ইসমাঈলী শী‘আদের ভ্রান্ত আক্বীদা-বিশ্বাস (শেষ কিস্তি)
মুখতারুল ইসলাম
কামাল হোসাইন 411 বার পঠিত
ভূমিকা : হতাশা বর্তমান যুবসমাজের এক গভীর ও জটিল বাস্তবতা। মানুষ নানা প্রতিকূলতা, অনিশ্চয়তা ও অপূর্ণ চাহিদার কারণে ক্রমশ মানসিক চাপের শিকার হচ্ছে। শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থান, সামাজিক চাপ থেকে পারিবারিক দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক অস্থিরতা থেকে প্রযুক্তির অপব্যবহার সবকিছু মিলেই হতাশার বিস্তার ঘটাচ্ছে। বাইরে থেকে হাসি-খুশি মনে হলেও ভেতরে ভেতরে তারা ভেঙে পড়ে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম যখন তাদের স্বপ্ন ভঙ্গ হ’তে দেখে, যখন তারা প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত ফল পায় না, তখন মনের ভেতর জমে ওঠা বেদনা ও অস্থিরতা হতাশায় রূপ নেয়। এ হতাশা শুধু ব্যক্তিকে ভেঙে দেয় না বরং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সুতরাং হতাশা শুধু মানসিক যন্ত্রণা নয়; বরং এটি বিশ্বাসকে দুর্বল করে, আল্লাহর রহমতের উপর আস্থা কমিয়ে দেয় এবং জীবনের প্রতিটি উদ্যম, পরিশ্রম আর ভবিষ্যতের আলোকিত স্বপ্নগুলোকে ধীরে ধীরে পুড়িয়ে ফেলে। আলোচ্য প্রবন্ধে যুবসমাজে হতাশার কারণ ও তা থেকে উত্তরণের উপায় সম্পর্কে জানব ইনশাআল্লাহ!
হতাশার কারণ সমূহ
১. ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা ও ভয় : যুবক বয়স এমন এক সময়, যখন স্বপ্ন আর আশা দিয়ে তার জীবন সাজাতে চায়। কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় সেই স্বপ্নকে ভেঙে দেয়। অনেক যুবক পড়াশোনায় পরিশ্রম করেও কাংখিত চাকরির জন্য বছরের পর বছর চেষ্টা করে, কিন্তু সফল হ’তে পারে না। কেউ ব্যবসা শুরু করে ব্যর্থ হয়। আবার কেউ দারিদ্র বা পারিবারিক সংকটের কারণে পড়াশোনা শেষ করতেই পারে না। এমন পরিস্থিতিতে তার অন্তরে ভয় জন্মায়। চারপাশের সমাজ যখন তাকে বারবার তুলনা করে, তখন সেই তুলনা তার হৃদয়কে ক্ষত-বিক্ষত করে দেয়। ক্যারিয়ারের এই অনিশ্চয়তা তাকে গভীর মানসিক চাপে ফেলে। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় যোগ দিলেও অন্তরের ভেতর থেকে এক তীব্র শূন্যতা তাকে তাড়া করে। ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা আর ক্যারিয়ারের দুশ্চিন্তা এভাবেই অনেক যুবকের হতাশার বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিদিন নতুন করে চেষ্টা করার আগ্রহ কমে যায়, পরিশ্রমের শক্তি নিঃশেষ হয়ে আসে এবং সে জীবনের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে। এমন কি দেশের সবের্বাচ বিদ্যাপিঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও এমন পরিস্থিতিতে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে’।[1]
২. দারিদ্র ও অর্থকষ্ট : দারিদ্র যুবকের জীবনে এক ভয়াবহ বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। শৈশব থেকেই সংসারের অভাব যদি তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তাহ’লে বড় হ’তে হ’তে সেটি তার আত্মাকে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলে। পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়ার কথা থাকলেও, সে টিউশনি বা ছোটখাটো কাজ করে সংসারে সাহায্য করার চেষ্টা করে। তবুও পরিবারের চাহিদা পূরণ হয় না। আরো ভয়াবহ অবস্থা হয়, যখন বেকারত্ব তার সাথে যুক্ত হয়। সে দেখে, চারপাশের সমবয়সীরা চাকরি করছে, সংসার চালাচ্ছে, কেউ কেউ বিদেশে গিয়ে টাকা পাঠাচ্ছে। অথচ সে এখনো পরিবারকে আর্থিকভাবে কিছুই দিতে পারছে না। এটি একজন যুবকের আত্মবিশ্বাস কেড়ে নেয়, তার হৃদয়ে হতাশার বিষ ঢুকিয়ে দেয়, কখনও বা অর্থকষ্টের আত্মহত্যার বেছে নিছে।[2]
৩. রোগ-ব্যাধি ও মানসিক অসুস্থতা : যুবক বয়স মানেই উদ্যম, শক্তি আর স্বপ্নে ভরা সময়। এ বয়সে মানুষ পাহাড় ভাঙার মতো সাহস অনুভব করে। কিন্তু যখন কোনো যুবক দীর্ঘস্থায়ী রোগ-ব্যাধিতে ভোগে, তখন সেই শক্তি আর উদ্যম মুহূর্তেই নিভে যায়। শরীরের কষ্ট তার মনকে ভেঙে দেয়, জীবনের প্রতি ভালোবাসা কমিয়ে দেয়। এছাড়াও কিছু যুবক মানসিক অসুস্থতার শিকার হয়। দীর্ঘদিনের ডিপ্রেশন, উদ্বেগ বা ভয় তাদের মনে অন্ধকার ঘনিয়ে আনে। ধীরে ধীরে তাদের ভেতরের আলো নিভে যায়।
৪. প্রিয়জন হারানো বা বিচ্ছেদ : যুবকের জীবনে সবচেয়ে বড় ভরসা হ’ল তার আপনজন। তাদের সাথে ভাগ করা প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি কথা, প্রতিটি হাসি সবকিছু জীবনের শক্তি হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু হঠাৎ সেই আপনজন দূরে চলে গেলে বা চিরতরে হারিয়ে গেলে, পুরো পৃথিবী যেন অন্ধকার হয়ে যায়। হঠাৎ করেই নীরবতা নেমে আসে। যেখানে প্রতিদিন হাসি-আনন্দে ভরে থাকত, সেখানে এখন শূন্যতা। যেখানে নিয়মিত খোঁজ নেওয়া হ’ত, সেখানে নীরবতা। সেই চিরচেনা কণ্ঠ আর শোনা যায় না, দরজায় কেউ অপেক্ষা করে না। আর কারো সাথে মনের কষ্টগুলো ভাগ করার সুযোগও থাকে না।
শুধু প্রিয়জন হারানো নয়, বিচ্ছেদও একইভাবে কষ্ট দেয়। এই শূন্যতা, একাকীত্ব আর পরিত্যক্ত হওয়ার অনুভূতি যুবকের মনে হতাশার গভীর ক্ষত তৈরি করে। ধীরে ধীরে সে বিশ্বাস করতে শুরু করে, তার সমস্ত স্বপ্ন, সমস্ত আশা ভেঙে চূর্ণ হয়ে গেছে।
৫. সামাজিক অবহেলা ও অপমান : যুবকের জীবনে সমাজ একটি বড় জায়গা দখল করে থাকে। সে চায় মানুষ তাকে সম্মান দিক, তার পরিচয় মূল্যবান হৌক। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় শুধু বন্ধু বা আত্মীয় নয়, সে সমাজ থেকে কেবল অবহেলা আর অপমানই পায়। কখনও তার পোশাক, চেহারা বা পারিবারিক অবস্থা নিয়ে হাসাহাসি করে। কখনও বা তার দারিদ্র, কখনও বেকারত্ব, কখনও ব্যর্থতা এসব নিয়ে তাকে হেয় করা হয়। এই অপমানের বোঝা বহন করা তার জন্য অসহ্য হয়ে ওঠে। তাই শুধু সামাজিক অবহেলা ও অপমান বাইরের মানুষের আচরণ নয়, বরং যুবকের অন্তরের ভেতর আশা ও স্বপ্নগুলোকে ধ্বংস করার এক নীরব আগুন। এই অবহেলা তার অন্তরে এক ভয়ংকর হতাশার জন্ম দেয়।
৬. সম্পর্কের টানাপোড়েন : মানুষ যতই স্বপ্ন দেখুক, যতই পরিকল্পনা করুক শান্তি খুঁজে সে প্রথমে পরিবারে, আপন সম্পর্কের ভেতরেই। বিশেষ করে একজন যুবকের জীবনে পরিবার, ঘর, প্রিয়জন এসবই তার শক্তি ও আশ্রয়। কিন্তু যখন সেই সম্পর্কগুলোতে ভাঙন ধরে, তখন তার পৃথিবীটা যেন একেবারে অচেনা হয়ে যায়। আবার কোনো যুবকের ক্ষেত্রে পিতা-পুত্রের দ্বন্দ্ব, ভাই-ভাইয়ের দ্বন্দ্ব ঘরকে নরক বানিয়ে দেয়। উত্তরাধিকার, টাকার হিসাব, কিংবা ছোটখাটো বিষয় নিয়ে অনবরত দ্বন্দ্ব চলে। সে যুবক মনে করে, আমার আপনজনই আমার শত্রু হয়ে গেল। আমি কোথায় যাব? এই তিক্ততা তার হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করে।
এছাড়াও দাম্পত্য জীবনের টানাপোড়েনও যুবকের জন্য এক ভয়াবহ হতাশার কারণ। হয়তো সে নতুন সংসার শুরু করেছে অনেক স্বপ্ন। নিয়ে, কিন্তু প্রতিদিন স্বামী-স্ত্রীর কলহ তার আশা ধূলিসাৎ করে দেয়। এসব যুবকের ভেতর এক গভীর দুঃখ জমা করে। তখন সে ভাবে, আমি তো নিজের ঘরেও শান্তি পেলাম না। এই জীবন নিয়ে এগোবো কিভাবে? এই সম্পর্কের টানাপোড়েন ধীরে ধীরে যুবকের অন্তরকে ভেঙে দেয়। যেখানে সে ভালোবাসা, সমর্থন আর নিরাপত্তা আশা করেছিল, সেখানে সে পেল কেবল কষ্ট, বেদনা আর অস্থিরতা। তখন তার মনে হয় পৃথিবীর কোথাও আর আশ্রয় নেই। এই অনুভূতি থেকেই জন্ম নেয় গভীর হতাশা।
৭. লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থতা : যুবক বয়স মানেই স্বপ্ন দেখার সময়। প্রতিটি যুবকের মনে থাকে বড় স্বপ্ন ভালো ফল করা, কাঙ্ক্ষিত চাকরি পাওয়া, ব্যবসায় সাফল্য, কিংবা সমাজে কোনো গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা। যখন বারবার চেষ্টা করা সত্ত্বেও সে ব্যর্থ হয় তখন হতাশার ঘন অন্ধকার তার মন দখল করে নেয়। সে সময়ের সাথে সাথে আত্মসম্মান হারাতে থাকে, নিজের দক্ষতা নিয়ে সন্দিহান হয়, এবং মনে করে আমি সত্যিই কোনো কাজে লাগার মানুষ নই। এই ভাবনা তার মনকে গভীর হতাশার জালে আটকে দেয়। প্রতিদিনের অনুশীলন বা পরিশ্রম তার কাছে অর্থহীন মনে হয়। সে মনে করতে থাকে, আমার চেষ্টা তো বৃথা, আমার সব স্বপ্ন শেষ। পড়াশোনা, পরীক্ষা, কর্মজীবনের প্রতিটি ব্যর্থতা তার হৃদয়ে কষ্টের ছাপ ফেলে। লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থতা শুধু ফলাফল না পাওয়াকে বোঝায় না; এটি যুবকের আত্মবিশ্বাস, মনোবল এবং জীবনের প্রতি আস্থা ক্ষয় করে। প্রতিটি ব্যর্থতার সঙ্গে তার হতাশা বেড়ে যায়।
৮. একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতা : যুবকের জীবনে সম্পর্ক আর যোগাযোগের গুরুত্ব অপরিসীম। বন্ধু, পরিবার, সহকর্মী তাদের সাথে সংযোগই তার শক্তি। কিন্তু অনেক সময় যুবক মনে করে, সে একা, তাকে কেউ বোঝে না, বা সে কাউকে বোঝাতে পারছে না। এই একাকীত্ব ধীরে ধীরে হতাশার অদৃশ্য আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এ একাকীত্ব কেবল নিঃসঙ্গতার অনুভূতি নয়, বরং তা যুবকের আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাসকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সে ধীরে ধীরে নিজেকে অবমূল্যায়ন করতে শুরু করে, মনে হয় আমার জীবনে আর কেউ মূল্য দিচ্ছে না। আমি একা, আমি তুচ্ছ। নিঃসঙ্গতা আর একাকীত্বের এই মিলন যুবকের মানসিক স্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলে। প্রতিদিনের ছোট্ট উদ্দীপনা, আনন্দ, স্বপ্ন এসব ধীরে ধীরে মলান হয়ে যায়। তার মনে অন্ধকার ভরে যায় এবং হতাশা তার হৃদয়কে ঘিরে ফেলে। এভাবেই নিঃসঙ্গতা গভীর হতাশার মূল কারণ হয়ে ওঠে। অর্থ সম্পদ নাগরিক সুযোগ সুবিধা থাকলেই যে সে সুখী তা ভাববার সুযোগ নেই, উন্নত বিশ্বে নিঃসঙ্গ, নানাবিধ হতাশায় খোয়া যাচ্ছে অনেকের জীবন, এ যেমন ধরা যাক জাপানের কথা, ২০২২ সালে নানাবিধ কারণে নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ৮৪৯১০ জন। এছাড়াও ২০২৪ সালে নিঃসঙ্গ অবস্থায় নিজ গৃহে মারা যায় ৪০ হাযার।[3]
৯. বারবার পাপে ডুবে যাওয়া : যুবক বয়স মানেই উৎসাহ, প্রলোভন এবং নফসের প্রভাব বেশি থাকে। অনেক যুবক সহজেই বন্ধুদের প্রভাব বা সমাজের প্রলোভনে পড়ে ছোট-বড় পাপে জড়িয়ে যায়। প্রতিদিনই মোবাইল বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে অশ্লীল বিষয় দেখছে, এক সময় প্রতিদিনের ভুলের কারণে নিজেকে অপরাধবোধে ডুবিয়ে দেয়। এই ভাবনা তার ঈমানকে দুর্বল করে, আল্লাহর দয়ার প্রতি আস্থা কমিয়ে দেয়। ফলে সে আত্মমর্যাদা হারায়, আত্মবিশ্বাস কমে যায়। বারবার পাপে ডুবে যাওয়া কেবল যুবকের শারীরিক বা মানসিক শান্তি নষ্ট করে না, বরং তার আধ্যাত্মিক অবস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই কারণটি যুবকের হতাশার এক প্রগাঢ় মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
১০. অতীতের ভুল ও পাপের ভার : কৈশোর ও তারুণ্যে অনেক যুবক নানা ভুলের মধ্যে পড়ে যায়। বয়সের উত্তেজনা, কৌতূহল আর বন্ধু-বান্ধবের প্রভাবে তারা অনেক সময় এমন কিছু করে ফেলে, যা পরে মনে করলে বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। কারও কিশোর বয়স কেটেছে আড্ডা, গান-বাজনা আর অযথা সময় নষ্টের মধ্যে। আবার কেউ ইন্টারনেট ও মোবাইলের নেশায় অশ্লীলতায় ডুবে গিয়েছে। কেউ গোপনে মাদক, গাঁজা বা সিগারেটের মতো অভ্যাসে জড়িয়ে পড়েছে। তখন এগুলোকে হালকা মনে হলেও সময়ের সাথে সাথে এগুলোর ক্ষত গভীরভাবে অনুভূত হয়। যুবক বয়সে যখন তার হৃদয় একটু নরম হয়, জীবনকে নিয়ে ভাবতে শুরু করে, তখন অতীতের ভুলগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ধীরে ধীরে মনে হয় আমি আর ভালো হ’ত পারব না। আমার জন্য ক্ষমার দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। আমি হয়তো চিরদিনের জন্য নষ্ট হয়ে গেছি। এই অপরাধবোধ তাকে গভীর হতাশায় ডুবিয়ে দেয়। সে যতই চেষ্টা করুক, অতীতের ভুল যেন এক অদৃশ্য শিকলের মতো তাকে টেনে ধরে। ফলে তার ভেতরে এক ধরনের মানসিক যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধ যত বাড়তে থাকে, ততই তার জীবনের আনন্দ, স্বাভাবিকতা ও শান্তি হারিয়ে যায়। এভাবে অতীতের ভুল ও পাপের ভার একজন যুবকের বর্তমানকে ছিনিয়ে নেয়।
১১. হিংসা ও ঈর্ষা : যুবকের জীবনে বন্ধুবান্ধব, সহপাঠী বা সহকর্মীদের সাফল্য দেখা খুবই সাধারণ বিষয়। কিন্তু অনেক সময় সেই সাফল্য দেখে যুবকের ভেতরে হিংসা ও ঈর্ষা জন্ম নেয়। এই নেগেটিভ অনুভূতিই তার মনে হতাশার আগুন জ্বালিয়ে দেয়। হিংসা ও ঈর্ষা ধীরে ধীরে যুবকের অন্তরের শান্তি কেড়ে নেয়। সে অন্যের সাফল্যকে উপভোগ করতে পারে না বরং বারবার নিজের ব্যর্থতার সঙ্গে তুলনা করে নিজেকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করে। রাত জেগে চিন্তা করতে করতে চোখের পানি ঝরায়, মন ভারাক্রান্ত হয়। এই মানসিক চাপ যুবকের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়। হিংসা ও ঈর্ষা শুধু অন্যের সুখকে বিরক্তি ভাবা নয়; এটি যুবকের নিজের জীবনের প্রতি আস্থা, আশা এবং সুখকে ধংস করে। এর ফলে যুবক এক অন্ধকারের মধ্যে ডুবে যায়, যেখানে সে ভবিষ্যতের কোনো সম্ভাবনাই দেখতে পায় না। ধীরে ধীরে এই অনুভূতি তাকে গভীর হতাশায় ঠেলে দেয়।
১২. ঘুমের অভাব ও ক্লান্তি : যুবকের জীবনে শারীরিক ও মানসিক শক্তি হ’ল তার দিনের কাজ, লক্ষ্য পূরণ এবং স্বপ্ন বাস্তবায়নের মূল শক্তি। কিন্তু আধুনিক জীবনযাত্রা, পড়াশোনা, কাজের চাপ বা প্রযুক্তি ব্যবহার তার ঘুমকে বিঘ্নিত করে। যখন পর্যাপ্ত ঘুম হয় না, তখন ক্লান্তি ধীরে ধীরে হতাশার আগুন জ্বালাতে শুরু করে। ধরুন একজন যুবক, কলেজ বা অফিসের কাজ শেষ করে রাত জেগে মোবাইলে সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় কাটাচ্ছে, পরের দিন সকালেই ক্লাস বা অফিসে উপস্থিত হ’তে হবে। ঘুম নেই, শরীর ভারাক্রান্ত, মন অস্থির। দিনের প্রথম মিনিট থেকেই সে হালকা চাপ অনুভব করতে থাকে। একসময় এই ক্লান্তি মানসিক ভারে পরিণত হয়। ঘুমের অভাব শুধু শারীরিক শক্তি কমায় না; এটি যুবকের ধৈর্য, মনোযোগ ও আত্মবিশ্বাসও কমিয়ে দেয়। সে ছোট ছোট ব্যর্থতা, দেরি, ভুল বা সমালোচনায় অতিরিক্ত চাপ অনুভব করতে থাকে। প্রতিদিনের ছোট ব্যর্থতাও তার মনে বড় অন্ধকার সৃষ্টি করে। একইভাবে, দীর্ঘসময় ক্লান্তি এবং বিশ্রামের অভাবের কারণে যুবক তার জীবনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়। সে ভাবতে শুরু করে আমি কি কখনো এগোতে পারব? এত ক্লান্তি আর চাপের মধ্যে আমি কি সফল হবো? এই অনুভূতি ধীরে ধীরে হতাশার গভীর জালে তাকে আটকে দেয়। ঘুমের অভাব এবং ক্লান্তি তাই শুধু শারীরিক সমস্যা নয়; এটি যুবকের মানসিক স্থিতি, উদ্যম ও আশা নষ্ট করে এবং তাকে ধীরে ধীরে হতাশার অন্ধকারে নিমজ্জিত করে।
১৩. সামাজিক মিডিয়ার কুপ্রভাব : সামাজিক মিডিয়া আজকের যুবকের জীবনকে ঘিরে ধরে। আজকের যুবকের জীবন সামাজিক মিডিয়ার সঙ্গে এত ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত যে এটি তার মানসিক ও আবেগিক স্থিতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। শুরুতে মনে হয় এটি শুধু বিনোদন, বন্ধুত্ব বা তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যম। কিন্তু ধীরে ধীরে সামাজিক মিডিয়া হতাশার এক অদৃশ্য জাল পোঁতা শুরু করে। ধরুন একজন যুবক সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মোবাইল স্ক্রল করছে ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক, টিকটক। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিন রাত কাটাতে কাটাতে তার পড়াশোনা, কাজ বা লক্ষ্য পূরণে সময় কমে যায়। এছাড়া, অনলাইন কেনাকাটা বা গেমের মাধ্যমে সুখ খুঁজে নেওয়া যুবককে স্বল্প সময়ের আনন্দ দেয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি মানসিক স্থিতি এবং সন্তুষ্টি বৃদ্ধি করে না। ফলে হতাশা ক্রমশ তার জীবনে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নেয়।
১৪. শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে হতাশা : যুবক বহু বছর কঠোর পরিশ্রম করে পড়াশোনা ও কোর্স সম্পন্ন করে, স্বপ্ন দেখে চাকরি, ক্যারিয়ার ও জীবনের স্থিতিশীলতা অর্জনের। কিন্তু বাস্তবতা তার আশা ভেঙে দেয় চাকুরীর সীমিত সুযোগ, তত্ত্বের সঙ্গে বাস্তবতার ফাঁক, পর্যাপ্ত পরিকাঠামো ও অভিজ্ঞতার অভাব তাকে অক্ষম ও হতাশ মনে করায়। রাতে চাকরির বিজ্ঞাপন দেখেও মনে হয়, আমি এত পড়াশোনা করেছি, তবুও কোনো সুযোগ নেই। এই উপলব্ধি তার আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়, স্বপ্ন ও উদ্যমকে অন্ধকারে ঠেলে দেয় এবং ভবিষ্যতের প্রতি আশাহীনতার সৃষ্টি করে।
১৫. আল্লাহর রহমতের প্রতি অবিশ্বাস : একজন যুবকের জীবনে সবচেয়ে ভয়াবহ হতাশার কারণ হ’ল আল্লাহর রহমত এবং সাহায্যের প্রতি অবিশ্বাস। যখন সে নিজেকে নানা সমস্যার, ব্যর্থতার এবং পাপের মধ্যে দেখতে পায়, তখন তার মনে হয় আল্লাহ আমাকে আর সাহায্য করবেন না। আমার জীবন যেন নিঃশেষ। কিছু যুবক আবার পাপ এবং অতীতের ভুলের জন্য আল্লাহর দয়ার প্রতি অবিশ্বাসী হয়ে পড়ে। বারবার পাপে লিপ্ত হওয়া, পরিবার বা সমাজের হতাশার কারণে জীবনে রোগ, দারিদ্র বা সম্পর্কের সমস্যা দেখা দেয়, তখন যুবক করে আমার জন্য কোনো পথ নেই। আল্লাহর রহমত আমার কাছে আসছে না। এই অবিশ্বাস শুধু যুবকের মনকে ক্লান্ত করে না; এটি তার জীবনের আশা, শক্তি, উদ্যম এবং ঈমানকেও নষ্ট করে। যখন যুবক নিজেকে নিঃসহায় ও পরিত্যক্ত মনে করে, তখন হতাশার ছায়া তার জীবনকে ঘিরে ফেলে।
(ক্রমশঃ)
-কামাল হোসাইন
[সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ, রাজশাহী-পশ্চিম সাংগঠনিক যেলা]
[1]. ৪ঠা অক্টোবর ২০২৫, দৈনিক ইত্তেফাক, ৬ই ফেব্রুয়ারী ২০২২ দৈনিক যায় যায় দিন।
[2]. ১৪ই সেপ্টেম্বর ২০২৫, দৈনিক প্রথম আলো।
[3]. ৩১শে আগস্ট ২০২৪, দৈনিক প্রথম আলো।