রাসূল (ছাঃ)-এর দো‘আয় ধন্য যারা

মুহাম্মাদ মুত্ত্বালিব 316 বার পঠিত

আলহামদুলিল্লাহ অগণিত শুকরিয়া সেই পরম করুণাময় আল্লাহর জন্য, যিনি আমাদের শেষনবী হযরত মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর উম্মত হওয়ার সৌভাগ্য দান করেছেন। এই এক সৌভাগ্য, যা দুনিয়ার যাবতীয় নে‘মতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ এবং আখেরাতের মুক্তির অমূল্য চাবিকাঠি।

তিনি শুধুমাত্র একজন মহামানব নন। বরং তিনি হচ্ছেন মানবতার শ্রেষ্ঠতম আদর্শ, যাঁর আলোয় আলোকিত হয়েছে গোটা বিশ্ব-যুগ থেকে যুগান্তর, প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। তিনি এমন এক পুরুষ, যাঁর জীবন ও শিক্ষা চিরন্তন সত্য ও ন্যায়ের দিশারী। তাঁর আগমনে অন্ধকারাচ্ছন্ন আরব সমাজ নবজীবন লাভ করে; আরবের মরুময় ধূলিকণাও যেন তাঁর বরকতে হয়ে উঠেছিল জ্ঞানের অমূল্য রত্নভান্ডার।

এই মহামানবের ছায়াতলে আশ্রয় নেওয়া রাজা-প্রজা, বেদুইন-যাযাবর সবাই জ্ঞানে, চরিত্রে ও আখলাকে হয়ে উঠেছিল মানবজাতির আদর্শ। তাদের অনেকেই পেয়েছিলেন নবীজীর মুখনিঃসৃত বিশেষ দো‘আ, যা তাদের জীবনকে অভূতপূর্ব গৌরবে অভিষিক্ত করেছিল। এই অসংখ্য সৌভাগ্যবান ছাহাবীর মধ্য থেকে আমরা বেছে নিয়েছি বিশেষ কয়েকজনকে, যারা ছিলেন নবীজীর সান্নিধ্যে ধন্য, দো‘আর পরশে পবিত্র এবং সত্য-ন্যায়ের প্রতিচ্ছবি। তাদের জীবন-কাহিনী শুধুই ইতিহাস নয়, তা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা, আদর্শ এবং হৃদয়ের গভীরে জাগ্রত করা এক উদ্দীপনা।

আশা করি, প্রবন্ধটি পাঠকালে সম্মানিত পাঠকমন্ডলী অনুভব করবেন সেইসব সৌভাগ্যবানদের জীবনগাঁথা ও সফলতার মাহাত্ম্য। হৃদয়ের গহীনে হয়তো একটিবার হলেও জপে উঠবে ‘ইশ! আমিও যদি পেতাম সেই বরকতময় দো‘আর পরশ...’।

১. আবু হুরায়রা (রাঃ)

যারা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর বিশেষ দো‘আ দ্বারা ধন্য হয়েছেন, তাদের মধ্যে আবু হুরায়রা (রাঃ) অন্যতম শীর্ষস্থানীয়। হাদীছ বর্ণনায় তার অবদান অতুলনীয়। আল্লাহ তা‘আলা নবীজীর মুখনিঃসৃত অমূল্য বাণীগুলো সংরক্ষণ ও প্রচারের জন্য তাকেই মনোনীত করেছিলেন। এ অসাধারণ কীর্তি তিনি অর্জন করেছিলেন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর এক বিশেষ দো‘আর বরকতে। আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন,قلتُ : يا رسولَ اللهِ إنِّي أسمعُ منكَ حديثًا كثيرًا أنساهُ، قال : ابسُطْ رداءَكَ، فبسَطتُهُ، فغرفَ بيدِهِ فيهِ، ثمَّ قال : ضُمَّهُ، فضممتُهُ، فما نسيتُ حديثًا بعدُ ‘আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আমি আপনার কাছ থেকে অনেক হাদীছ শুনি, কিন্তু ভুলে যাই। তখন তিনি বললেন, তোমার চাঁদরটি মেলে ধরো। আমি তা মেলে ধরলাম। তিনি তাঁর হাত দ্বারা তাতে কিছু ঢেলে দেওয়ার মতো ভঙ্গি করলেন। তারপর বললেন, এখন এটিকে নিজের বুকে লাগাও। আমি তাই করলাম। তারপর থেকে আমি আর কোনো হাদীছ ভুলিনি’।[1]

এই দো‘আই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। আল্লাহ তাকে দান করেন অপূর্ব স্মৃতিশক্তি, যার ফলে তিনি ছাহাবীগণের মধ্যে সর্বাধিক হাদীছ বর্ণনাকারী হয়ে ওঠেন। তার বর্ণিত হাদীছের সংখ্যা ৫,৩৭৪টি, যা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ। ইসলামের জ্ঞানভান্ডারে তার নাম এক অবিস্মরণীয় চিহ্ন। হাদীছের প্রতিটি পাতা যেন সাক্ষ্য দেয় তার অশেষ পরিশ্রম ও বরকতের। যুগে যুগে, দেশে দেশে, তালিবুল ইলমদের মুখে মুখে আবু হুরায়রা (রাঃ)-এর নাম উচ্চারিত হয় গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে।

আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, আল্লাহর কসম! আল্লাহ এমন কোনো মুমিন সৃষ্টি করেননি, যে আমার কথা শুনেছে এবং আমাকে দেখেছে, কিন্তু সে আমাকে ভালোবাসেনি। বলা হ’ল, ‘হে আবু হুরায়রা! আপনি কীভাবে তা জানেন? তিনি বললেন, আমার মা ছিলেন একজন মুশরিক নারী। আমি তাকে ইসলামের দাওয়াত দিতাম, কিন্তু তিনি আমার কথা মানতেন না। একদিন আমি আবার তাকে ইসলামের দিকে আহবান করলাম, কিন্তু তিনি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সম্পর্কে এমন কথা বললেন, যা আমার খুবই অপসন্দনীয় ছিল। তখন আমি কাঁদতে কাঁদতে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছে গেলাম এবং বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আমি আমার মাকে ইসলাম গ্রহণের জন্য আহবান করি। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। আজ আমি তাকে আহবান করলে তিনি আপনার সম্পর্কে এমন কথা বললেন, যা আমি সহ্য করতে পারিনি। অনুগ্রহ করে আপনি আল্লাহর নিকট দো‘আ করুন, যেন তিনি আবু হুরায়রার মাকে হেদায়াত দেন।

তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, اللَّهمَّ اهدِها ‘হে আল্লাহ! তাকে হেদায়াত দাও’। অতঃপর আমি যখন বাড়ি ফিরে আসি, তখন দেখি দরজা বন্ধ। আমি পানি ঢালার শব্দ শুনি (অর্থাৎ তিনি গোসল করছিলেন)। তারপর তিনি আমার পায়ের আওয়াজ শুনে বললেন, হে আবু হুরায়রা! দাঁড়াও (ভিতরে এসো না)। অল্পক্ষণ পর দরজা খুললেন, তিনি তাঁর চাঁদর গায়ে দিলেন এবং বললেন,إنِّي أشهَدُ أنْ لا إلهَ إلَّا اللهُ وأشهَدُ أنَّ مُحمَّدًا رسولُ اللهِ ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল’। আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছে ফিরে গেলাম। যেমন করে দুঃখে কাঁদতে কাঁদতে এসেছিলাম, তেমনি আবার আনন্দে কাঁদতে কাঁদতে ফিরে গেলাম। আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল! সুসংবাদ গ্রহণ করুন! আল্লাহ আপনার দো‘আ কবুল করেছেন। আবু হুরায়রার মাকে হেদায়াত দিয়েছেন।

এরপর আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর কাছে দো‘আ করুন, যেন তিনি আমাকে ও আমার মাকে তাঁর মুমিন বানদাদের ভালোবাসা দান করেন এবং মুমিন বান্দাদেরকে জন্য আমাদের ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন,اللَّهمَّ حبِّبْ عُبَيدَكَ وأُمَّه إلى عبادِكَ المُؤمِنينَ وحبِّبْهم إليهما ‘হে আল্লাহ! তোমার এই বান্দা (আবু হুরায়রা) এবং তার মাকে মুমিন বান্দাদের হৃদয়ে প্রিয় করে দাও এবং তাদেরকেও (মুমিনদেরও) তাদের (আবু হুরায়রা ও তাঁর মায়ের) নিকট প্রিয় করে দাও’।[2]

২. আবুবকর ছিদ্দীক (রাঃ)

তিনি হ’লেন খোলাফায়ে রাশেদাহর প্রথম খলীফা, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সর্বাধিক ঘনিষ্ঠ সাথী ও বিশ্বস্ত বন্ধু। সত্যনিষ্ঠা, ত্যাগ ও ঈমানের দৃঢ়তার কারণে তিনি ছিদ্দীক উপাধিতে ভূষিত হন, যা আজও তার নামের সাথে জড়িয়ে আছে। তিনি জীবনের সকল ক্ষেত্রে বিশেষ করে বিপদে-আপদে সবসময় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সঙ্গী ছিলেন। হিজরতের সময় রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে তিনিই একান্ত সঙ্গী ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘আমার উপর জান-মাল দিয়ে সবচেয়ে বেশি অনুগ্রহ করেছেন আবুবকর’।[3]

আবুবকর (রাঃ) ছিলেন উম্মতে মুহাম্মাদীর সর্বোচ্চ ঈমানের অধিকারী ও সর্বোত্তম ব্যক্তি। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘আবুবকর আমার উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম’।[4] অন্যত্র তিনি বলেন, ‘আমি যদি কাউকে খলীল (অন্তরঙ্গ বন্ধু) বানাতাম, তবে আবুবকরকেই বানাতাম’।[5] রাসূল (ছাঃ) আবুবকর (রাঃ)-এর জন্য কখনো সরাসরি দো‘আ করেছেন এমন বর্ণনা পাওয়া যায় না। তবে আবুবকর (রাঃ) সম্পর্কে তাঁর উত্তম ধারণা ও উপরোক্ত মন্তব্যসমূহ দো‘আর ন্যায়। যার ফলে তিনি উম্মতের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত ও অনুকরণীয় হয়ে আছেন। জীবদ্দশায় জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন ছাহাবীর মধ্যে আবুবকর (রাঃ) অন্যতম। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,أَبُو بَكْرٍ فِي الْجَنَّة ‘আবুবকর জান্নাতবাসীদের অন্তর্ভূক্ত’।[6]

৩. ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)

ওমর (রাঃ) ইসলাম গ্রহণের আগেও ছিলেন এক সাহসী, প্রভাবশালী ও কঠোর স্বভাবের মানুষ। তিনি প্রথমদিকে ইসলাম ও রাসূল (ছাঃ)-এর প্রবল বিরোধিতা করতেন। এমনকি একবার তিনি রাসূল (ছাঃ)-কে হত্যা করার উদ্দেশ্যে বের হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ঘটনাপ্রবাহ পাল্টে যায় আল্লাহর পরিকল্পনায়। যা রাসূল (ছাঃ)-এর খাছ দো‘আয় সম্ভব হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আল্লাহর কাছে দো‘আ করেছিলেন,اللَّهُمَّ أَعِزَّ الإِسْلاَمَ بِأَحَبِّ هَذَيْنِ الرَّجُلَيْنِ إِلَيْكَ: بِأَبِي جَهْلٍ أَوْ بِعُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ ‘হে আল্লাহ! আবু জাহল অথবা ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব এই দুই ব্যক্তির যিনি তোমার নিকট অধিক প্রিয় তার মাধ্যমে ইসলামকে শক্তিশালী করো’।[7]

আল্লাহ তা‘আলা রাসূল (ছাঃ)-এর দো‘আ কবুল করেন এবং ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করেন। এরপর ইসলাম এক নতুন যুগে প্রবেশ করে। কারণ মক্কার কুরাইশরা ওমর (রাঃ)-কে ভয় করত। তার ইসলাম গ্রহণে মুসলমানরা প্রকাশ্যে ইবাদত করার সাহস পায় ও শত্রুরা স্তব্ধ হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর দো‘আ আল্লাহ তা‘আলা এমনভাবে কবুল করেন যে, ওমর (রাঃ) পথে হাটলে শয়তান সে পথে হাটার সাহস পেত না। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,إِنِّي لَأَرَى الشَّيَاطِينَ تَفِرُّ مِنْ عُمَرَ ‘আমি দেখেছি শয়তান ওমরের কাছ থেকে পালিয়ে যায়’।[8] 

এছাড়া রাসূল (ছাঃ) ওমর (রাঃ)-কে শাহাদাত বরণের সুসংবাদ দেন। তিনি বলেন,يا عُمَرُ، ألا أُخْبِرُكَ بِشَيْءٍ أَعْطَانِيهِ الله؟ৃ تُقْتَلُ شَهِيدًا فِي سَبِيلِ اللهِ ‘হে ওমর! আমি কি তোমাকে এমন এক সংবাদ দেব, যা আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন?...তা হ’ল তুমি আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হবে’।[9] পরবর্তীতে ওমর (রাঃ) ফজরের ছালাতে এক আততায়ীর ছুরিকাঘাতে শহীদ হন। এছাড়া ওমর (রাঃ) ছিলেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন ছাহাবীর অন্যতম।

৪. ওছমান ইবনু আফফান (রাঃ)

ওছমান ইবনু আফফান (রাঃ) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর অন্যতম ঘনিষ্ঠ ছাহাবী, তাঁর দুই মেয়ের জামাতা ও এবং ইসলামের তৃতীয় খলীফা। তিনি অত্যন্ত নম্র, ধৈর্যশীল এবং দানশীল ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তার জন্য একাধিকবার বিশেষ দো‘আ করেছেন। এখানে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দো‘আ তুলে ধরা হ’ল-

ক. ওছমানের দানশীলতার প্রতিদানস্বরূপ দো‘আ : যখন ওছমান (রাঃ) তাবুক যুদ্ধের সময় এক বিশাল পরিমাণ অর্থ ও সামগ্রী দিয়ে সাহায্য করেছিলেন, তখন রাসূল (ছাঃ) বলেছিলেন, ‘ওছমান যা কিছু আজ করেছে, আজকের পর সে যা করবে তাতে তার কোনো ক্ষতি হবে না’।[10] অন্যত্র তিনি বলেন, ‘ওছমান জান্নাতে যাবে এবং তার ওপর কোনো বিপদ আসবে না’।[11] এটি একটি দো‘আ এবং ঘোষণা, যা তার গুনাহ মাফ এবং জান্নাতের নিশ্চয়তার ইঙ্গিত দেয়।

খ. আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দো‘আ : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলতেন, ‘হে আল্লাহ! তুমি ওছমানের উপর সন্তুষ্ট হও। কারণ আমি তার উপর সন্তুষ্ট’।[12] এ দো‘আ রাসূল (ছাঃ) বহুবার করেছেন, বিশেষ করে যখন ওছমান (রাঃ) ইসলামের জন্য দান করতেন।

গ. রাসূল (ছাঃ) একদিন আবুবকর, ওমর, ওছমান (রাঃ)-সহ ওহোদ পাহাড়ে ছিলেন। তখন পাহাড় কেঁপে উঠলে, রাসূল (ছাঃ) বললেন, ‘চুপ কর হে ওহোদ! তোমার উপর আছেন একজন নবী, একজন ছিদ্দীক ও দুই শহীদ’।[13] নবী হ’লেন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ), ছিদ্দীক আবুবকর (রাঃ) ও শহীদ দ্বারা উদ্দেশ্য হ’লেন ওমর ও ওছমান (রাঃ)। বাস্তবেই তারা শহীদ হয়েছিলেন।

ঘ. রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) একদিন বললেন, ‘কে রুমা কূপটি ক্রয় করে মুসলিমদের পানি গ্রহণের জন্য ওয়াক্বফ করবে, যার বিনিময়ে সে জান্নাতে তার চেয়ে উত্তম কিছু পাবে? তখন ওছমান (রাঃ) সেই কূপটি কিনে মুসলিমদের জন্য ওয়াক্বফ করে দেন’।[14] অতঃপর রাসূল (ছাঃ) দো‘আ করে বললেন, ‘হে আল্লাহ! ওছমানের অতীত ও ভবিষ্যতের গুনাহ, গোপন ও প্রকাশ্য গুনাহ এবং ক্বিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু ঘটবে সব মাফ করে দিন’।[15] রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ওছমান (রাঃ)-এর ন্যায় কারো জন্য এতো বেশি দো‘আ করেননি, যা তার জন্য অত্যন্ত সৌভাগ্যের ছিল।

৫. আলী ইবনু আবী তালেব (রাঃ)

তিনি ছিলেন রাসূল (ছাঃ)-এর চাচাতো ভাই ও জামাতা। তিনি জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত ছাহাবীদের অন্যতম এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের ৪র্থ খলীফা। তিনি ছোট থেকে রাসূল (ছাঃ)-এর সাহচর্যে থাকায় অনেক সময় প্রিয় নবীর বরকতময় দো‘আয় ধন্য হওয়ার সুযোগ লাভ করেছেন। যার সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হ’ল :

ক. খায়বর যুদ্ধের সময় রাসূল (ছাঃ)-এর দো‘আ : খায়বর যুদ্ধের সময় মুসলমানদের শক্তিশালী শত্রুদের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য একজন শক্তিশালী নেতা দরকার ছিল। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন,لَأُعْطِيَنَّ الرَّايَةَ غَدًا رَجُلًا يُحِبُّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ، وَيُحِبُّهُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ، يَفْتَحُ اللَّهُ عَلَى يَدَيْهِ ‘আগামীকাল আমি পতাকা তাকে দিব, যিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলও তাকে ভালোবাসেন। আল্লাহ তার হাত দিয়ে বিজয় দিবেন’।

পরদিন রাসূল (ছাঃ) আলী ইবনু আবী তালিব (রা)-কে ডাকলেন। তখন তাঁর চোখে ব্যথা থাকায় তিনি আলীর চোখে নিজ হাত দ্বারা থুতু লাগিয়ে দো‘আ করলেন। সঙ্গে সঙ্গে ব্যথা চলে গেল। এরপর তাকে সেনাপতি বানিয়ে খায়বারে সৈন্য প্রেরণ করলেনন এবং তার মাধ্যমেই আল্লাহ বিজয় দান করলেন।[16]

খ. খুম কুয়ার নিকট দো‘আ : বিদায় হজ্জ থেকে ফেরার পথে রাবেগের নিকটবর্তী খুম কূয়ার নিকট পৌঁছে বুরায়দা আসলামী (রাঃ) রাসূল (ছাঃ)-এর নিকটে হযরত আলী (রাঃ) সম্পর্কে কিছু অভিযোগ পেশ করেন। যা ইয়ামনে গণীমত বণ্টন সংক্রান্ত বিষয়ে ছিল। এতে রাসূল (ছাঃ)-এর চেহারা পরিবর্তন হয়ে যায়। অতঃপর তিনি বলেন,يَا بُرَيْدَةُ، أَلَسْتُ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ؟ ‘হে বুরায়দা! আমি কি মুমিনদের নিকট তাদের নিজের চাইতে অধিক ঘনিষ্টতর নই? বুরায়দা বললেন, হ্যাঁ। তখন রাসূল (ছাঃ) বলেন,مَنْ كُنْتُ مَوْلاَهُ فَعَلِىٌّ مَوْلاَهُ ‘আমি যার বন্ধু, আলী তার বন্ধু’।[17] অন্য বর্ণনায় এরপর তিনি দো‘আ করেন,اللَّهُمَّ وَالِ مَنْ وَالَاهُ، اللَّهُمَّ عَادِ مَنْ عَادَاهُ ‘হে আল্লাহ! তুমি তার বন্ধু হও, যে তার বন্ধু হয়, আর তার শত্রু হও, যে তার সাথে শত্রুতা করে’।[18]

তাছাড়া তিনি অন্যত্র বলেন,أَنْتَ مِنِّي بِمَنْزِلَةِ هَارُونَ مِنْ مُوسَى، إِلَّا أَنَّهُ لا نَبِيَّ بَعْدِي ‘মূসার কাছে হারূন যেমন ছিলেন, তুমি আমার কাছে তেমন। পার্থক্য কেবল আমার পরে কোন নবী নেই’।[19]

৬. আনাস বিন মালেক (রাঃ)

আনাস (রাঃ) ছোটবেলায় তার মা উম্মু সুলায়েম (রাঃ)-এর মাধ্যমে নবী (ছাঃ)-এর খিদমতে নিযুক্ত হন। তিনি প্রায় ১০ বছর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সেবা করেছেন এবং নবী করীম (ছাঃ)-এর অসংখ্য হাদীছ বর্ণনা করেছেন। অধিকাংশ সময় তিনি রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে থাকায় তিনিও তার বরকতময় দো‘আ লাভে ধন্য হন।

তার মাতা উম্মু সুলায়েম (রাঃ)-এর দো‘আ চাওয়ার ঘটনা : আনাস (রাঃ) বলেন, ‘আমার মা আমাকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট গেলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আনাস আপনার খিদমতে থাকবে, আপনি তার জন্য আল্লাহর কাছে দো‘আ করুন। তখন তিনি বললেন,اللَّهُمَّ أَكْثِرْ مَالَهُ وَوَلَدَهُ، وَبَارِكْ لَهُ ‘হে আল্লাহ! তুমি তার ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বৃদ্ধি কর এবং তাকে বরকত দান কর’।[20] এ বিষয়ে আনাস (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) আমার জন্য তিনটি দো‘আ করেছিলেন। (১) আয়ু বৃদ্ধি (২) সন্তান-সন্ততি বৃদ্ধি (৩) সম্পদে বরকত। আমি এই তিনটি পেয়েছি। তিনি আমার জন্য চতুর্থ একটি জিনিস চেয়েছিলেন। তাহ’ল জান্নাত, আমি আশা করি সেটাও পাব ইনশাআল্লাহ।[21] ইমাম যাহাবীর মতে তিনি ১০৩ বছর বেঁচেছিলেন এবং প্রচুর সম্পদের মালিক হয়েছিলেন। অন্য বর্ণনায় এসেছে যে, তার সন্তান সন্ততি ১০০ এর কাছাকাছি ছিল।[22] যা রাসূল (ছাঃ)-এর বিশেষ দো‘আয় অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল।

৭. আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ)

আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ) ছিলেন রাসূল (ছাঃ)-এর আপন চাচাতো ভাই। তিনি অল্প বয়স থেকেই রাসূল (ছাঃ)-এর সান্নিধ্যে বড় হন। সেই সুবাদে তিনিও বেশ কয়েকবার রাসূল (ছাঃ)-এর দো‘আ লাভ করেন। যার সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হ’ল :

ক. আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরলেন এবং বললেন, اللَّهُمَّ عَلِّمْهُ الْكِتَابَ ‘হে আল্লাহ! তাকে কিতাব (কুরআন) শিক্ষা দাও’।[23]

খ. আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ) যখন খুবই অল্প বয়সের ছিলেন, তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর খুব নিকট থাকতেন এবং তাঁর খিদমত করার চেষ্টা করতেন। তিনি বলেন, ‘নবী (ছাঃ) একবার পায়খানায় প্রবেশ করলেন। আমি তাঁর জন্য ওযূর পানি প্রস্ত্তত করে রাখলাম। তিনি বের হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এটা কে রেখেছে? তাঁকে তা (পানি আব্দুল্লাহ রেখেছে) জানানো হ’ল। তিনি বললেন,اللهمَّ فقِّههُ في الدِّينِ، وعلِّمهُ التَّأويلَ ‘হে আল্লাহ! তুমি তাকে দ্বীনের বুঝ দান কর এবং কুরআনের ব্যাখ্যা শিখিয়ে দাও’।[24]

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর দো‘আর ফলে ইবনু আববাস (রাঃ) তাফসীর শাস্ত্রে ব্যাপক ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। এজন্য তাকে ‘রঈসুল মুফাসসিরীন’ বা প্রধান মুফাসসির বলা হয়। কুরআনের উপর অধিক দক্ষতার জন্য ওমর (রাঃ) তাকে সম্মান করতেন এবং পরামর্শ সভায় বদরী ছাহাবীদের সাথে রাখতেন। আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, একদিন ওমর (রাঃ) জ্যেষ্ঠ বদরী ছাহাবীদের মজলিসে আমাকে ডেকে বসালেন। এতে অনেকে সংকোচ বোধ করেন। প্রবীণতম ছাহাবী আব্দুর রহমান ইবনু ‘আওফ (রাঃ) বলেন,أتسأله ولنا بنون مثله ‘আপনি ওকে জিজ্ঞেস করবেন? অথচ ওর বয়সের ছেলেরা আমাদের ঘরে রয়েছে’। ওমর (রাঃ) বললেন, সত্বর জানতে পারবেন’। অতঃপর তিনি সবাইকে সূরা নছরের তাৎপর্য জিজ্ঞেস করলেন। তখন সকলে প্রায় একই জওয়াব দিলেন যে, ‘এর মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর নবীকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, যখন বিজয় লাভ হবে, তখন যেন তিনি তওবা-ইস্তেগফার করেন’। এবার তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন। আমি বললাম, إِنَّمَا هُوَ أَجَلُ رَسُوْل ِاللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَعْلَمَهُ إِيَّاهُ- ‘এ সূরার মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর রাসূলের মৃত্যু ঘনিয়ে আসার খবর দিয়েছেন’। অতঃপর বললাম, إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللهِ وَالْفَتْحُ ‘যখন এসে গেছে আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়’ অর্থ فذلك علامة موتك ‘এটাতে আপনার মৃত্যুর আলামত এসে গেছে’। অতঃপর فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ ‘এক্ষণে তুমি তোমার প্রভুর প্রশংসাসহ পবিত্রতা বর্ণনা কর ও তওবা-ইস্তেগফার কর’।

এ ব্যাখ্যা শোনার পর ওমর (রাঃ) বললেন, تَلُوْمُوْنِىْ عَلَيْهِ؟ وَاللهِ مَا أَعْلَمُ مِنْهَا إِلاَّ مَا تَعْلَمُ- ‘আপনারা আমাকে এই ছেলের ব্যাপারে তিরষ্কার করছিলেন? আল্লাহর কসম! হে ইবনে আববাস! তুমি যা বলেছ, এর বাইরে আমি এর অর্থ অন্য কিছুই জানিনা’।[25] এজন্য এ সূরাকে সূরা তাওদী‘ (التوديع) বা ‘বিদায় দানকারী’ সূরা বলা হয় (কুরতুবী)। কেননা এ সূরার মধ্যে রাসূল (ছাঃ)-এর চির বিদায়ের ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে।

মুজাহিদ বলেন, ‘আমি পুরো কুরআন তিনবার ইবনু আববাস (রাঃ)-এর সামনে উপস্থাপন করেছি এবং প্রতিটি আয়াতের পর থেমে আমি তাকে তার ব্যাখ্যা জিজ্ঞাসা করেছি। আর তিনি তার ব্যাখ্যা করেছেন। (অর্থাৎ তিনি প্রতিটি আয়াতের ব্যাখ্যা জানতেন)। [26] [ক্রমশ]

মুহাম্মাদ মুত্ত্বালিব

[ছাত্র, ছানাবিইয়াহ, আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী, নওদাপাড়া, রাজশাহী]


[1]. বুখারী হা/১১৯।

[2]. মুসলিম হা/২৪৯১; ছহীহ ইবনু হিববান হা/৭১৫৪।

[3]. বুখারী হা/৪৬৭।

[4]. ইবনু মাজাহ হা/৪৬৭, সনদ হাসান।

[5]. বুখারী হা/৩৬৫৬।

[6]. তিরমিযী হা/৩৭৪৭।

[7]. তিরমিযী হা/৩৬৮১।

[8]. বুখারী হা/৩৬৮৩।

[9]. হাকেম হা/৩৬৮১।

[10]. তিরমিযী হা/৩৭০১; বুখারী হা/৩৬৯৫।

[11]. তিরমিযী হা/৩৭৪৭।

[12]. তিরমিযী হা/৩৭০২।

[13]. বুখারী হা/৩৬৮৬।

[14]. তিরমিযী হা/৩৭০০, সনদ হাসান।

[15]. ত্বাবারনী হা/৭৬৭।

[16]. বুখারী হা/৪২১০।

১৭. আহমাদ হা/২২৯৯৫; তিরমিযী হা/৩৭১৩।

১৮. ইবনু মাজাহ হা/১১৬।

[19]. বুখারী হা/৪৪১৬।

[20]. বুখারী হা/৬২৪৪।

[21]. আল-আদাবুল মুফরাদ, হা/৩৪৭।

[22]. মুসলিম হা/২৪৮১।

[23]. বুখারী হা/৭৫।

[24]. বুখারী হা/১৪৩।

২৫. বুখারী হা/৩৬২৭; তিরমিযী হা/৩৩৬২; কুরতুবী হা/৬৫০৯।

[26]. তাফসীর আত্ব-ত্বাবারী ১/৬২ পৃ.।



আরও