সফলতার দৈনন্দিন কর্মসূচী (শেষ কিস্তি)

আবু আফিয়া 5 বার পঠিত

১৪. সময় মতো ছালাত আদায় করুন : ছালাত হ’ল এক দিব্য বিরতি, যেখানে মন শান্ত হয়, হৃদয় পরিশুদ্ধ হয়। আপনি যখন একনিষ্ঠচিত্তে ছালাত আদায় করবেন, তখন আপনার মনে হবে আমি একা নই। আমার রব আমার সঙ্গে আছেন। ছালাত কেবল দায়িত্ব নয়, এটি আপনার রুহের বিশ্রাম, আত্মার শক্তি ও জীবনের দিকনির্দেশনা। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বেলালকে বলেছিলেন,يَا بِلَالُ أَقِمِ الصَّلَاةَ أَرِحْنَا بِهَا- ‘হে বেলাল (ছালাতের জন্য) ইক্বামত দাও, এর মাধ্যমে আমাদের শান্তি দাও’।[1]

ছালাত কেবল একটি ফরয ইবাদতই নয়, এটি আত্মিক পরিশুদ্ধিতার দৈনিক চক্র। যেখানে হৃদয় গুনাহের ধুলা ঝেড়ে ফেলে। আর আত্মা ফিরে পায় তার রবের সান্নিধ্য। যে ব্যক্তি সময়মতো ছালাত পড়ে, সে শিখে নেয় নিয়মানুবর্তিতা, অভ্যস্থ হয় সুশৃংখল জীবন যাপনে, খুঁজে পায় হৃদয়ের প্রশান্তি ও জীবনের প্রকৃত অর্থ। আল্লাহ বলেন,فَإِذَا اطْمَأْنَنْتُمْ فَأَقِيمُوْا الصَّلَاةَ إِنَّ الصَّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِيْنَ كِتَابًا مَوْقُوْتًا ‘যখন তোমরা শংকামুক্ত হও, তখন সুস্থরভাবে ছালাত আদায় কর। নিশ্চয় ছালাত মুমিনদের উপর নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্ধারিত’ (নিসা ৪/১০৩)। সময়মতো ছালাত পড়া মানে আপনি আপনার জীবনের সব কিছুর আগে আল্লাহকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। নিজের কাজ, ফোন, মিটিং সবকিছুর আগে আপনি দাঁড়াচ্ছেন সেই মহান রবের সামনে, যিনি আপনাকে সৃষ্টি করেছেন, পরিচালনা করছেন, আর যিনি আপনার দুঃখ-কষ্ট, উদ্বেগ ও আশা সব জানেন।

ছালাত আমাদের শেখায় দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে। দুনিয়ার দৌড়ের মাঝেও আত্মাকে জাগিয়ে রাখা, উদ্বেগের ভেতরেও তাওয়াক্কুল শেখা, আর ভুলে যাওয়া পৃথিবীর মাঝে আবার নিজেকে চিনে ফেলা। প্রতিটি ছালাত হ’ল গুনাহ থেকে ফিরে আসার এক নতুন শুরু। অহংকার ভেঙে আল্লাহর সামনে বিনয় শেখার আর নিজের হৃদয়কে নতুন করে পরিশুদ্ধ করার এক অপূর্ব সুযোগ।

কার্যকরের উপায় : চলুন এক সপ্তাহের জন্য একটা প্রতিশ্রুতি নেই। এমন এক প্রতিশ্রুতি, যা আপনার জীবনকে ভেতর থেকে বদলে দিতে পারে। একটি টেবিলে লিখে রাখুন আপনার পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতের সময়। প্রতিটি ছালাতের দশ মিনিট আগে একটি অ্যালার্ম দিন, যেন দুনিয়ার ব্যস্ততা নয়, বরং আল্লাহর ডাকই প্রথমে শোনা যায়। চেষ্টা করুন ছালাত প্রথম ওয়াক্তেই আদায় করতে। প্রতিবার ছালাত শেষে আপনার এক লাইন অনুভূতি লিখুন। যেমন আজ যোহরের ছালাত পড়েছি সময়মতো। মনে হ’ল যেন হৃদয়ে নেমে এসেছে প্রশান্তির বৃষ্টি। ফজরের সময়টা কঠিন ছিল, কিন্তু উঠেই যখন ছালাত করলাম, পুরো দিনটাই আলোকিত হয়ে গেল।

সাত দিন পর একটু থেমে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন। আমার আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কটা কি আরও গভীর হয়েছে? সময় কি এখন বেশি বরকতময় মনে হচ্ছে? অন্তর কি আগের চেয়ে বেশি শান্ত? দেখবেন, এক সপ্তাহে আপনার ভেতর এক অদ্ভুত পরিবর্তন শুরু হবে। কারণ ছালাত শুধু ইবাদত নয়। এটা হ’ল আপনার রবের সঙ্গে সাক্ষাৎ, আত্মার পুনর্জাগরণ, আর ক্লান্ত হৃদয়ের পুনরায় আলোয় ভরে ওঠার মুহূর্ত।

মনে রাখবেন, যে ছালাতকে অাঁকড়ে ধরে, আল্লাহ তাকে রক্ষা করবেন। আর যে ছালাতকে হারায়, সে আসলে নিজের শান্তি, বরকত, আর জীবনের দিশা হারায়। তাই আর এক মুহূর্তও দেরি না করে আজ থেকেই শুরু করুন আপনার রবের সঙ্গে নির্ধারিত সাক্ষাৎ। কারণ যখন আপনি আল্লাহর জন্য সময় দেন, তখন আল্লাহ আপনার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে বরকত ও প্রশান্তি ঢেলে দেন।

১৫. কুরআন পড়ুন : কুরআন কোন স্মৃতিচারণার বই নয়। না শুধু তাকের সাজসজ্জার এক অলংকার। এটা সেই জীবন্ত বাণী; যার প্রতিটি শব্দ আপনার আত্মাকে জাগিয়ে তোলে। আপনার চিন্তাকে সঠিক পথে ফেরায়। আল্লাহ বলেন,لَوْ أَنْزَلْنَا هَذَا الْقُرْآنَ عَلَى جَبَلٍ لَرَأَيْتَهُ خَاشِعًا مُتَصَدِّعًا مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ وَتِلْكَ الْأَمْثَالُ نَضْرِبُهَا لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ- ‘যদি এই কুরআন আমরা কোন পাহাড়ের উপর নাযিল করতাম, তাহ’লে অবশ্যই তুমি তাকে দেখতে আল্লাহর ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ হ’তে। আর আমরা এইসব দৃষ্টান্ত মানুষের জন্য বর্ণনা করি যাতে তারা চিন্তা করে’ (হাশর ৫৯/২১)

কুরআনের প্রতিটি আয়াত হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে তোলে, হতাশার আঁধার তাড়িয়ে আশার আলো সঞ্চার করে, আল্লাহর উপর ঈমান ও তাওয়াক্কুল বৃদ্ধি করে। আল্লাহ বলেন,وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ ‘আর যখন তাদের উপর তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয়, তখন তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং তারা তাদের প্রতিপালকের উপর ভরসা করে’ (আনফাল ৮/২)

যিনি কুরআনকে নিজের দ্বীনের অংশ বানান, তার জীবনে নেমে আসে আলো। তার সিদ্ধান্তে আসে প্রজ্ঞা। আর তার প্রতিটি পদক্ষেপে মেলে প্রশান্তির ছোঁয়া। প্রত্যেক আয়াতই আপনার জন্য আল্লাহর এক ব্যক্তিগত বার্তা। আপনাকে দরকার কেবল একটু সময় বের করা। একটা শান্ত হৃদয় আর গভীর মনোযোগ নিয়ে তেলাওয়াত করা। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,اقْرَءُوا الْقُرْآنَ فَإِنَّهُ يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ شَفِيعًا لِأَصْحَابِهِ ‘তোমরা কুরআন পাঠ করো। কারণ কুরআন ক্বিয়ামতের দিন তার পাঠকদের পক্ষে সুপারিশ করবে’।[2]

কুরআন আপনার কাছে অধিক পরিমাণের নয়, ধারাবাহিকতা রক্ষার আহবান জানায়। প্রতিদিন একটি আয়াত হলেও পড়ুন। কারণ সেই একটি আয়াতই হয়তো হয়ে উঠবে আপনার নতুন জীবনের পথপ্রদর্শক।

কার্যকরের উপায় : প্রতিদিন সকালে বা রাতে মাত্র ৫ মিনিট কুরআন তেলাওয়াত করুন। যখন আপনার মন শান্ত থাকে ও পরিবেশ নিরিবিলি থাকে। ছোট একটি পদক্ষেপ। কিন্তু এর প্রভাব অসীম। ধীরস্থিরভাবে মন দিয়ে কুরআনের একটি পৃষ্ঠা পড়ুন। একটি আয়াতের অর্থ ভাবুন! অনুধাবন করুন, কেন এটি আপনার হৃদয় স্পর্শ করছে। ডায়েরিতে লিখুন। কোন আয়াতটি আজ আমার হৃদয় নরম করেছে? আমি কীভাবে এটি আমার জীবনে প্রয়োগ করব?

মনে রাখবেন, এটি প্রতিদিন কুরআনের সঙ্গে কেবল ৫ মিনিটের সাক্ষাৎ নয়, বরং এটি আপনার পুরো দিন এমনকি জীবনকে নতুন আলোয় আলোকিত করার প্রয়াস।

১৬. ইস্তিগফার, আল্লাহর স্মরণ, দো‘আ ও কৃতজ্ঞতা : সকাল হৌক বা সন্ধ্যায় প্রতিদিনের এই চারটি আধ্যাত্মিক অভ্যাস আপনার হৃদয়কে শুদ্ধ করবে। বড় কোন অনুষ্ঠান বা বিশেষ মুহূর্তের অপেক্ষা নেই, আপনার জীবন্ত হৃদয় ও ভিজা জিহবাই যথেষ্ট।

ইস্তিগফার : রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা, এটি মানসিক শান্তির চাবিকাঠি। আল্লাহ বলেন,اسْتَغْفِرُوْا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا- يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا- وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِيْنَ وَيَجْعَلْ لَكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَلْ لَكُمْ أَنْهَارًا- ‘অতঃপর আমি তাদের বলেছি, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই তিনি অতীব ক্ষমাশীল’। ‘তিনি তোমাদের উপর মুষলধারে বারি বর্ষণকারী মেঘমালা প্রেরণ করবেন’। ‘তিনি তোমাদের সম্পদ ও সন্তানাদি বৃদ্ধি করে দিবেন এবং তোমাদের জন্য বাগিচাসমূহ সৃষ্টি করবেন ও নদীসমূহ প্রবাহিত করবেন’ (নূহ ৭১/১০-১১)। নবী করীম (ছাঃ) প্রতিদিন কমপক্ষে ৭০ বার ইস্তিগফার করতেন।[3]

আল্লাহকে স্মরণ : হৃদয় ভরে আল্লাহর স্মরণ করুন। ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আলহামদুলিল্লাহ’, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, ‘আল্লাহু আকবর’ এগুলো সহজ শব্দ, কিন্তু হৃদয়কে প্রশান্তি দেয়, আমলকে ওযন দেয়, আত্মাকে জীবন্ত করে। কেননা মহান আল্লাহ বলেন, أَلَا بِذِكْرِ اللهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ- ‘মনে রেখ, আল্লাহর স্মরণেই কেবল হৃদয় প্রশান্ত হয়’ (রা‘দ ১৩/২৮)। আল্লাহ আরো বলেন,إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ ‘মুমিন কেবল তারাই, যখন তাদের নিকট আল্লাহকে স্মরণ করা হয়, তখন তাদের অন্তর সমূহ ভয়ে কেঁপে ওঠে...’ (আনফাল ৮/২)

দৈনন্দিন দো‘আ করুন : দো‘আ হ’ল মুমিনের অস্ত্র, আধ্যাত্মিক ক্ষমতার চাবিকাঠি। বিপদে হেŠক বা সমৃদ্ধিতে, সকালে হেŠক বা সন্ধ্যায়, বিশ্বাস রাখুন, আল্লাহ শুনেন, প্রতিফলিত করেন। আর যা ভালো হবে তা দান করেন। আল্লাহ বলেন, وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُوْنِيْ أَسْتَجِبْ لَكُمْ ‘আর তোমাদের প্রতিপালক বলেন, তোমরা আমাকে ডাক। আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব’ (মুমিন ৪০/৬০)

কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন : আপনি যদি আজ সুস্থ শরীর নিয়ে ঘুম থেকে জাগেন, তবে এটি পৃথিবীর অগণিত মানুষের কাছে একটি বড় স্বপ্ন। অথচ আমরা প্রায়ই যা আমাদের নেই তা নিয়ে আফসোস করি। কিন্তু যা আছে তার সঠিক মূল্যায়ন করি না। অথচ কৃতজ্ঞতা হ’ল সেই চাবিকাঠি যা আমাদের জীবনের বন্ধ দরজাগুলো খুলে দেয়। কেননা কৃতজ্ঞতা আদায় করলে নে‘মত বাড়ে। আর অকৃতজ্ঞ হলে নে‘মত উঠিয়ে নেওয়া হয়। আল্লাহ বলেন, لَئِنْ شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ ‘যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর, তাহ’লে আমি অবশ্যই তোমাদেরকে বেশী বেশী দেব’ (ইব্রাহীম ১৪/৭)। শুধু মুখে নয়, হৃদয় ও আচরণে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন। প্রতিটি মুহূর্তকে উপহার হিসাবে দেখুন।

মনে রাখবেন, ইস্তিগফার পাপ মুছে দেয়, আল্লাহর স্মরণ হৃদয়কে আলোকিত করে, দো‘আ দরজা খুলে দেয়, কৃতজ্ঞতা অধিক বরকত আনে। চলুন, এই চারটি অভ্যাসকে প্রতিদিনের রুটিন বানাই। হৃদয় হবে শান্ত। জীবন হবে বরকতপূর্ণ এবং আত্মা হবে জীবন্ত।

১৭. আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করুন : কারণ প্রাকৃতিক জগত ঈমানের দরজা খুলে দেয়। আল্লাহ বলেন,إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَآيَاتٍ لِأُولِي الْأَلْبَابِ- ‘নিশ্চয়ই আসমান ও যমীনের সৃষ্টিতে এবং রাত্রি ও দিবসের আগমন-নির্গমনে জ্ঞানীদের জন্য (আল্লাহর) নিদর্শন সমূহ রয়েছে’ (আলে ইমরান ৩/১৯০)। আমরা প্রতিদিনই দেখতে পাই বিশাল নীল আকাশে সাদা-কালো মেঘের সমাহার। উপভোগ করি নতুন ভোরের তাযা নিশ্বাস, সাগরের নীলিমা, মাটির মধ্যে লুকানো ফুলের সুঘ্রাণ ও রকমারি ফলের স্বাদ। অসচেতন হৃদয় এসব দেখেও অদৃশ্যভাবে চলে যায়। তবে চিন্তাশীল অন্তর প্রতিটি দৃশ্যে আল্লাহর অস্তিত্ব ও ক্ষমতার বার্তা উপলব্ধি করে।

চিন্তা-ভাবনা হ’ল এক ধরণের নীরব ইবাদত। যা মগজ ও হৃদয়ের জন্য এক উচ্চতম প্রশিক্ষণ। সুফিয়ান ইবনু উয়াইনা (রহঃ) বলেছেন, ‘চিন্তা-ভাবনা রহমতের চাবিকাঠি। তুমি কি দেখ না, মানুষ চিন্তা করে, অতঃপর তওবা করে?’।[4] নিজের সৃষ্টিতে চিন্তা করুন। কীভাবে এক বিন্দু পানি থেকে আপনি মানব হবার সৌভাগ্য লাভ করলেন। বুদ্ধি, জিহবা, শ্রবণ ও দৃষ্টিসহ প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আল্লাহর সূক্ষ্মদৃষ্টির সাক্ষ্য দেয়। রাত-দিনের পরিবর্তন ও জীবনের উত্থান-পতন পর্যবেক্ষণ করুন। সবই আপনাকে রবের পথে ফিরে আসার আহবান জানায়।

জীবন স্থির নয়, এটি একটি যাত্রাপথ। আপনার জীবনের ছোট ছোট অনুগ্রহ চিন্তা করুন। এর কৃতজ্ঞতা জানান, অনুতপ্ত হন এবং উন্নতি করুন। আকাশের রাজত্বে নযর দিন। আপনার মন নরম হবে এবং দৃঢ় বিশ্বাস তৈরী হবে এবং উচ্চতর দৃষ্টিভঙ্গি জন্ম নিবে।

কার্যকরের উপায় : প্রতিদিন মাত্র ১০ মিনিট সময় নিন। নীরব পরিবেশে, নিজের সঙ্গে একান্তে বসুন। কোন মোবাইল নয়, কোন শব্দ নয়, শুধু আপনি আর নীরবতা। তারপর একটি বিষয় বেছে নিন। সূর্যাস্তের দৃশ্য বা ভোরের আলো। কোন শিশুর হাসি বা উড়ে যাওয়া পাখি। গাছের পাতা, কিংবা বৃষ্টির ফোঁটা। এবার নিজেকে প্রশ্ন করুন। এই দৃশ্য আমাকে কী শিক্ষা দিল? এটি কীভাবে আল্লাহর মহিমা ও প্রজ্ঞার নিদর্শন? এই সৌন্দর্য দেখে আমার নিজের জীবনে কী পরিবর্তন আনা প্রয়োজন?

সবশেষে, আপনার অনুভূতিগুলো একটি বিশেষ ডায়েরিতে লিখে রাখুন। কয়েক সপ্তাহ পর দেখবেন। আপনার হৃদয় বদলে গেছে। নরম হয়েছে, গভীর হয়েছে। আল্লাহর আরও কাছাকাছি এসেছেন। যে ব্যক্তি হৃদয়ের চোখ দিয়ে দেখে, সে আল্লাহর আহবান শুনে প্রতিটি দৃশ্যেই। চিন্তা-ভাবনা হ’ল এমন এক ইবাদত। যার জন্য ওযূ লাগে না, কণ্ঠের শব্দ লাগে না, লাগে শুধু এক জাগ্রত হৃদয় ও সূক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গি।

২১. নিজের স্বাস্থ্য রক্ষা করুন : সুস্বাস্থ্য আপনার দুনিয়াবী জীবনের সর্বোত্তম নে‘মত। অথচ অধিকাংশ মানুষ এ ব্যাপারে বেখেয়াল থাকে ও অবহেলা করে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,نِعْمَتَانِ مَغْبُونٌ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ، الصِّحَّةُ وَالْفَرَاغُ- ‘দু’টি নে’মত আছে, যেগুলোতে অনেক মানুষ প্রতারিত হয়, সুস্থতা ও অবসর’।[5] সুস্থতা মানে শুধু রোগমুক্ত থাকা নয়। এটা হ’ল দেহের শক্তি, মনের সতেজতা, আর আত্মার প্রশান্তি।

অতএব, স্বাস্থ্যই সেই মূলধন, যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ; সফলতা ও ব্যর্থতা। চিন্তা করুন। যদি শরীর অসুস্থ থাকে, তবে উচ্চাকাংখার মূল্য কী? যদি দুর্বল শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তবে অর্থ বা খ্যাতি আপনাকে কী আনন্দ দিবে? একটি সুস্থ শরীরই আপনাকে দেয় মনোযোগী ইবাদত, পরিশ্রমী কর্মজীবন এবং পূর্ণোদ্যমে এগিয়ে চলার শক্তি। নবী করীম (ছাঃ) আমাদের শিখিয়েছেন একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনধারা যেখানে ঘুম, খাদ্য, পরিচ্ছন্নতা ও সতর্কতা, সবকিছুরই রয়েছে যথাযথ গুরুত্ব। তিনি বলেছেন,الْمُؤْمِنُ الْقَوِيُّ، خَيْرٌ وَأَحَبُّ إِلَى اللهِ مِنَ الْمُؤْمِنِ الضَّعِيفِ ‘শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর নিকট দুর্বল মুমিনের তুলনায় অধিক প্রিয়’।[6]

এই শক্তি শুধু দেহের নয়; বরং তা হৃদয়ের দৃঢ়তা, মানসিক স্থিতি, আর আত্মার জাগ্রত জীবনীশক্তির প্রতিফলন। স্বাস্থ্যকে অবহেলা করবেন না, কারণ এটাই সেই সম্পদ, যা হারালে জীবনের স্বাদ মলান হয়ে যায়, আর রক্ষা করলে প্রতিটি দিন হয়ে ওঠে নতুন সম্ভাবনার সূচনা।

কার্যকরের উপায় : সুস্বাস্থ্যের জন্য পাঁচটি সোনালী নিয়ম। (১) প্রতিদিন রাতে অন্তত ৬-৭ ঘণ্টা ঘুমান। ঘুম শুধু বিশ্রাম নয়, এটাই আপনার শরীরের পুনর্গঠন ও মনের প্রশান্তির সময়। (২) নিয়মিত পানি পান করুন। প্রতি ঘণ্টায় এক গ্লাস পানি। শুনতে সহজ, কিন্তু এটাই আপনার দেহের শ্রেষ্ঠ ওষুধ। পানি শরীরকে পরিষ্কার করে, মনকে সতেজ রাখে এবং ক্লান্তি দূর করে। অনেক সময় সুখের শুরু হয় এক গ্লাস ঠান্ডা পানি দ্বারা। (৩) প্রতিদিন অন্তত ১৫ মিনিট হাঁটলে শরীরের প্রতিটি কোষে প্রাণ ফিরে আসে। হাঁটা শুধু ব্যায়াম নয়, এটি আত্মাকে জাগিয়ে তোলার এক নিরব বিপ্লব। মনে রাখবেন, জীবন চলার নাম, বসে থাকার নয়।

(৪) নিয়মিত নিজের যত্ন নিন। অসুস্থ হওয়ার অপেক্ষা করবেন না। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন। প্রতিটি সচেতন পদক্ষেপ আপনাকে রোগ নয়, শান্তি ও স্বস্তির পথে রাখবে। (৫) কাজ ও বিশ্রামের ভারসাম্য বজায় রাখুন। কাজে নিজেকে উৎসর্গ করুন, কিন্তু শরীরকে নিঃশেষ করে নয়। কিছু সময় শুধু নিজের জন্য রাখুন। নীরবতা, প্রকৃতি বা প্রিয় বইয়ের সঙ্গে। বিশ্রাম মানে অলসতা নয়; বরং এটি আগামী দিনের কর্মপ্রস্ত্ততি।

স্বাস্থ্যই জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। অর্থ, সাফল্য, খ্যাতি সবকিছুই অর্থহীন হয়ে যায়, যদি শরীর ও মন অসুস্থ থাকে। তাই আজ থেকেই শুরু করুন। একটি ছোট পরিবর্তন। একটি সৎ নিয়ত, আর একটি কৃতজ্ঞ হৃদয় নিয়ে। নিজের শরীরকে ভালোবাসুন। নিজের জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞ হৌন। কারণ সুস্বাস্থ্যই প্রকৃত সুখের দরজা খুলে দেয়।

(২২) নিয়মিত শরীর চর্চা বা ব্যায়াম করুন : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, فَإِنَّ لِجَسَدِكَ عَلَيْكَ حَقًّا، ‘তোমার শরীরেরও তোমার উপর অধিকার আছে’।[7]

শরীর আল্লাহর এক মহান দান, এক অমূল্য আমানত। যে শরীরকে নড়ালো না, সে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। যে পেশী কাজে লাগে না, তা দুর্বল হয়ে যায়। আর যে হৃদয়কে পরিশ্রম শেখানো হয় না, তা অকালে বৃদ্ধ হয়ে যায়। ব্যায়াম কোন বিলাসিতা নয়। বরং এটি জীবনধারার অপরিহার্য অংশ, ইবাদতের প্রস্ত্ততি। আর জীবনীশক্তির উৎস।

নবী করীম (ছাঃ) ছিলেন সক্রিয় ও প্রাণবন্ত। তিনি স্ত্রী আয়েশা (রাঃ)-এর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছেন, তিরন্দাজি করেছেন, ছাহাবীদের শিখিয়েছেন সাঁতার ও ঘোড়ায় চড়া। কারণ তিনি জানতেন, শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের চেয়ে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়’।[8]

ব্যায়াম মানেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিম নয়। এটা হ’তে পারে প্রতিদিনের ১৫ মিনিট হাঁটা, সিঁড়ি বেয়ে ওঠা, কিছু স্ট্রেচিং, বা সকালে সূর্যের আলোয় গভীর শ্বাস নেওয়া। মনে রাখুন, এই শরীর আপনার ছালাতের বাহন, ইবাদতের হাতিয়ার, জীবনের জ্বালানি। তাকে যত্ন করুন। কারণ একদিন হয়তো সেই অবহেলিত শরীরই আপনাকে ছালাতে দাঁড়াতে বা সিজদায় যেতে বাধা দিবে।

কার্যকরের উপায় : মাত্র ১৫ মিনিটের চ্যালেঞ্জ নিন। প্রতিদিন অন্তত এতটুকুই দরকার আপনার জীবনকে নতুন করে জাগিয়ে তুলতে। এই ছোট্ট সময়টুকু হ’তে পারে আপনার শক্তি, শান্তি ও আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার শুরু। শুরু করুন আজ থেকেই। বাড়ির আশেপাশে একটু দ্রুত হাঁটুন। এছাড়া যদি সুযোগ থাকে তাহ’লে দৈনিক সাইকেল চালানো, দৌড়ানো বা সাঁতার কাটার অভ্যাস করুন। সময়টা নির্দিষ্ট করুন, ফজরের পরের সতেজ সকাল, কর্মশেষের নীরব বিকেল বা রাত কিংবা ছালাতের আগে একটু অবসর। এই সময়টি হোক আপনার নিজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎ, যেখানে আপনি ক্লান্ত শরীরকে নয়, জাগিয়ে তুলবেন দৃঢ় মনকে।

মনে রাখুন, ব্যায়াম শুধু পেশি গঠন করে না, এটা গড়ে তোলে ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস আর মানসিক প্রশান্তি। যে শরীর সক্রিয়, তার মন কখনো পরাজিত হয় না। এক সপ্তাহ নিয়মিত চেষ্টা করুন, আপনি নিজেই অবাক হবেন আপনার ঘুমে, মনোভাবে, ও জীবনের উচ্ছ্বাসে পরিবর্তন দেখে। কারণ, যে নিজেকে নড়াতে পারে, তাকে কেউ থামাতে পারে না।

(২৩) বুদ্ধি দিয়ে খান, লোভ দিয়ে নয় : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, مَا مَلَأَ آدَمِيٌّ وِعَاءً شَرًّا مِنْ بَطْنٍ- ‘আদম সন্তান তার পেটের চেয়ে নিকৃষ্ট কোন পাত্র কখনো পূর্ণ করে না’।[9] পেট হ’ল রোগের ঘর, আর সংযম হ’ল সেরা ওষুধ। আপনার দেহ আসলে আপনি যা খান তারই প্রতিবিম্ব। খাবার শুধুই জিহবার স্বাদ নয়, এটি আপনার শক্তি, আপনার প্রাণ। যদি খাওয়াকে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখেন, এটি হয় স্বস্তি ও শান্তি; অন্যথায়, এটি হয়ে ওঠে ক্লান্তি ও অসুস্থতা। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,فَثُلُثٌ لِطَعَامِهِ وَثُلُثٌ لِشَرَابِهِ وَثُلُثٌ لِنَفَسِهِ ‘মানুষের পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানির জন্য, এবং এক-তৃতীয়াংশ নিঃশ্বাসের জন্য রাখুক।[10] এই ছোট্ট নিয়ম মানলেই সঙ্কীর্ণতা, অলসতা ও হজমের সমস্যা দূর হয়।

মনে রাখুন! খাদ্য শুধু জিহবার আনন্দ নয়, এটা আপনার চেতনার প্রতিচ্ছবি, আপনার আত্মনিয়ন্ত্রণের পরীক্ষা। বুদ্ধি দিয়ে খেলে খাবার হয় ওষুধ। আর লোভ দিয়ে খেলে সেটাই হয়ে যায় রোগ। আজ থেকেই প্রতিদিনের খাবারে সংযম রাখুন। আপনার শরীরকে শক্তিশালী, প্রাণবন্ত ও সুস্থ করুন।

কার্যকরের উপায় : আজ আপনার শরীর ও মনকে সচেতন খাবারের অভিজ্ঞতা দিন। লক্ষ্য করুন, প্রতিটি পুষ্টিকর খাদ্য শুধু খাদ্যই নয়, এটি আপনার শক্তি, স্বাস্থ্য এবং মনোভাব গড়ে তোলে। দিনে তিনটি সুষম প্রধান খাবার খান, স্ন্যাকস এড়িয়ে যান। প্রতিটি খাবার ২০-৩০ সেকেন্ড ধরে চিবান। মনের সাথে খাবারের সংযোগ অনুভব করুন। খাওয়া থামান তখনই, যখন শরীর বলে পর্যাপ্ত। পেট পূর্ণ হওয়ার অপেক্ষা করবেন না। চিনি ও তেল কমান। সবজি বেশি বেশি খান।

খাওয়ার আগে এক গ্লাস পানি পান করুন। এটি ছোট্ট অভ্যাস, কিন্তু বড় পরিবর্তন। আপনার খাদ্য সচেতনতা বাড়াবে। খাবার হোক পরিমিত, সুষম, কৃতজ্ঞচিত্তে। এমন খাবার বেছে নিন যা আপনাকে শক্তিশালী ও সুস্থ রাখবে।

(২৪)নিয়মিত ঘুমান : আপনি যন্ত্র নন! নিদ্রা হ’ল শরীরের বিশ্রাম, মনের প্রশান্তি এবং শক্তির পুনর্জাগরণ। অথচ আজকের দুনিয়ায় যেখানে স্ক্রিনের আলো, রাতজাগা এবং ব্যস্ততা নিত্যসঙ্গী। নিয়মিত ঘুম একটি হারিয়ে যাওয়া অভ্যাস হয়ে গেছে। কিন্তু কম ঘুম মানে শুধু ক্লান্তি নয়, এটি মনোযোগ, মেজাজ, স্মৃতি, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা, এমনকি ইবাদতেও প্রভাব ফেলে।

নবী করীম (ছাঃ) নিজে ঘুমিয়েছেন, জেগেছেন, এবং রাত-দিনের জীবনকে সুশৃংখলভাবে ভাগ করেছেন। রাতে প্রথম অংশে ঘুম ও রাতের শেষ তৃতীয়াংশে ইবাদত। এছাড়া অপ্রয়োজনীয় রাতজাগা থেকে বিরত থাকাকে উৎসাহ দিয়েছেন। ঘুমকে সময়ের অপচয় ভাববেন না। এটি স্বাভাবিক পুনরোদ্যম, মানসিক চাপ মুক্তি এবং শক্তিশালী জীবনধারার মূল চাবিকাঠি।

কার্যকরের উপায় : ৩ দিনের ঘুমের একটি রুটিন করে নিজেকে অভ্যস্থ করুন। আর দেখুন কত তাড়াতাড়ি পরিবর্তন আসে। রাতে ঘুমানোর সময় এবং সকালে ওঠার সময় ঠিক করুন। উদাহরণ হিসাবে রাত ১১-টা থেকে ভোর ৫-টা। ঘুমের ৩০ মিনিট পূর্বে সব ধরনের স্ক্রিন বন্ধ করুন। কারণ ব্লু লাইট মনকে শান্ত হ’তে দেয় না।

ঘুমানোর আগে কয়েকটি আয়াত বিশেষ করে সূরা মুলক এবং সূরা বাক্বারা শেষ ক’টি আয়াত পড়ুন। মনে প্রশান্তি এবং আত্মায় নরম স্নিগ্ধতা অনুভব করবেন। ভারি খাবার এড়িয়ে চলুন। প্রয়োজনে ঘুমের সময় ঠিক রাখার জন্য স্মার্ট ওয়াচ ব্যবহার করুন। মনে রাখবেন, ঘুম কোন অলসতা নয়, বরং এটি শরীর ও মনকে রিস্টার্ট করার শক্তিশালী মাধ্যম। ভালো ঘুম নিন এবং জেগে উঠুন শক্তিশালী, সতেজতায় ভরপুর হয়ে।

২৫. নিজেকে পরিচ্ছন্ন রাখুন : নিজের পরিচ্ছন্নতা একটি ঈমানী ও উত্তম ব্যক্তিত্বের পরিচায়ক। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, إِنَّ اللهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ- ‘নিশ্চয় আল্লাহ সুন্দর। তিনি সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন’।[11]

এছাড়াও নিজেকে পরিচ্ছন্ন রাখা, সুন্দর সাজসজ্জা করা কোন শৈলী নয়। এটি নিজের প্রতি সম্মান, চারপাশের মানুষদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আল্লাহর প্রতি দায়িত্ব প্রকাশের মাধ্যম। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ ‘তোমার পোশাক পবিত্র কর’ (মুদ্দাছছির ৭৪/৫)। আর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, الطُّهُورُ شَطْرُ الْإِيمَانِ ‘পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অংশ’।[12] পোষাক পরিচ্ছন্নতার সাথে দেহ পরিচ্ছন্ন রাখুন। নিয়মিত গোসল ও স্বাস্থ্যকর অভ্যাস তৈরী করুন। ঘর, কাজের জায়গা ও ব্যক্তিগত জিনিস পরিচ্ছন্ন রাখুন। আপনার আচার-ব্যবহারও পরিচ্ছন্নতার অংশ। কারণ মানুষ প্রথমে আপনার দৃশ্যমান চেহারা দেখবে। তারপরই আপনার অন্তরের গভীরতা বুঝবে। মনে রাখবেন, নিজের প্রতি পরিচ্ছন্নতা এবং যত্নই আপনাকে আত্মবিশ্বাসী, প্রভাবশালী ও স্মরণীয় করে তুলবে।

কার্যকরের উপায় : সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন মনের জন্য কয়েকটি সহজ অভ্যাস গড়ে তুলুন। (১) আলমারী থেকে অতিরিক্ত জিনিস-পত্র ফেলে দিন ও শুধুমাত্র আপনার প্রয়োজনীয় এবং মানানসই গুলো রাখুন। (২) সপ্তাহে অন্তত একবার পোশাক পরিচ্ছদ পরিষ্কার করুন। (৩) ছোট হলেও একটি ব্যক্তিগত সুগন্ধি সবসময় সঙ্গে রাখুন এবং প্রয়োজন মাফিক ব্যবহার করুন। (৪) চুল হাত-পায়ের নখ কাটাসহ ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন ও নিয়মিত পরিপাটি করুন। (৫) সপ্তাহে একদিন ঘর বা অফিস পরিষ্কার করুন, যাতে পরিবেশে স্থিরতা ও শান্তি আসে। (৬) বিছানা ও পোশাক পরিষ্কার রাখুন। নোংরা কাপড় বা বিছানা শুধু ব্যথা নয়, আপনার মানসিক শক্তিকেও কমিয়ে দেয়। (৭) বাইরে বের হওয়ার আগে নিজেকে পরিপাটি করুন। এটি অন্যের জন্য নয়, নিজের ফোকাস বৃদ্ধির জন্য।

আপনার বাইরের পরিবেশকে সুশৃংখল করুন, আপনার ভিতরের মন শান্তি পাবে। পরিষ্কার ঘর, পরিপাটি পোশাক, এবং সুসংগঠিত কাজের স্থান মানসিক শান্তি এবং জীবনকে সহজ করে। নিজেকে ভালোভাবে দেখাশোনা করা কোন অহংকার নয়, এটি নিজের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ।

উপসংহার : পরিবর্তনের যাত্রা আজই শুরু করুন, কাল নয়। পড়া কেবল প্রথম ধাপ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হ’ল শুরু করা। এই অভ্যাসগুলো কোন তাত্ত্বিক পাঠ নয়। এগুলো হ’ল ছোট ছোট বীজ, যেগুলো আপনি আজ বপন করলে, কাল আপনার জীবন ফুলে-ফলে সুশোভিত হবে। এমন দরজা যা আপনার মনকে স্পষ্ট করবে। সময়কে নিয়ন্ত্রিত করবে, হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করবে, আর দেহকে সুস্থ রাখবে।

সুতরাং একটি উত্তম মুহূর্তের অপেক্ষা করবেন না। পরিবর্তন কখনো শনিবার বা সোমবারে, মাসের শুরুতে বা নতুন বছরের শুরুতে আসে না। পরিবর্তন শুরু হয় তখন, যখন আপনি শুরু করেন।

জীবন অনেক ছোট। অথচ আমরা বাজে অভ্যাসে দিনগুলো নষ্ট করি। জীবন অনেক বিস্তৃত, যদি আমরা অল্পেই সন্তুষ্ট থাকি। তাই আজই শুরু করুন। যাতে আগামীকাল আপনি নিজেকে আজকের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত, শক্তিশালী এবং সফল হয়ে উঠতে পারেন। মহান আল্লাহর ঐ বাণী অবশ্যই মনে রাখবেন,إِنَّ اللهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنْفُسِهِمْ، ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোন জাতির অবস্থার পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে’ (রা’দ ১৩/ ১১)

 [এমফিল গবেষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়]


[1]. আবুদাঊদ হা/৪৯৮৫; মিশকাত হা/১২৫৩।

[2]. মুসলিম হা/৮০৪; মিশকাত হা/২১২০ রাবী আবু উমামাহ (রাঃ)।

[3]. বুখারী হা/৬৩০৭; মিশকাত হা/২৩২৩ রাবী আবু হুরায়রা (রাঃ)।

[4]. ইহইয়াউ উলূমুদ্দীন ৭/৩০৬ পৃ.।

[5]. বুখারী হা/৬৪১২।

[6]. মুসলিম হা/২৬৬৪; মিশকাত হা/৫২৯৮; রাবী আবু হুরায়রা (রাঃ)।

[7]. বুখারী হা/১৯৭৫; মুসিলম হা/১১৫৯; মিশকাত হা/২০৫৫।

[8]. মুসলিম হা/২৬৬৪; মিশকাত হা/৫২৯৮; রাবী আবু হুরায়রা (রাঃ)।

[9]. তিরমিযী হা/২০৮০; মিশকাত হা/৫০৯২।

[10]. তিরমিযী হা/২০৮০; মিশকাত হা/৫০৯২।

[11]. মুসলিম হা/৯১; রাবী আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ)।

[12]. মুসলিম হা/২২৩; মিশকাত হা/২৮১ ‘পবিত্রতা’ অধ্যায়।



বিষয়সমূহ: বিবিধ
আরও