সালাফদের ঈদ উদযাপন

নাজমুন নাঈম 3 বার পঠিত

উপস্থাপনা : প্রতিটি জাতির নিজস্ব কিছু উৎসব রয়েছে। মুসলমানদের জন্য রয়েছে দু’টি ঈদ। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা। অন্যান্য জাতির তুলনায় মুসলমানদের ঈদ উদযাপনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হ’ল তারা ঈদ উদযাপন করে আল্লাহ তা‘আলার কৃতজ্ঞতা স্বীকার, নৈকট্য অর্জন ও তাঁর আনুগত্যের উদ্দেশ্যে। পক্ষান্তরে অন্য অনেক জাতির উৎসব গড়ে উঠেছে কুসংস্কার, কল্পকাহিনী এবং প্রবৃত্তির উপর। যেখানে তারা সাময়িক আনন্দ উপভোগ করে। যার পরিণাম হয় দুনিয়া ও আখিরাতে দুঃখ ও আফসোস।

ঈদের পরিচয় ও নামকরণ : ‘ঈদ’ শব্দটি আরবী عَوْدُ ‘আওদ’ মূলধাতু থেকে এসেছে। যার অর্থ ফিরে আসা। একে ‘ঈদ’ বলার কারণ, এটি প্রতি বছর ফিরে আসে। কেউ বলেন, এর নাম ‘ঈদ’ হয়েছে কারণ এর আগমনে আনন্দ ফিরে আসে। ঈদের পরিচয় সম্পর্কে সালাফে ছালেহীনের কিছু বক্তব্য নিম্নরূপ :

শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ (রহঃ) বলেন, ‘কোনো নির্দিষ্ট দিনে সকল মানুষের একসাথে মিলিত হওয়াকে ঈদ বলা হয়। যা প্রতি বছর, মাস বা সপ্তাহে নিয়মিতভাবে ফিরে আসে। যেমন এক বছর পর ঈদুল ফিতর; কিংবা এক সপ্তাহ পর জুম‘আ অনুষ্ঠিত হয়। ঈদের মধ্যে কয়েকটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়। (ক) একটি নির্দিষ্ট দিন, যেমন প্রতি বছরের শাওয়াল মাসের ১ তারিখ ঈদুল ফিতর বা প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার সাপ্তাহিক ঈদ জুম‘আ। (খ) মানুষের সমবেত হওয়া। (গ) সেই দিনে নির্দিষ্ট কিছু ইবাদত ও সংশ্লিষ্ট সামাজিক রীতি পালন করা। এটি নির্দিষ্ট স্থানের সাথে সম্পর্কিত হ’তে পারে। আবার সাধারণভাবেও পালিত হ‘তে পারে। এ সবকিছুকে সম্মিলিতভাবে ‘ঈদ’ বলা হয়’।[1]

হাফেয ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন,الْعِيدُ مَا يُعْتَادُ مَجِيؤُهُ وَقَصْدُهُ مِنْ زَمَنٍ وَمَكَانٍ ‘ঈদ হ’ল এমন সময় বা স্থান যা নিয়মিতভাবে ফিরে আসে ও উদযাপিত হয়’।[2]

ইমাম বাগাভী (রহঃ) বলেন,اَلْعِيْدُ يَوْمُ السُّرُوْرِ، وَسُمِّيَ بِهِ لِلْعَوْدِ مِنَ الْفَرْحِ إِلٰى الْفَرْحِ ‘ঈদ হ’ল আনন্দের দিন। এক আনন্দ থেকে আরেক আনন্দের দিনে বারবার ফিরে আসে বলে এই নামকরণ করা হয়েছে’।[3]

ইমাম শাওকানী (রহঃ) বলেন,قِيلَ: لِيَوْمِ الْفِطْرِ وَالْأَضْحَى عِيدَانِ، لِأَنَّهُمَا يَعُودَانِ فِي كُلِّ سَنَةٍ ‘ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহাকে ঈদ বলা হয়। কারণ এগুলো প্রতি বছর ফিরে আসে’।[4]

ইসলামে নির্ধারিত ঈদ : মুসলমানদের জন্য বার্ষিক ঈদ বা আনন্দেও দিন দু’টি। ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা। আর শুক্রবার সাপ্তাহিক ঈদের দিন। এছাড়া আর কোন ঈদ নেই। মুহাম্মাদ ইবনু ছালেহ আল-ওছাইমীন (রহঃ) বলেন, ‘শরী‘আতে নির্ধারিত ঈদ তিনটি। যথা : ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা এবং জুম‘আর দিন। এগুলো ছাড়া আর কোনো ঈদ নেই’।[5]

আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যখন হিজরত করে মদীনায় আসলেন, তখন তারা দু’টি নির্দিষ্ট দিনে খেলাধুলা করত। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এ দু’দিন কী? তারা বলল, আমরা জাহেলী যুগে এ দুই দিনে খেলাধুলা করতাম। তিনি বললেন,إِنَّ اللهَ قَدْ أَبْدَلَكُمْ بِهِمَا خَيْرًا مِنْهُمَا: يَوْمَ الْأَضْحَى، وَيَوْمَ الْفِطْرِ ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য এ দু’টির পরিবর্তে আরও উত্তম দু’টি দিন নির্ধারণ করেছেন, কুরবানীর দিন ও ফিতরের দিন’।[6] ছালেহ আল-ফাওযান বলেন, ‘এই দুই ঈদের সাথে নতুন কোনো ঈদ সংযোজন করা বৈধ নয়’।[7]

ঈদ সম্পর্কে সালাফদের মন্তব্য :

হাসান বাছরী (রহঃ) বলেন,كُلُّ يَوْمٍ لَا يُعْصَى اللَّهُ فِيهِ فَهُوَ عِيدٌ، فَالْيَوْمُ الَّذِي يَقْطَعُهُ الْمُؤْمِنُ فِي طَاعَةِ مَوْلَاهُ وَذِكْرِهِ وَشُكْرِهِ فَهُوَ لَهُ عِيدٌ. ‘যে দিন আল্লাহর অবাধ্যতা করা হয় না, সেদিনই ঈদ। অতএব মুমিন যে দিন আল্লাহর আনুগত্য, যিকর ও কৃতজ্ঞতার মধ্যে অতিবাহিত করে সেদিনই তার জন্য ঈদ’।[8]

হাফেয ইবনু রজব (রহঃ) বলেন,لَيْسَ الْعِيْدُ لِمَنْ لَبِسَ الْجَدِيْدَ إِنَّمَا الْعِيْدُ لِمَنْ طَاعَاتَهُ تَزِيْدُ... لَيْسَ الْعِيْدُ لِمَنْ تَجَمَّلَ بِاللِّبَاسِ وَالرُّكُوْبِ إِنَّمَا الْعِيْدُ لِمَنْ غُفِرَتْ لَهُ الذُّنُوْبُ فِي لَيْلَةِ الْعِيدِ تَتَفَرَّقُ خِلَعُ الْعِتْقِ وَالْمَغْفِرَةِ عَلَى الْعَبِيدِ، فَمَنْ نَالَهُ مِنْهَا شَيْءٌ فَهُوَ لَهُ عِيدٌ، وَإِلَّا فَهُوَ مَطْرُودٌ بَعِيدٌ ‘ঈদ তার জন্য নয় যে নতুন পোশাক পরেছে। বরং ঈদ তার জন্য যার আনুগত্য বৃদ্ধি পেয়েছে...। ঈদ তার জন্য নয় যে সুন্দর পোশাক ও বাহনে সজ্জিত হয়েছে। বরং ঈদ তার জন্য যার গুনাহসমূহ ক্ষমা করা হয়েছে। ঈদের রাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দাদের মধ্যে (জাহান্নাম থেকে) মুক্তি ও ক্ষমার অনুগ্রহ বণ্টন করা হয়। যে ব্যক্তি এর মধ্য থেকে কিছু অংশ পেয়ে যায়, তার জন্য সেটাই প্রকৃত ঈদ। আর যে তা থেকে বঞ্চিত হয়, সে তো বঞ্চিত ও দূরে নিক্ষিপ্ত’।[9]

আব্দুর রহমান আস-সা‘দী (রহঃ) বলেন,جَعَلَ اللهُ تَعَالٰى أَعْيَادَ الْمُسْلِمِيْنَ وَمَنَاسِكَهُمْ مُذَكِّرَةٌ لِآيَاتِهِ، وَمُنَبِّهًا عَلٰى سُنَنِ الْمُرْسَلِيْنَ وَطُرُقِهِمِ الْقَوِيْمَةِ، وَفَضْلِهِ وَإِحْسَانِهِ عَلَيْهِمْ ‘আল্লাহ মুসলমানদের ঈদ ও ইবাদতের অনুষ্ঠানসমূহকে তাঁর নিদর্শনসমূহের স্মারক, রাসূলদের সুন্নাত ও সঠিক পথের পথনির্দেশক এবং বান্দাদের প্রতি তাঁর দয়া ও অনুগ্রহের নিদর্শন করেছেন’।[10]

ঈদের দিনে আনন্দ প্রকাশ : ঈদ আসে দীর্ঘ এক মাস ছিয়াম পালনের পূর্ণতা ও আল্লাহর রাহে ত্যাগের নমুনা স্বরূপ পশু কুরবানীর আনন্দ নিয়ে। তাই এ দুই দিন তাকবীর পাঠ করা, ভালো খাওয়া-দাওয়া করা ও আনন্দ করা ইসলামের নিদর্শন।

ইমাম খাত্ত্বাবী (রহঃ) ও হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, أَنَّ إِظْهَارَ السُّرُورِ فِي الْأَعْيَادِ مِنْ شِعَارِ الدِّينِ ‘ঈদের দিনে আনন্দ প্রকাশ করা ইসলামের একটি নিদর্শন’।[11]

ইমাম ছান‘আনী (রহঃ) বলেন,أَنَّ إظْهَارَ السُّرُورِ فِي الْعِيدَيْنِ مَنْدُوبٌ، وَأَنَّ ذَلِكَ مِنْ الشَّرِيعَةِ الَّتِي شَرَعَهَا اللَّهُ لِعِبَادِهِ إذْ فِي إبْدَالِ عِيدِ الْجَاهِلِيَّةِ بِالْعِيدَيْنِ الْمَذْكُورَيْنِ دَلَالَةٌ عَلَى أَنَّهُ يُفْعَلُ فِي الْعِيدَيْنِ الْمَشْرُوعَيْنِ مَا تَفْعَلُهُ الْجَاهِلِيَّةُ فِي أَعْيَادِهَا، وَإِنَّمَا خَالَفَهُمْ فِي تَعْيِينِ الْوَقْتَيْنِ ‘ঈদের দুই দিনে আনন্দ প্রকাশ করা মুস্তাহাব। এটি শরী‘আতের অংশ। যা আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য বিধান করেছেন। জাহেলিয়াতের উৎসবের পরিবর্তে এই দুই ঈদ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে যে, বৈধ এই দুই ঈদের দিনে সেইসব আনন্দ ও খুশি প্রকাশ করা যাবে, যা জাহেলিয়াতের লোকেরা তাদের উৎসবের দিনে করত। ইসলাম শুধু উৎসবের সময় নির্ধারণে তাদের থেকে পার্থক্য করেছে।[12]

হাফেয ইবনু রজব (রহঃ) বলেন,اَلْعِيْدُ هُوَ مَوْسِمُ الْفَرْحِ وَالسُّرُوْرِ، وَأَفْرَاحُ الْمُؤْمِنِيِنَ وَسُرُوْرُهُمْ فِيْ الدُّنْيَا إِنَّما هُوَ: بِمَوْلَاهُمْ، إِذَا فَازُوْا بِإِكْمَالِ طَاعَتِهِ، وَحَازُوْا ثَوَابَ أَعْمَالِهِمْ بِوُثُوْقِهِمْ بِوَعْدِهِ لَهُمْ عَلَيْهَا بِفَضْلِهِ وَمَغْفِرَتِهِ- ‘ঈদ হ’ল আনন্দ ও খুশির মৌসুম। আর দুনিয়াতে মুমিনদের প্রকৃত আনন্দ হ’ল তাদের প্রভুকে ঘিরে, যখন তারা তাঁর পরিপূর্ণ আনুগত্য করতে পারে এবং কৃতকর্মের প্রতিদান স্বরূপ তাঁর প্রতিশ্রুত ক্ষমা ও অনুগ্রহ প্রত্যাশা করে’।[13] কেননা আল্লাহ বলেন,قُلْ بِفَضْلِ اللهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَلِكَ فَلْيَفْرَحُوا هُوَ خَيْرٌ مِمَّا يَجْمَعُونَ- ‘বল, আল্লাহর এই দান ও তাঁর অনুগ্রহের কারণে তাদেও আনন্দিত হওয়া উচিত। এটি তারা যা সঞ্চয় করে সবকিছু থেকে উত্তম’ (ইউনুস ১০/৫৮)

সালাফদের ঈদ উদযাপনের কিছু নমুনা : সালাফে ছালেহীন ঈদ উদযাপন করতেন আল্লাহর শুকরিয়া আদায়, বড়ত্ব ঘোষণা ও আনুগত্যের মাধ্যমে। সেখানে অশ্লীলতা ও অবাধ্যতার কোন স্থান ছিল না। তাদের পোশাক হ’ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন; কিন্তু তাতে বিলাসিতার কোন ছাপ ছিল না। তাদের দৃষ্টি থাকত সংযত। তাদের আচরণে ছিল বিনয়। সেখানে ঔদ্ধত্য ও দাম্ভিকতার লেশ থাকত না। ইমাম ইবনুল জাওযী (রহঃ) বলেন,أَوَّلُ وَظِيفَةٍ تَخْتَصُّ بِالْعِيدِ الْغُسْلُ، ثُمَّ الْبُكُورُ وَالْخُرُوجُ عَلَى أَحْسَنِ هَيْئَةٍ، إِلا أَنْ يَكُونَ مُعْتَكِفًا فَيَخْرُجُ فِي ثِيَابِ اعْتِكَافِهِ وَيُخْرِجُ مَعَهُ زَكَاةَ فِطْرِهِ،... فَإِذَا مَشَى فِي الطَّرِيقِ غَضَّ بَصَرَهُ ‘ঈদের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রথম কাজ হ’ল গোসল করা। এরপর সকালে তাড়াতাড়ি বের হওয়া এবং সর্বোত্তম পোশাক ও সজ্জায় বের হওয়া। তবে যদি কেউ ই‘তিকাফে থাকে, তাহলে সে তার ই‘তিকাফের পোশাকেই বের হবে এবং তার সাথে যাকাতুল ফিতর বের করবে...। আর যখন সে রাস্তায় চলবে, তখন নিজের দৃষ্টি সংযত রাখবে’।[14]

সুন্দর পোশাক ও সাজসজ্জা : ইমাম ইবনুল জাওযী (রহঃ) বলেন, قَدْ كَانَ السَّلَفُ يَلْبَسُوْنَ الثِّيَابَ الْمُتَوَسِّطَةَ لَا الْمُرْتَفِعَةَ وَلَا الدُّوْنَ، وَيَتَخَيَّرُوْنَ أَجْوَدَهُمَا لِلْجُمْعَةِ وَالْعِيْدِ وَلِقَاءِ الْإِخْوَانِ، وَلَمْ يَكُنْ تَخَيَّر الْأَجْوَدَ عِنْدَهُمْ قَبِيْحًا- ‘সালাফরা মধ্যম মানের পোশাক পরতেন। অতি উচ্চমানেরও না, একেবারে নিম্নমানেরও না। তারা জুম‘আ, ঈদ ও ভাইদের সাথে সাক্ষাতের সময় সবচেয়ে ভালো পোশাকটি বেছে নিতেন। সাধ্য অনুযায়ী ভালো পোশাক পরিধান না করা

তাদের কাছে অপসন্দনীয় ছিল’।[15]

ঈদের দিন নারীদের হাতে-পায়ে মেহেদী দেওয়া পসন্দনীয় কাজ। আলী ইবনু হুমাইদ বলেন,أَنَّ طَاوُسًا كَانَ لَا يَدَعُ جَارِيَةً لَهُ سَوْدَاءَ وَلَا غَيْرَهَا إِلَّا أَمَرَهُنَّ فَيَخْضِبْنَ أَيْدِيَهُنَّ وَأَرْجُلَهُنَّ لِيَوْمِ الْفِطْرِ وَيَوْمِ الْأَضْحَى ‘ত্বাউস (রহঃ) তার একজন কালো দাসী হোক বা অন্য কাউকে ছেড়ে দিতেন না। তিনি নারীদেও সকলেক ফিতর ও আযহার দিনে হাত-পায়ে মেহেদি লাগানোর নির্দেশ দিতেন’।[16]

ঈদের দিনে দৃষ্টি সংযম : ওয়াকী‘ (রহঃ) বলেন, আমরা একবার সুফিয়ান ছাওরীর সাথে ঈদের দিনে বের হ’লাম। তিনি বললেন, إِنَّ أَوَّلَ مَا نَبْدَأُ بِهِ فِي يَوْمِنَا هَذَا غَضُّ الْبَصَرِ ‘আজকের দিনে আমাদের প্রথম কাজ হ’ল দৃষ্টি সংযত রাখা।[17] হাসান ইবনু আবি সিনান (রহঃ) একবার ঈদের দিন বের হয়ে ফিরে এলে তাঁর স্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, আজ কত সুন্দরী নারী দেখেছ? তিনি বললেন,مَا نَظَرْتُ إِلا فِي إِبْهَامِي مُنْذُ خَرَجْتُ إِلَى أن رجعت ‘আমি বের হওয়ার পর থেকে ফিরে আসা পর্যন্ত আমার বুড়ো আঙুল ছাড়া আর কোথাও তাকাইনি’।[18]

ঈদের দিনে আনন্দ ও খেলাধুলা : শায়খ মুহাম্মাদ ইবনু ছালেহ ওছাইমীন (রহঃ) বলেন, ‘মানুষ যদি ঈদের দিনগুলোকে খেলাধুলা ও আনন্দের দিন বানায়, তাতে কোনো সমস্যা নেই। তবে শর্ত হ’ল এই আনন্দ ও খেলাধুলা যেন শরী‘আতের সীমা অতিক্রম না করে। যদি সেই খেলাধুলার মধ্যে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা থাকে, তাহ’লে মেলামেশার কারণে তা হারাম হবে। একইভাবে যদি এতে নিষিদ্ধ ছবি, হারাম গান বা নিষিদ্ধ বাদ্যযন্ত্র থাকে, তাহ’লে তাও জায়েয নয়। তবে শরী‘আতের সীমার ভেতরে থাকে এমন খেলাধুলা বা আনন্দ, যার মাধ্যমে মানুষ মনকে প্রশান্ত করে এবং ঈদের আনন্দ অনুভব করে। এতে কোনো অসুবিধা নেই’।[19]

ঈদের আনন্দে সীমালঙ্ঘন না করা : ইমাম ইবনুল জাওযী (রহঃ) বলেন,عِبَادَ اللّٰهِ إِنَّ يَوْمَكُمْ هَذَا يَوْمَ الْعِيدِ قَدْ مُيِّزَ فِيهِ الشَّقِيُّ وَالسَّعِيدُ، فَكَمْ فَرِحَ بِهَذَا الْيَوْمِ مَسْرُورٌ وَهُوَ مَطْرُودٌ مَهْجُورٌ ‘হে আল্লাহর বান্দাগণ! আজকের দিনেই সৌভাগ্যবান ও দুর্ভাগা পৃথক হয়ে যায়। কত মানুষ আজ আনন্দ করছে। অথচ তারা আল্লাহর কাছ থেকে বঞ্চিত, বিতাড়িত’![20]

মুমিনের প্রকৃত ঈদ তো জান্নাতে আল্লাহর সাথে দীদারকালে। দুনিয়াবী ঈদ তো ক্ষণকালের আনন্দ মাত্র। হাফেয ইবন রজব (রহঃ) বলেন, أَمَّا أَعْيَادُ الْمُؤْمِنِينَ فِي الْجَنَّةِ، فَهِيَ أَيَّامُ زِيَارَتِهِمْ رَبَّهُمْ عَزَّ وَجَلَّ، فَيَزُورُونَهُ وَيُكْرِمُهُمْ غَايَةَ الْإِكْرَامِ، وَيَتَجَلَّى لَهُمْ فَيَنْظُرُونَ إِلَيْهِ، فَمَا أَعْطَاهُمْ شَيْئًا هُوَ أَحَبُّ إِلَيْهِمْ مِنْ ذَلِكَ، وَهُوَ الزِّيَارَةُ، فَلَيْسَ لِلْمُحِبِّ عِيدٌ سِوَى قُرْبِ مَحْبُوبِهِ ‘আর জান্নাতে মুমিনদের ঈদ হ’ল তাদের প্রতিপালক মহান আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভের দিনগুলো। তারা তাঁর সাক্ষাৎ লাভ করবে, আর তিনি তাদের সর্বোচ্চ সম্মান দান করবেন। তিনি তাদের সামনে আত্মপ্রকাশ করবেন এবং তারা তাঁর দিকে তাকাবে। আল্লাহ তাদেরকে যে সব নে‘মত দিবেন, তার মধ্যে এই সাক্ষাৎই তাদের কাছে সবচেয়ে প্রিয় হবে। প্রেমিকের জন্য প্রকৃত ঈদ তো প্রিয়তমের নিকটবর্তী হওয়া ছাড়া আর কিছু নয়’।[21]

উপসংহার : ঈদের আনন্দ মানে শরী‘আতের সীমালঙ্ঘন নয়। বরং আল্লাহর নে‘মতের কৃতজ্ঞতা স্বীকার ও তাঁর আনুগত্যে নত হওয়া। কত মানুষ আছে যারা ঈদের দিনে আনন্দ করছে, অথচ তারা আল্লাহর কাছ থেকে অনেক দূরে! প্রকৃত ঈদ তো তাদের জন্য যারা আনুগত্যের মাধ্যমে ক্ষমা অর্জন করতে পেরেছে ও আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করেছে। তাই খেয়াল রাখতে হবে, ঈদের আনন্দ যেন অবাধ্যতার দুর্ভোগ বয়ে না আনে। আল্লাহ আমাদের তাওফীক্ব দিন।-আমীন!


[1]. ইক্বতিযাউ ছিরাতিল মুস্তাক্বীম ১/৪৯৬ পৃ.।

[2]. মাজমূ‘আতুর রাসায়েল ওয়াল মাসায়েল ১/১৮০ পৃ.।

[3]. তাফসীরে বাগাভী ২/১০২ পৃ.।

[4]. ফাতহুল ক্বাদীর ২/১০৬ পৃ.।

[5]. ফাতাওয়া নূর আলাদ দারব ৪/২পৃ.।

[6]. আবূদাউদ হা/১১৩৪; নাসাঈ হা/১৫৫৬।

[7]. ফাতাওয়া নূর আলাদ দারব ৪/২পৃ.।

[8]. লাওয়ামি‘ আনওয়ারুল বাহিইয়াহ ২/২৫০ পৃ.।

[9]. ইবনু রজব, লাত্বাইফুল মা‘আরিফ ১/২৭৭ পৃ.।

[10]. তাফসীরে সা‘দী ১/২৪৯ পৃ.।

[11]. ফাৎহুল বারী ২/৪৪৩ পৃ.।

[12]. সুবুলুল ইসলাম ১/৪৩৬ পৃ.।

[13]. তাফসীর ইবনু রজব ১/৩৮৩ পৃ.।

[14]. আত-তাবছিরাহ লি ইবনিল জাওযী ২/১০৬ পৃ.।

[15]. তালবীসু ইবলীস ১/১৭৮ পৃ.।

[16]. মুছান্নাফ আব্দুর রায্যাক হা/৫৮৫৬।

[17]. হিলয়াতুল আউলিয়া ৭/২৩ পৃ.।

[18]. আত-তাবছিরাহ লি ইবনিল জাওযী ২/১০৬ পৃ.।

[19]. শরহ বুলূগুল মারাম, কিতাবুছ ছালাত ৪৪-এর ব্যাখ্যা।

[20]. আত-তাবছিরাহ লি ইবনিল জাওযী ২/১০৬ পৃ.।

[21]. আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিইয়াহ ৩/৩৫১ পৃ.।



বিষয়সমূহ: ঈদ
আরও