হালাল রিযিক : দুনিয়া ও আখেরাতের আলোকবর্তিকা

মামূন বিন হাসমত 5 বার পঠিত

ভূমিকা : ইসলামী জীবনাদর্শনে রিযিক কেবল পেট পূর্ণ করার নাম নয়। বরং এটি হ’ল স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির এক নিবিড় সেতুবন্ধন। হালাল রিযিক হ’ল সেই আলোকবর্তিকা, যা একজন মুমিনের অন্তরে তাক্বওয়ার নূর জ্বালিয়ে দেয়। এটি সেই পবিত্র জ্বালানি, যা দেহকে ইবাদতের শক্তি জোগায় এবং আত্মাকে করে তোলে কলুষমুক্ত। বিপরীতে হারাম রিযিক আপাতদৃষ্টিতে চাকচিক্যময় মনে হলেও তা আসলে এক মরীচিকা। যা দো‘আ কবুলের পথ রুদ্ধ করে এবং পরকালের অনন্ত যাত্রাকে করে তোলে অন্ধকারাচ্ছন্ন। আজকের এই প্রবন্ধে আমরা সেই সত্যেরই সন্ধান করব, কীভাবে হালাল রিযিক আমাদের এই নশ্বর পৃথিবী এবং অবিনশ্বর আখেরাত আলোকবর্তিকা স্বরূপ হ’তে পারে।-

হালালের সংজ্ঞা : হালালের আভিধানিক অর্থ হ’লالْمُبَاحُ বা বৈধ। পারিভাষিক অর্থে,هُوَ الْمُبَاحُ الَّذِي انْحَلَّتْ عَنْهُ عُقْدَةُ الْحَظْرِ وَأَذِنَ الشَّارِعُ فِي فِعْلِهِ ‘হালাল ঐ বৈধ জিনিস যা নিষেধাজ্ঞার বন্ধন হ’তে মুক্ত এবং শরী‘আত যে কর্মের প্রতি অনুমোদন দেয়’।[1] রাসূল (ছাঃ)-এর ভাষায়,الْحَلاَلُ مَا أَحَلَّ اللهُ فِى كِتَابِهِ وَالْحَرَامُ مَا حَرَّمَ اللهُ فِى كِتَابِهِ وَمَا سَكَتَ عَنْهُ فَهُوَ مِمَّا عَفَا عَنْهُ- ‘আল্লাহ তাঁর কিতাবে যেসব জিনিস হালাল করেছেন তা হালাল এবং আল্লাহ তাঁর কিতাবে যেসব জিনিস হারাম করেছেন তা হারাম। আর যেসব জিনিস সম্পর্কে তিনি নীরব থেকেছেন তা তিনি ক্ষমা করেছেন’।[2] 

রিযিকের সংজ্ঞা : আল্লামা ইবনু মানযুর রিযিকের সংজ্ঞায় লিখেছেন, الرِّزْقُ هُوَ مَا تَقُوْمُ بِهِ حَيَاةُ كُلِّ كَائِنٍ حَيٍّ ‘রিযিক হ’ল এমন বস্ত্ত, যার মাধ্যমে প্রতিটি জীবন্ত সত্তার জীবন প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত হয়’।[3]

রিযিক অন্বেষণে সালাফদের সতর্কতা : (১) সুফিয়ান ছাওরী (রহঃ) বলেন, হারামে পতিত হওয়ার ভয়ে হালালের দশ ভাগের নয় ভাগও ছেড়ে দিতাম’।[4] (২) আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, ‘যার পেটে হারাম খাদ্য রয়েছে, তার কোনো আমল কবুল হয় না’।[5] (৩) ইমাম ইবনুল মুবারক (রহঃ) বলেন, ‘তুমি রাতভর ইবাদত করলেও, যদি তোমার খাদ্য হারাম হয়, তা তোমার কোনো উপকারে আসবে না’।[6] (৪) ইয়াহইয়া ইবনু মু‘আয (রহঃ) বলেন, ইবাদত আল্লাহর এমন এক সঞ্চিত ভান্ডার, যার চাবিকাঠি হ’ল দো‘আ। আর সেই চাবির দাঁত হচ্ছে হালাল খাদ্য গ্রহণ’।[7]

রিযিক ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ : রিযিক কেবল একটি অর্থনৈতিক শব্দ নয়। এটি আমাদের ঈমানের এক গভীরতম পরীক্ষা। রিযিক মূলত অদৃশ্যের প্রতি বিশ্বাসের অন্তর্ভুক্ত। এছাড়াও রিযিকের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা ঈমানের অন্যতম স্তম্ভ বা রুকন হিসাবে বিবেচিত। মহান আল্লাহর গুণবাচক নামসমূহের মধ্যে একটি অনন্য নাম হ’ল ‘আর-রাযযাক’। তাই রিযিক দেওয়া মহান আল্লাহর রুবূবিয়াত বা প্রভুত্বের এক অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্য। তিনি তাঁর প্রতিটি সৃষ্টিকে, ছোট-বড় নির্বিশেষে, সকল প্রকার রিযিক দিয়ে ধন্য করেন। তিনি বলেন,إِنَّ اللهَ هُوَ الرَّزَّاقُ ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِينُ- ‘নিশ্চয় আল্লাহই তো সবচেয়ে বড় রিযিকদাতা ও প্রবল শক্তির অধিকারী’ (যারিয়াত ৫১/৫৮)। যখন আপনি জানবেন যে আপনার রিযিকদাতা স্বয়ং আল্লাহ, তখন আপনার দুশ্চিন্তা হওয়ার কথা নয়। মানুষ আপনাকে বঞ্চিত করতে পারে, পৃথিবী আপনাকে অবহেলা করতে পারে, কিন্তু ‘আর-রাযযাক’ কখনো আপনাকে ভুলে যাবে না।

রিযিক পূর্বনির্ধারিত : আপনার রিযিক আপনার জন্য ঠিক সেভাবেই নির্ধারিত, যেভাবে আপনার মৃত্যু নির্ধারিত। মৃত্যু যেমন মানুষকে খুঁজে বের করে নেয়, আপনার জন্য বরাদ্দকৃত রিযিকও ঠিক তেমনি আপনাকে খুঁজে নিবেই। কোনো শক্তিই তা আটকাতে পারবে না। মানুষ যখন পৃথিবীর আলো দেখেনি, যখন সে মায়ের অন্ধকার জঠরে বড় হচ্ছে, তখনই তার রিযিকের ফায়ছালা হয়ে যায়। আব্দুল্লাহ বিন মাসঊদ (রাঃ) বর্ণিত বিখ্যাত হাদীছে রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, মানুষের ভ্রূণ যখন মাতৃগর্ভে ১২০ দিন অতিবাহিত করে, তখন মহান আল্লাহ চারটি বিষয়ের নির্দেশ নিয়ে একজন ফেরেশতাকে তার কাছে পাঠান। সে তার আমল, আয়ুষ্কাল, রিযিক এবং সে হতভাগা হবে না সৌভাগ্যবান হবে, তা লিখে দেয়। তারপর সে তার মধ্যে রূহ ফুঁকে দেয়’।[8] 

শুধু তাই নয়, মহান আল্লাহ এই মহাবিশ্ব সৃষ্টির বহু পূর্বেই আমাদের কার কপালে কী জুটবে, তা লিখে রেখেছেন। আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন ‘আছ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘আল্লাহ সৃষ্টিজগতের তাক্বদীর সমূহ লিপিবদ্ধ করেছেন আসমান-যমীন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাযার বৎসর পূর্বে’।[9]

আল্লাহ তা‘আলা তাঁর প্রতিটি সৃষ্টির অবস্থা সম্পর্কে পূর্ণ অবগত। তিনি জানেন কার জন্য কোন রিযিক কল্যাণকর। আল্লাহ বলেন,وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللهِ رِزْقُهَا وَيَعْلَمُ مُسْتَقَرَّهَا وَمُسْتَوْدَعَهَا كُلٌّ فِي كِتَابٍ مُبِينٍ- ‘আর ভূপৃষ্ঠে বিচরণশীল এমন কোন প্রাণী নেই যার রিযিক আল্লাহর যিম্মায় নেই। আর তিনি জানেন তার স্থায়ী ও অস্থায়ী ঠিকানা। সবকিছুই সুস্পষ্ট কিতাবে (লওহে মাহফূযে) লিপিবদ্ধ রয়েছে’ (হূদ ১১/৬)

রিযিক সুনিশ্চিত : রিযিক নিয়ে আমাদের অস্থিরতা অনেক সময় আমাদের বিবেককে অন্ধ করে দেয়। কিন্তু ইসলামের চিরন্তন সত্য হ’ল আপনার জন্য যা বরাদ্দ করা হয়েছে, তা পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত আপনার মৃত্যু আসবে না। মহান আল্লাহ কেবল রিযিকের প্রতিশ্রুতি দিয়েই ক্ষান্ত হননি। বরং নিজের নামে কসম খেয়ে আমাদের আশ্বস্ত করেছেন। তিনি বলেন, وَفِي السَّمَاءِ رِزْقُكُمْ وَمَا تُوعَدُونَ- فَوَرَبِّ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ إِنَّهُ لَحَقٌّ مِثْلَ مَا أَنَّكُمْ تَنْطِقُونَ- ‘আর আকাশে রয়েছে তোমাদের রিযিক এবং তোমাদের প্রতিশ্রুত বিষয়সমূহ’। ‘নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের পালনকর্তার শপথ, তোমাদের পারস্পরিক কথোপকথনের মতই এটি সত্য’ (যারিয়াত ৫১/২২-২৩)

অণুপরিমাণ রিযিক বাকি থাকতে কেউ মৃত্যুবরণ করবে না। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর হৃদয়ে জিব্রাঈল (আঃ) এক অমোঘ সত্য ঢেলে দিয়েছেন, যা আমাদের অন্তরের সব ভয় দূর করে দেয়। নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন,وَإِنَّ الرُّوحَ الْقُدُسَ - نَفَثَ فِي رُوعِي أَنَّ نَفْسًا لَنْ تَمُوتَ حَتَّى تَسْتَكْمِلَ رِزْقَهَا، ‘পবিত্র আত্মা (জিব্রাঈল) আমার হৃদয়ে এই কথাটি ফুঁকে দিয়েছেন যে, কোনো প্রাণই ততক্ষণ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করবে না, যতক্ষণ না সে তার নির্ধারিত আয়ু পূর্ণ করে এবং বরাদ্দকৃত রিযিক পুরোপুরি ভোগ করে’।[10] অপর এক হাদীছে রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, إِنَّ الرِّزْقَ لَيَطْلُبُ الْعَبْدَ كَمَا يَطْلُبُهُ أَجَلُهُ ‘নিশ্চয়ই রিযিক বান্দাকে তার মৃত্যুর চেয়েও বেশি গুরুত্বের সাথে তালাশ করে’।[11]

রিযিক অন্বেষণে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল : আপনার সম্মান, আপনার রিযিক এবং আপনার ভবিষ্যৎ সবকিছুই সেই পরম দয়ালু আল্লাহর হাতে। তাই রিযিক আসতে দেরি হলে হতাশ হবেন না, বরং আপনার চেষ্টা চালিয়ে যান এবং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল বা পূর্ণ ভরসা রাখুন। আল্লাহর ভান্ডারে যা কিছু আছে, তা কেবল তাঁর আনুগত্য বা ইবাদতের মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব। যদি আপনার রিযিক আপনাকে খুঁজে নেয়-ই এবং তা কোনোভাবেই আপনার হাতছাড়া না হয়, তবে কেন আপনি উপার্জনের ক্ষেত্রে অস্থির হয়ে আল্লাহর নাফরমানি করবেন? রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সেই অমূল্য উপদেশটি মনে রাখুন,أَلَا فَاتَّقُوا اللهَ، وَأَجْمِلُوا فِي الطَّلَبِ، وَلَا يَحْمِلَنَّكُمُ اسْتِبْطَاءُ الرِّزْقِ أَنْ تَطْلُبُوهُ بِمَعَاصِي اللهِ، فَإِنَّهُ لَا يُدْرَكُ مَا عِنْدَ اللهِ إِلَّا بِطَاعَتِهِ- সাবধান! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং রিযিক অন্বেষণে মার্জিত পন্থা (হালাল পথ) অবলম্বন করো। রিযিক আসতে দেরি হচ্ছে দেখে অধৈর্য হয়ে তোমরা যেন তা আল্লাহর নাফরমানীর মাধ্যম তালাশ না করো। কারণ, আল্লাহর কাছে যা রয়েছে, তা কেবল তাঁর আনুগত্যের মাধ্যমেই লাভ করা সম্ভব’।[12] আর এজন্য রাসূল (ছাঃ) প্রতিটি ফরয ছালাত শেষে আল্লাহর কাছে নিজের আত্মসমর্পণ প্রকাশ করে বলতেন, اَللَّهُمَّ لاَ مَانِعَ لِمَا أَعْطَيْتَ وَلاَ مُعْطِيَ لِمَا مَنَعْتَ وَلاَ يَنْفَعُ ذَا الْجَدِّ مِنْكَ الْجَدُّ- ‘হে আল্লাহ! তুমি যা দিতে চাও, তা রোধ করার কেউ নেই এবং তুমি যা রোধ কর, তা দেওয়ার কেউ নেই। আর কোন সম্পদশালী ব্যক্তির সম্পদ কোন উপকার করতে পারে না তোমার অনুগ্রহ ব্যতীত’।[13]

রিযিক বণ্টনের রহস্য : রিযিকের কমবেশি হওয়া আল্লাহর রাগান্বিত হওয়া বা খুশি হওয়ার মাপকাঠি নয়। এটি কেবলই তাঁর এক সুনিপুণ পরীক্ষা। আমাদের সমাজে কেউ অঢেল সম্পদের মালিক। আবার কেউ নুন আনতে পান্তা ফুরায়। বাহ্যিক দৃষ্টিতে এটি বৈষম্য মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে আছে মহান আল্লাহর এক সুগভীর প্রজ্ঞা ও হিকমত। তিনি পরম ন্যায়বিচারক। তিনি জানেন কার জন্য সম্পদ কল্যাণকর আর কার জন্য দারিদ্রতাই নিরাপদ। আর এজন্য তিনি বলেন,إِنَّ رَبَّكَ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ وَيَقْدِرُ إِنَّهُ كَانَ بِعِبَادِهِ خَبِيرًا بَصِيرًا- ‘নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক যাকে ইচ্ছা রূযী প্রশস্ত করেন ও সংকুচিত করেন। নিঃসন্দেহে তিনি তাঁর বান্দাদের সবকিছু জানেন ও দেখেন’ (বনু ইস্রাঈল ১৭/৩০)

অনেক সময় আমরা যা চাই, তা না পাওয়াটাই আমাদের জন্য মঙ্গলজনক হয়। যদি আল্লাহ সবাইকে অগাধ সম্পদ দিতেন, তবে পৃথিবীতে বিশৃংখলা ও ঔদ্ধত্য ছড়িয়ে পড়ত। আল্লাহ বলেন,وَلَوْ بَسَطَ اللَّهُ الرِّزْقَ لِعِبَادِهِ لَبَغَوْا فِي الْأَرْضِ وَلَكِنْ يُنَزِّلُ بِقَدَرٍ مَا يَشَاءُ إِنَّهُ بِعِبَادِهِ خَبِيرٌ بَصِيرٌ- ‘আর যদি আল্লাহ তার বান্দাদের জন্য (প্রয়োজনের অতিরিক্ত) রূযী প্রশস্ত করে দিতেন, তাহ’লে তারা দুনিয়াতে সীমালংঘন করত। কিন্তু তিনি যতটুকু চান, ততটুকু রূযী নাযিল করে থাকেন। নিশ্চয়ই তিনি বান্দাদের সব খবর রাখেন ও সবকিছু দেখেন’ (শূরা ৪২/২৭)

প্রাপ্ত রিযিকে আল্লাহর উপর তুষ্ট থাকা : জীবনে প্রকৃত সুখের দেখা পেতে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে হলে তাঁর নির্ধারিত বণ্টনের ওপর আপনাকে সন্তুষ্ট থাকতে হবে। নিজেকে সেই অন্তহীন প্রতিযোগিতার বৃত্ত থেকে বের করে আনুন, যার শেষ গন্তব্য কেবল ক্লান্তি। কারণ দিনশেষে আপনার ভাগ্যে ঠিক ততটুকুই জুটবে, যতটুকু আপনার তাক্বদীরে লেখা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘হে আবু হুরায়রা! তুমি পরহেজগার হও, তাহ’লে তুমি মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ইবাদতকারী হ’তে পারবে। আর আল্লাহ তোমার জন্য যা ভাগ করে দিয়েছেন তাতে সন্তুষ্ট থাকো, তবেই তুমি হবে পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধ ও অভাবহীন মানুষ। নিজের এবং পরিবারের জন্য যা পসন্দ করো, অন্য মুসলিম ও মুমিনদের জন্যও তা-ই পসন্দ করো এবং নিজের জন্য যা অপসন্দ করো, তাদের জন্যও তা অপসন্দ করো, তবেই তুমি প্রকৃত মুমিন হ’তে পারবে’।[14]

এই নশ্বর পৃথিবী মহান আল্লাহ তাকেও দেন যাকে তিনি ভালোবাসেন, আবার তাকেও দেন যাকে তিনি ঘৃণা করেন। তিনি কারুন ও ফেরাউনকে অঢেল সম্পদ দিয়েছিলেন, অথচ তাদের তিনি পছন্দ করতেন না। আবার তিনি হযরত সুলায়মান (আঃ), ওছমান (রাঃ) এবং আব্দুর রহমান বিন আউফ (রাঃ)-কে প্রাচুর্য দিয়েছিলেন, যাঁদের তিনি অত্যন্ত ভালোবাসতেন। সুতরাং সম্পদ থাকা মানেই আল্লাহর প্রিয় হওয়া নয়।

অনেক সময় দেখা যায়, একজন মানুষ আল্লাহর নাফরমানী করছে। তবুও তার জীবনে সুখ-সম্পদের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। একে আল্লাহর দয়া মনে করে বিভ্রান্ত হবেন না। এটি মূলত ইস্তিদরাজ বা ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে টেনে নেওয়ার একটি কৌশল। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, তুমি যখন দেখবে যে, কোনো বান্দা পাপাচার করা সত্ত্বেও আল্লাহ তাকে তার পসন্দমতো দুনিয়াবী নে‘মত দিয়েই যাচ্ছেন, তবে বুঝে নিবে যে, তা কেবল তাকে ফাঁদে ফেলার জন্য। অতঃপর রাসূল (ছাঃ) কুরআনের এই আয়াতটি তেলাওয়াত করেন,فَلَمَّا نَسُوا مَا ذُكِّرُوا بِهِ فَتَحْنَا عَلَيْهِمْ أَبْوَابَ كُلِّ شَيْءٍ حَتَّى إِذَا فَرِحُوا بِمَا أُوتُوا أَخَذْنَاهُمْ بَغْتَةً فَإِذَا هُمْ مُبْلِسُونَ- ‘অতঃপর যখন তারা ঐসব উপদেশ ভুলে গেল যা তাদের দেওয়া হয়েছিল, তখন আমরা তাদের জন্য প্রত্যেক বস্ত্তর (প্রবৃদ্ধির) দুয়ার সমূহ খুলে দিলাম। এভাবে তারা যখন নে‘মত সমূহ পেয়ে খুশীতে মত্ত হয়ে গেল, তখন তাদেরকে আমরা হঠাৎ পাকড়াও করলাম। ফলে তারা হতাশ হয়ে পড়ল’ (আন‘আম ৬/৪৪)[15]

রিযিক অন্বেষণের মূলমন্ত্র : ইসলাম আমাদের শেখায় কেবল হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়, বরং সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করা এবং ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা। এটিই হ’ল রিযিক অন্বেষণের মূলমন্ত্র। মহান আল্লাহ এই পৃথিবীকে আমাদের জন্য চলার উপযোগী ও অনুগত করে দিয়েছেন। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন,هُوَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ ذَلُولًا فَامْشُوا فِي مَنَاكِبِهَا وَكُلُوا مِنْ رِزْقِهِ وَإِلَيْهِ النُّشُورُ- ‘তিনিই তো পৃথিবীকে তোমাদের জন্য অনুগত করে দিয়েছেন। অতঃপর তোমরা তার দিকে দিকে বিচরণ কর এবং আল্লাহর দেওয়া রিযিক ভক্ষণ করে থাক। আর তাঁর দিকেই হবে তোমাদের পুনরুত্থান’ (মুলক ৬৭/১৫)। অর্থাৎ ঘরে বসে অলস সময় পার করা নয়। বরং রিযিক খুঁজতে যমীনে ছড়িয়ে পড়াই আল্লাহর নির্দেশ।

চেষ্টার সাথে তাওয়াক্কুলের সমন্বয় রয়েছে। এজন্য একজন মুসলিমের কর্তব্য হ’ল পুরো শক্তি দিয়ে চেষ্টা করা, আল্লাহর ওপর উত্তম ভরসা রাখা এবং তাঁর করুণার প্রতীক্ষায় থাকা। তবে মনে রাখতে হবে, আমাদের এই প্রচেষ্টা বা উপায়গুলো নিজে থেকে ফলাফল দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। কখনো একই প্রচেষ্টায় কেউ সফল হয়, আবার কেউ হয় না। কারণ মূল ক্ষমতার উৎস কেবল আল্লাহ। যদি তাওয়াক্কুল বা ভরসা সঠিক হয়, তবে আল্লাহ অলৌকিকভাবেও পথ খুলে দেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহর ওপর সঠিক ও যথাযথভাবে ভরসা করতে, তবে আল্লাহ তোমাদের ঠিক সেভাবেই রিযিক দিতেন, যেভাবে তিনি পাখিদের রিযিক দেন। যারা সকালে খালি পেটে বাসা থেকে বের হয় এবং দিনশেষে ভরা পেটে নীড়ে ফিরে আসে’। [16]

ইসলামে হালাল রিযিক অন্বেষণের জন্য শ্রম দেওয়া কেবল একটি প্রয়োজন নয়। বরং এটি নবীগণের সুন্নাত। ইবনু আববাস (রাঃ) ও অন্যান্য বর্ণনা থেকে নবীগণের পেশা সম্পর্কে যা জানা যায়, হযরত আদম (আঃ) ছিলেন একজন কৃষক। হযরত নূহ (আঃ) ছিলেন কাঠমিস্ত্রি (তক্ষক)। হযরত ইদ্রিস (আঃ) ছিলেন দর্জি। হযরত ছালেহ (আঃ) ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। হযরত দাউদ (আঃ) ছিলেন বর্ম নির্মাতা। হযরত সুলায়মান (আঃ) বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি হওয়া সত্ত্বেও নিজের হাতে ঝুড়ি তৈরি করতেন এবং তা বিক্রয় করে জীবিকা নির্বাহ করতেন; তিনি বায়তুল মাল (রাষ্ট্রীয় কোষাগার) থেকে নিজের প্রয়োজনে কিছু গ্রহণ করতেন না। হযরত মূসা, শো‘আয়েব ও মুহাম্মাদ (ছাঃ) ছিলেন মেষপালক’।[17]

রিযিক বৃদ্ধির অপ্রকাশ্য মাধ্যমসমূহ

রিযিক অন্বেষণে কেবল বাহ্যিক পরিশ্রমই যথেষ্ট নয়। বরং কিছু ইবাদত ও আমল রয়েছে, যা রিযিক প্রাপ্তিতে অভাবনীয় বরকত নিয়ে আসে। তার মধ্যে অন্যতম হ’ল।- 

(১) ইস্তিগফার : ইস্তিগফার হ’ল সেই জাদুকরী চাবিকাঠি, যা বন্ধ দরজাকে খুলে দেয়। যখন আপনি আল্লাহর কাছে নিজের ভুল স্বীকার করে লজ্জিত হন, তখন তিনি কেবল আপনার আত্মাকেই পবিত্র করেন না। বরং এটি আসমানী রিযিকের দরজা খুলে দেয়। মহান আল্লাহ বিভিন্ন নবীর যবানে এই সত্যটি ব্যক্ত করেছেন। যেমন হযরত হূদ (আঃ) তাঁর কওমকে বলেছিলেন,وَيَاقَوْمِ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا وَيَزِدْكُمْ قُوَّةً إِلَى قُوَّتِكُمْ، ‘আর হে আমার জাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। অতঃপর তাঁরই দিকে ফিরে এস (তওবা কর)। তিনি তোমাদের উপর প্রচুর বারিধারা বর্ষণ করবেন এবং তোমাদেরকে শক্তির উপর শক্তি বৃদ্ধি করে দিবেন’ (হূদ-মাক্কী ১১/৫২)

আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে নূহ (আঃ)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন,فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا- يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا- وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَلْ لَكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَلْ لَكُمْ أَنْهَارًا- ‘অতঃপর আমি তাদের বলেছি, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই তিনি অতীব ক্ষমাশীল’। ‘তিনি তোমাদের উপর মুষলধারে বারি বর্ষণকারী মেঘমালা প্রেরণ করবেন’। ‘তিনি তোমাদের সম্পদ ও সন্তানাদি বৃদ্ধি করে দিবেন এবং তোমাদের জন্য বাগিচাসমূহ সৃষ্টি করবেন ও নদীসমূহ প্রবাহিত করবেন’ (নূহ ৭১/১০-১২)

রিযিকের মালিক যখন আপনার ওপর খুশি হন, তখন আপনার অল্প পরিশ্রমেও এমন বরকত হবে যা পাহাড়সম উপার্জনেও সম্ভব নয়। তাই প্রতিদিনের কর্মব্যস্ততার মাঝে আপনার জিহবাকে ইস্তিগফার দ্বারা সজীব রাখুন। এটি আপনার মনকে হালকা করবে এবং আপনার সংসারে প্রশান্তির ধারা প্রবাহিত করবে।

(২) আল্লাহর পথে ব্যয় : দান কেবল আপনার সম্পদ বাড়ায় না, এটি আপনার বিপদ দূর করে এবং আপনার উপার্জনে এমন বরকত নিয়ে আসে, যা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। মুষ্টিবদ্ধ হাতে রিযিক আসে না। হাত যখন অন্যের জন্য উন্মুক্ত হয়, তখনই আল্লাহর রহমত সেই হাতে বর্ষিত হয়। পার্থিব অংকের হিসাবে মনে হ’তে পারে, সম্পদ দান করলে তা কমে যায়। কিন্তু ঈমানের গণিতে দান হ’ল সম্পদ বৃদ্ধির সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। আধ্যাত্মিক রিযিক লাভের ক্ষেত্রে এটি এক অনন্য চাবিকাঠি।

মহান আল্লাহ রিযিক বণ্টনের দায়িত্ব নিজের হাতে রেখে আমাদের আশ্বস্ত করেছেন যে, তাঁর পথে খরচ করলে তিনি এর পূর্ণ বিনিময় দান করবেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,قُلْ إِنَّ رَبِّي يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَيَقْدِرُ لَهُ وَمَا أَنْفَقْتُمْ مِنْ شَيْءٍ فَهُوَ يُخْلِفُهُ وَهُوَ خَيْرُ الرَّازِقِينَ- ‘তুমি বল, আমার প্রতিপালক তার বান্দাদের মধ্যে যাকে চান রূযী প্রশস্ত করেন ও সংকুচিত করেন। আর তোমরা যা কিছু (তাঁর পথে) ব্যয় করবে, তিনি তার প্রতিদান দিবেন। আর তিনিই শ্রেষ্ঠ রূযীদাতা’ (সাবা ৪৩/৩৯)

দানকে আল্লাহ তা‘আলা একটি শস্যদানার সাথে তুলনা করেছেন, যা থেকে অগণিত ফলন পাওয়া যায়। আল্লাহ বলেন,مَثَلُ الَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنْبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ سُنْبُلَةٍ مِائَةُ حَبَّةٍ وَاللهُ يُضَاعِفُ لِمَنْ يَشَاءُ وَاللهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ- ‘যারা আল্লাহর পথে নিজেদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উপমা একটি শস্য বীজের ন্যায়। যা থেকে সাতটি শিষ জন্ম নেয়। প্রতিটি শিষে একশ’টি দানা হয়। আর আল্লাহ যাকে চান বহুগুণ বৃদ্ধি করে দেন। বস্ত্তত আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও সর্বজ্ঞ’ (বাক্বারাহ ২/২৬১)

এছাড়াও দান করলে ফেরেশতাদের দো‘আ ও বদ্দো‘আ পাওয়া যায়। আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, প্রতিদিন সকালে দু’জন ফেরেশতা অবতরণ করেন। তাদের একজন দো‘আ করে বলেন, হে আল্লাহ! দানকারীকে আপনি উত্তম বিনিময় দান করুন। আর অন্যজন (কৃপণ ব্যক্তির জন্য) বদ্দো‘আ করে বলেন, হে আল্লাহ! সম্পদ যে আঁকড়ে ধরে রাখে (দান করে না), তার সম্পদ ধ্বংস করে দিন’।[18]

দানের এক অলৌকিক ঘটনা : আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, এক ব্যক্তি জন-মানবহীন এক মরুপ্রান্তর দিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ সে মেঘের গর্জনের মাঝে একটি কণ্ঠস্বর শুনতে পেল। কেউ বলছে, অমুকের বাগানে পানি দাও’। মুহূর্তের মধ্যে সেই মেঘ একখন্ড পাথুরে ভূমির উপর গিয়ে সবটুকু পানি বর্ষণ করল। সেই পানির স্রোত একটি নালা দিয়ে প্রবাহিত হ’তে শুরু করল। কৌতূহলী পথচারী পানির স্রোত অনুসরণ করে চলল। কিছুদূর গিয়ে সে দেখল, এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে কোদাল দিয়ে তার বাগানে পানি সেঁচছে। পথচারী তাকে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর বান্দা! আপনার নাম কী? লোকটি সেই নামই বলল, যে নামটি সে মেঘের গর্জনের ভেতর শুনেছিল। বাগানের মালিক জিজ্ঞেস করল, আপনি কেন আমার নাম জিজ্ঞেস করছেন? পথচারী উত্তর দিল, আমি এইমাত্র যে মেঘ থেকে পানি পড়ল, তার ভেতর থেকে আপনার নাম ধরে কাউকে বলতে শুনেছি, অমুকের বাগানে পানি দাও। আপনি এই বাগান নিয়ে এমন কী কাজ করেন? বাগানের মালিক উত্তর দিল, এই বাগান থেকে যা ফসল উৎপাদিত হয়, আমি তাকে তিন ভাগে ভাগ করি। এক ভাগ আমি নিজের ও আমার পরিবারের জন্য রাখি। এক ভাগ (বীজ ও খরচ হিসাবে) পুনরায় এই বাগানেই বিনিয়োগ করি। আর বাকি এক ভাগ আমি মিসকীন, প্রার্থী এবং মুসাফিরদের জন্য (ছাদাক্বা হিসাবে) বিলিয়ে দিই’।[19] 

(৩) আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করা : আমাদের যান্ত্রিক জীবনে আমরা অনেক সময়ই আপনজনদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। কিন্তু ইসলামী জীবনদর্শনে আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা কেবল একটি সামাজিক শিষ্টাচার নয়, বরং এটি রিযিক বৃদ্ধি এবং জীবনে বরকত লাভের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। আনাস বিন মালেক (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি এটি কামনা করে যে, তার রিযিক প্রশস্ত হোক এবং তার আয়ু বৃদ্ধি পাক, সে যেন অবশ্যই তার আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখে’।[20]

আমরা রিযিক বাড়াতে কতই না কৌশল অবলম্বন করি, অতিরিক্ত পরিশ্রম করি। কিন্তু রিযিকের মালিক আমাদের এক সহজ ও প্রেমময় পথের কথা বলে দিয়েছেন। যখন আপনি আপনার কোনো আত্মীয়ের বিপদে পাশে দাঁড়ান, তাদের খোঁজখবর নেন কিংবা সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের সহায়তা করেন, তখন আসমানের মালিক আপনার রিযিকের প্রবাহকে বাড়িয়ে দেন।

(৪) তাক্বওয়া অবলম্বন করা : কেউ আপনার রিযিক কেড়ে নিতে পারে, সমাজ আপনাকে কোণঠাসা করতে পারে, কিন্তু আপনি যদি মুত্তাক্বী হন, তবে আসমানের মালিক আপনার জন্য সেই মরুপ্রান্তরের মাঝেও রিযিকের ঝরনাধারা প্রবাহিত করতে পারেন। আপনার বুদ্ধির সীমানা যেখানে শেষ হয়, আল্লাহর কুদরতি রিযিকের সীমানা সেখান থেকেই শুরু হয়। তাই রিযিক অন্বেষণের পথে মুমিনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হ’ল ‘তাক্বওয়া’ বা মহান আল্লাহকে ভয় করে চলা। গোপনে কিংবা প্রকাশ্যে, সর্বাবস্থায় আল্লাহর বিধান মেনে চলাই হ’ল তাক্বওয়া। আর যে ব্যক্তি নিজের জীবনকে তাক্বওয়ার নূরে আলোকিত করে, আল্লাহ তার জন্য রিযিকের এমন সব দরজা খুলে দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না। আল্লাহ বলেন, وَمَنْ يَتَّقِ اللهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا- وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللهِ فَهُوَ حَسْبُهُ، ‘যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উপায় বের করে দেন’। ‘আর তিনি তাকে তার ধারণাতীত উৎস থেকে রিযিক প্রদান করে থাকেন। বস্ত্তত যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে, তিনি তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান’ (তালাক ৬৫/২-৩)

(৫) নিয়মিত ছালাতের হেফাযত করা : আমরা রিযিকের জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরি, কিন্তু যিনি রিযিকদাতা তাঁর সামনে মাথা নত করতে অলসতা করি। অথচ ছালাত হ’ল এমন এক ইবাদত, যা কেবল আত্মার শান্তিই দেয় না, বরং অভাবমুক্ত জীবনের নিশ্চয়তাও প্রদান করে। মহান আল্লাহ যখন তাঁর বান্দাকে ছালাতের নির্দেশ দেন, তখন তিনি তার রিযিকের দায়িত্বও গ্রহণ করেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা ঘোষণা করেছেন,وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا لَا نَسْأَلُكَ رِزْقًا نَحْنُ نَرْزُقُكَ وَالْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوَى- ‘আর তুমি তোমার পরিবারকে ছালাতের আদেশ দাও এবং তুমি এর উপর অবিচল থাক। আমরা তোমার নিকট রূযী চাই না। আমরাই তোমাকে রূযী দিয়ে থাকি। আর (জান্নাতের) শুভ পরিণাম তো কেবল মুত্তাক্বীদের জন্যই নির্ধারিত’ (ত্বোয়াহা ২০/১৩২)

ওমর (রাঃ)-এর আমল ও এক অনন্য শিক্ষা : আমীরুল মুমিনীন হযরত ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ)-এর জীবন ছিল এই আয়াতের এক মূর্ত প্রতীক। তিনি রাতের শেষ প্রহর পর্যন্ত গভীর ইবাদতে নিমগ্ন থাকতেন। যখন ফজরের সময় ঘনিয়ে আসত, তখন তিনি পরিবারের সদস্যদের ছালাতের জন্য জাগিয়ে দিতেন এবং বলতেন, আছ-ছালাত, আছ-ছালাত। এরপর তিনি উপরের এই আয়াতটি (ত্বোয়াহা ২০/ ১৩২) তেলাওয়াত করতেন’।[21]

যখন আল্লাহ দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা দিচ্ছেন, ‘আমরা তোমার নিকট রূযী চাই না। আমরাই তোমাকে রূযী দিয়ে থাকি’ তখন এর চেয়ে বড় গ্যারান্টি আর কী হ’তে পারে? আপনার কপালে ভাজ পড়া দুশ্চিন্তার চেয়ে সিজদাহর জায়নামাযে ঝরে পড়া অশ্রুর দাম আল্লাহর কাছে অনেক বেশি। ছালাতের মাধ্যমে আপনি সরাসরি রিযিকের মালিকের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলুন। তিনি সবকিছু সমাধান করে দিবেন ইনশাআল্লাহ।

উপসংহার : আমাদের অপ্রাপ্তিগুলো অনেক সময় আমাদের জন্য এক অদৃশ্য রহমত। হয়তো আপনি যে সম্পদ আজ দুহাত ভরে চাইছেন, তা পেলে আপনি অহংকারী হয়ে পড়তেন কিংবা সীরাতে মুস্তাকিম থেকে বিচ্যুত হয়ে যেতেন। আবার হয়তো দারিদ্রতা আপনাকে আল্লাহর কাছাকাছি রাখছে। যা অগাধ সম্পদ থাকলে সম্ভব হ’ত না। আপনি বর্তমানে যে অবস্থায় আছেন, বিশ্বাস রাখুন, বিশ্বজাহানের মালিক আপনার জন্য ঠিক সে অবস্থাটিকেই এই মুহূর্তের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত মনে করেছেন। আমরা কেবল বর্তমানটুকুই দেখি, কিন্তু আল্লাহ দেখেন আমাদের ভবিষ্যৎ এবং আমাদের আত্মার সামর্থ্য। তাই অন্যের সম্পদের দিকে তাকিয়ে নিজের জীবনকে বিষিয়ে তুলবেন না। বরং আপনার হাতে যা আছে তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন এবং যা নেই তার জন্য আল্লাহর প্রজ্ঞার ওপর ভরসা রাখুন। নিশ্চয়ই হালাল রিযিকই আমাদের জীবনে দুনিয়াবী কল্যাণ ও পরকালীন আলোকবর্তিকা হবে। আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন।- আমীন!

-মামূন বিন হাসমত

[সহ-সভাপতি, কুষ্টিয়া পশ্চিম সাংগঠনিক, বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ ও এমফিল গবেষক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া]

 

[1]. মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ, ইত্তিকাউল হারাম ওয়াশ শুবুহাত ফী তালাবির রিযক, (রিয়াদ : দারু কুনুয ইশবিলিয়া, ১ম সংস্করণ ২০০ ৯ খৃ.), পৃ. ১১।

[2]. তিরমিযী হা/১৭২৬; ইবনু মাজাহ হা/৩৩৬৭; মিশকাত হা/৪২২৮।

[3]. লিসানুল আরব, ১০/১১৫ পৃ.।

[4]. আবু নু‘আইম, হিলইয়াতুল আওলিয়া ৭/৫২ পৃ.।

[5]. তাফসীর কুরতুবী ২/২০৭ পৃ.।

[6]. ইবনুল মুবারক, আল-জুহদ ২০৩ পৃ.।

[7]. ইমাম গাযালী, ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন ২/৯১ পৃ.।

[8]. বুখারী হা/৬৫৯৪; মুসলিম হা/২৬৪৩; মিশকাত হা/৮২।

[9]. মুসলিম হা/২৬৫৩; মিশকাত হা/৭৯।

[10]. বায়হাক্বী, শো‘আবুল ঈমান, হা/৯৮৯১; মিশকাত হা/৫৩০০; ছহীহুল জামে হা/২০৮৫।

[11]. হিলইয়া, মিশকাত হা/৫৩১২; ছহীহুত তারগীব হা/১৭০৩।

[12]. বায়হাক্বী, শো‘আবুল ঈমান, হা/৯৮৯১; মিশকাত হা/৫৩০০; ছহীহুল জামে হা/২০৮৫; শেষাংশ।

[13]. বুখারী হা/৮৪৪; মুসলিম হা/৫৯৩; মিশকাত হা/৯৬২।

[14]. ইবনু মাজাহ হা/৪২১৭; ছহীহুল জামে‘ হা/৪৫৮০।

[15]. আহমাদ হা/১৭৩৪৯; মিশকাত হা/৫২০১; ছহীহাহ হা/৪১৩।

[16]. তিরমিযী হা/২৩৪৪; ইবনু মাজাহ হা/৪১৬৪; মিশকাত হা/৫২৯৯।

[17]. তাফসীর রুহুল বায়ান, ১/১০০ পৃ.।

[18]. বুখারী হা/১৪৪২; মুসলিম হা/১০১০; মিশকাত হা/১৮৬০।

[19]. মুসলিম হা/২৯৮৪; মিশকাত হা/১৮৭৭।

[20]. বুখারী হা/২০৬৭; মুসলিম হা/২৫৫৭; মিশকাত হা/৪৯১৮।

[21]. মুওয়াত্ত্বা মালেক হা/৫; মিশকাত হা/২০৪০ সনদ ছহীহ, রাবী আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ); তাফসীর ইবনু কাছীর ৫/৩২৭।



বিষয়সমূহ: হালাল-হারাম
আরও