শায়খ আব্দুর রহীম ম্যাকার্থী (আমেরিকা)

তাওহীদের ডাক ডেস্ক 439 বার পঠিত

[শায়েখ আব্দুর রহীম ম্যাকার্থী যুক্তরাষ্ট্রের বাল্টিমোর, মেরিল্যান্ডে ১৯৭৩ সালে খ্রিস্টান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৯৪ সালে ইসলাম গ্রহণের পর তিনি মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০ বছর অধ্যয়ন করেন এবং আরবী ভাষা, দাওয়াহ ও ইসলামী শরী‘আহ বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেন। ইসলামের শান্তিপূর্ণ বার্তা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে তিনি ৩৫টিরও বেশি দেশে বক্তৃতা ও দাওয়াহ কার্যক্রম চালিয়েছেন। তিনি PeaceTV, HudaTV, Tayba TV, Sharjah TV, Ges Qatar TV-এর মতো চ্যানেলে উপস্থাপক হিসেবে কাজ করেছেন। এছাড়াও তিনি IERA (UK)One Ummah Charity (UK)-এর দাওয়াহ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত আছেন। বর্তমানে তিনি আয়ারল্যান্ডে অবস্থান করছেন।]

প্রশ্ন : আপনার পরিচয় ও জীবনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিন।

আব্দুর রহীম ম্যাকার্থী : আমি আব্দুর রহীম ম্যাকার্থী। ১৯৯৪ সালে আঠারো বছর বয়সে আমি ইসলাম গ্রহণ করি। ইসলাম গ্রহণের ছয় মাসের মধ্যেই আমি সুদানে একটি সফরে যাই। এরপর ইসলামের গভীর অধ্যয়নের জন্য যাত্রা করি। আলহামদুলিল্লাহ মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি দশ বছর ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করি। স্নাতক সম্পন্ন হওয়ার পর থেকে আমি দাওয়ার কাজে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করেছি। পিস টিভি, হুদা টিভিসহ বিভিন্ন ইসলামী মিডিয়ায় কাজ করার সুযোগ হয়েছে এবং বিভিন্ন দেশে ঘুরে ঘুরে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দিচ্ছি।

প্রশ্ন : ইসলাম গ্রহণের আগে আপনার ধর্মীয় বিশ্বাস কেমন ছিল?

আব্দুর রহীম ম্যাকার্থী : আমি ক্যাথলিক খ্রিস্টান পরিবারে জন্মেছি এবং সেই বিশ্বাসেই বড় হয়েছি। ছোটবেলা থেকে আমি ক্যাথলিক স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করেছি। কিন্তু আমার দুষ্টু স্বভাবের কারণে আমাকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয়। আমাদের পরিবার নিয়মিত গির্জায় যেত। বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আমরা গির্জায় যেতাম, এমনকি মাঝে মাঝে প্রতি সপ্তাহেও। আমাদের ঘরে বাইবেল ছিল, আমরা ক্রস চিহ্নের মতো ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহার করতাম এবং রোজারি পড়তাম। সবকিছু মিলিয়ে খ্রিস্টান ধর্ম আমাদের জীবন-যাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।

প্রশ্ন : ইসলাম গ্রহণের আগে আপনার জীবন কেমন ছিল?

আব্দুর রহীম ম্যাকার্থী : আমি তখন ১৮ বছর বয়সে এক কঠিন জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলাম। তখন আমি মাদক বিক্রিতে জড়িয়ে পড়ি। আমার খুব কাছের এক বন্ধু এই জীবনধারার ছিল। সেই সময় গাঁজা-ধূমপান অনেক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। আমার বন্ধু একদিন আমাকে গাঁজা রোল বানিয়ে বলেছিল, ‘সব গ্যাংস্টার আর শক্তিশালী লোকেরা এগুলো করে’। তখন আমি একজন ক্রীড়াবিদ ছিলাম। তাই শুরুতে এসবের বিরুদ্ধে ছিলাম। কিন্তু একটু পর মনে হ’ল, এটা কুল কাজ। এরপর গাঁজা শুরু করলাম। সিগারেট আর মদ্যপানও শুরু করি। মদ্যপান আমার সংস্কৃতিরই অংশ ছিল। এভাবে বাস্কেটবল থেকে সরাসরি ভুল পথে চলে গেলাম, ভুল বন্ধু আর পরিবেশের কারণে।

আমি স্কুলেও যাওয়া বন্ধ করে দিলাম। মাঝে মাঝে স্কুলে গেলে অস্ত্র নিয়ে যেতে হ’ত। কারণ আমাদের পাড়ার প্রতিপক্ষ ছেলেদের সঙ্গে ঝামেলা ছিল। তারা আমাকে হত্যার হুমকি দিয়েছিল। একদিন এক বন্ধু আমাকে স্কুলের পর তার বাড়িতে আমন্ত্রণ জানাল। সে বলল, তোমাকে নিজেকে রক্ষা করতে হবে। সে তার গদি থেকে একটি পিস্তল তুলে আমাকে দিল। বলল, হয়তো তুমি বাঁচবে, নয়তো তারা। আর শোনো, একটি পিস্তল চেম্বারে রাখ। তখন থেকে প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার সময় আমি আমার বন্দুক সাথে রাখতাম। তারপর তাদের আসার অপেক্ষা করতাম। তারা একবার এসেছিল, কিন্তু আমাদের স্কুলের বন্ধুদের সাহায্যে তাদের তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলাম।

প্রশ্ন : তাহ’লে আপনার জীবনে কিভাবে পরিবর্তন শুরু হ’ল?

আব্দুর রহীম ম্যাকার্থী : আমি ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম, এই ধরনের জীবনধারায় আমি বেশিদিন টিকে থাকতে পারব না। কিন্তু সত্যি বলতে, তখনও আমি এটি ছাড়তে চাইছিলাম না। কারণ আমি এই জীবন উপভোগ করছিলাম। আমি জানতাম, এই পথে চললে হয়তো জেলে যেতে হবে অথবা জীবনের কোনো এক সময় মারা পড়ব। তবুও আমি উচ্চবিলাসী জীবন-যাপন করতে চেয়েছিলাম। ১৭ বছর বয়সে আমি প্রতিদিন এক হাযার ডলার আয় করতাম। আমি সাধারণ জীবন যাপন করতে পারতাম না। আমি হোটেলে থাকতাম, বাড়িতে যেতাম না। কিন্তু কিছু সময় পর বুঝতে পারলাম, এই জীবন আমাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

একবার আমি একটু বেশি মাদক সেবন করেছিলাম। তখন আমার দেখা হয় এমন একজনের সঙ্গে, যে আমার শত্রুদের একজন। সে ইচ্ছা করলেই আমাকে ভয়ানক পরিস্থিতিতে ফেলতে পারত। কিন্তু সে আমাকে করুণা করল। কারণ সে বুঝতে পারল, আমি তখন নেশাগ্রস্তত। আমি নিজেও ভাবলাম, আমি কতটা দুর্বল হয়ে পড়েছি! আমি কখনো কোকেন বা হেরোইনের মতো মাদক সেবন করিনি, যদিও বিক্রি করতাম। কারণ আমি দেখেছি, কিভাবে এসব মাদক মানুষকে দুর্বল করে দেয়। আর আমিও এত দুর্বল হয়ে গেলাম যে, নিজেকে রক্ষা করতে পারছিলাম না। ফলে আমি আর দুর্বল ও অরক্ষিত থাকতে চাইছিলাম না।

এই উপলব্ধিতে ১৮ বছর বয়সে আমি কঠোর সিদ্ধান্ত নিলাম নিজের জন্য কিছু লক্ষ্য নির্ধারণ করব। আমি মোট ছয়টি লক্ষ্য ঠিক করলাম। সেগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই ভাল ছিল না। যেমন, হারাম সাম্রাজ্য গড়ে তোলা, অর্থাৎ অবৈধ মাদক ব্যবসা করে ধনী হওয়া। আমি তখনো পরিবারের সঙ্গে থাকতাম, তাই আমি চেয়েছিলাম একটি সুন্দর বাড়ি আর সাধারণ কোনো গাড়ি। কিন্তু পুলিশের নযরে না পড়ার মতো। একজন প্রবীণ আমাকে বলেছিলেন, ‘সবসময় দামি গাড়ি চালিও না, কারণ পুলিশ দেখবে তুমি ১৭-১৮ বছরের বেকার, তবুও দামি গাড়ি চালাচ্ছ, তাহ’লে বুঝতে পারবে তুমি অবশ্যই কিছু একটা করছ। সেদিন থেকে আমি শিখলাম একটা সাধারণ গাড়ি রাখব, আর কোনো অনুষ্ঠানে গেলে তখন ভালো গাড়ি ব্যবহার করব। আমার দ্বিতীয় লক্ষ্য ছিল নিজের থাকার মতো একটি সুন্দর জায়গা বা বাড়ি। তৃতীয় লক্ষ্য ছিল, একজন বিশেষ মানুষের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলা। চতুর্থ লক্ষ্য ছিল আমার স্বাস্থ্য ফিরিয়ে নেওয়া। কারণ আমি বুঝতে পারছিলাম, মদ্যপান আর ধূমপান আমার শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

একটি স্মরণীয় ঘটনা মনে পড়ে, আমি তখন রাস্তা দিয়ে আমার এক বন্ধুর সঙ্গে হাঁটছিলাম। হঠাৎ দু’জন মেক্সিকান মাতাল আমাদের গালিগালাজ করতে শুরু করল। তারা এমন বাজে কথা বলছিল, যা এখানে বলা সম্ভব নয়। আমি রেগে গিয়ে তৎক্ষণাৎ বেল্ট খুলে হাতে জড়িয়ে এক ছেলেকে মারার উদ্দেশ্যে এগিয়ে গেলাম। ঠিক সেই সময় পিছন থেকে একটি পুলিশের গাড়ি চলে আসল। আমি ছেলেটিকে ঘুষি মারলাম, তখন সে আমার দিকে একটি মদের বোতল ছুঁড়ে মেরে বাঁচার চেষ্টা করল।

পুলিশ দেখে আমি দ্রুত দৌড় দিলাম। আমি এ এলাকাতেই বড় হওয়ায় জানতাম, কোন পথ ধরে পালানো উচিত। একসময় আমরা খেলোয়াড় ছিলাম। বেড়ার ওপর দিয়ে খরগোশের মতো লাফিয়ে পালাতাম। কিন্তু এবার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল, কারণ ধূমপান আর নেশার কারণে শরীর দুর্বল ছিল। অবশেষে আমি হাল ছেড়ে বসে পড়লাম। ভেবেছিলাম, পুলিশ এখনই আমাকে ধরে ফেলবে। কিন্তু তারা তখনও মেক্সিকান ছেলেদের নিয়েই ব্যস্ত ছিল। সেই সুযোগে আমি পালিয়ে যেতে পেরেছিলাম। সেই সময়ই আমি গভীরভাবে বুঝতে পারলাম, আমার স্বাস্থ্যের অবস্থা আগের মতো নেই। এই উপলব্ধি আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করল, স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। নিজেকে শক্তিশালী করতে হবে।

আমার ষষ্ঠ লক্ষ্য ছিল আরও ধার্মিক হওয়া। আমি অনুভব করলাম, আমার স্রষ্টার সঙ্গে একটি অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। যদিও তখন আমার ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি ছিল মাফিয়াদের মতো। যারা সপ্তাহজুড়ে যাই করুক, রবিবার গির্জায় গিয়ে দান করে এবং কমিউনিটি কাজে অংশ নেয়। কিন্তু বাকি ছয় দিন ঠিক উল্টো জীবন যাপন করে। আমিও ভাবতাম, আমি বাইবেল পড়ব, আমার হাতে সোনার একটি চেইন ছিল, যার ওপর সোনার ক্রস ঝুলত। এটাই ছিল আমার ধর্মীয় অভিব্যক্তি। তবুও আমি জানতাম, জীবনে আধ্যাত্মিকতার প্রয়োজন আছে।

প্রশ্ন : তাহ’লে আপনার হেদায়াতের সঙ্গে সেই ছয়টি লক্ষ্যের কি কোনো সম্পর্ক ছিল?

আব্দুর রহীম ম্যাকার্থী : নিশ্চয়ই সম্পর্ক ছিল। আমার ষষ্ঠ লক্ষ্য আধ্যাত্মিকতা ও ধার্মিকতাই ছিল আমার ইসলামে যাত্রার শুরু। একবার আমি আমার এক বন্ধুর বাবার কাছে যাই, যিনি আফ্রিকান-আমেরিকান ছিলেন। তখন আমরা তার ছেলের সঙ্গে মাদক ব্যবসা করতাম। কিন্তু সে বাড়িতে ছিল না। তাই তার বাবা আমাকে বেসমেন্টে অপেক্ষা করতে বললেন। আমি বিরক্ত হয়ে বসে থাকলাম। তখন দেখলাম, তার বাবা কুরআনের তেলাওয়াত শুনছেন। সেই মুহূর্তে আমার মনে গভীর প্রভাব পড়ল এবং আল্লাহর প্রতি একটা টান অনুভব করলাম। আলহামদুলিল্লাহ এই ঘটনাই ছিল আমার জীবনের মোড়। যা আমাকে ইসলামের দিকে নিয়ে গেল। তাই আমার ষষ্ঠ লক্ষ্যই প্রথম লক্ষ্য হিসাবে পূর্ণ হ’ল।

প্রশ্ন : তিনি কি মুসলিম ছিলেন?

আব্দুর রহীম ম্যাকার্থী : হ্যাঁ, আমার বন্ধুর বাবা মুসলিম ছিলেন। আমি যখন তার বাড়িতে গেলাম, তিনি তখন কুরআনের তেলাওয়াত শুনছিলেন। যেখানে আরবী পাঠের পরই ইংরেজি অনুবাদ হচিছল। তিনি মনোযোগ দিয়ে সেই অনুবাদ শুনছিলেন। ইসলাম সম্পর্কে আমার আগ্রহ জাগল। তাই আমি সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে তাকে বললাম, ‘আমি কি আপনার সঙ্গে বসে ইসলাম নিয়ে কিছু প্রশ্ন করতে পারি? তিনি বললেন, অবশ্যই। আমি টিম্বারল্যান্ড বুট পরে জায়নামাযের ওপর দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম। তিনি নম্রভাবে বললেন, ওটা ছালাতের চাদর। আমি জুতা খুলে বসে পড়লাম। আমার প্রথম প্রশ্ন ছিল, আমি কি মুসলিম হ’তে পারি? কারণ তখনও আমার মনে কিছু ভুল ধারণা ছিল। যেমন ইসলাম কেবল কালো মানুষদের জন্য কিংবা সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি হেসে বললেন, ‘অবশ্যই! তুমি সাদা হও, কালো হও, বাদামী, এমনকি বেগুনি বা গোলাপী হলেও তোমার রঙ কোনো বিষয় না। ইসলাম সবার জন্য। তারপর তিনি আমাকে ইসলাম সম্পর্কে কিছু জানালেন। আমি আগ্রহী হয়ে জানতে চাইলাম, ‘আপনার কাছে কি ইসলাম নিয়ে পড়ার মতো কিছু বই আছে? আলহামদুলিল্লাহ তিনি আমাকে চারটি বই দিলেন। আমি সেগুলো নিয়ে বাসায় গিয়ে শেলফে রাখলাম। এর একটি ছিল মুসলিমরা যীশু (আঃ) সম্পর্কে কী বিশ্বাস করে। কিন্তু সুবহানাল্লাহ! যখন কেউ সত্যের সন্ধানে থাকে মুসলিম হোক বা না হোক আল্লাহ তার জন্য পথ খুলে দেন।

প্রশ্ন : শেষ পর্যন্ত কীভাবে ইসলাম গ্রহণ করলেন?

আব্দুর রহীম ম্যাকার্থী : প্রায় দুই মাস পরে এমন একটি ঘটনা ঘটল, যা আমাকে নাড়িয়ে দিল। সেটি ছিল একটি গাড়ি দুর্ঘটনা। তখন আমি এমন এক সময় পার করছিলাম, যখন আমার লাইসেন্স স্থগিত ছিল এবং আমি অন্য একজনের পরিচয়ে গাড়ি চালাতাম। কারণ সেই সময় কম্পিউটারে ছবি দেখা যেত না। তাই উচ্চতা, ওজন, চুলের রঙ আমার বন্ধুর বিবরণের সাথে মিলে যাওয়ায় আমি তার নাম ব্যবহার করতাম। সেই দিন আমরা গাঁজাসহ কিছু অবৈধ বস্ত্ত সেবন করে গাড়ি চালানোর সময় দুর্ঘটনার শিকার হই। আমি জানতাম পুলিশ এলেই আমি জেলে যাব। আমি তাদের আসার অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তারা আসতে দেরি করল। মনে হ’ল এটি হয়তো আমার পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ। তখনই আমি গাড়ি ফেলে ছোট এক বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে বন্ধুর বাড়ির দিকে দৌঁড়াতে শুরু করলাম। যেন কোনো হলিউড সিনেমা চলছে যে গাছপালা, কুকুর, হেলিকপ্টার সবই ছিল। আলহামদুলিল্লাহ ধরা পড়িনি।

এরপর আমি গাড়িহীন হয়ে পড়ি। সেই একঘেয়ে সময়ে হঠাৎ মনে পড়ে গেল ইসলাম নিয়ে কিছু বই তো আমার কাছে আছে! তখন আমার জীবনের ছয় নম্বর লক্ষ্য ছিল আরও ধার্মিক হওয়া। তাই ভাবলাম, ধর্ম নিয়ে কিছু পড়া যাক। আমি বইগুলো হাতে নিলাম। একটির নাম ছিল The Religion of Truth অর্থাৎ ‘সত্যের ধর্ম’। বইটি খুলতেই আমার মনোযোগ আটকে গেল। এটা ছিল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা, লাইলাতুল জুম‘আ। আমি বইটি এক বসাতেই পড়ে শেষ করে ফেললাম। চারটি বিষয় আমার হৃদয় ছুঁয়ে গেল।-

(১) তাওহীদ হ’ল এক আল্লাহর উপাসনা : ইসলামের সবচেয়ে বড় বার্তা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। একজন মুসলিম হিসাবে কোনো মধ্যস্থতাকারী নেই, আপনি সরাসরি আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন। খ্রিস্টধর্মে যেমন গির্জায় গিয়ে পাদ্রীর সামনে পাপ স্বীকার করতে হয়। ইসলামে এমন কিছু নেই। আমি ভাবলাম, সে কে? যে আমাকে ক্ষমা করে? ইসলাম আমাকে শিখাল ক্ষমা চাইতে হয় সরাসরি আল্লাহর কাছে। এটি আমার অন্তরে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

(২) পবিত্রতা ও ছালাতের প্রস্ত্ততি : আমি জানতাম না একজন মুসলিম কীভাবে ছালাতের জন্য নিজেকে প্রস্ত্তত করেন। যেমন একান্তভাবে থাকা, বসে টয়লেট ব্যবহার করা যাতে কাপড়ে নাপাকি না লাগে। পশ্চিমে এইসবকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। আমি নিজেও আগে অস্বস্তি বোধ করতাম। অথচ মুসলিমদের এই পবিত্রতা আমাকে মুগ্ধ করল। এমনকি একজন শিক্ষিকা শুধুমাত্র একজন মুসলিম ছাত্রের পবিত্রতা দেখে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

(৩) শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনব্যবস্থা : ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ আমাকে অনেকটা মালকম এক্সের কথা মনে করিয়ে দেয়। সেই সোজাসাপ্টা পথ কালেমা, ছালাত, যাকাত, ছিয়াম ও হজ্জ একটি শৃঙ্খলার বার্তা দেয়। আমি বুঝলাম, এটাই আমার প্রয়োজন। এই শৃঙ্খলা আমার জীবনকে সোজা করতে সাহায্য করবে।

(৪) শুধু বিশ্বাস নয়, কাজও যরূরী : ইসলামে শুধু মুখে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বললেই হবে না, সেটা কাজের মাধ্যমে প্রকাশ পেতে হবে। আমি বুঝলাম, বিশ্বাস ও আমলের মধ্যে ভারসাম্যই প্রকৃত মুসলিম হওয়ার চাবিকাঠি। এটি ছিল আমার কাছে অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত। এই চারটি বিষয় আমাকে এতটাই আলোড়িত করল যে, আমি আর দেরি করিনি।

পরদিন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম ইসলামই আমার একমাত্র পথ। আমি সঙ্গে সঙ্গে আমার বন্ধুর বাবাকে ফোন করলাম। তিনি আমাকে ওয়াশিংটন ডিসির ইসলামিক সেন্টারে নিয়ে গেলেন। সেখানেই আমি আমার শাহাদাহ পাঠ করলাম। আলহামদুলিল্লাহ আমার জীবনের নতুন সূচনা হ’ল।

প্রশ্ন : শাহাদাহ পাঠের সময় আপনি কি অনুভব করেছিলেন?

আব্দুর রহীম ম্যাকার্থী : শাহাদাহ গ্রহণের মুহূর্তটি ছিল আমার জীবনের এক স্মরণীয় ও অন্তর্দর্শনভরা সময়। কিন্তু সত্যি বলতে সেই মুহূর্তে আমি ভীষণ নার্ভাস ছিলাম। আমাকে শাহাদাহ শেখাচ্ছিলেন। আর আমাকে সেটা আরবীতে বলতে হবে। আমি তখন বললাম, ‘আমি তো কেবলমাত্র লেভেল ১ স্প্যানিশ পারি, আরবীতে শাহাদাহ বলা তো অসম্ভব লাগছে! আমি তখনো মুসলিম ছিলাম না, কিন্তু মুসলিমদের সঙ্গে ইসলামিক সেন্টারে মাগরিবের ছালাতে দাঁড়িয়েছিলাম। আমি ছালাতে দাঁড়িয়ে থাকলেও ভিতরে ভিতরে যেন ভেঙে পড়ছিলাম। তখন ইমাম ছাহেব আমাকে বললেন, চিন্তা করো না, এটা সহজ হবে। আমি তার পেছনে ধীরে ধীরে বলতে লাগলাম, আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’। আরবীতে উচ্চারণটা ছিল যেন জিহবার উপর মধুর মত নরম, স্বচ্ছন্দ। সেই মুহূর্তে আমি অনুভব করলাম, যেন আমার বুক থেকে বিশাল এক বোঝা নেমে গেল। যেন আমি সত্যিই বদলে যাচ্ছিলাম। চারপাশের সবাই এসে আমাকে আলিঙ্গন করছিল, অভিনন্দন জানাচ্ছিল। আমার মনে হচ্ছিল, আমি একটি নতুন পরিবারের অংশ হয়ে গেছি। এক অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করছিলাম।

প্রশ্ন : ইসলাম গ্রহণের পর আপনার পরিবারের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?

আব্দুর রহীম ম্যাকার্থী : আলহামদুলিল্লাহ আমার পরিবার অত্যন্ত ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল। যদিও তারা ইসলাম সম্পর্কে তেমন কিছু জানত না। কিন্তু তারা আমার ব্যক্তিত্ব ও জীবনধারায় ইতিবাচক পরিবর্তনে খুশি ছিল। তারা ভাবতেও পারেনি যে এই পরিবর্তনটা দীর্ঘস্থায়ী হবে। আমার দাদা যিনি ছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানিতে প্রবেশ করা প্রথম মার্কিন সেনাবাহিনীর সদস্যদের একজন, তিনিও খুশি হয়েছিলেন। তিনি প্রায় বলতেন, আমি জানি না মুসলিমদের মধ্যে কী আছে তাদের মসজিদ, তাদের কুরআন? কিন্তু ছেলেটা বদলে গেছে, ভালো হয়েছে। এখন সে রাতে বাইরে যায় না, ঘরের কাজে সাহায্য করে’। এটা তার চোখে একটা প্রশংসনীয় পরিবর্তন ছিল।

প্রশ্ন : মুসলিম হওয়ার পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল?

আব্দুর রহীম ম্যাকার্থী : সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল আগের জীবনের পরিবেশ থেকে নিজেকে আলাদা করা। আমি যেখানেই ছিলাম, সেটি ছিল আমার প্রাক্তন জীবনের ঠিক দরজার পাশে। একধরনের টান অনুভব করতাম। একবার তো আমি ইসলাম গ্রহণের মাত্র ৯ দিন পর রাস্তার সেই পুরনো পথে হেঁটে যাচ্ছিলাম, ঠিক যেন ফিরে যেতে চলেছি। ঠিক তখনই এক বন্ধু আমাকে বলল, ‘দেখ, সে তো বলে সে মুসলিম, কিন্তু তার আচরণে আমাদের সঙ্গে কোনো পার্থক্য নেই’। কথাটা যেন বজ্রপাতের মতো হৃদয়ে আঘাত করল। আমি নিজেকে প্রশ্ন করলাম, ‘তুমি মুসলিম হলে কেন? শুধু নামের জন্য, না সত্যিই আল্লাহর দিকে ফিরে আসার জন্য? এরপর প্রায় এক থেকে দেড় মাস আমি এক ভেতরের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গেলাম। শরীরও অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। মন, দেহ, আত্মা সবই যেন এক পরীক্ষা পার করছিল। কিন্তু আমি নিজেকে ধরে রেখেছিলাম, মসজিদে যেতাম, মুসলিমদের সাহচর্যে থাকতাম। নবী করীম (ছাঃ)-এর যুগেও নব মুসলিমদের জন্য একটি আশ্রয়স্থল ছিল ‘দারুল আরকাম’। তেমনি আমিও আমার চারপাশের মুসলিম ভাইদের মাঝে আশ্রয় পেয়েছিলাম। সেই পরিবেশই আমাকে টিকিয়ে রেখেছিল। এখন পেছনে তাকালে মনে হয় আলহামদুলিল্লাহ এটি ছিল আল্লাহর অশেষ রহমত।

প্রশ্ন : আপনি প্রথম কাকে দাওয়াত দিয়েছিলেন?

আব্দুর রহীম ম্যাকার্থী : আমি যাকে প্রথম দাওয়াহ দিয়েছিলাম, তিনি ছিলেন আমার খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আল্লাহর অশেষ কৃপায় তিনি আমার কথা শুনলেন এবং ইসলাম গ্রহণ করলেন। যদিও তিনি পরে কিছুটা পথভ্রষ্ট হয়ে যান, আমি আশা করি আল্লাহ তাঁর অন্তরের ইখলাছ জানেন। এরপর আমি অনেক বন্ধুদের ইসলামের দিকে ডাক দিয়েছি। কেউ কেউ প্রভাবিত হয়েছিল, কেউ বলেছিল, ‘আমি এক বছরের মধ্যে মুসলিম হবো কিন্তু নানা ব্যস্ততায় পিছিয়ে গেছে। কেউ শুনেইনি, কেউ শুনে চিন্তা করেছে। আমি আমার পরিবারের সাথেও কথা বলেছিলাম। বিশেষ করে আমার দাদীর উপর বেশি মনোযোগ দিয়েছিলাম। কারণ তিনি ছিলেন সেই মানুষ যিনি আমাকে বড় করেছেন। যখন আমি মাত্র পাঁচ বছরের, তখন আমার বাবা-মা বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। তখন আমি, আমার ভাইবোন এবং চাচাতো ভাইবোন মিলে ছয়জন একসাথে বড় হচ্ছিলাম, আর আমি ছিলাম সবার ছোট।

আমার দাদীর সাথে ছিল আমার এক অটুট সম্পর্ক। তিনি তখন বয়সের ভারে ক্লান্ত, হুইলচেয়ারে বসে থাকতেন। আমি কুরআন জোরে পড়তাম যেন তিনি শুনতে পারেন। আমি তাঁকে বলতাম, আমরা মুসলিমরা কী বিশ্বাস করি? বিশেষ করে ঈসা (আঃ) সম্পর্কে। তিনি হতবাক হয়ে যেতেন, যেন কোনো অজানা সত্য তাঁর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। একদিন আমি যখন তাঁকে গোসল করাতে সাহায্য করছিলাম, তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি আমার কথা বিশ্বাস করেন? এটা কি আপনার কাছে সত্য বলে মনে হয়? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি তাঁকে কালেমা পড়ে শুনালাম, ব্যাখ্যা করলাম, কীভাবে উচ্চারণ করতে হয়। তিনি আমার সাথে শাহাদাহ পাঠ করলেন, আলহামদুলিল্লাহ।

পরে আমি বিদেশে চলে যাই। তাঁর সাথে খুব বেশি সময় কাটাতে পারিনি। কিন্তু আমি যখন আলেমদের জিজ্ঞেস করি, তারা বললেন, যেহেতু তিনি ঈমান এনেছেন এবং কালেমা পাঠ করেছেন, ইনশাআল্লাহ তিনি মুসলিম হিসেবেই মৃত্যুবরণ করেছেন। এই ঘটনাটি আমার জীবনে এক গভীর ছাপ ফেলেছে। কারণ তিনি শুধু আমার দাদী নন, ছিলেন আমার জীবনের মূল ভিত্তিগুলোর অন্যতম। আল্লাহ তাঁকে জান্নাত দান করুন।

প্রশ্ন : আপনি এমন কোনো ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন যা কখনো ভুলতে পারবেন না?

আব্দুর রহীম ম্যাকার্থী : আলহামদুলিল্লাহ, এমন অনেক ঘটনা আছে। তবে বিশেষ একটি ঘটনা বলি যা খুবই আবেগময় এবং আপনাদের কাছেই প্রথমবার শেয়ার করছি। আমি কাতার বিশ্বকাপে দাওয়াহ কার্যক্রমে ছিলাম। হঠাৎ এক কাতারী বোন আমাকে ফোন করে জানালেন একজন ৬ বছর বয়সী আমেরিকান ছেলে ইসলাম গ্রহণ করতে চায়! আমি অবাক হয়ে ভাবছিলাম, এই বয়সে সে কী বুঝবে? হয়তো মজা করছে। কিন্তু তাঁরা অনুরোধ করলেন, যেন আমি আসি। আমি যখন সেখানে পৌঁছালাম, ছেলেটির মা বললেন, সে নিজের ইচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করতে চায়। আমি তাকে শিক্ষা দিচ্ছি, নিজেও শিখছি। সে ছেলেটি কাতারে একটি স্কুলে পড়ছে, যেখানে তাঁর বন্ধুরা মুসলিম। ইসলামিক স্টাডিজের ক্লাসগুলো তার মনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। সে তার মাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করত, আমরা কেন ছালাত পড়ি? আর তার মা তাকে বুঝিয়ে বলত, ‘আল্লাহ আমাদের সবকিছু দেন, তাই আমরা তাঁরই উপাসনা করি। একজন ৬ বছর বয়সী বাচ্চার এমন ঈমান, এমন উপলব্ধি দেখে আমি অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম। সে স্পষ্টভাবে জানত সে কী করছে। সেই দিনই সে শাহাদাহ পাঠ করে মুসলিম হয়।

তারপর আমি তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘আপনার কী হবে? তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, ‘আমি ইসলামকে বিশ্বাস করি, কিন্তু অপেক্ষা করছিলাম বিশেষ কোনো সময়ের জন্য’। আমি বললাম, ‘এটির চেয়ে বিশেষ মুহূর্ত আর কী হ’তে পারে! আপনার সন্তান আজ মুসলিম হয়েছে! এই কথার পর তিনি বললেন, ‘আপনি ঠিক বলেছেন’। আর সেদিনই তিনি তার ছেলের সাথে ইসলাম গ্রহণ করলেন। সুবহানাল্লাহ! সে দিনটি ছিল চোখে পানি আসার মতো এক মুহূর্ত। সেখানে উপস্থিত সবাই কেঁদে ফেলেছিল। পরে জানতে পারি তার স্কুলে একটি বড় সেলিব্রেশনও করা হয়েছিল তার ইসলাম গ্রহণ উপলক্ষ্যে।

 [তথ্য সূত্র : ইন্টারনেট]



আরও