাকতে পারে না। কেননা আল্লাহ বলেছেন, রাসূল যে নির্দেশ দেন তা গ্রহণ কর, আর যা নিষেধ করেন তা বর্জন কর (হাশর ৫৯/৭)

অতএব, মুমিন নর-নারীর জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর আদেশের বাইরে নিজের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নেই (আহযাব ৩৩/৩৬)। যদি কেউ তা করে, তবে সে স্পষ্টভাবে গোমরাহীতে পতিত হবে। সুতরাং সাফল্য অর্জনের একমাত্র পথ হ’ল কুরআন ও ছহীহ হাদীছ মেনে চলা। অর্থাৎ আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশ অনুসরণ করে জামা‘আতবদ্ধ জীবন যাপন করা।

তাওহীদের ডাক : যুবসমাজের উদ্দেশ্যে কিছু নছীহত করুন।

মুহাম্মাদ আনোয়ারুল হক : যুবসমাজ হ’ল আমাদের সমাজের সবচেয়ে শক্তিশালী ও গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট। যুবকের প্রতি ফোটা রক্ত আল্লাহর দেওয়া পবিত্র আমানত। যদি তা আল্লাহর পথে ব্যয় না হয়, তবে তা হবে চরম খেয়ানত। তাই যুবসমাজের শক্তি, সময়, অর্থ ও মননশীলতা রূহানী কাজে লাগানোর জন্য আমাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

মুরববী এবং অভিভাবকদের দায়িত্ব হ’ল তাদের সন্তানদের ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা। পুরো সমাজকে পরিকল্পিতভাবে কাজ করতে হবে, যাতে যুবসমাজ শক্তিশালী ও নিবেদিত প্রাণ হয়ে উঠতে পারে। আল্লাহ প্রদত্ত মস্তিষ্ক যদি আমরা পড়াশোনা ও শিক্ষায় না লাগাই, তবে সেই শক্তি কাজে লাগবে না। যত বেশি পড়াশোনা ও ইলমের অধ্যয়ন করা হবে, মস্তিষ্ক তত বেশি চাঙ্গা হবে ও কর্মক্ষম হবে।

তাওহীদের ডাক : ‘তাওহীদের ডাক’ পত্রিকার পাঠকদের উদ্দেশ্যে যদি কিছু বলতেন।

মুহাম্মাদ আনোয়ারুল হক : তাওহীদের ডাক পত্রিকা দাওয়াতী ময়দানের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। শুধু পড়ার জন্য নয়, যদি একজন নতুন গ্রাহকও যুক্ত করা যায়, সেটাই এক ধরনের দাওয়াতী ফলাফল। তাই এই পত্রিকাটি পড়ুন, বন্ধু ও আত্মীয়কে পড়তে বলুন, বাড়ীতে-বাজারে বিতরণ করুন এবং আর্থিকভাবে প্রকাশনার কাজে সহযোগিতা করুন। আধুনিক যুগে জিহাদের তিনটি প্রধান হাতিয়ার হ’ল কথা, কলম ও সংগঠন। পত্রিকা পড়া, গ্রাহক করা, বিতরণ করা এবং প্রকাশনার জন্য আর্থিক সহায়তা করা এসবই কলমী জিহাদের অংশ। মনে রাখুন, একটি পাতার লেখা, একটি নিবন্ধও মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। যদি কেউ এই পত্রিকা পড়ে হেদায়াত পায়, তবে সেটাই আমাদের জন্য পরকালের মুক্তির এক শক্তিশালী মাধ্যম হবে ইনশাআল্লাহ। দো‘আ করি আল্লাহ আমাদের সবার ইলম বাড়িয়ে দিন এবং আমাদের কলমকে সর্বদা ইসলামের পথে সক্রিয় রাখুন।

তাওহীদের ডাক : আপনার মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

মুহাম্মাদ আনোয়ারুল হক : ‘তাওহীদের ডাক’ পত্রিকা পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের শিক্ষা থেকে শাশ্বত শান্তি ও মুক্তির বার্তা সর্বস্তরে পৌঁছে দিচ্ছে। তাই পত্রিকার সংশ্লিষ্ট সকলেই আলোর বাহক। আমি সকলের সুস্বাস্থ্য কামনা করছি এবং পত্রিকার উত্তরোত্তর অগ্রগতি কামনা করছি জাযাকুমুল্লাহু খায়রাল জাযা।



আরও