মধ্যপন্থার সংকট ও আমাদের তরুণ সমাজ

ড. আহমাদ আব্দুল্লাহ ছাকিব 37 বার পঠিত

বর্তমান এই ফিতনার যুগে আমাদের মুসলিম তরুণ সমাজ এক অস্থির টানাপোড়েনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। তরুণদের একটি বড় অংশ আজ হয় চরমপন্থা, নতুবা চরম শিথিলতার চোরাবালিতে নিমজ্জিত। একদিকে নিদারুণ উদাসীনতা, অলসতা, দুনিয়ামুখিতা; অন্যদিকে আবেগপ্রবণতা, অস্থিরতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রবণতা। কেউ দ্বীনের বিষয়গুলোকে চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই আক্ষরিকভাবে নিয়ে সবকিছু কঠিন করে তোলে, আবার কেউ সহজতার নামে দ্বীনের সীমারেখাকেই মুছে দিতে চায়। এই বাইনারি বা দ্বি-বিভক্ত মানসিকতাই আমাদের অস্থিরতার মূল কারণ। এই দুই মেরুর প্রান্তিকতার মাঝখানে যে প্রজ্ঞাপূর্ণ, ভারসাম্যপূর্ণ পথ, সেটা হ’ল মধ্যপন্থা তথা মানহাজে সালাফের পথ।

মূলতঃ আহলেহাদীছ বা সালাফী পরিভাষা কোন আবেগীয় নাম নয়; এটি কুরআন ও সুন্নাহ তথা দ্বীনের মৌলিক দু’টি ভিত্তিকে ছাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে সালেহীনের বুঝ অনুযায়ী ধারণ করার নাম। এটি যেমন শিরক, বিদ‘আত ও বাতিলের বিরুদ্ধে দৃঢ়, তেমনি ন্যায়, প্রজ্ঞা, দয়া ও উত্তম চরিত্রের ক্ষেত্রেও অনন্য। তাই প্রকৃত সালাফী সেই ব্যক্তি, যার মধ্যে আক্বীদার স্বচ্ছতা যেমন থাকবে, তেমনি আখলাকের সৌন্দর্যও থাকবে; দলীলের দৃঢ়তা যেমন থাকবে, তেমনি সত্যকে গ্রহণ করার সাহসও থাকবে। এসব কিছুই ধারণ করা সম্ভব, যদি আমরা আমাদের আখলাক ও চেতনায় মধ্যপন্থার সহজতা ও সৌন্দর্যকে ধারণ করতে পারি।

দুঃখজনকভাবে আজকের তরুণ সমাজ অধিকাংশই মধ্যপন্থার বিষয়ে সচেতন নয়। ফলে সোশ্যাল মিডিয়ার এই সংবেদনশীল ময়দানে তাদের মধ্যে একটা বড় রোগ যুক্ত হয়েছে ‘জাজমেন্টাল’ হওয়া। সত্যের অনুসন্ধান বা গভীর উপলব্ধির চেয়ে ট্যাগিং বা লেবেল এঁটে দেওয়াতেই যেন তাদের বেশী তৃপ্তি। সামান্য মতপার্থক্য পেলেই তারা বোলতার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। সুরূরী, মানহাজী, মাদখালী, জামী, ইখওয়ানী-নানা ট্যাগ দিয়ে তারা নিজেদের পক্ষ-বিপক্ষ ঠিক করে নেয়। এই বিভাজন আমাদের চিন্তার জগতকে যেমন সংকীর্ণ করে ফেলছে, তেমনি একে অপরের প্রতি বিদ্বেষকে উসকে দিচ্ছে। তারা এমনভাবে ‘মানহাজ’ নিয়ে কথা বলে, যেন জান্নাতী ও জাহান্নামী শ্রেণীবিন্যাস করা এবং এর সার্টিফিকেট বিতরণ করার এলাহী দায়িত্ব তারা নিয়ে বসে আছে। এর ফলে দ্বীনের গভীরতা ও পরিধি যে কত বিশাল, তা বোঝার ধৈর্য বা উদারতা আমাদের মাঝে দিন কে দিন কমে যাচ্ছে।

এ কথা সত্য যে, বাতিল আক্বীদা, মানহাজ সম্পর্কে সতর্ক করা আলেমদের দায়িত্বের অংশ। কিন্তু সেই সতর্কতা যদি অজ্ঞতা ও আবেগের উপর দাঁড়ায়, নিজের ব্যক্তিগত পক্ষপাত বা বিদ্বেষের উপর ভিত্তিশীল হয়, ন্যায়ের বদলে অন্যায়কে আশ্রয় করে চালিত হয়, তাহ’লে তা সমাজে হেদায়াতের চেয়ে বিভাজনই বেশী সৃষ্টি করে। তাতে উদ্দেশ্য যতই ভাল হোক।

প্রিয় পাঠক, তারুণ্য হ’ল শক্তির সময়, স্বপ্নের সময়, আত্মগঠনের সময়। এই সময়টাকে যদি আমরা কেবল বিতর্ক, প্রতিক্রিয়া আর পারস্পারিক সংঘাতে ব্যয় করি, তাহলে উম্মাহ একজন সম্ভাবনাময় দাঈ, গবেষক, শিক্ষক বা সমাজসংস্কারককে হারাবে। তাই দ্বীনদার তরুণদের উচিত নিজের ভেতরে তাকানো। আমরা কি সত্যিই আল্লাহর জন্য দ্বীন শিখছি, নাকি কেবল গোষ্ঠীবাদী সমর্থকগ্রুপ হয়ে উঠছি? আমরা কি মানুষের হেদায়াত চাই, নাকি বিতর্কে জয়ী হতে চাই? আমরা কি সালাফদের ইখলাছ, ইবাদত, ধৈর্য ও দয়ার দিকগুলো অনুসরণ করছি, নাকি কেবল তাদের কঠোরতার ঘটনাগুলো খুঁজে খুঁজে সমাজে বিদ্বেষ তৈরী করছি? আমরা কি আমাদের সমাজ, আমাদের উম্মাহকে এক ধাপ এগিয়ে নিচ্ছি, নাকি আরো বিশৃংখল, বিভক্ত করছি? আমাদের ভাষা কি ধ্বংস করার ভাষা, নাকি সংশোধনের ভাষা। কারণ জান্নাতের পথ কেবল শুদ্ধ আক্বীদার নয়, বরং শুদ্ধ হৃদয়, উত্তম চরিত্র ও মধ্যপন্থারও পথ।

সালাফী মানহাজের অন্যতম সৌন্দর্য হ’ল, এটি মানুষকে যৌক্তিক, দালীলিক, বাস্তববাদী ও দায়িত্বশীল করে তোলে। একজন দ্বীনদার ব্যক্তি স্বীয় সমাজ থেকে পালিয়ে যায় না; বরং সমাজের ভেতরে থেকেই দরদের সংশোধনের কাজ করে। সে পরিবারে উত্তম সন্তান, প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বশীল কর্মী, সমাজে বিশ্বস্ত মানুষ এবং উম্মাহর জন্য উপকারী ব্যক্তি হওয়ার চেষ্টা করে। সে জানে ইসলাম কোন বিতর্কের বস্ত্ত নয়; বরং এটি সচ্চরিত্র, নেক আমল, দাওয়াত প্রদান, ধৈর্য, আত্মত্যাগ ও মধ্যপন্থার মহা অনুশীলনের নাম।

আমাদের তরুণদের প্রয়োজন এমন এক জাগরণ, যা কেবল শ্লোগান বা তত্ত্বনির্ভর নয়; বরং আত্মশুদ্ধি, ধৈর্য ও প্রজ্ঞার উপর প্রতিষ্ঠিত। প্রয়োজন এমন তারুণ্য, যারা রাতের নির্জনতায় আল্লাহর সামনে কাঁদবে, দিনের আলোয় মানুষের উপকারে এগিয়ে যাবে। যারা উম্মাহর ব্যথা অনুভব করবে, কিন্তু আবেগের বশে ভারসাম্য হারাবে না; যারা সত্য বলবে, কিন্তু আদব-আখলাক, শিষ্টাচার হারাবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, উম্মাহর মূল সংকট কেবল জাগতিক শক্তি না থাকা নয়; বরং নিজেদের ভেতরের অজ্ঞতা, মূর্খতা, বিভাজন, অহংকার এবং আত্মসমালোচনার অভাব।

প্রিয় পাঠক, ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য হ’ল তার ভারসাম্য ও মধ্যপন্থা। মহান আল্লাহ উম্মতে মুহাম্মদীকে ‘উম্মাতে ওয়াসাত’ বা মধ্যপন্থী জাতি হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। আমাদের তরুণদের তাই মধ্যপন্থী হওয়ার অনুশীলনে যুক্ত হ’তে হবে। রাসূল (ছা.)-এর জীবন থেকে মধ্যপন্থার শিক্ষা নিতে হবে। আর এজন্য তাদেরকে কয়েকটি বিষয়ের দিকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে- (১) কোন বিষয়ে গোঁড়ামি থেকে মুক্ত থাকতে হবে ও অন্ধভাবে আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রবণতা পরিহার করতে হবে। কেননা ভুল স্বীকারের মানসিকতা থেকেই জন্ম নেয় মধ্যপন্থা। তাই অহেতুক তর্ক-বিকর্কের জালে আটকে থাকা নয়; বরং বাস্তবতা ও সত্যকে মূল্যায়নের অভ্যাস ও পরিপক্কতা অর্জন করতে হবে। (২) আবেগ নয়, বিবেককে সর্বদা খোলা রাখতে হবে। কেননা অতি আবেগ আমাদেরকে ত্বরাপ্রবণ করে, দৃষ্টিভঙ্গিকে সংকীর্ণ করে ফেলে এবং বাস্তবতাকে আড়াল করে দেয়। বিশেষ করে দ্বীনী বিষয়ে কোন মত দিতে গেলে সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই এবং ভবিষ্যৎ ফলাফল চিন্তা করা অপরিহার্য। পথ চলতে গিয়ে হয়ত কখনও বাধা আসবে।

তখন শয়তান উসকে দেবে ক্ষোভের মেঘ, আর মানুষ হিসাবে আমাদের মনেও জমা হবে পুরু অভিমান। কিন্তু তরুণদের মনে রাখতে হবে, ক্ষোভের সেই মেঘকে ধুইয়ে দেওয়ার প্রকৃত অস্ত্র হ’ল ক্ষমার বৃষ্টি। ধৈর্য এবং ক্ষমার বাঁধ দিয়ে ক্ষোভ ও বিদ্বেষের স্রোতকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারাই মধ্যপন্থা অর্জনের অন্যতম পথ। (৩) সাধ্যমত অলসতা ও নিষ্ক্রিয়তা থেকে মুক্ত থাকতে হবে। কেননা অলস মস্তিস্ক সঠিক চিন্তা ও সঠিক সমাধান বের করার ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা। এজন্য দৈনন্দিন জীবনে অর্থপূর্ণ কাজের মাধ্যমে জীবনে শৃঙ্খলা ও গতিশীলতা বজায় রাখা প্রয়োজন। (৪) অভিযোগ নয়, সংশোধনের মানসিকতা অর্জন করতে হবে। কেউ যত বড় ভুলই করুক, তাকে হেয় করা বা ছোট করা নয়, বরং আন্তরিকতা ও সহানুভূতির মাধ্যমে তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টাই যরূরী। আমাদের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত প্রতিকূলতম অবস্থাতেও ইসলামের সৌন্দর্য ও ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা মানুষের সামনে তুলে ধরা, কাউকে সামাজিকভাবে কোণঠাসা করা নয়। (৫) প্রসঙ্গ ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা ব্যতীত মন্তব্য থেকে বিরত থাকতে হবে। কোন ঘটনা বা বক্তব্যের পূর্ণ প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ না করে হঠাৎ মন্তব্য করলে প্রায়ই তা ভুল সিদ্ধান্ত ও বিভ্রান্তির কারণ হয়। তাই ধৈর্যসহকারে বিষয়টি বোঝার পরই মন্তব্য করা কাম্য। (৬) সর্বোপরি হতাশা নয়, আশাবাদী ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রাখতে হবে। আশা না থাকলে মধ্যপন্থা ধরে রাখা যায় না। জীবনের প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তাই হতাশাকে স্থান না দিয়ে আশাবাদী মানসিকতা লালন করা উচিত। কারণ প্রতিটি সংকটের মধ্যেই আল্লাহ কোন না কোন কল্যাণ লুকিয়ে রাখেন। তাই ভবিষ্যতের প্রতি আস্থা রেখে ধৈর্য ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন।

শেষ কথা হ’ল, মধ্যপন্থা অবলম্বন করা অসম্ভব কোন কাজ নয়; বরং এটিই সঠিক পথ। এটিই একজন মুমিনের পরিচয়কে সুদৃঢ় করে তোলে। মধ্যপন্থা ব্যতীত ছিরাতুল মুস্তাকীমের পথে চলা যায় না। ভারসাম্যহীনতা বা প্রান্তিকতা কখনোই ঈমানের পথ নয়, জান্নাতের পথ নয়। অতএব আসুন, আমরা আমাদের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে মধ্যপন্থা ও ভারসাম্যতার নিবিড় চর্চা করি। ধৈর্যশীল, ক্ষমাপরায়ণ ও কল্যাণকামী এক আখলাকী সত্তা হিসাবে নিজেকে গড়ে তুলি। এভাবেই আল্লাহর দেয়া জীবন নামের আমানতটাকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করি। সে পথেই ছুটে চলুক আমাদের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ, যে পথের শেষ ঠিকানা জান্নাত। আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন। আমীন!



বিষয়সমূহ: যুবসমাজ বিবিধ
আরও