সূরা কাহ্ফের আলোকে দুই বাগানের মালিকদ্বয়ের ঘটনা

ইহসান ইলাহী যহীর 547 বার পঠিত

উপস্থাপনা : মানবজীবনে প্রবৃত্তি এক অবিচ্ছেদ্য বাস্তবতা। ক্ষুধা, রাগ, লোভ, ভালোবাসা, যৌন আকর্ষণ প্রভৃতি মানুষের ভেতর স্বাভাবিকভাবে বিদ্যমান। এসব প্রবৃত্তি সঠিক পথে পরিচালিত হলে মানুষের জীবন সুন্দর ও সুশৃঙ্খল হয়। কিন্তু যখন মানুষ বিবেক, বুদ্ধি ও শরী‘আতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে অন্ধভাবে প্রবৃত্তির অনুসরণ করতে থাকে, তখনই ঘটে বিপর্যয়। প্রবৃত্তির দাসত্ব মানুষকে ন্যায়ের পথ থেকে বিচ্যুত করে অপকর্ম, পাপাচার ও নৈতিক অবক্ষয়ের পথে ধাবিত করে। এই প্রবন্ধে আমরা প্রবৃত্তির অন্ধ অনুসরণের নানা কুফল, এর সামাজিক ও আধ্যাত্মিক প্রভাব এবং এর থেকে মুক্তির উপায় নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করব।

প্রবৃত্তি : প্রবৃত্তিকে আরবিতে বলে ‘হাওয়া’। যার অর্থ আল্লাহর বিধান অমান্য করে নিজের ইচ্ছা বা খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করা। এ বিষয়ে কুরআন ও হাদীছ থেকে নিম্নে আলোচনা করা হ’ল :

১. প্রবৃত্তির অনুসরণ ইহূদী ও নাছারাদের বৈশিষ্ট্য : ইহূদী-নাছারাদের নিকট কোন আসমানী কিতাব নেই। তারা কেবল নিজেদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে। এজন্য আল্লাহ তাদের অনুসরণ ও সামঞ্জস্য করতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَلَنْ تَرْضَى عَنْكَ الْيَهُودُ وَلَا النَّصَارَى حَتَّى تَتَّبِعَ مِلَّتَهُمْ قُلْ إِنَّ هُدَى اللهِ هُوَ الْهُدَى وَلَئِنِ اتَّبَعْتَ أَهْوَاءَهُمْ بَعْدَ الَّذِي جَاءَكَ مِنَ الْعِلْمِ مَا لَكَ مِنَ اللهِ مِنْ وَلِيٍّ وَلَا نَصِيرٍ ‘আর ইহূদী-নাছারারা কখনোই তোমার উপর সন্তুষ্ট হবে না, যে পর্যন্ত না তুমি তাদের ধর্মের অনুসরণ করবে। তুমি বল, নিশ্চয়ই আল্লাহর দেখানো পথই সঠিক পথ। আর যদি তুমি তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ কর, তোমার নিকটে (অহি-র) জ্ঞান এসে যাওয়ার পরেও, তবে আল্লাহর কবল থেকে তোমাকে বাঁচাবার মতো কোন বন্ধু বা সাহায্যকারী নেই’ (বাক্বারাহ ২/১২০)

অন্য আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূলকে নির্দেশ দিয়ে বলেন,قُلْ إِنِّيْ نُهِيْتُ أَنْ أَعْبُدَ الَّذِينَ تَدْعُونَ مِنْ دُوْنِ اللهِ قُلْ لَا أَتَّبِعُ أَهْوَاءَكُمْ قَدْ ضَلَلْتُ إِذًا وَمَا أَنَا مِنَ الْمُهْتَدِيْنَ ‘তুমি কাফেরদের বলে দাও যে, আল্লাহকে ছেড়ে তোমরা যাদের আহবান কর, তাদের ইবাদত করতে আমাকে নিষেধ করা হয়েছে। বলে দাও যে, আমি তোমাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করব না। তাতে আমি পথভ্রষ্ট হয়ে যাব এবং সুপথ প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত থাকবো না’ (আন‘আম ৬/৫৬)

ইহূদী-নাছারাদের ন্যায় কাফের-মুশরিকরাও নিজেদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে। এজন্য তাদের অনুসরণ করতেও নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন,وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَ الَّذِيْنَ كَذَّبُوْا بِآيَاتِنَا وَالَّذِيْنَ لَا يُؤْمِنُوْنَ بِالْآخِرَةِ وَهُمْ بِرَبِّهِمْ يَعْدِلُوْنَ ‘আর তুমি তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না, যারা আমাদের আয়াত সমূহে মিথ্যারোপ করে ও যারা আখেরাতে বিশ্বাস করে না এবং যারা তাদের প্রতিপালকের সাথে অন্যকে সমতুল্য গণ্য করে’ (আন‘আম ৬/১৫০)

২. প্রবৃত্তির অনুসরণ ন্যায়বিচারকে বাধাগ্রস্ত করে : আল্লাহর বিধানের আলোকে দলীল-প্রমাণের ভিত্তিতে নির্মোহ ও নিরপেক্ষ বিচারই ন্যায়বিচার। অন্যদিকে প্রবৃত্তি মানুষকে আল্লাহর বিধানের পরিবর্তে মানবরচিত মতামত ও পক্ষপাতিত্বের দিকে আকৃষ্ট করে। এজন্য আল্লাহ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি প্রবৃত্তির অনুসরণ করতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ বলেন,يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ للهِ وَلَوْ عَلَى أَنْفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ إِنْ يَكُنْ غَنِيًّا أَوْ فَقِيرًا فَالله أَوْلَى بِهِمَا فَلَا تَتَّبِعُوا الْهَوَى أَنْ تَعْدِلُوا وَإِنْ تَلْوُوا أَوْ تُعْرِضُوا فَإِنَّ اللهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক আল্লাহর জন্য সাক্ষ্যদাতা হিসাবে, যদিও সেটি তোমাদের নিজেদের কিংবা তোমাদের পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধে যায়। (বাদী-বিবাদী) ধনী হৌক বা গরীব হৌক, আল্লাহ তাদের সর্বাধিক শুভাকাংখী। অতএব ন্যায়বিচারে তোমরা প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না। আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বল অথবা পাশ কাটিয়ে যাও, তবে জেনে রেখ আল্লাহ তোমাদের সকল কৃতকর্ম সম্পর্কে সম্যক অবহিত’ (নিসা ৪/১৩৫)

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَأَنِ احْكُمْ بَيْنَهُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللهُ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ وَاحْذَرْهُمْ أَنْ يَفْتِنُوكَ عَنْ بَعْضِ مَا أَنْزَلَ اللهُ إِلَيْكَ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَاعْلَمْ أَنَّمَا يُرِيدُ اللهُ أَنْ يُصِيبَهُمْ بِبَعْضِ ذُنُوبِهِمْ وَإِنَّ كَثِيرًا مِنَ النَّاسِ لَفَاسِقُونَ ‘আর তুমি তাদের মধ্যে আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফায়ছালা করবে এবং তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবে না। আর তাদের ব্যাপারে সতর্ক থেকো, যেন তারা তোমাকে আল্লাহ প্রেরিত কোন বিধানের ব্যাপারে বিভ্রান্তিতে না ফেলে। কিন্তু তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে জেনে রেখ যে, আল্লাহ চান তাদেরকে তাদের কিছু কিছু পাপের দরুন (পার্থিব জীবনে) শাস্তি প্রদান করতে। বস্ত্তত লোকদের মধ্যে অনেকেই আছে পাপাচারী’ (মায়েদাহ ৫/৪৯)। আল্লাহ আরো বলেন,فَلِذَلِكَ فَادْعُ وَاسْتَقِمْ كَمَا أُمِرْتَ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ وَقُلْ آمَنْتُ بِمَا أَنْزَلَ اللهُ مِنْ كِتَابٍ وَأُمِرْتُ لِأَعْدِلَ بَيْنَكُمُ اللهُ رَبُّنَا وَرَبُّكُمْ لَنَا أَعْمَالُنَا وَلَكُمْ أَعْمَالُكُمْ لَا حُجَّةَ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ اللهُ يَجْمَعُ بَيْنَنَا وَإِلَيْهِ الْمَصِيرُ ‘সুতরাং দ্বীনের জন্যই তুমি তাদেরকে আহবান কর এবং তুমি অবিচল থাক যেভাবে তুমি আদিষ্ট হয়েছ। তুমি তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করো না। তুমি বল, আল্লাহ যে কিতাব নাযিল করেছেন তাতে আমি বিশ্বাস স্থাপন করেছি। আর আমি তোমাদের মধ্যে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় আদিষ্ট হয়েছি। আল্লাহ আমাদের প্রতিপালক ও তোমাদের প্রতিপালক। আমাদের জর্ন আমাদের কর্ম ও তোমাদের জন্য তোমাদের কর্ম। আমাদের ও তোমাদের মাঝে কোন ঝগড়া নেই। আল্লাহ আমাদের একত্রিত করবেন। আর তাঁর দিকেই হবে সকলের প্রত্যাবর্তন’ (শূরা ৪২/১৫)

দাঊদ (আঃ) কে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ বলেন,يَا دَاوُودُ إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ فَاحْكُمْ بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعِ الْهَوَى فَيُضِلَّكَ عَنْ سَبِيلِ اللهِ إِنَّ الَّذِينَ يَضِلُّونَ عَنْ سَبِيلِ اللهِ لَهُمْ عَذَابٌ شَدِيدٌ بِمَا نَسُوا يَوْمَ الْحِسَابِ ‘হে দাঊদ! আমরা তোমাকে পৃথিবীতে শাসক নিযুক্ত করেছি। অতএব তুমি লোকদের মধ্যে ন্যায়বিচার কর। আর তুমি প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না। তাহ’লে তা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে। নিশ্চয়ই যারা বিচার দিবসকে ভুলে যাওয়ার কারণে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত হয়, তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি’ (ছোয়াদ ৩৮/২৬)। দাঊদ (আঃ) ছিলেন একই সাথে রিসালাত ও খেলাফতের মালিক। তাকেই যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন ধমক খেতে হয়, তাহ’লে এ যুগের তুচ্ছ শাসকদের অবস্থা কেমন হবে?

ইবনু বুরায়দাহ (রাঃ) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন,الْقُضَاةُ ثَلَاثَةٌ: وَاحِدٌ فِي الْجَنَّةِ، وَاثْنَانِ فِي النَّارِ، فَأَمَّا الَّذِي فِي الْجَنَّةِ فَرَجُلٌ عَرَفَ الْحَقَّ فَقَضَى بِهِ، وَرَجُلٌ عَرَفَ الْحَقَّ فَجَارَ فِي الْحُكْمِ، فَهُوَ فِي النَّارِ، وَرَجُلٌ قَضَى لِلنَّاسِ عَلَى جَهْلٍ فَهُوَ فِي النَّارِ ‘বিচারক তিন প্রকার। তন্মধ্যে এক প্রকার জান্নাতী ও অপর দু’ প্রকার জাহান্নামী। জান্নাতী বিচারক হ’ল, যে সত্যকে বুঝে তদনুযায়ী ফায়সালা দেয়। আর যে বিচারক সত্যকে জানার পর স্বীয় বিচারে যুলুম করে সে জাহান্নামী এবং যে বিচারক অজ্ঞতার উপর ফায়সালা দেয় সেও জাহান্নামী’।[1]

৩. দ্বীনের নামে প্রবৃত্তির অনুসরণ ভ্রষ্টতার শামিল : আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা কিছু নিয়ে এসেছেন সেগুলোই কেবল দ্বীন হিসেবে গণ্য হবে। নিজেদের মনগড়া আবেগী প্রথা কখনোই এর অন্তর্ভুক্ত নয়। বরং তা দ্বীনের নামে বাড়াবাড়ি ও ভন্ডামীর শামিল। এগুলো যারা করে তারা নিজেরাও পথভ্রষ্ট হয়, অন্যদেরও বিপথগামী করে। এজন্য এদের থেকে দূরে থাকতে হবে। আল্লাহ বলেন,قُلْ يَاأَهْلَ الْكِتَابِ لَا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ غَيْرَ الْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعُوا أَهْوَاءَ قَوْمٍ قَدْ ضَلُّوا مِنْ قَبْلُ وَأَضَلُّوا كَثِيرًا وَضَلُّوا عَنْ سَوَاءِ السَّبِيلِ ‘তুমি বল, হে আহলে কিতাবগণ! তোমরা তোমাদের দ্বীনে অন্যায়ভাবে বাড়াবাড়ি করো না এবং ঐসব লোকদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করো না, যারা ইতিপূর্বে পথভ্রষ্ট হয়েছে ও বহু লোককে পথভ্রষ্ট করেছে এবং নিজেরা সরল পথ থেকে বিচ্যুৎ হয়েছে’ (মায়েদাহ ৫/৭৭)। এ জাতীয় কাফির-ধার্মিক উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে হ’তে পারে। যারা কাফের দ্বীনকে খেলনা মনে করে এবং ধার্মিকরা তাদের কপট স্বার্থে দ্বীনকে ব্যবহার করে। ইহূদী-নাছারাদের ন্যায় মুসলিম ধর্ম নেতাদের এ চরিত্র এখন সর্বত্র প্রকট। এরা দ্বীনের অপব্যাখ্যা করেই দ্বীনদারদের দ্বীন থেকে বিচ্যুত করছে। মুসলিম উম্মাহর মধ্যে যত শিরক ও বিদ‘আতের ছড়াছড়ি, তার প্রায় সবই ধর্মনেতাদের সৃষ্টি এবং তারাই এগুলিকে উদ্ভট সব যুক্তি দিয়ে লালন করেন স্রেফ মাল ও মর্যাদার লোভে। এরা হ’ল প্রবৃত্তিপূজারী।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,بَلِ اتَّبَعَ الَّذِينَ ظَلَمُوا أَهْوَاءَهُمْ بِغَيْرِ عِلْمٍ فَمَنْ يَهْدِي مَنْ أَضَلَّ اللهُ وَمَا لَهُمْ مِنْ نَاصِرِينَ ‘বরং সীমালংঘনকারীরা অজ্ঞতাবশে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে। অতএব আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তাকে পথ দেখাবে কে? আর তাদের তো কোন সাহায্যকারী নেই’ (রূম ৩০/২৯)। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, فَإِنْ لَمْ يَسْتَجِيبُوا لَكَ فَاعْلَمْ أَنَّمَا يَتَّبِعُونَ أَهْوَاءَهُمْ وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدًى مِنَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ ‘অতঃপর যদি তারা তোমার কথায় সাড়া না দেয় তবে জানবে যে, তারা কেবল তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর হেদায়াত অগ্রাহ্য করে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, তার চাইতে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে আছে? নিশ্চয় আল্লাহ যালেম সম্প্রদায়কে সুপথ প্রদর্শন করেন না’ (ক্বাছাছ ২৮/৫০)

অধিকাংশ সমাজ নেতা বাপ-দাদা ও প্রচলিত রীতি-নীতি অথবা নিজ প্রবৃত্তির অনুসারী হয়ে থাকে। পার্থিব স্বার্থে অন্ধ হওয়ার কারণে সঠিক পথ পাওয়ার ব্যাপারে অন্ধ থাকাকেই তারা ভালবাসে। সেকারণ নবী-রাসূলের দাওয়াতকে সত্য জেনেও তারা তা শুনতে চায় না ও মানতে চায় না। ফলে হেদায়াতের নূর এদের অন্তরে প্রবেশ করে না। আর আল্লাহর শাস্তি থেকে বাঁচানোর জন্য এদের কোন সাহায্যকারী থাকে না। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَى عِلْمٍ وَخَتَمَ عَلَى سَمْعِهِ وَقَلْبِهِ وَجَعَلَ عَلَى بَصَرِهِ غِشَاوَةً فَمَنْ يَهْدِيهِ مِنْ بَعْدِ اللَّهِ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ ‘তুমি কি তাকে দেখেছ যে তার খেয়াল-খুশীকে তার উপাস্য বানিয়েছে? আল্লাহ জেনে-শুনেই তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন। তার কানে ও অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন এবং তার চোখের উপর আবরণ টেনে দিয়েছেন। অতএব আল্লাহর পরে কে তাকে সুপথ প্রদর্শন করবে? এরপরেও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?’ (জাছিয়াহ ৪৫/২৩)

৪. প্রবৃত্তির অনুসারী চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায় : আল্লাহ বলেন,أَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ أَفَأَنْتَ تَكُونُ عَلَيْهِ وَكِيلًا أَمْ تَحْسَبُ أَنَّ أَكْثَرَهُمْ يَسْمَعُونَ أَوْ يَعْقِلُونَ إِنْ هُمْ إِلَّا كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ سَبِيلًا ‘তুমি কি তাকে দেখেছ, যে তার প্রবৃত্তিকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছে? তুমি কি তার যিম্মাদার হবে? তুমি কি মনে কর ওদের অধিকাংশ শোনে ও বোঝে? তারা তো চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায়। বরং তার চাইতে অধিক পথভ্রষ্ট’ (ফুরক্বান ২৫/৪৩)

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَلَوْ شِئْنَا لَرَفَعْنَاهُ بِهَا وَلَكِنَّهُ أَخْلَدَ إِلَى الْأَرْضِ وَاتَّبَعَ هَوَاهُ فَمَثَلُهُ كَمَثَلِ الْكَلْبِ إِنْ تَحْمِلْ عَلَيْهِ يَلْهَثْ أَوْ تَتْرُكْهُ يَلْهَثْ ذَلِكَ مَثَلُ الْقَوْمِ الَّذِينَ كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا فَاقْصُصِ الْقَصَصَ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ ‘যদি আমরা চাইতাম তাহ’লে উক্ত নিদর্শনাবলী অনুযায়ী কাজ করার মাধ্যমে অবশ্যই তার মর্যাদা আরও উন্নত করতে পারতাম। কিন্তু সে মাটি অাঁকড়ে রইল ও স্বীয় প্রবৃত্তির অনুসারী হ’ল। তার দৃষ্টান্ত হ’ল কুকুরের মত। যদি তুমি তাকে তাড়িয়ে দাও তবুও হাঁপাবে, আর যদি ছেড়ে দাও তবুও হাঁপাবে। এটি হ’ল সেই সব লোকদের উদাহরণ যারা আমাদের আয়াত সমূহে মিথ্যারোপ করে। অতএব তুমি এদের কাহিনী বর্ণনা কর, যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে’ (আ‘রাফ ৭/১৭৬)

আল্লাহ বলেন,وَكَذَلِكَ أَنزَلْتُهُ حُكْمًا عَرَبِيًّا وَلَئِن اتَّبَعْت أَهْوَاءَهُم بَعْدَمَا جَاءَكَ مِنَ الْعِلْمِ مَا لَكَ مِنَ الله مِن وَلِيٍّ وَلَا وَاقٍ ‘এমনিভাবে আমরা এ কুরআনকে আরবী ভাষায় বিধানগ্রন্থ হিসাবে নাযিল করেছি। অতএব তোমার নিকট নিশ্চিত জ্ঞান পৌঁছে যাবার পরেও যদি তুমি লোকদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ কর, তাহ’লে আল্লাহর শাস্তি থেকে বাঁচাবার জন্য তোমার কোন সাহায্যকারী বা রক্ষাকারী থাকবে না’ (রা‘দ ১৩/৩৭)

আল্লাহ তা‘আলা প্রবৃত্তির অনুসারী ব্যক্তিদের থেকে মুমিনগণকে সতর্ক করেছেন। কেননা তারা মানুষকে আল্লাহর ইবাদত থেকে বিমুখ করে প্রবৃত্তির পূজারী বানায়, এমনকি তারা আখেরাতের উপর বিশ্বাসকেও দুর্বল করে দিতে পারে। আল্লাহ বলেন,فَلَا يَصُدَّنَّكَ عَنْهَا مَنْ لَا يُؤْمِنُ بِهَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ فَتَرْدَى ‘সুতরাং যে ব্যক্তি ক্বিয়ামতে বিশ্বাস করেনা ও নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, সে যেন তোমাকে উক্ত বিশ্বাস থেকে নিবৃত্ত না করে। তাহলে তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে’ (ত্বোয়াহা ২০/১৬)। আর ক্বিয়ামতে বিশ্বাস ও আখেরাতে জওয়াবদিহিতার দায়িত্বানুভূতি ছাড়া কোন মানুষ সত্যিকারের পুণ্যবান ও সৎকর্মশীল হতে পারে না।

৫. জাহান্নাম প্রবৃত্তি দিয়ে ঘেরা : আল্লাহ জাহান্নাম সৃষ্টি করে তাকে প্রবৃত্তি দ্বারা ঘিরে রেখেছেন। যারাই প্রবৃত্তির অনুসরণ করবে, তারাই জাহান্নামের দিকে ধাবিত হবে। আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, حُجِبَتِ النَّارُ بِالشَّهَوَاتِ، وَحُجِبَتِ الْجَنَّةُ بِالْمَكَارِهِ ‘জাহান্নাম কামনা-বাসনা দ্বারা বেষ্টিত। আর জান্নাত বেষ্টিত কষ্ট সমূহ দ্বারা’ (বুখারী হা/ ৬৪৮৭)

আল্লাহ জান্নাতী ও জাহান্নামীদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেন। জান্নাতীদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হ’ল কুপ্রবৃত্তি থেকে বিরত থাকা। আল্লাহ বলেন,فَأَمَّا مَنْ طَغَى وَآثَرَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا فَإِنَّ الْجَحِيمَ هِيَ الْمَأْوَى وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى ‘তখন যে ব্যক্তি সীমালংঘন করেছে এবং পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়েছে জাহান্নাম তার ঠিকানা হবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার প্রভুর সম্মুখে দন্ডায়মান হওয়ার ভয় করেছে এবং নিজেকে প্রবৃত্তির গোলামী হ’তে বিরত রেখেছে, জান্নাত তার ঠিকানা হবে’ (নাযি‘আত ৭৯/৩৭-৪১)

এজন্য রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘তিনটি বস্ত্ত হ’ল ধ্বংসকারী ও তিনটি বন্ধ হ’ল নাজাত দানকারী। অতঃপর নাজাতদানকারী তিনটি বস্ত্ত হ’ল, গোপনে ও প্রকাশ্যে আল্লাহকে ভয় করা, খুশীতে ও নাখুশীতে সত্য কথা বলা এবং সচ্ছলতায় ও অচ্ছলতায় মধ্যপথ অবলম্বন করা। অতঃপর ধ্বংসকারী তিনটি বস্ত্ত হ’ল, প্রবৃত্তির অনুসারী হওয়া, লোভের দাস হওয়া এবং আত্ম অহংকারে লিপ্ত হওয়া। আর এটাই হ’ল সবগুলির মধ্যে ভয়ংকর’।[2]

[ক্রমশঃ]

-ড. ইহসান ইলাহী যহীর

[প্রশিক্ষণ সম্পাদক, বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ, কক্সবাজার]

 

[1]. আবুদাঊদ হা/১৬৪৪।

[2]. মিশকাত হা/৫১২২; ছহীহাহ হা/১৮০২।



আরও