মাহফূযুর রহমান (জয়পুরহাট)
তাওহীদের ডাক ডেস্ক
তাওহীদের ডাক : আপনি কেমন আছেন?
হাফেয শেখ সা‘দী : আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ ভালো রেখেছেন।
তাওহীদের ডাক : আপনার জন্ম ও পরিবার সম্পর্কে বলুন।
হাফেয শেখ সা‘দী : আমার জন্ম ১৯৮১ সালের ১৭ই আগস্টে ঢাকার আগারগাঁওয়ে বাবার কর্মস্থলে। আমাদের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর যেলার শাহরাস্তিতে। তবে বাবার সরকারী চাকুরীর কারণে ১৯৯১ সাল থেকে আমরা চট্টগ্রামে বসবাস শুরু করি। বর্তমানে আমাদের স্থায়ী নিবাস চট্টগ্রাম।
তাওহীদের ডাক : আপনার শিক্ষাজীবন সম্পর্কে কিছু বলুন।
হাফেয শেখ সা‘দী : আমি গ্রামের বাড়ী শাহরাস্তিতেই তৃতীয় শেণী পর্যন্ত পড়েছি। এরপর চট্টগ্রামে এসে চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি হই। ওই সময় আমাদের বাসার পাশেই একটি কওমী মাদ্রাসায় হিফয বিভাগ ছিল। আমি সেই মাদ্রাসার হিফযখানা থেকে ছাত্রদের কুরআন তেলাওয়াত শুনে আকৃষ্ট হই। এক পর্যায়ে পরিবারের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ার মাঝামাঝি সময়ে জেনারেল পড়াশোনা ছেড়ে হিফয বিভাগে ভর্তি হই। আলহামদুলিল্লাহ, পাঁচ বছরে পূর্ণাঙ্গ কুরআন হিফয সম্পন্ন করি। এরপর একটি সুন্নিয়া মাদ্রাসায় চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণী শেষ করে ‘বাইতুশ শরফ’ মাদ্রাসায় ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে ফাযিল পর্যন্ত পড়াশোনা সম্পন্ন করেছি।
তাওহীদের ডাক : আপনি কখন বিশুদ্ধ ইসলাম বুঝতে শুরু করেছিলেন?
হাফেয শেখ সা‘দী : আমাদের পরিবার ছিল ধর্মপ্রাণ। তবে ২০০৮-০৯ সালের দিকে টিভিতে ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলি দেখতাম। বিশেষ করে এনটিভিতে প্রচারিত ‘আপনার জিজ্ঞাসা’ অনুষ্ঠানটি নিয়মিত দেখতাম। একদিন মাওলানা আবুল কালাম আযাদের একটি বক্তব্যে প্রথমবার শুনি, ছালাতের নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা ‘বিদ‘আত’। কথাটা আমার মনে খুব প্রভাব ফেলে। এরপর থেকে ছহীহ আক্বীদা, শিরক ও বিদ‘আত মুক্ত আমল ইত্যাদি বিষয়ে আগ্রহ বাড়ে। ২০১০-১১ সালে ড. যাকির নায়েকের ‘পিস টিভি বাংলা’-এর মাধ্যমে দলীলভিত্তিক জ্ঞান অর্জনে আগ্রহী হই।
২০১২ সালে আমাদের এলাকার মাছূম নামে এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে মতীউর রহমান মাদানীর লেকচারগুলো শুনে আহলেহাদীছ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাই। এছাড়া সেই সময়ে বিভিন্ন আহলেহাদীছ আলেমদের ছালাতের উপর বিভিন্ন বই পড়ি। বিশেষত মাওলানা আব্দুর রঊফ এবং আব্দুল্লাহ ইবনু ফযলের লিখিত ‘সহীহ নামায শিক্ষা’ বইটি প্রথমে পাই। তারপর নেট থেকে বিভিন্ন বই পড়া শুরু করি এবং বিভিন্ন আলেমদের আলোচনা শুনতে থাকি। মতীউর রহমান মাদানীর একটি আলোচনায় তাকে যখন বাংলাদেশের কয়েকজন আলেমের নাম বলতে বলা হয়, তখন তিনি প্রথমেই ‘আমীরে জামা‘আত’-এর নাম বলেন। এরপর থেকেই আমীরে জামা‘আতের প্রতি আমার সম্মান এবং শ্রদ্ধা বাড়তে থাকে।
আমি সঠিক দ্বীন জানার পর আমার পূর্বে পড়া ‘মিশকাতুল মাছাবীহ’র সাথে সব মিলিয়ে দেখা শুরু করি। আলহামদুলিল্লাহ আহলেহাদীছ আলেমদের রেফারেন্স সবই কুরআন-হাদীছের সাথে মিলে যায়। এতে আমি অবাক হই যে, ফাযিল পর্যন্ত পড়ার পরও মাদ্রাসায় আমাদের এইগুলো পড়ানো হয়নি কেন! তখন থেকেই আমি যেই অডিওগুলো শুনে পরিবর্তন হয়েছি সেই অডিওগুলো অন্যদের শোনানো আমার প্রধান দাওয়াতী কাজ হয়ে দাঁড়ায়।
এরপর আমার এক বন্ধুর মাধ্যমে ২০১৩ সালে চট্টগ্রামের খুলশিতে প্রথম কোন আহলেহাদীছ জামে মসজিদে ছালাত আদায় করি। সেখানে আমার অধ্যয়নকৃত সব বিষয় সরাসরি দেখে মন পুরোপুরি প্রশান্ত হয়ে যায়। তখন থেকে আহলেহাদীছের সাথে আমার সরাসরি যুক্ত হওয়া।
তাওহীদের ডাক : আহলেহাদীছ হওয়ার পর পারিবারিকভাবে কোনো বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন কি?
হাফেয শেখ সা‘দী : শুধুমাত্র আমার বাবা আপত্তি করেছিলেন। আল্লাহ উনার প্রতি রহম করুন। তিনি এখন আর বেঁচে নেই। তবে মা, ভাই-ভাবী, স্ত্রী খুব সুন্দরভাবে আমাকে সমর্থন করেছেন। বাবা মাঝে মাঝে একটু বকা-ঝকা করে বলতেন, তুমি কি নতুন ধর্ম নিয়ে এসেছ? তিনি প্রায়ই মাকে বকা দিতেন এই বলে যে, তুমি তোমার ছেলের কথা শুনছো কেন? এছাড়া তেমন কোনো বড় বাধা পাইনি। তবে সময়ের ব্যবধানে ২০১৭-১৮ সালের দিকে এসে আল্লাহ বাবাকেও এই পথে কবুল করেন। তিনি প্রায় দেড় বছর আগে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
তাওহীদের ডাক : সামাজিকভাবে কোনো বাধার মুখোমুখি হয়েছেন কি?
হাফেয শেখ সা‘দী : হ্যাঁ, আমার এলাকায় যে মসজিদে ছালাত আদায় করতাম, সেখানে বড় ধরনের বাধার সম্মুখীন হই। প্রথমে ইমামের সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক ছিল। আমরা তার সাথে ছহীহ ছালাত, সূরা ফাতিহা পড়া, সশব্দে আমীন বলাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতাম; তিনি আমাদের কথা সমর্থন করতেন। কিন্তু খুৎবায় আমাদের নাম ধরে বিষোদগার করতেন।
একদিন সরাসরি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি খুলশী আহলেহাদীছ মসজিদে কেন যাও? ওখানে তো জঙ্গি প্রশিক্ষণ হয়! রায়হান মাদানী, ড. আসাদুল্লাহ আল-গালিব এরা তো জঙ্গী! বিষয়টি আমার খুবই খারাপ লাগে। ফলে আমি ধীরে ধীরে তার সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করি। এরপর তিনি আমাকে কেন্দ্র করে মুছল্লী ও কমিটির মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেন। এমনকি একবার আমার বাড়িতে হামলার পরিকল্পনা হয়। তবে আল্লাহর রহমতে তা বাস্তবায়ন হয়নি। এরপর আমার বিরুদ্ধে বড় করে একটি সাইনবোর্ড লাগিয়ে মসজিদে আমার কুরআন শিক্ষার তা‘লীম ও হালাকা নিষিদ্ধ করা হয়। যা শুধু আমার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ছিল। কিন্তু সেখানে তাবলীগ ও জামায়াতীদের তা‘লীম অব্যাহত ছিল। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছে। আগের মতো খুৎবায় সরাসরি আমাদের নিয়ে বিষোদগার করা হয় না। এখন সেই মসজিদে আমরা প্রায় ২০-২৫ জন নিয়মিত ছহীহভাবে ছালাত আদায় করি। আলহামদুলিল্লাহ।
তাওহীদের ডাক : আপনার সাংগঠনিক জীবন কিভাবে শুরু হয়?
হাফেয শেখ সা‘দী : ২০১৩ সাল থেকে আমি খুলশী আহলে হাদীছ জামে মসজিদে নিয়মিত যাতায়াত শুরু করি। তখন আমাদের এলাকার এক ভাইয়ের মাধ্যমে চট্টগ্রাম যেলার তৎকালীন ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন’-এর সভাপতি ডা. শামীম আহসানের সঙ্গে পরিচয় হয়। তিনি আমাকে নিয়মিত ফোন দিয়ে সাংগঠনিক ব্রিফ দিতেন এবং এলাকায় এসে তা‘লীম করতেন। তিনি আমার পিছনে অনেক পরিশ্রম করেছেন। আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদান দিন। তার এই পরিশ্রম অন্যদের জন্যও শিক্ষণীয়। তার মাধ্যমেই আমার সাংগঠনিক জীবন শুরু। তিনি আমাদের এলাকায় গেলে প্রায়ই আমরা চায়ের দোকানে বসে তা‘লীম করতাম। এজন্য এলাকার সেই খতীব আমাদেরকে চায়ের দোকানের মুফতী বলেও কটাক্ষ করতেন। সংগঠনে যোগ দেয়ার পরপরই ২০১৩ সালের শেষের দিকে আমাকে চট্টগ্রাম যেলা সাধারণ সম্পাদক হিসাবে মনোনীত করা হয়। অতঃপর ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে আমি সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করছি। আলহামদুলিল্লাহ!
তাওহীদের ডাক : আমীরে জামা‘আতের সাথে আপনার প্রথম সাক্ষাৎ কীভাবে হয়েছিল?
হাফেয শেখ সা‘দী : ২০১৪ সালের ২২শে মার্চ শনিবার হ’তে ২৮শে মার্চ শুক্রবার পর্যন্ত সপ্তাহব্যাপী মুহতারাম আমীরে জামা‘আত ৩০ জনের একটি দাওয়াতী কাফেলা নিয়ে দেশের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ববঙ্গে দাওয়াতী সফরে বের হয়েছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২৬শে মার্চ বুধবার খুলশী আহলেহাদীছ জামে মসজিদে চট্টগ্রাম যেলা সম্মেলনের তারিখ ধার্য ছিল। কিন্তু বিরোধীদের চক্রান্তে প্রশাসনের অনুমতি না পাওয়ায় যেলা সম্মেলন স্থগিত করা হয়। পরে আমাদের এক দ্বীনি ভাই তাসলীম বিন সাইফুলের সহযোগিতায় এক হানাফী মসজিদ ‘কাঠঘর নাযিরপাড়া রাজা মিয়াঁ জামে মসজিদে’ সুধী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এই সফরেই প্রথম আমীরে জামা‘আতের সঙ্গে আমার সরাসরি সাক্ষাৎ ঘটে।
তাওহীদের ডাক : আপনি পেশায় ব্যবসায়ী। কখনও কি শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা হয়েছিল?
হাফেয শেখ সা‘দী : না, আমি কখনো পেশাগতভাবে শিক্ষকতায় নিযুক্ত হইনি। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমার পরিচিতদের মাঝে দ্বীন ও কুরআন শিক্ষার কাজ করেছি। এটিকে আমি ইসলামের আবশ্যিক প্রয়োজন হিসাবে দেখেছি।
তাওহীদের ডাক : পতেঙ্গায় আহলেহাদীছ আন্দোলনের মারকাযটি প্রতিষ্ঠার ইতিহাস সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন?
হাফেয শেখ সা‘দী : পতেঙ্গায় অবস্থিত আমাদের মারকাযটি কেবল চট্টগ্রামই নয়, বরং বৃহত্তর চট্টগ্রামে আহলেহাদীছ আন্দোলনের সর্বপ্রথম কোন মারকায। চট্টগ্রাম শহরে আমাদের যখন কোন বসার জায়গা ছিল না, তখন হঠাৎ করেই এই ভূখন্ডটি আমাদের আয়ত্বে আসে। এর জমিদাতারা সবাই আমেরিকা প্রবাসী। আমেরিকায় সঠিক দ্বীন পাওয়ার পর ২০১৩ সালে উনারা বাংলাদেশে আসেন। উনারা ছহীহ আক্বীদার একটা মসজিদ নির্মাণ করবেন বলে লোক মারফতে জানলে তৎকালীন সভাপতি ডা. শামীম আহসান ভাইকে নিয়ে দাতার ছেলের সাথে সাক্ষাৎ করি। আরো বিভিন্ন গ্রুপ এই জমিতে মসজিদ নির্মাণ করতে চাইলেও আমরা দাতাকে বিশ্বাস করাতে পেরেছি যে, মসজিদ যদি ‘আন্দোলনে’র তত্ত্বাবধানে তৈরী হয়, তাহ’লে ইনশাআল্লাহ এই মসজিদ আজীবন হকের প্রচার কেন্দ্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে। দাতা আমাদের কথায় আশ্বস্ত হয়ে বর্তমান মারকাযের পশ্চিম-দক্ষিণ পার্শ্বে মসজিদ নির্মাণের জন্য ৪ কাঠা জমি লিখে দেন। আমরা যখন ঐ জায়গায় কাজ আরম্ভ করে প্রায় ৬টি বেইজ ঢালাই সম্পূর্ণ করি এবং প্রায় ৫ লক্ষ টাকা খরচ করে ফেলি। তখন আশে-পাশের বিদ‘আতীরা বিভিন্ন অজুহাতে স্থানীয় প্রভাবশালী লোকদের সহযোগিতায় নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেয়। অনেক তদবীর, বৈঠক করার পরও প্রায় দীর্ঘ ২ মাস কাজ বন্ধ থাকে। যখন বুঝতে পারি ঐখানে কাজ করাটা আরো সমস্যা সৃষ্টি করবে, তখন দাতা মসজিদ নির্মাণের জন্য বর্তমান জায়গাটা আমাদেরকে দেওয়ার প্রস্তাব করেন। যেহেতু বর্তমান মারকাযের জায়গায় দাতার একটি মক্তব আগে থেকেই চালু ছিল এবং দাতার বেশ কয়েকটি সেমিপাকা ভাড়া ঘর ছিল, সেহেতু ছোট মক্তবটিকে এক সপ্তাহের মধ্যে ২০ বাই ৩০ ফিটের মসজিদ নির্মাণ করতে তেমন সমস্যা হয়নি। বিদ‘আতীরা কিছু বুঝে উঠার আগেই এক সপ্তাহের মধ্যে জুম‘আ চালু হয়ে গেলে এলাকায় শোরগোল পড়ে যায়। পরবর্তীতে আমরা বিভিন্ন কৌশলে মসজিদ সম্প্রাসরণ করতে থাকি এবং নির্মাণ কাজ করতে থাকি। প্রথম থেকেই বিদ‘আতীদের বড় একটা সমস্যা ছিল, ফজরের ছালাতের আযান ও আছরের ছালাতের আযান নিয়ে। আর যখন আমরা রামাযানে প্রচলিত নিয়মের বাহিরে গিয়ে সূর্যাস্তের সাথে সাথে মাগরিবের আযান দিলাম, তখন বিদ‘আতীরা আর মেনে নিতে পারল না। তারা স্থানীয় কমিশনারের প্রতিনিধির মাধ্যমে মারকাযে আসে এবং এই বিষয়ে আলোচনা করে। আলেচনার এক পর্যায়ে কিছু উগ্র বিদ‘আতী আমাদের একজন দ্বীনী ভাইকে আহত করে। এমন উগ্রতা দেখে স্থানীয় কমিশনার তাদের এমন ব্যবহারের জন্য তিরষ্কার করলে তারা স্থান ত্যাগ করে।
কিন্তু বিদ‘আতীরা দমে যায় নি। তারা মারকাযের বহুতল ভবনের নির্মাণ কাজে বিভিন্নভাবে বাধা সৃষ্টি করে। যা আমরা বিভিন্ন বৈঠক ও ধৈর্যের সাথে মোকাবেলা করি এবং আল্লাহর সাহায্যে মসজিদের কাজ সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে বিদা‘আতীরা বিভিন্নভাবে মসজিদ দখল করার জন্য পাঁয়তারা করতে থাকে। কোন এক জুম‘আতে তারা বিভিন্ন মসজিদ থেকে লোক নিয়ে আসবে এমন খবর আমাদের নিকট আসলে আমরা থানায় ১০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ করি। তখন থানা থেকে তাদেরকে ডেকে এই বিষয়ে সতর্ক করে। কিন্তু তারপরও তারা চক্রান্ত চালাতে থাকে।
সর্বশেষ ১৫ই অক্টোবর ২০১৭ সালে, পাঠের অনুপযোগী ছিন্ন কুরআন পানিতে ফেলাকে ইস্যু করে মাযহাব, পীর ও মাযারপন্থীরা একাট্টা হয়ে আহলেহাদীছ মসজিদ দখলের গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। থানায় শালিশ বসলে সেখানে আহলেহাদীছ বিরোধী প্রায় দুই-তিন হাযার লোক জড়ো করা হয়। এক প্রকার থানা ঘেরাওয়ের মত পরিস্থিতি। থানা কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে শালিশ বৈঠক থেকেই অন্যায়ভাবে মসজিদের জমিদাতা জনাব আব্দুশ শাকূর, মসজিদ কমিটির সভাপতি ও যেলা ‘আন্দোলন’-এর সভাপতি ডা. শামীম আহসান ও ইমাম মুহাম্মাদ রফীকুল ইসলামসহ ৬ জনকে গ্রেফতার করে এবং পরদিন কোর্টের মাধ্যমে তাদেরকে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়। এতেও তারা ক্ষান্ত হয়নি। এরপর রাস্তার মোড়ে মোড়ে আহলেহাদীছ বিরোধী ব্যানার, ফেস্টুন টাঙ্গানো হয়।
অতঃপর ২০শে অক্টোবর জুম‘আর ছালাতের পর পীর ও মাযারপন্থী প্রায় পাঁচ হাযার লোক আহলেহাদীছ বিরোধী বিশাল মিছিল বের করে। এ সময় আহলেহাদীছ বিরোধী বিভিন্ন শ্লোগান, প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন প্রদর্শন ছাড়াও হাযার হাযার লিফলেট বিতরণ করা হয়। কিন্তু মহান আল্লাহর অশেষ কৃপায় তাদের সকল ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয়। সরাসরি কেন্দ্রের নামে রেজিষ্ট্রিকৃত উক্ত জমিতে তারা দখলদারী কায়েম করতে ব্যর্থ হয়। সেই সাথে কারান্তরীণ দায়িত্বশীলগণও কিছুদিন পর মুক্তি লাভ করেন। ফালিল্লাহিল হামদ।
তাওহীদের ডাক : আমীরে জামা‘আত এই মারকাযে প্রথম কবে আসেন?
হাফেয শেখ সা‘দী : ২০১৫ সালের ৩০শে অক্টোবর শুক্রবার ৮-টার ফ্লাইটে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পৌঁছালে আমরা বিমানবন্দরে আমীরে জামা‘আতকে অভ্যর্থনা জানাই। ‘ইসলামিক কমপ্লেক্স’ রাজশাহীর অধীনে পরিচালিত ‘বায়তুর রহমান আহলেহাদীছ জামে মসজিদ কমপ্লেক্স’-এ এসে মুহতারাম আমীরে জামা‘আত পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচী অনুযায়ী জুম‘আর খুৎবা প্রদান করেন। এ সময়ে মুহতারাম আমীরে জামা‘আত নগরীর এই গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আহলেহাদীছ জামে মসজিদ কমপ্লেক্স-এর জন্য জমি দান করায় আমেরিকা প্রবাসী জনাব আব্দুশ শাকূরের জন্য খাছ দো‘আ করেন এবং এটিকে অত্রাঞ্চলের ‘আহলেহাদীছ আন্দোলনে’র মারকায হিসাবে কবুলের জন্য মহান আল্লাহর নিকটে প্রার্থনা করেন।
উল্লেখ্য যে, সারাদিন হালকা বৃষ্টির মধ্যেও শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুল সংখ্যক মুছল্লী আমীরে জামা‘আতের খুৎবা শোনার জন্য মসজিদে সমবেত হন। কিন্তু মসজিদে স্থান সংকুলান না হওয়ায় অনেককে বাহিরে ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে বক্তব্য শুনতে হয়। অতঃপর খুৎবা শেষে পর পর তিনটি জামা‘আতে ছালাত আদায় করতে হয়। মসজিদে মহিলাদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা ছিল। অতঃপর জুম‘আর ছালাত শেষে আমীরে জামা‘আত মসজিদ সংলগ্ন যেলা ‘আন্দোলন’-এর নতুন কার্যালয় উদ্বোধন করেন।
পরদিন ৩১শে অক্টোবর শনিবার সকাল ৯-টায় গ্রীনলাইন কোচ যোগে আমীরে জামা‘আত ও তার সফরসঙ্গীগণ কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ‘কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে’ যেলা ‘আন্দোলন’-এর উদ্যোগে যেলা সম্মেলনের সকল প্রস্ত্ততি সম্পন্ন হওয়ার পরও স্থানীয় প্রশাসন বিনা কারণে মাত্র একদিন আগে সম্মেলনের অনুমতি বাতিল করে দেয়। ফলে দায়িত্বশীলদের সাথে মতবিনিময় এবং পূর্বেই বিমানের টিকিট কাটা থাকায় কক্সবাজার হয়ে ঢাকা ফেরার উদ্দেশ্যে আমীরে জামা‘আত কক্সবাজারের পথে রওয়ানা হন। ৯০ কিলোমিটার পথ যাওয়ার পর বাধ সাধে কক্সবাজারের স্থানীয় প্রশাসন। কক্সবাজার প্রবেশ করলেই গ্রেফতার করা হবে এমন ন্যক্কারজনক হুমকি প্রদান করে প্রশাসনের কান্ডজ্ঞানহীন কর্তা ব্যক্তিরা। বাধ্য করা হয় মাঝপথ থেকে পুনরায় চট্টগ্রাম ফিরে আসতে। অতঃপর ভাড়া করা মাইক্রো যোগে বেলা আড়াইটার দিকে রওয়ানা হয়ে ভাঙ্গা রাস্তা মাড়িয়ে অত্যন্ত কষ্ট করে রাত ৮-টায় আমীরে জামা‘আত চট্টগ্রাম ফিরে আসেন। অতঃপর চট্টগ্রামে রাত্রি যাপন করে পরদিন সকাল ৯-টার বিমান যোগে আমীরে জামা‘আত ঢাকায় পৌঁছালে ।
তাওহীদের ডাক : আপনাদের মাধ্যমে এই যেলায় আন্দোলনের কাজ যথেষ্ট অগ্রসর হয়েছে এবং ধারাবাহিকভাবে যেলা সম্মেলন হচ্ছে। এ সম্পর্কে বলুন।
হাফেয শেখ সা‘দী : ২০১৮ সাল থেকে আমরা ধারাবাহিকভাবে যেলা ‘আন্দোলন’-এর পক্ষ থেকে বিভিন্ন উন্মুক্ত প্রোগ্রাম করে আসছি। বিশেষ করে-
(১) ২০১৮ সালের ১৬ই মার্চ শুক্রবার জিইসি মোড়ে বিএমএ ভবনের কনফারেন্স হলে যেলা ‘আন্দোলন’-এর সভাপতি ডা. শামীম আহসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসাবে মুহতারাম আমীরে জামা‘আত উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য যে, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে শিক্ষাসফর উপলক্ষ্যে আমীরে জামা‘আত ১৫ই মার্চ বিকালে কক্সবাজারে পৌঁছেন । কক্সবাজার প্রোগ্রাম সেরে পরের দিন তিনি চট্টগ্রামে আসেন। অতঃপর ১৭ই মার্চ চট্টগ্রাম মারকায থেকে দু’দিন ব্যাপী রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে ‘আন্দোলন’-এর কেন্দ্রীয় শিক্ষা সফরের যাত্রা শুরু হয়। যেখানে ২২টি যেলা থেকে ‘আন্দোলন’ ও ‘যুবসংঘ’-এর মোট ৯৭ জন কর্মী ও সুধী একত্রিত হন।
(২) ১১ই মার্চ ২০২০ বুধবার ‘আন্দোলন’-এর উদ্যোগে তিন দিনব্যাপী কেন্দ্রীয় শিক্ষা সফর উপলক্ষ্যে কক্সবাজার যাওয়ার পথে আমীরে জামা‘আত চট্টগ্রাম আসেন। অতঃপর বাদ মাগরিব নগরীর জিইসি মোড়ে বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন (বিএমএ) মিলনায়তনে সুধী সমাবেশে তিনি প্রধান অতিথির ভাষণ প্রদান করেন।
(৩) ২৬শে জানুয়ারী ২০২৪ শুক্রবার যেলা শহরের স্টেশন রোডের রিয়াযুদ্দীন বাজারস্থ হোটেল সৈকত-এর মিলনায়তনে আমীরে জামা‘আত প্রধান অতিথির ভাষণ প্রদান করেন। উল্লেখ্য যে, সম্মেলনের পূর্বে তিনি চট্টগ্রাম মারকায আহলেহাদীছ জামে মসজিদে জুম‘আর খুৎবা প্রদান করেন।
(৪) সর্বশেষে ১৭ই জানুয়ারী ২০২৫ শুক্রবার হালিশহর বিডিআর ময়দানে অনুষ্ঠিত যেলা সম্মেলনে আমীরে জামা‘আত প্রধান অতিথির ভাষণ প্রদান করেন। উল্লেখ্য যে, এদিনও সম্মেলনের পূর্বে তিনি চট্টগ্রাম মারকায আহলেহাদীছ জামে মসজিদে জুম‘আর খুৎবা প্রদান করেন।
তাওহীদের ডাক : এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে দাওয়াতের গুরুত্ব নিয়ে আপনার মতামত কী?
হাফেয শেখ সা‘দী : চট্টগ্রামের এই অঞ্চলটিকে বলা হয় ‘বাবুল ইসলাম’ বা ইসলামের প্রবেশদ্বার। এখানে মূল ইসলামই প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু কালক্রমে দাওয়াতের অভাবে কবরপূজা, মাযারপূজা, পীর-ফক্বীর ইত্যাদির সংমিশ্রণ ঘটে গেছে। এখনো এখানকার মানুষ ধর্মপ্রাণ। কিন্তু দাওয়াতের মাধ্যমে তাদের কাছে সঠিক ইসলামের বার্তা পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। গত ১০ বছরে আহলেহাদীছ আন্দোলনের দাওয়াতী প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ এখানে নিয়মিত আহলেহাদীছ সম্মেলন হচ্ছে। এছাড়া এখানে ছয়টি মসজিদ ও বেশ কয়েকটি মাদ্রাসা গড়ে উঠেছে। আলহামদুলিল্লাহ মানুষ সঠিক দ্বীন গ্রহণ করছে। বর্তমানে শুধু চট্টগ্রাম নয়, পাশ্ববর্তী পার্বত্য যেলা রাঙামাটি, বান্দরবন এবং খাগড়াছড়িতেও আমাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম ও দাওয়াতী সফর শুরু হয়েছে। ফালিল্লাহিল হাম্দ।
তাওহীদের ডাক : আমীরে জামা‘আতের সঙ্গে আপনার স্মৃতিচারণ সংক্ষেপে বলুন।
হাফেয শেখ সা‘দী : আমীরে জামা‘আতের সাথে আমার স্মরণীয় দু’টি ঘটনা উল্লেখ করব। (১) ২০১৮ সালে নিঝুম দ্বীপে একটি জুম‘আর ছালাতে মসজিদ কমিটি আমীরে জামা‘আতকে খুৎবা দেওয়ার অনুমতি দিতে না চাইলে আমি আবেগাপ্লুত কণ্ঠে মুছল্লীদের সামনে আবেদন করি। পরে তাকে ছালাত শেষে বক্তব্য দিতে দেওয়া হয়। প্রথমে আমীরে জামা‘আত আমার উক্ত আচরণে অসন্তুষ্ট হলেও অনেকদিন পরে আমাকে বলেন, ‘তুমি যা করেছিলে, ভালোই করেছিলে, ঐভাবে না বললে হবে না’। উল্লেখ্য যে, আমার জোরালো দাবীর ফলেই ঐদিন খুৎবার পর তারা আমীরে জামা‘আতকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন।
(২) একবার আমীরে জামা‘আতকে বলেছিলাম, আমি সাংগঠনিক পদ ছেড়ে দিতে চাই। তখন তিনি বলেন, সাংগঠনিক প্লাটফর্ম ছাড়া তুমি কি কাজ করতে পারবে? আমি বললাম, ‘না!’ তার এই কথাটি আমার মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে এবং আমি বুঝতে পারি দাওয়াতী কাজ করার জন্য ইমারতের অধীনে থাকতে হবে।
তাওহীদের ডাক : স্যারের বিশেষ কোন বইয়ের স্মৃতিচারণ করতে চান কি?
হাফেয শেখ সা‘দী : জি, স্যারের ‘বায়‘এ মুআজ্জাল’ বইটি উল্লেখ করব। আমার মাধ্যমে বইটি উপহার পেয়ে কয়েকজন দ্বীনী ভাই সূদের ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ।
তাওহীদের ডাক : যুবকদের উদ্দেশ্যে আপনার সংক্ষিপ্ত নছীহত করুন?
হাফেয শেখ সা‘দী : বর্তমান সময়ে ফিৎনা-ফাসাদ বাড়ছে। যুবকদের অবশ্যই সংযমী, নিয়ন্ত্রিত ও সচেতন হ’তে হবে। ‘বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘে’র পতাকা তলে সমবেত হ’লে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে এবং সরল-সঠিক পথের সন্ধান পাবে ইনশাআল্লাহ।
তাওহীদের ডাক : তাওহীদের ডাক পত্রিকার পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।
হাফেয শেখ সা‘দী : যুবসংঘের মুখপত্র ‘তাওহীদের ডাক’ পত্রিকা কুরআন-সুন্নাহর মণিমুক্তাখচিত একটি পত্রিকা। এই পত্রিকা নিয়মিত পড়া উচিত। কারণ পড়া ছাড়া ইসলামের সঠিক বোধ ও জ্ঞান অর্জন সম্ভব নয়।
তাওহীদের ডাক : সবশেষে আপনার কোন বিশেষ বার্তা আছে কি?
হাফেয শেখ সা‘দী : সবশেষে বলব, আমার সাংগঠনিক জীবনে যারা মেহনত করেছেন, বিশেষ করে ডা. শামীম আহসান ভাইকে আল্লাহ উত্তম প্রতিদান দিন। তার একটি কথা আমাকে এখনো অনুপ্রাণিত করে যে, ‘আমীরে জামা‘আত তার মেধাকে আল্লাহর রাস্তায় ছাদাক্বা করে দিয়েছেন এবং তিনি তাঁর যাবতীয় কথা ও কর্ম আল্লাহর জন্য করেন’। তার এই অনুপ্রেরণা নিয়েই আমি কাজ করে যাচ্ছি আলহামদুলিল্লাহ’। আল্লাহ আমীরে জামা‘আতের নেতৃত্ব আমাদের উপর দীর্ঘায়িত করুন এবং আমাদের সবাইকে সঠিক পথে টিকে থাকার তাওফীক দান করুন। আর এই গোনাহগার বান্দার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করার জন্য ‘যুবসংঘ’-এর কেন্দ্রীয় কমিটিকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
তাওহীদের ডাক :মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য আপনাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ।