কুরবানীর আয়নায় মুমিনের উত্তরণ

আসাদুল্লাহ আল-গালিব 6 বার পঠিত

ভূমিকা : জীবন মানেই এক নিরন্তর সংগ্রাম। আর এই সংগ্রামের সার্থকতা নিহিত থাকে ত্যাগের মহিমায়। সৃষ্টির শুরু থেকে আজ অবধি পৃথিবীতে যত মহান বিপ্লব সাধিত হয়েছে, তার প্রতিটি বাঁকে মিশে আছে ত্যাগের গল্প। মহান আল্লাহ মুসলিম উম্মাহর জন্য ‘কুরবানী’কে কেবল একটি বার্ষিক উৎসব হিসাবে দেননি। বরং এর আমাদের ভেতরের সুপ্ত মনুষ্যত্বকে জাগিয়ে তোলার এক আধ্যাত্মিক পরশপাথর। কুরবানী আমাদের শেখায়, জীবনের উদ্দেশ্য কেবল ভোগ করা নয়, বরং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের সবচেয়ে প্রিয় বস্ত্তকে বিলিয়ে দেওয়া। এটি আমাদের আত্মশুদ্ধি, ধৈর্য এবং শৃংখলা শিক্ষা দেয়। যখন একজন মুমিন আল্লাহর নামে পশুর গলায় ছুরি চালায়, তখন সে আসলে তার মনের ভেতরে থাকা পশুত্ব, অহংকার এবং স্বার্থপরতাকেই বিসর্জন দেয়। কুরবানীর এই মহান শিক্ষা আমাদের যাপিত জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে প্রেরণা জোগাতে পারে। আলোচ্য প্রবন্ধে কুরবানীর আয়নায় মুমিনের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরা হ’ল।-

কুরবানী নববী সুন্নাত :

ইসলামী শরী‘আতে কুরবানী হ’ল একটি সুমহান ‘সুন্নাহ’। হযরত বারা বিন আযেব (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,مَنْ ذَبَحَ قَبْلَ الصَّلاَةِ فَإِنَّمَا يَذْبَحُ لِنَفْسِهِ، وَمَنْ ذَبَحَ بَعْدَ الصَّلاَةِ فَقَدْ تَمَّ نُسُكُهُ وَأَصَابَ سُنَّةَ الْمُسْلِمِينَ- ‘যে ব্যক্তি ছালাতের পূর্বে পশু যবেহ করল, সে কেবল নিজের (গোশত খাওয়ার) জন্যই যবেহ করল। আর যে ব্যক্তি ছালাতের পর যবেহ করল, তার কুরবানী পূর্ণ হ’ল এবং সে মুসলিমদের সুন্নাহ লাভ করল’।[1] অত্র হাদীছে নবী করীম (ছাঃ) শিখিয়েছেন যে, যদি কোন সঠিক কাজ সঠিক সময়ে ও সঠিক পদ্ধতিতে করা না হয়, তবে তার প্রকৃত মূল্য হারিয়ে যায়। সাথে সাথে রাসূল (ছাঃ) কর্তৃক অনুসৃত আমলগুলো তাঁর দেখানো পদ্ধতিতেই হ’তে হবে। তবেই সেটি সুন্নাহ হিসাবে গণ্য হবে।

খলীলুল্লাহ ইব্রাহীম (আঃ)-এর সুন্নাহর পুনর্জাগরণ :

কুরবানী কেবল একটি নির্দিষ্ট দিনে পশু যবেহের নাম নয়। বরং এটি মুমিনের জীবনের এমন এক আয়না, যেখানে ফুটে ওঠে তার ঈমান, আনুগত্য এবং আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসার প্রকৃত রূপ। কুরবানী এই আত্মত্যাগের ইতিহাস আজ থেকে কয়েক হাযার বছর আগে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) আল্লাহর নির্দেশে তাঁর কলিজার টুকরো সন্তান হযরত ইসমাইল (আঃ)-কে কুরবানী করতে উদ্যত হয়ে যে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, আল্লাহ ক্বিয়ামত পর্যন্ত আসা মুসলিম উম্মাহর জন্য সেই স্মৃতিকে স্মরণীয় করে দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন,فَلَمَّا أَسْلَمَا وَتَلَّهُ لِلْجَبِينِ- وَنَادَيْنَاهُ أَنْ يَاإِبْرَاهِيمُ- قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ- إِنَّ هَذَا لَهُوَ الْبَلَاءُ الْمُبِينُ- وَفَدَيْنَاهُ بِذِبْحٍ عَظِيمٍ- وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الْآخِرِينَ- ‘অতঃপর পিতা-পুত্র উভয়ে যখন আত্মসমর্পণ করল এবং পিতা পুত্রকে উপুড় করে ফেলল’। ‘তখন আমরা তাকে ডাক দিলাম হে ইব্রাহীম! অবশ্যই তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছ। এভাবেই আমরা সৎকর্মশীলদের পুরস্কার দিয়ে থাকি’। ‘নিশ্চয়ই এটা ছিল একটি সুস্পষ্ট পরীক্ষা’। ‘আর আমরা তার বিনিময়ে তাকে দান করলাম একটি মহান কুরবানী’। ‘এবং আমরা তার প্রশংসাবাণী অব্যাহত রাখলাম পরবর্তীদের মধ্যে’ (ছফফাত ৩৭/১০৩-১০৮)

কুরবানী আমাদের শেখায়, হারানো মানেই শেষ হয়ে যাওয়া নয়; বরং আল্লাহর জন্য কোনো কিছু হারানো মানে হ’ল চিরস্থায়ী ও মহান কোনো প্রাপ্তির দিকে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। তাই ইব্রাহীমী এই চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে ত্যাগের মাধ্যমে বিজয়ের সোপানে আরোহণ করুন। কারণ যে হৃদয় আল্লাহর জন্য বিসর্জন দিতে জানে, সেই হৃদয়ই প্রকৃতপক্ষে জয়ী হয়।

আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ :

একজন মুমিনের উপর আল্লাহর সীমাহীন করুণার জীবন্ত নিদর্শন হ’ল কুরবানীর এই মহান আমল। কেননা যে, মহান আল্লাহ পশুকে আমাদের জন্য অনুগত করে দিয়েছেন। যদি তিনি তা না করতেন, তবে আমাদের সাধ্য ছিল না তাকে সামলানোর। আল্লাহ বলেন,كَذَلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمْ لِتُكَبِّرُوا اللهَ عَلَى مَا هَدَاكُمْ وَبَشِّرِ الْمُحْسِنِينَ- ‘এভাবে ওগুলিকে (কুরবানীর পশু) আল্লাহ তোমাদের অনুগত করে দিয়েছেন। যাতে তোমরা আল্লাহর মহিমা ঘোষণা কর এজন্য যে, তিনি তোমাদেরকে সুপথ প্রদর্শন করেছেন। অতএব তুমি সৎকর্মশীলদের সুসংবাদ দাও’ (হজ্জ ২২/৩৬)

প্রভূত দুনিয়াবী কল্যাণ :

আল্লাহর নির্দেশিত পথে ব্যয় করলে কখনো সম্পদ কমে না। বরং এই আত্মিক ও আর্থিক কুরবানীর মধ্যে প্রভূত কল্যাণ রয়েছে। আল্লাহ বলেন, وَالْبُدْنَ جَعَلْنَاهَا لَكُمْ مِنْ شَعَائِرِ اللهِ لَكُمْ فِيهَا خَيْرٌ فَاذْكُرُوا اسْمَ اللهِ عَلَيْهَا صَوَافَّ.... ‘আর কুরবানীর উটকে আমরা তোমাদের জন্য আল্লাহর অন্যতম নিদর্শন করেছি। এতে তোমাদের জন্য প্রভূত কল্যাণ রয়েছে’ (হজ্জ ২২/৩৬)

ইবনু কাছীর (রহঃ) এই আয়াতের তাফসীরে একটি চমৎকার ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, সালাফে ছালেহীন বা পূর্বসূরীগণের মধ্যে কেউ কেউ এমন ছিলেন, যারা ঋণ করে হলেও কুরবানীর জন্য উট নিয়ে আসতেন। তাঁকে যখন জিজ্ঞেস করা হ’ল, আপনি ঋণ করে কুরবানীর পশু কিনছেন? তখন তিনি উত্তরে বললেন, আমি মহান আল্লাহর বাণী থেকে জেনেছি তিনি বলেছেন, এতে তোমাদের জন্য প্রভূত কল্যাণ রয়েছে’।[2] 

তাক্বওয়া অর্জনের মাধ্যম :

আমাদের যাপিত জীবনে আমরা যা কিছু করি, তার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত তাক্বওয়া। কেননা আল্লাহর দরবারে পশুর রক্ত বা গোশত পৌঁছায় না, বরং পৌঁছায় সেই ‘তাক্বওয়া’ যা পশুর গলায় ছুরি চালাতে উদ্বুদ্ধ করেছে। আল্লাহ বলেন,لَنْ يَنَالَ اللهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَكِنْ يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنْكُمْ- ‘ওগুলির গোশত ও রক্ত আল্লাহর নিকটে পৌঁছে না। বরং তাঁর নিকট পৌঁছে তোমাদের আল্লাহভীতি’ (হজ্জ ২২/৩৭)। সুতরাং পশুর গলায় ছুরি চালানোর সময় আপনার মনে আল্লাহর প্রতি কতটুকু ভালোবাসা ও ভয় কাজ করছিল, তা-ই আসল।

নিঃস্বার্থ ত্যাগের মহিমা :

পুণ্যবানরা পরকালকে ভয় করেন। এই ভয়ই তাদের দানশীল হ’ত উদ্বুদ্ধ করে। যখন দুনিয়াদার মানুষ নিজ স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত থাকে, তখন তারা তাদের প্রিয় খাদ্য ও সম্পদ বিলিয়ে দেন সেইসব মানুষের মাঝে, যাদের থেকে কোনো প্রতিদান পাওয়ার আশা নেই। আমাদের কুরবানীর পশুর যে অংশটি আমরা নিঃস্বার্থভাবে নিঃস্ব, অভাবী যারা চায় এবং যারা চায়না তাদের যা দেই, তা মূলত আমাদের জন্য পরকালীন নিরাপত্তা স্বরূপ। মহান আল্লাহ বলেন, وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَى حُبِّهِ مِسْكِينًا وَيَتِيمًا وَأَسِيرًا- إِنَّمَا نُطْعِمُكُمْ لِوَجْهِ اللهِ لَا نُرِيدُ مِنْكُمْ جَزَاءً وَلَا شُكُورًا- إِنَّا نَخَافُ مِنْ رَبِّنَا يَوْمًا عَبُوسًا قَمْطَرِيرًا- فَوَقَاهُمُ اللهُ شَرَّ ذَلِكَ الْيَوْمِ وَلَقَّاهُمْ نَضْرَةً وَسُرُورًا- ‘তারা আল্লাহর মহববতে অভাবগ্রস্ত, ইয়াতীম ও বন্দীদের আহার্য প্রদান করে’। ‘(তারা বলে) আমরা শুধুমাত্র আল্লাহর চেহারা কামনায় তোমাদেরকে খাদ্য দান করি। তোমাদের নিকট থেকে আমরা কোনরূপ প্রতিদান ও কৃতজ্ঞতা কামনা করি না’। ‘আমরা আমাদের পালনকর্তার পক্ষ হ’তে এক ভয়াবহ ও দীর্ঘস্থায়ী সংকটের দিনকে ভয় করি’। ‘অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে সেদিনের অনিষ্ট হ’তে রক্ষা করবেন এবং তাদেরকে দিবেন প্রফুল্লতা ও আনন্দ’ (দাহর ৭৬/৫-১২)

অন্নদান শ্রেষ্ঠ মানবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য :

মানবজীবনের প্রকৃত স্বার্থকতা ত্যাগের মাধ্যমে অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর মধ্যে নিহিত। এজন্য রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁর গোটা জীবনে কেবল ইবাদতের কথাই বলেননি। বরং অন্নহীনকে খাবার দেওয়া এবং অভাবীদের পাশে দাঁড়ানোকে সর্বোত্তম মানুষের বৈশিষ্ট্য হিসাবে ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, خِيَارُكُمْ مَنْ أَطْعَمَ الطَّعَامَ ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে অন্যকে খাদ্য দান করে’।[3] আর যথাযথভাবে কুরবানীর গোশত বন্টনের মধ্যদিয়ে আমরা সেই শ্রেষ্ঠ মানুষ হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারি ইনশাআল্লাহ।

কুরবানীর মাধ্যমে ডান দিকের সৌভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্তি :

কুরবানীর গোশত ও অন্যান্য খাদ্য সামগ্রী বণ্টনের সময় সবার আগে নিজের গরীব আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের খোঁজ নেওয়া উচিত। আল্লাহ বলেন,أَوْ إِطْعَامٌ فِي يَوْمٍ ذِي مَسْغَبَةٍ- يَتِيمًا ذَا مَقْرَبَةٍ- أَوْ مِسْكِينًا ذَا مَتْرَبَةٍ- ثُمَّ كَانَ مِنَ الَّذِينَ آمَنُوا وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ وَتَوَاصَوْا بِالْمَرْحَمَةِ- أُولَئِكَ أَصْحَابُ الْمَيْمَنَةِ- ‘অথবা ক্ষুধার দিনে অন্নদান করা’, ‘ইয়াতীম নিকটাত্মীয়কে’, ‘অথবা ভূলুণ্ঠিত অভাবগ্রস্তকে’। অতঃপর তাদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দেয় ও পরস্পরকে দয়ার উপদেশ দেয়’। ‘এরাই হ’ল ডান পাশের মানুষ’ (বালাদ ৯০/১৪-১৮)। এছাড়াও রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়দের পাশে দাঁড়ানো দ্বিগুণ ছওয়াবের কাজ’।[4]

মুমিনের হৃদয়ে আনন্দ প্রবেশের মাধ্যম :

মুমিনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা হ’ল তার কোন কাজ বা আচরণের মাধ্যমে অপর একজন মুসলিমের বিষণন হৃদয়ে আনন্দের সঞ্চার করা। কুরবানী সেই আনন্দ বিলিয়ে দেওয়ার এক শ্রেষ্ঠ মৌসুম। যখন আপনি কুরবানীর গোশত নিয়ে কোনো অসহায় মানুষের দ্বারে পৌঁছান, তখন তার তৃপ্তির হাসি কেবল আপনার জন্য ছওয়াবই বয়ে আনে না, বরং মহান আল্লাহর কাছে আপনাকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। হযরত ইবনুল মুনকাদির (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, সর্বোত্তম আমলসমূহের অন্যতম হ’ল তোমার (অন্য) মুমিন ভাইয়ের হৃদয়ে আনন্দ প্রবেশ করানো। তা হ’তে পারে তার ঋণ পরিশোধ করে দেওয়ার মাধ্যমে, তার কোনো প্রয়োজন পূরণ করে দেওয়ার মাধ্যমে অথবা তার কোনো বিপদ বা দুশ্চিন্তা দূর করে দেওয়ার মাধ্যমে।[5] 

কুরবানীর মৌসুমে অনেক পরিবার হয়তো অর্থাভাবে পশু যবেহ করতে পারে না। তাদের পাশে দাঁড়ান। তাদের প্রয়োজনে সাড়া দিন এবং তাদের সন্তানদের মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করুন। ইনশাআল্লাহ সেটিই হবে অন্যতম একটি শ্রেষ্ঠ ইবাদত।

বহুগুণ নেকী বৃদ্ধি :

একটি ছোট গৃহপালিত পশুর বাচ্চাকে যেমন আপনি যত্ন করেন, খাবার দেন এবং আস্তে আস্তে সেটি বড় হয়। ঠিক তেমনি আপনার সামান্য দানকেও আল্লাহ লালন করেন। অতঃপর হঠাৎ দেখা যাবে সেটি পাহাড়ের মতো বিশাল ও মহান কিছুতে পরিণত হয়েছে। তাই পরিমাণের চেয়ে উপার্জনের বিশুদ্ধতাই আল্লাহর কাছে বেশি দামী।[6] 

সুতরাং একটি খেজুরের মতো সামান্য দানও আল্লাহর কাছে তুচ্ছ নয়। কুরবানীর আনন্দঘন দিনগুলোতে অভাবী মানুষকে ভুলে যাবেন না। আপনার আশে-পাশে অনেক অভাবী মানুষ পাবেন, তাদের পাশে দাঁড়ান। সার্বিক খোঁজ-খবর নিন ও সহযোগিতা করুন। ক্বিয়ামতের দিন সেটিই আপনার সামনে একটি বিশাল পাহাড়ের ছওয়াব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে ইনশাআল্লাহ।

পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি ও জান্নাতের পথ সুগম :

ঈমানের পূর্ণতা আসে পারস্পরিক ভালোবাসা ও মমত্ববোধের মাধ্যমে। ইসলামী শরী‘আতে মুমিনদের এক দেহের মতো তুলনা করা হয়েছে। যখন আপনি আপনার কুরবানীর গোশত নিয়ে অন্য ভাইয়ের পাশে দাঁড়ান কিংবা মুখে হাসি নিয়ে তাকে সালাম দেন, তখন আপনাদের মাঝে তৈরি হয় জান্নাতী সম্প্রীতি। এই পারস্পরিক ভালোবাসা ছাড়া ঈমান পূর্ণ হয় না। আর পূর্ণ ঈমান ছাড়া জান্নাতে প্রবেশ করা সম্ভব নয়।[7]

তাই কুরবানীর এই দিনগুলোতে যখন আমরা একে অপরের বাড়িতে যাই, তখন পারস্পরিক সালামের বিনিময় হয়। এতে পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়।

আল্লাহর দরবারে ত্যাগের কবুলিয়াত :

মুমিন জীবনের প্রতিটি ইবাদতের মূল লক্ষ্য হ’ল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ইবাদতের গুরুত্ব থাকলেও ১০ই জিলহজ্জ বা কুরবানীর দিন আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়। এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়। বরং এটি বান্দার অন্তরের তাক্বওয়া এবং আল্লাহর নির্দেশের প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্যের এক বহিঃপ্রকাশ। এই মহান দিন সম্পর্কে রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, إِنَّ أَعْظَمَ الأَيَّامِ عِنْدَ اللَّهِ تَبَارَكَ وَتَعَالَى يَوْمُ النَّحْرِ ثُمَّ يَوْمُ الْقَرِّ ‘নিশ্চয় দিনগুলোর মধ্যে আল্লাহর নিকট সর্বশ্রেষ্ঠ দিন হ’ল, নাহরের (কুরবানীর) দিন। এরপর এর পরবর্তী দিন (কুরবানীর দ্বিতীয় দিন)’।[8]

আনন্দের মধ্যেও আল্লাহর যিকিরে আত্মিক সিক্ততা :

একজন মুমিন উৎসবের দিনেও তার রবের কথা ভুলে যায় না। আনন্দের আতিশয্যে আমরা যেন আমাদের ছালাত, তাকবীর এবং দ্বীনি দায়িত্বগুলো ভুলে যাই না। বরং আনন্দ ও ত্যাগের এই অপূর্ব ভারসাম্যই ইসলামী শরী‘আতের মূল সৌন্দর্য। হযরত নুবাইশাহ আল-হাযালী (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেছেন,أَيَّامُ التَّشْرِيقِ أَيَّامُ أَكْلٍ وَشُرْبٍ وَذِكْرِ اللهِ- ‘আইয়ামে তাশরীক্ব তথা কুরবানীর পরবর্তী তিন দিন হ’ল পানাহার এবং মহান আল্লাহর যিকিরের দিন’।[9]

ছহেবে মির‘আত বলেন, এই দিনগুলোতে পানাহারের নির্দেশের পরপরই আল্লাহর যিকিরের নির্দেশ দেওয়ার কারণ হ’ল বান্দা যেন কেবল নিজের প্রবৃত্তি আর স্বাদ আস্বাদনেই ডুবে না যায় এবং এই আনন্দের দিনগুলোতে মহান আল্লাহর হক বা অধিকারের কথা ভুলে না যায়।[10]

উপসংহার :

কুরবানী আমাদের শেখায় কোনো ত্যাগই বৃথা যায় না। বরং তা আল্লাহর নিকট লালিত-পালিত হ’তে থাকে। আপনি আজ আল্লাহর জন্য যে ক্ষুদ্র ত্যাগটুকু করবেন, তা কাল আপনার জন্য মুক্তির বড় অসিলা হয়ে দাঁড়াবে। ত্যাগের মাধ্যমেই মানুষ পশুত্বের স্তর থেকে মনুষত্বের স্তরে উন্নীত হয়। আপনার ভেতরের অলসতা, হিংসা আর সংকীর্ণতাকে আজ কুরবানী দিন। ত্যাগের এই মহান আদর্শকে কেবল বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনে সীমাবদ্ধ না রেখে একে আপনার জীবনের স্থায়ী নীতিতে পরিণত করুন। কারণ, যে নিজেকে বিলিয়ে দিতে জানে, দিনশেষে পৃথিবীটা কেবল তার জয়েই মুখরিত হয়। আসুন, এবারের কুরবানীর প্রতিটি মুহূর্তকে আমরা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতায় ভরিয়ে তুলি। আমাদের পশু যবেহ, আমাদের ছালাত এবং আমাদের দান সবই যেন হয় একমাত্র আল্লাহর জন্য। আমরা আল্লাহর সেই প্রতিধ্বনি তুলি,قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ- ‘বল, আমার ছালাত ও আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ, সবকিছুই জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য’ (আন‘আম ৬/১৬২)

 -আসাদুল্লাহ আল-গালিব

[কেন্দ্রীয় অর্থ সম্পাদক, বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ]


[1]. বুখারী হা/৫৫৪৬; মুসলিম হা/১৯৬১; মিশকাত হা/১৪৩৭।

[2]. তাফসীরে ইবনে কাছীর ৩/২২১।

[3]. ইবনু আসাকির, আল-মাক্বাতিল; ছহীহাহ হা/৪৪।

[4]. বুখারী হা/১৪৬৬; মুসলিম হা/১০০০; মিশকাত হা/১৯৩৪।

[5]. বায়হাকী শো‘আবুল ঈমান হা/৭২৭৪; ছহীহা হা/২২৯৯।

[6]. বুখারী হা/১৪১০; মুসলিম হা/১০১৪; মিশকাত হা/১৮৮৮।

[7]. মুসলিম হা/৫৪; মিশকাত হা/৪৬৩১।

[8]. আবু দাঊদ হা/১৭৬৫; মিশকাত হা/২৬৪৩।

[9]. মুসলিম হা/১১৪১; মিশকাত হা/২০৫০।

[10]. মির‘আতুল মাফাতীহ শরহ মিশকাতুল মাছাবীহ ৭/৭০ পৃ.।



আরও