আত্মশুদ্ধি থেকে রাষ্ট্রশুদ্ধি : চাই এক শক্তিশালী নৈতিক পুনর্জাগরণ

ড. আহমাদ আব্দুল্লাহ ছাকিব 5 বার পঠিত

ছাত্র-জনতার এক বহুল আলোচিত জুলাই’২৪ গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে পাওয়া সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হাত থেকে গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয়েছে। কিন্তু এই ক্ষমতার পরিবর্তন সাধারণ মানুষের মনে তেমন শুভ প্রত্যাশার জন্ম দেয়নি; বরং আমরা খুব স্পষ্টভাবেই লক্ষ্য করছি চারিদিকে এক অনিশ্চয়তার কালো ছায়া। স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে যে, অনির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মাত্র কয়েকজন উপদেষ্টা নিয়ে যেভাবে রাষ্ট্রকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করেছিলেন, গণতান্ত্রিক সরকার তার চেয়ে বহুগুণ বেশী মন্ত্রী, এমপি দিয়েও সে দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে পারছে না। মূলত দলীয় প্রশাসন যে কখনই নিরপেক্ষভাবে দেশ পরিচালনা করতে পারে না তার প্রকট নিদর্শন আমরা দেখতে পাচ্ছি। যদিও এ দৃশ্য নতুন নয়; কিন্তু নেশাগ্রস্তের মত আমরা সেই পথকেই যথারীতি ভাবছি মুক্তির দিশা।

যাই হোক না কেন এই দৃশ্য আমাদের কাছে এক মৌলিক প্রশ্ন তুলে রেখেছে যে, শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনেই কি আমাদের সমস্যাগুলোর প্রকৃত কোন সমাধান হবে? দুর্নীতি, অনাচার, সূদ-ঘুষ, নৈতিক অধঃপতনে আকণ্ঠ নিমজ্জিত দেশ কি উদ্ধার পাবে? ভিতরে গভীর ক্ষত রেখে বাইরে মলমের প্রলেপ দিলেই কি রোগমুক্তি হবে?

এর স্পষ্ট উত্তর হ’ল- না। কারণ রাষ্ট্রশুদ্ধির প্রাথমিক শর্তই হল আত্মশুদ্ধি, যা ছাড়া প্রকৃত সমাধান কখনই সম্ভব নয়। যে জাতির ব্যক্তি ও সমাজ নৈতিকভাবে দুর্বল, সে জাতির রাষ্ট্রযন্ত্র কখনোই চেতনায়, নৈতিকতায় শক্তিশালী হ’তে পারে না। এজন্য রাসূলুল্লাহ (ছা.) মক্কায় যে আন্দোলন শুরু করেছিলেন, তা ছিল এই আত্মশুদ্ধিরই ব্যাপকভিত্তিক আন্দোলন। তিনি প্রথমে মানুষের আক্বীদা শুদ্ধ করেছেন, তাদের হৃদয়ে তাওহীদের আলো জ্বালিয়েছেন, তাদের চেতনায় আল্লাহর ভয় ও আখেরাতের জবাবদিহিতা জাগিয়েছেন। সেই সূত্র ধরেই পরবর্তীতে মদীনায় ইনছাফপূর্ণ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সমাজের প্রকৃত সংস্কার এ পথেই কেবল সম্ভব। এতদ্ভিন্ন দ্বিতীয় কোন পথে মুক্তি নেই। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যতই ‘সংস্কার’-এর কথা বলা হোক, যতই প্রত্যাশা নিয়ে নতুন সরকার আসুক- যদি ব্যক্তি দুর্নীতিগ্রস্ত, ঘুষখোর, সূদখোর ও নৈতিকতাহীন থাকে, তাহ’লে রাষ্ট্র কখনো শুদ্ধ হবে না।

এক্ষণে প্রশ্ন হল এই কাঙ্খিত আত্মশুদ্ধির পথ কী? কিভাবে এই জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী পথে আমরা অগ্রসর হব? মূলতঃ এই পথ দীর্ঘ সংগ্রামের পথ। মহা সাধনার পথ। এ পথ ফুলশয্যার নয়। এ পথে রাতারাতি কোন লক্ষ্য পূরণ হয় না। এর জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিকভাবে অবিরাম লেগে থাকা। এই পথে আবশ্যকীয়ভাবে পাড়ি দিতে হয় অনেকগুলো মাইলফলক। যেমন- (১) তাওহীদের পূর্ণ অনুশীলন : যেখানে শিরকমুক্তিই ঈমানের মূল পারদ। যেখানে থাকবে আল্লাহ, রাসূল (ছা.) এবং আখেরাতের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস। যেখানে থাকবে কুরআন ও ছহীহ হাদীছ মোতাবেক জীবন গঠন এবং সালাফে ছালেহীনের মানহাজ অনুসরণ। যেখানে থাকবে তাওহীদী আক্বীদাবিরোধী সকল কর্মকান্ড থেকে নিজেকে পবিত্র রাখা। (২) তাক্বওয়া ও ইহসান : প্রতিটি কাজে আল্লাহকে সামনে রাখা, আল্লাহর উদ্দেশ্যেই সমস্ত কাজ করা এবং আল্লাহকে ভয় করার মাধ্যমে ছোট-বড় গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা। (৩) নৈতিক পুনর্জাগরণ : ব্যক্তিগত জীবনে সততা, আমানতদারিতা, পর্দা, হালাল-হারামের সীমারেখা মেনে চলা। (৪) তাছফিয়াহ ও তারবিয়াহ : প্রতিটি মুহূর্তে নিজেকে পরিশুদ্ধ রাখার চেষ্টা করা এবং দাওয়াত ও জিহাদের মেহনত চালিয়ে যাওয়া। যেন ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত করা যায়।

এভাবে যখন মানুষের ব্যক্তিজীবন শুদ্ধ হবে, তখনই সমাজের সামগ্রিক শুদ্ধতার পথ খুলে যাবে। আর সমাজ শুদ্ধ হলে রাষ্ট্রযন্ত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে ন্যায়-ইনছাফপূর্ণ ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হবে। ইসলামী শাসনতন্ত্রের দাবী তখন আর শুধু কেবল শ্লোগান থাকবে না; বরং তা হয়ে উঠবে জাতির প্রতিটি সদস্যের আত্মার দাবী। এভাবে আমরা চাই এমন এক জাতি, যার সদস্যরা হবে আল্লাহর হুকুমের অনুগত। যেখানে দুর্নীতি, অনাচার হবে আগুনে ঝাপ দেয়ার চেয়েও কঠিন, যেখানে যুলুম-অত্যাচার হবে ভীষণতম শাস্তি পরিবেষ্টিত। শুধু ক্ষমতার পালাবদলে এই পরিবর্তন কখনও আসে না।

এই আত্মশুদ্ধির মহা সংগ্রাদ্ধে আমরা সর্বদা অগ্রভাগে রাখতে চাই যুবসমাজকে। কেননা একটি জাতির ভবিষ্যৎ যে তার যুবসমাজের হাতেই গড়ে ওঠে, এ কথা নতুন নয়; বরং ইতিহাসের বারবার প্রমাণিত সত্য। নবীদের দাওয়াত প্রথমে যুবকরাই গ্রহণ করেছে। ছাহাবীগণ অধিকাংশই ছিলেন তরুণ। তাদের হৃদয় ছিল সত্য গ্রহণের জন্য প্রস্ত্তত, তাদের ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর দূর্বিনীত সাহস। রাসূল (ছা.)-এর হাতে গড়ে ওঠা সেই যুবসমাজই একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগকে হিরন্ময় আলোকিত যুগে পরিণত করেছিল।

দুঃখের বিষয় এই আলো ঝলমলে সভ্যতার যুগে আমাদের যুবসমাজ এক অদ্ভুত টানাপোড়েনের মধ্যে বসবাস করছে। একদিকে সীমাহীন সম্ভাবনা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের ঝলকানি, বিশ্বসংযোগের অবাধ সুযোগ; অন্যদিকে ভয়াবহ চেতনার বিভ্রাট, নাস্তিক্যবাদ, ভোগবাদ, পরিচয় সংকট আর নৈতিক চরিত্রের নিদারুণ অবক্ষয়। আমাদের যুবকদের সামনে চ্যালেঞ্জ ভিন্ন ভিন্ন, কিন্তু মূল সমস্যা সেই একটাই- আল্লাহ থেকে দূরে সরে যাওয়া। ফলে জীবনের উদ্দেশ্য হারিয়ে যায় চরম অবহেলায়, সময় অপচয় হয় তুচ্ছতায়, আর প্রতিভা নষ্ট হয় অর্থহীন প্রতিযোগিতায়। চারিদিকে তাকালে একই দৃশ্য। আহ কি নিদারুণ অবহেলায় না অপচিত হচ্ছে আমাদের তরুণদের জীবন!

কোন জাতির মূল শক্তি তথা যুবসমাজ যদি এমন লক্ষ্যহীন, আদর্শহীন এবং বিভ্রান্তির অতল গহবরে নিমজ্জিত থাকে, তাহ’লে সেই জাতি নিয়ে কতটা প্রত্যাশা করা যায়? 

সুতরাং এই যুগ সন্ধিক্ষণে প্রিয় তরুণ সমাজের প্রতি আমাদের সবচেয়ে যরূরী যে আহবান তা হ’ল- আত্মপরিচয়ের সংকট থেকে বেরিয়ে আসা। আমরা যে মুসলিম, আমরা যে বিশ্বাসী-সেই পরিচয়কে কঠোরভাবে আঁকড়ে ধরা। আমাদের প্রকৃত সংকট যে রাজনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক নয়; বরং তা হ’ল ঈমানের সংকট, নৈতিকতার সংকট-সেটাকে মনে প্রাণে উপলব্ধি করা। কেবলমাত্র তাওহীদের জ্ঞান অর্জন করা তথা এক আল্লাহর প্রতি নিখাদ বিশ্বাসই মানুষকে তার সেই প্রকৃত পরিচয় ও উদ্দেশ্যের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। তাওহীদ মানে শুধু একটি বিশ্বাস নয়; এটি এক অন্তরের বিপ্লব, চেতনার বিপ্লব, জীবনের বিপ্লব। এই বিশ্বাস আমাদের শেখায়, আমরা কারো দাস নই-না প্রবৃত্তির, না ব্যক্তির, না সমাজের, না কোন মতবাদের। আমরা কেবল আল্লাহর বান্দা, আর এই পরিচয়ই আমাদেরকে দেয় প্রকৃত স্বাধীনতা ও মর্যাদা। আমাদের হৃদয়ে জাগায় মনুষ্যত্ব, মানবতা, বিবেক।

‘বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ’ তরুণ হৃদয়ে আত্মশুদ্ধির আগুন জ্বালাতেই সলতে হয়ে কাজ করে যাচ্ছে দৃঢ়চিত্তে। আমাদের এই সংগ্রাম নৈতিক পুনর্জাগরণের সংগ্রাম। সঠিক আক্বীদা-বিশ্বাসের ছাঁচে সমাজটাকে গড়ার সংগ্রাম। আমরা আন্তরিকভাবে চাই আমাদের যুবসমাজকে এবং তাদের শক্তি, সময় ও মেধাকে একটি মহৎ লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করতে। তারুণ্যের এই আত্মশুদ্ধির সংগ্রামই একদিন আমাদের পৌঁছে দেবে রাষ্ট্রশুদ্ধির সেই কাঙ্খিত গন্তব্যে ইনশাআল্লাহ। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, পৃথিবীর চাকা সবসময় চেতনাসম্পন্ন, আদর্শবান তরুণদের হাতেই ঘুরেছে।

সুতরাং হে যুবক, হে তরুণ! আড়ামোড়া ভেঙ্গে এগিয়ে এসো; নিজেকে চিনো। তুমি কেবল এই দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী বাসিন্দা নও; তুমি এক মহান রবের বান্দা, তুমি এক প্রেরিত মহাপুরুষের দেখানো পথের অনুসারী, তুমি এক মহান উদ্দেশ্যের ধারক-বাহক। তোমার অন্তরে তাওহীদের আলো জ্বালাও, তোমার জীবনকে গড়ে তোলো পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোয়, দাঁড়িয়ে যাও সত্যের পথে- যে পথ নবীগণের পথ, যে পথ সালাফে ছালেহীন তথা আল্লাহর প্রিয়পাত্রদের পথ। তুমি হও নিশান বরদার সেই সব মানুষের, যারা পথ হারিয়ে ডুবে আছে গভীর অমানিশায়। আপোষহীন ভাবে রুখে দাঁড়াও বাতিলের সকল শিখন্ডীর বিরুদ্ধে। তুমি হও আগামী দিনের পরিবর্তনের অগ্রদূত! গভীরভাবে স্মরণ কর তোমার প্রতি মহান রবের সেই ব্যাকুল আহবান- ’যারা ঈমান এনেছে তাদের হৃদয় কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য নাযিল হয়েছে তার জন্য বিগলিত হওয়ার সময় এখনও আসেনি!’ (হাদীদ ৫৭/১৬)। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে তাওফীক দান করুন- আমীন!



আরও