যেভাবে প্রশান্তি ছড়িয়ে দিতেন নবী (ছাঃ)

আসাদুল্লাহ আল-গালিব 420 বার পঠিত

জীবন সবসময় হাসি-খুশির নয়। এখানে আছে দুঃখ-কষ্ট, উত্থান-পতন। অনেক সময় এমনও মুহূর্ত আসে, যখন বুক ভারী হয়ে যায়। মন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। তখন আমরা নীরব হয়ে এক ধরনের ব্যথাভরা নিস্তব্ধতায় ডুবে থাকি। দু’হাতের ফাঁকে মাথা লুকিয়ে একটু ভালবাসা খুঁজি, স্নেহমাখা একটি শব্দ কিংবা অন্তত এমন একটি দৃষ্টি, যা মনে করিয়ে দেবে তুমি একা নও, আমরা তোমার পাশে আছি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, খুব কম মানুষই আমাদের নীরবতার ভাষা বুঝেন, আমাদের হৃদয়ের গভীরে লুকানো ব্যথা অনুভব করেন।

তথাপি জীবন তখনই সত্যিকারের সুন্দর হয়ে ওঠে, যখন আমরা এমন মানুষদের সান্নিধ্যে থাকি, যারা আমাদের না বলা কথা বুঝেন। যারা আমাদের নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসে, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য ব্যাকুল থাকেন। এই মহান গুণের সর্বোচ্চ উদাহরণ হলেন আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদ (ছাঃ)। তিনি ছিলেন ভগ্ন হৃদয় জোড়ার আলোকবর্তিকা। তার জীবনের উল্লেখ্যযোগ্য একটি দিক ছিল দুঃখীদের সান্ত্বনা দেওয়া, অভাবগ্রস্তদের সাহায্য করা, হতাশাগ্রস্তদের আশায় ভরিয়ে তোলা। তিনি দুঃখীর মুখে হাসি ফুটাতেন, আহত হৃদয়ে প্রশান্তির সুধা ঢালতেন। তার কোমল ব্যবহার, স্নিগ্ধ বাণী আর মমতামাখা আচরণ ভাঙা মনকেও গড়ে তুলত। ক্লান্ত আত্মাকে দিত শান্তির পরশ। আর এভাবেই তিনি মানুষের হৃদয় জয় করতেন। আলোচ্য প্রবন্ধে আমরা রাসূল (ছাঃ)-এর সেই উজ্জ্বল দৃষ্টান্তগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করব, যাতে পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়, চোখে অশ্রু আসে, আর অন্তরে প্রশান্তি জন্ম নেয়।

১. ব্যথাতুর স্ত্রী ছাফিইয়াহ্কে সান্ত্বনা : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কখনোই কোনো অশ্রু কিংবা ভাঙা হৃদয়কে উপেক্ষা করতেন না। তিনি মানুষের দুঃখকে অনুভব করতেন। তাদের ব্যথা নিজের হৃদয়ে টেনে নিতেন। তাই তো তিনি প্রথমে মমতার সঙ্গে প্রশ্ন করতেন, তারপর সান্ত্বনা দিতেন, প্রয়োজনে কোমল ভৎর্সনাও করতেন। আর সবকিছুর ভেতরে থাকত মমতা, শিক্ষা আর ন্যায়ের এক অনন্য সমন্বয়।

আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ)-এর স্ত্রী ছাফিইয়াহর কাছে এ কথাটি পৌছেছে যে, হাফসাহ (রাঃ) তাকে ইহূদী কন্যা বলেছেন। এ কথা শুনে ছাফিইয়াহ কাঁদতে লাগলেন। এমন সময় নবী করীম (ছাঃ) তার কাছে গিয়ে দেখলেন, তিনি কাঁদছেন। প্রশ্ন করলেন, কি কারণে তুমি কাঁদছ? ছাফিইয়াহ (রাঃ) বললেন, হাফসাহ আমাকে ইহূদী কন্যা বলেছে। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন,وَإِنَّكِ لَابْنَةُ نَبِيٍّ، وَإِنَّ عَمَّكِ لَنَبِيٌّ، وَإِنَّكِ لَتَحْتَ نَبِيٍّ، فَفِيمَ تَفْخَرُ عَلَيْكِ... ‘তুমি তো এক নবীর কন্যা, আরেক নবী তোমার চাচা এবং তুমি আরেক নবীর স্ত্রী। অতএব হাফসা কোন কথায় তোমার ওপর গর্ব করতে পারে? অতঃপর তিনি বললেন, হে হাফসা! আল্লাহকে ভয় কর’।[1]

রাসূল (ছাঃ) স্ত্রী ছাফিইয়াহ (রাঃ)-এর বেদনাহত হৃদয় উপলব্ধি করে শুধু তার হয়ে কথা বলেননি, বরং তার মর্যাদা ফিরিয়ে দিয়েছেন। তার আত্মসম্মানকে উঁচু করেছেন, নবুঅতের ছায়ায় তাকে সম্মানিত করেছেন। ফলতঃ এমন সময় কি চোখে অশ্রু থাকতে পারে? এধরনের সান্ত্বনায় মন থেকে ভাঙন দূর হয়ে যাবে, হৃদয়ে ভরে উঠবে নতুন আত্মবিশ্বাস আর মর্যাদার গৌরবে।

শিক্ষা : একটি তীক্ষ্ণ বাক্য হৌক তা অনিচ্ছাকৃত, হৃদয়কে ভেঙে দিতে পারে। তাই আমাদের উচিত রাসূল (ছাঃ) পথ অনুসরণ করা। কোমলভাবে প্রশ্ন করা, স্নেহের পরশে ব্যথা মুছে দেওয়া। আর ভেঙে যাওয়া হৃদয়কে শক্ত করে দাঁড় করিয়ে দেওয়া।

২. বেদুঈন যাহেরকে মূল্যায়ন : নবী করীম (ছাঃ) জানতেন কখন, কীভাবে ভাঙা হৃদয় জোড়া দিতে হয়। তিনি শুধু কথা দিয়ে নয়, বরং স্নেহের ছোঁয়ায় আপন করে নেওয়া আর রসিকতার মাধ্যমেও ছাহাবীদের মন ভরিয়ে দিতেন। ফলে এক সাধারণ স্থানটিও তার উপস্থিতিতে পরিণত হ’ত দয়া, ভালবাসা ও সম্মান প্রদানের এক অন্যন্য আসরে।

আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, যাহের নামে এক বেদুঈন গ্রাম থেকে নবী করীম (ছাঃ)-এর কাছে উপহার নিয়ে আসতেন। আর নবী করীম (ছাঃ) শহর থেকে তার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র প্রস্ত্তত করে দিতেন। তিনি বলতেন, إِنَّ زَاهِراً بَادِيَتُنَا وَنَحْنُ حَاضِرُوهُ ‘যাহের আমাদের গ্রামের প্রতিনিধি, আর আমরা তার শহরের প্রতিনিধি’। নবী করীম (ছাঃ) তাকে খুব ভালবাসতেন। যাহের ছিল দেখতে খাটো আর মোটাসোটা। চেহারায় কোন আকর্ষণ ছিল না। একদিন যাহের বাজারে জিনিস-পত্র বিক্রি করছিল, এমন সময় নবী করীম (ছাঃ) হঠাৎ পেছন থেকে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন। যাহের তখন দেখতে পাচ্ছিল না কে তাকে ধরেছে! সে বলল, ছাড়ুন! কে আপনি? পেছন ফিরে তাকাতেই বুঝল, তিনি আল্লাহর নবী। সঙ্গে সঙ্গে সে খুশি হয়ে নিজের পিঠকে নবী করীম (ছাঃ) বুকের সাথে ঠেসে ধরতে লাগল, যেন আঁকড়ে রাখতে চায়। তখন আল্লাহর নবী মজা করে বলতে লাগলেন, কে এই দাসকে কিনবে? কে এই দাসকে কিনবে? যাহের হেসে কেঁদে ফেলল। হায় আল্লাহর রাসূল! আপনি যদি আমাকে বিক্রি করতে চান, তবে আমি তো একেবারেই মূল্যহীন, কেউ আমাকে কিনবে না। তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, لَكِنْ عِنْدَ اللهِ لَسْتَ بِكَاسِدٍ ‘কিন্তু আল্লাহর কাছে তুমি কখনো মূল্যহীন নও’। অথবা তিনি বললেন, لَكِنْ عِنْدَ اللهِ أَنْتَ غَالٍ ‘কিন্তু আল্লাহর কাছে তুমি মূল্যবান’।[2]

রাসূল (ছাঃ) যাহেরকে মজার ছলে খোঁচা দিলেন। কিন্তু যাহেরের মুখ থেকে বেরিয়ে এল বহুদিনের চাপা কষ্ট। রাসূল (ছাঃ) তা গভীরভাবে বুঝলেন, আর কোমল কথায় বললেন, ‘কিন্তু আল্লাহর কাছে তুমি কখনো মূল্যহীন নও’। রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট থেকে এমন অশেষ মূল্যায়নে তার আত্মঅবমূল্যায়ন কি থাকতে পারে! রাসূল (ছাঃ)-এর এমন সান্নিধ্য তার হৃদয় ভরে উঠবে সম্মান আর ভালবাসায়।

শিক্ষা : অনেক মানুষের চেহারায় বা স্বভাব-চরিত্রে এমন কিছু থাকতে পারে, যা তারা নিজেরাই অপছন্দ করে, কিংবা অন্যেরা তাতে ত্রুটি খুঁজে। কিন্তু তাদের সেই কষ্টকে আর না বাড়িয়ে বরং যদি একটি স্নেহভরা কথা বলা যায়, তবে সেটাই হবে তাদের হৃদয়ের সান্তনা। তাই নিজেদের তুচ্ছ মনে করা মানুষদের কাছে পৌঁছে দিন এমন সুসংবাদ বার্তা যা তার জন্য আল্লাহর কাছে আছে, কিন্তু নিজেই উপলব্ধি করতে পারো না।

৩. জান্নাত প্রত্যাশী বৃদ্ধার সাথে মৃদু রসিকতা : রাসূল (ছাঃ) ছিলেন দয়ার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তিনি কাউকে বিমুখ করতেন না। তিনি জানতেন একটি হৃদয়ে কিভাবে সুখ ঢেলে দিতে হয়। তিনি মাধুর্যপূর্ণ ভালবাসায় টেনে নিতেন আল্লাহ ও তাঁর সুখময় জান্নাত পানে। তার রসিকতাতেও লুকিয়ে থাকত দাওয়াত, শিক্ষা আর সুসংবাদ। এমনই এক বৃদ্ধা মহিলাকে সামান্য রসিকতার মধ্য দিয়ে তিনি জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন।

আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী করীম জনৈক বৃদ্ধা মহিলাকে বললেন, কোন বৃদ্ধা জান্নাতে যাবে না। বৃদ্ধা জিজ্ঞেস করল, কি কারণে বৃদ্ধারা জান্নাতে যাবে না? অথচ এ বৃদ্ধা মহিলা কুরআন পাঠ করেছিল। তখন রাসূল (ছাঃ) তাকে বললেন, তুমি কি কুরআনের এ আয়াত পাঠ করনিإِنَّا أَنْشَأْنَاهُنَّ إِنشاءً- فَجَعَلْنَاهُنَّ أَبْكَارًا- ‘আমরা তাদেরকে (অর্থাৎ জান্নাতী রমনীদের) সৃষ্টি করেছি বিশেষ রূপে’। ‘অতঃপর আমরা তাদেরকে করেছি কুমারী’ (&ওয়াক্বি‘আহ ৫৬/৩৫-৩৬)[3]

সেই বৃদ্ধা প্রথমে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। ভেবে নিয়েছিলেন, হয়তো জান্নাত আর তার জন্য নয়। কিন্তু নবী করীম (ছাঃ) তাকে সে অবস্থায় ছেড়ে দিলেন না। তিনি এমনভাবে বুঝালেন, এমন মধুর বাণী শোনালেন যে, মুহূর্তেই তার দুঃখ মিলিয়ে গেল। অশ্রু বদলে গেল হাসিতে, হতাশা বদলে গেল অগাধ আশায়। তার অন্তর ভরে গেল দৃঢ় বিশ্বাসে জান্নাত তাকে নতুন যৌবনের রূপে আলিঙ্গন করবে।

শিক্ষা : একটি ছোট্ট কথা কখনো কখনো মানুষের অন্তর ভেঙে দিতে পারে। আর একইভাবে একটি কোমল বাক্য সেই ভাঙা মনকে জোড়া লাগাতে পারে। যদি আপনার কথায় কারো মনে কষ্টের আঁচ লাগে, তবে দেরি না করে বুঝিয়ে দিন, ভরসা দিন। এতে তার হৃদয়টা আনন্দে প্রশস্ত থেকে প্রশস্তর হবে।

৪. সন্তান হারানো মাকে সান্ত্বনা : সন্তান হারানোর বেদনায় মায়ের হৃদয় যখন ছিন্নভিন্ন, তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তার যন্ত্রণাভরা কথাগুলোর জন্য তাকে দোষারোপ করেননি। বরং স্নেহ ও মমতার পরশে তিনি দিলেন এক মহা সুসংবাদ, যা মুহূর্তেই মায়ের শোকভারী সন্দেহকে রূপ দিল দৃঢ় আশ্বাসে। আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, বদরের যুদ্ধে হারেছাহ (রাঃ) অজ্ঞাত তীরের আঘাতে শাহাদাত লাভ করলে তার মা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার অন্তরে হারেছাহর মায়া-মমতা যে কত গভীর তা তো আপনি জানেন। অতএব সে যদি জান্নাতে থাকে তবে আমি তার জন্য রোনাজারি করব না। আর যদি তা না হয়, তবে আপনি শীঘ্রই দেখবেন আমি কী করি। তখন রাসূল (ছাঃ) তাকে বললেন,هَبِلْتِ، أَجَنَّةٌ وَاحِدَةٌ هِىَ إِنَّهَا جِنَانٌ كَثِيرَةٌ، وَإِنَّهُ فِى الْفِرْدَوْسِ الأَعْلَى ‘তুমি কি জ্ঞানশূন্য হয়ে গেছ! জান্নাত কি একটি, না কি অনেক? আর সে তো সবচেয়ে উন্নত মর্যাদার জান্নাত ফিরদাউসে আছে’।[4]

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর দয়া ছিল মায়ের ব্যথার চেয়েও অগ্রগামী। তিনি তার কষ্টকে বাড়াননি। বরং প্রশমিত করেছেন। সংশয় ও প্রশ্নের ঘূর্ণিপাকে ডুবে যেতে দেননি। বরং নিশ্চিন্ততার আলোয় টেনে তুলেছেন এই বাণী দিয়ে, ‘সে তো সবচেয়ে উন্নত মর্যাদার জান্নাত ফিরদাউসে আছে’। এমন বাক্য শোনার পর মায়ের হৃদয় কি আর অশান্ত থাকতে পারে!

শিক্ষা : দুঃখাহত মানুষের বেদনা-বিধুর বাক্যে বিস্মিত হবেন না। কখনো কখনো গভীর কষ্ট জ্ঞানী মানুষকেও অসংলগ্ন করে তোলে। কারো এমন পরিস্থিতিতে তাকে ভৎর্সনা না করে, তার সাথে আরও কোমল ও সহমর্মী হৌন। তাকে সান্ত্বনা ও আশার আলো দিন। এমন বাক্য উচ্চারণ করুন, যা তার চোখের পানি মুছে দিয়ে হৃদয়কে আলোকিত করে তোলে। 

৪. দুর্বল শরীরের অধিকারী ইবনু মাসঊদের প্রতি সহমর্মিতা : রাসূল (ছাঃ) কাউকে এমন পরিস্থিতি ছেড়ে দেননি, যেখানে কারো হৃদয় ভেঙে যেতে পারে বা মর্যাদা ক্ষুণন হ’তে পারে। তিনি কাউকে কারোর ওপর হাস্যরস তৈরি হ’তে দেননি; বরং তা পরিণত করতেন মর্যাদা বৃদ্ধি এবং আল্লাহর কাছে ওজন অর্জনের এক মহৎ সুযোগে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) একবার আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ)-এর পা দেখলেন। তার পা ছিল সরু ও নাজুক। শরীরের ওপর দৃষ্টি পড়লেই মনে হ’ত দুর্বল। কিছু ছাহাবী এটি দেখে হেসে ফেললেন। তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, وَالَّذِى نَفْسِى بِيَدِهِ لَهُمَا أَثْقَلُ فِى الْمِيزَانِ مِنْ أُحُدٍ ‘তোমরা কি তার পায়ের সরুতা দেখে হাসছো? যা আমার প্রাণের কসম! ক্বিয়ামতের দিন, এই দুই পা হবে ওজনের পাল্লায় ওহোদ পর্বতের চেয়েও ভারী’।[5]

আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ নিজের পক্ষে কোনো প্রতিরক্ষা চাইলেন না, ন্যায্যতা দাবি করলেন না। কিন্তু নবী করীম (ছাঃ) সর্বাধিক বোঝাপড়া এবং সহমর্মিতা নিয়ে তাকে সমর্থন করলেন, একটি স্নেহময় বাক্যে তার মর্যাদা এমনভাবে বৃদ্ধি করলেন যে হাস্যরসটি আর কোনো ক্ষতি করতে পারেনি।

শিক্ষা : কারো অবমূল্যায়ন বা ভগ্ন হৃদয় দেখলে তার পাশে দাঁড়ান, তার মনস্তাত্বিক মনোবল বৃদ্ধিতে চেষ্টা করুন, তার বিশেষ মর্যাদা মনে করিয়ে দিন। কারণ সত্যিকারের শক্তি আসে ভেতরের বিশ্বাস, সৎ মনোভাব এবং আন্তরিক সহমর্মিতা থেকে, বাহ্যিক আকার বা শক্তি থেকে নয়।

৫. মৃত্যু সংবাদে কাতর কন্যাকে সান্তনা : জীবনের শেষ প্রহরেও নবী করীম (ছাঃ) নিজের কষ্ট নয়, প্রিয়জনের অনুভূতিকেই অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। তিনি আগতদের স্নেহভরে বরণ করতেন, তাদের আবেগকে সম্মান দিতেন এবং প্রতিটি শব্দ খুব যত্নের সাথে বেছে নিতেন। তার প্রতিটি আচরণে ফুটে উঠত শিক্ষা ও মমতা, বিদায় আর স্নেহের এক অপূর্ব মিশ্রণ।

আয়েশা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ)-এর সকল বিবি একত্রিত হলেন। তাদের মধ্যে একজনও বাদ রইলেন না। তখন ফাতেমা হেঁটে আসলেন। তার হাটার ভঙ্গী যেন একেবারে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর চলার মত। তিনি বললেন, খোশ আমদেদ স্নেহের মেয়ে আমার! অতঃপর তাকে তার ডানদিকে কিংবা তার বামদিকে বসালেন এবং চুপি চুপি কিছু কথা বললেন। এতে ফাতেমা কেঁদে ফেললেন। তারপর তিনি তাকে চুপি চুপি আবার কিছু বললেন, এতে তিনি হাসলেন। আমি তাকে বললাম, কিসে তোমাকে কাঁদালো? তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর গোপন কথা ফাস করতে পারি না। আমি বললাম, আমি আজকের মতো কোন আনন্দকে বেদনার এতো নিকটবর্তী দেখি নি। আমি বললাম, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদের ছেড়ে তোমাকে তার কথা বলার জন্য বিশেষত্ব দান করলেন। আর তুমি কাঁদছো? আবার তাকে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কী বলেছেন, তা জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর গোপন কথা প্রকাশ করতে পারি না।

অবশেষে যখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ইন্তেকাল করলেন, তখন আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম। তখন তিনি বললেন, তিনি আমাকে বলেছিলেন জিব্রীল (আঃ) প্রতি বছর একবার তার সঙ্গে কুরআন আবৃতি করতেন। আর এ বছর তিনি তার সঙ্গে দু’বার আবৃতি করেছেন। এতে আমার মনে হয় নিশ্চয়ই মৃত্যু আমার নিকটবর্তী। আর তুমিই আমার পরিজনদের মাঝে সর্বপ্রথম আমার সঙ্গে মিলিত হবে। তোমার জন্য আমি কতই না উত্তম অগ্রগামী। তখন আমি কেঁদেছি। এরপর তিনি আমাকে চুপ চুপি বললেন, ‘তুমি ঈমানদার মহিলাদের প্রধান অথবা এ উম্মতের মহিলাদের সরদার হওয়া কি পসন্দ কর না? একথা শুনে আমি হেসেছি’।[6]

পিতা নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) মেয়ে ফাতেমাকে এমন সুসংবাদে দিলেন, তুমিই আমার পরিজনদের মাঝে সর্বপ্রথম আমার সঙ্গে মিলিত হবে। এতে ফাতেমা বিদায়ের বেদনায় কাঁদছিলেন। এরপর যখন পিতা মাধ্যমে জানলেন, জান্নাতে নারীদের সর্দার হওয়ার সুসংবাদ, তখন মুহূর্তেই দুঃখ গলে পরিণত হল আনন্দে; কান্না রূপ নিল হাসিতে। কারণ পিতার সান্ত্বনা তার হৃদয়ের গভীরতম ক্ষতকেও প্রশমিত করল।

শিক্ষা : ভালবাসার প্রিয় মানুষটির বিচ্ছেদে পর্যদুস্ত ব্যক্তিকে বা মুমূর্ষু অবস্থায় পতিত ব্যক্তিকে বা আশাহত কোন ব্যক্তিকে একটি আশ্বাসবাণী দিন। তার সাথে মমতা জড়িত কথা বলুন। কারণ অসংখ্য ব্যথিত হৃদয় শুধু একটি কোমল বাক্যের অপেক্ষায় থাকে। যা তার ভাঙা মনকে জোড়া লাগাবে, প্রশান্তি ফিরিয়ে দেবে এবং আবারও মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলবে।

৬. প্রিয় ব্যক্তির সাথে হাশর-নাশর : নবী করীম (ছাঃ) তার ছাহাবীদের হৃদয় জয় করেছিলেন তাদের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিয়ে, ভালবাসাকে ঈমানের শিখরে স্থান দিয়ে। তিনি কোনো কঠিন শর্ত চাপিয়ে দেননি; বরং আশার দুয়ার খুলে দিয়েছিলেন। তিনি তাদের বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ঈমানের আসল সত্য মানুষ তার প্রিয়জনের সাথেই থাকবে। ইবনে মাসঊদ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, এক ব্যক্তি এসে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! কোন ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়কে ভালবাসে, কিন্তু (আমলে) তাদের সমকক্ষ হ’তে পারেনি। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, ‘মানুষ যাকে ভালবাসে, সে তারই সাথী হবে’।[7]

এই বাক্যটি ছাহাবীদের অন্তরে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিল। এজন্য তারা আল্লাহর রাসূল ও জলীল ছাহাবীদের হৃদয়ের গভীর থেকে ভালতেন। যেমন আনাস (রাঃ) বলেন, ইসলাম গ্রহণের পরে কোন কিছুতে আমরা এত বেশী খুশী হইনি যতটা নবী করীম (ছাঃ)-এর বাণী فَإِنَّكَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ ‘তুমি তার সঙ্গেই (থাকবে) যাকে তুমি ভালবাস’ দ্বারা আনন্দ লাভ করেছি। আনাস (রাঃ) বলেন, আমি আল্লাহ, তার রাসূল, আবুবকর ও ওমর (রাঃ)-কে ভালবাসি। সুতরাং আমি আশা করি যে, ক্বিয়ামত দিবসে আমি তাদের সঙ্গে থাকব, যদিও আমি তাদের মত আমল করতে পারিনি’।[8]

শিক্ষা : ভালবাসা তখনই জান্নাতের পথ হয়ে দাঁড়ায়, যখন তা সত্যিকার অর্থে সৎ ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে। আমল কম হলেও যদি ভালবাসা হয় সত্যিকার, তবে সেই ভালবাসাই জান্নাতের দুয়ার খুলে দিতে পারে, সৎকর্মশীলদের সান্নিধ্যে পৌঁছে দিতে পারে। তাই প্রিয়জনদের প্রতি ভালবাসা হারিয়ে ফেলবেন না।

৭.যেনাকারিণী নারীর তওবার গভীরতা : নবী করীম (ছাঃ) কখনো তওবাকারীর তওবাকে শুধু বাহ্যিক সীমাবদ্ধতায় আটকে রাখেন নি; বরং তিনি তার অন্তরকে জুড়িয়ে দিতেন। তার মর্যাদা প্রকাশ করতেন ও তার মান বৃদ্ধি করতেন। যদিও তিনি মৃত্যুবরণ করে থাকেন। এমন এক দৃষ্টান্তমূলক ঘটনা ঘটেছিল মদীনায় এক নারীর ক্ষেত্রে।

আবু নুজাইদ ইমরান ইবনু হোসাইন আল-খুযায়ী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত যে, জুহাইনা গোত্রের একটি নারী আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট হাযির হ’ল। সে অবৈধ মিলনে গর্ভবতী ছিল। সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি দন্ডনীয় অপরাধ করে ফেলেছি। তাই আপনি আমাকে শাস্তি দিন! সুতরাং আল্লাহর নবী (ছাঃ) তার আত্মীয়কে ডেকে বললেন, তুমি একে নিজের কাছে যত্ন সহকারে রাখ এবং সন্তান প্রসবের পর একে আমার নিকট নিয়ে এসো। সুতরাং সে তাই করল (অর্থাৎ প্রসবের পর তাকে রাসূল (ছাঃ)-এর কাছে নিয়ে এল)। আল্লাহর নবী তার কাপড় তার (শরীরের) উপর মযবুত করে বেঁধে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন।

অতঃপর তাকে রজম তথা পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলার আদেশ দিলেন। অতঃপর তিনি তার জানাযার ছালাত পড়লেন। ওমর (রাঃ) তাঁকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এই মেয়ের জানাযার ছালাত পড়লেন, অথচ সে ব্যভিচার করেছিল? তিনি বললেন, (ওমর! তুমি জান না যে,) এই মহিলাটি এমন বিশুদ্ধ তওবা করেছে, যদি তা মদীনার ৭০টি লোকের মধ্যে বন্টন করা হ’ত, তা তাদের জন্য যথেষ্ট হ’ত। এর চেয়ে কি তুমি কোন উত্তম কাজ পেয়েছ যে, সে আল্লাহর জন্য নিজের প্রাণকে কুরবান করে দিল?[9]

উক্ত মহিলার কী মহিমান্বিত স্বীকৃতি! তিনি নিজের জন্য কিছুই রেখে যাননি, বরং আত্মাকে পবিত্র করে আল্লাহর কাছে সমর্পণ করেছিলেন। তাই তো নবী করীম (ছাঃ) তাকে এমন এক সম্মান দিলেন, যা মৃত্যুর পরও স্মরণীয় হয়ে থেকে গেল। তার স্মৃতি হয়ে গেল গর্বের ইতিহাস, এক শিক্ষার আলোকবর্তিকা, কলঙ্ক নয়।

শিক্ষা : অতীতের দোষ দিয়ে অপমান ও কটু কথায় তওবাকারীর আলোকে নিভিয়ে দেওয়া উচিত নয়। তার জন্য সবচেয়ে বড় সহায়তা হ’ল, তাকে তওবায় দৃঢ় হ’তে সাহায্য করা। মনে রাখা উচিত, যে ভগ্ন হৃদয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে আসে, আল্লাহ তাকে মর্যাদার উচ্চ শিখরে পৌঁছে দেন। আর তার জীবনের গল্পকে অন্যদের জন্য দৃষ্টান্ত বানিয়ে দেন।

৮. মায়েযের প্রতি রাসূলের দৃষ্টিভঙ্গি : নবী করীম (ছাঃ) কোন অপরাধীকে হদ্দ প্রয়োগে কখনোই তাড়াহুড়া করেননি। বরং অপেক্ষা ও অযুহাত খুঁজতেন। যেমন মায়েযের জন্য ক্ষুদ্রতম অযুহাত খুঁজে ফিরেছিলেন। হয়তো এটি সরাসরি ব্যভিচার নয়, হয়তো এর চেয়ে হালকা কোনো গুনাহ। কারণ তার লক্ষ্য ছিল না শাস্তি দেওয়া। বরং রহমত ছড়িয়ে দেওয়া। তিনি তওবার দরজা খোলা রেখেছিলেন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত।

সুলায়মান ইবনু বুরায়েদ (রহঃ) তাঁর পিতা হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, মায়েয ইবনু মালেক নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে পবিত্র করুন। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, দুর্ভাগা! ফিরে চলে যাও এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর ও তওবা কর। বর্ণনাকারী বলেন যে, লোকটি অল্পদূর চলে গিয়ে আবার ফিরে এল। এরপর বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে পবিত্র করুন। তখন নবী করীম পূর্বের মতই কথা বললেন।

চতুর্থবার রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে বললেন, কোন বিষয়ে আমি তোমাকে পবিত্র করব? তখন সে বলল, ব্যভিচার হতে। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তার (সঙ্গী সাথীদের নিকট) জিজ্ঞাসা করলেন, তার মধ্যে কি কোন পাগলামী আছে। তখন তাঁকে জানানো হ’ল যে, সে পাগল নয়। এরপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, সে মদ্যপান করেছে। তখন এক ব্যক্তি দন্ডায়মান হ’ল এবং তার মুখ শুকে দেখল, সে তার মুখ থেকে মদের গন্ধ পেল না। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ঐ ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি ব্যভিচার করেছ? প্রত্যিত্তরে সে বলল, জী হ্যাঁ। অতএব রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তার প্রতি (ব্যভিচারের শাস্তি প্রদানের) নির্দেশ দিলেন। এরপর ত্যকে পাথর নিক্ষেপ করা হ’ল।

পরে এ ব্যাপারে জনগণ দু’দলে বিভক্ত হয়ে গেল। একদল বলতে লাগল, নিশ্চয়ই সে (মায়েয) ধ্বংস হয়ে গেছে। নিশ্চয়ই তার পাপ তাকে ঘিরে ফেলেছে। দ্বিতীয় দল বলতে লাগল, মায়েয এর তওবার চেয়ে উত্তম (তওবার অনুশোচনা) আর হয় না। সে প্রথমে নবী করীম (ছাঃ)-এর কাছে আগমন করল এবং নিজের হাত তার হাতের উপর রাখল। এরপর বলল আমাকে পাথর দ্বারা হত্যা করুন। বর্ণনা কারী বলেন যে, দু’তিন দিন পর্যন্ত মানুষ এ অবস্থায় অতিবাহিত করল।

এরপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আগমন করলেন তখন তারা (ছাহাবীগণ) বসে ছিলেন। তিনি সালাম দিলেন, এরপর বসলেন এবং বললেন, তোমরা মায়েয বিন মালেক এর জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। তখন তারা বললেন, আল্লাহ মায়েয বিন মালেককে ক্ষমা করুন। এরপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, সে এমন তওবা করেছে, যদি তা এক উম্মতের লোকদের মাঝে বন্টিত হয়, তবে সকলের জন্য তা যথেষ্ট হবে’।[10]

মায়েয যদিও এক মহাপাপে পতিত হয়েছিল, তবুও নবী করীম (ছাঃ) তার মৃত্যুর পরও তাকে সম্মানিত করলেন। সমালোচনার সব পথ রুদ্ধ করে দিলেন এবং ঘোষণা দিলেন, সে এমন তওবা করেছে, তা যদি সমগ্র উম্মতের মাঝে ভাগ করে দেওয়া হ’ত, তবে সবার জন্য যথেষ্ট হ’ত’। এভাবে তিনি তার মর্যাদা উঁচু করলেন, তার জীবনের অধ্যায়কে কলঙ্কমুক্ত করে গৌরবে রূপ দিলেন। আর তার ঘৃণ্য স্মৃতিকে এক শিক্ষণীয় ও গর্বের কাহিনীতে পরিণত করলেন।

শিক্ষা : আপনি যখন কোন পাপীকে তওবা করতে দেখেন, তখন তার অতীতের আঁধারের দিকে তাকাবেন না। বরং তার বর্তমানকে গড়ে তুলতে পাশে দাঁড়ান। কারণ তওবাকারীর জন্য আঘাত নয়, প্রয়োজন এমন সহানুভূতিশীলতা, যা তাকে আল্লাহর নৈকট্যশীল হ’তে সহায়তা করে।

৯. মদ্যপায়ী আব্দুল্লাহর প্রতি রাসূল (ছাঃ)-এর দৃষ্টিভঙ্গি : নবী করীম (ছাঃ) ভুলকে উপেক্ষা করতেন না। কিন্তু শাস্তির চেয়ে তার কাছে রহমতই ছিল অগ্রগণ্য। তিনি কখনো চাননি যেন কোনো পাপী তার গুনাহ আর মানুষের অভিশাপের ফাঁদে বন্দি হয়ে পড়ে। বরং তিনি তাকে টেনে তুলতে দিতেন করুণার দড়ি, যা তাকে আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছে দেয়।

ওমর ইবনুল খত্ত্বাব (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তির নাম ছিল আব্দুল্লাহ, কিন্তু তাকে ‘হিমার’ (গাধা) উপাধিতে ডাকা হ’ত। সে (অবোধের ন্যায় কথাবার্তা বলে) নবী করীম (ছাঃ)-কে হাসাত। একদিন মদ্যপানের জন্য তিনি তার ওপর দন্ড প্রয়োগ করেছিলেন। এরপর আবার একদিন তাকে নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট আনা হলে তিনি তাকে চাবুক মারার নির্দেশ দিলেন। তখন এক ব্যক্তি বলে উঠল, হে আল্লাহ! তার ওপর তোমার অভিসম্পাত বর্ষিত হোক। কতবারই না তাকে এ অপরাধে আনা হ’ল? এমতাবস্থায় নবী করীম (ছাঃ) বললেন, তাকে অভিশাপ দিও না। আল্লাহর শপথ! আমি তার সম্পর্কে জানি যে, সে আল্লাহ ও তার রাসূলকে ভালবাসে’।[11]

আব্দুল্লাহ মোটেও মুনাফিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত প্রেমিক, যার অন্তরের ভালবাসা তার ভুল-ত্রুটির চেয়ে অনেক ভারী ছিল। তাই নবী করীম (ছাঃ) চাইলেন তার মর্যাদা অটুট রাখতে, যেন কোনো স্থায়ী কলঙ্ক তার পিছু না নেয়। তিনি উচ্চারণ করলেন এক কালজয়ী বাক্য, فَوَاللهِ مَا عَلِمْتُ أَنَّهُ يُحِبُّ اللهَ وَرَسُولَهُ- ‘আল্লাহর শপথ! আমি তার সম্পর্কে জানি যে, সে আল্লাহ ও তার রাসূলকে ভালবাসে’।

শিক্ষা : আপনি কখনো কোনো পাপীকে তার অতীত গুনাহের শিকলে বেঁধে দিয়েন না। মনে রাখবেন, আপনার চোখে ধরা পড়ে শুধু তার কাজ, কিন্তু তার হৃদয়ের গোপন কথা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। হ’তে পারে তার ভেতরে এমন এক নিভৃত ভালবাসা বা এমন এক নীরব আমল আছে, যা আপনার সকল আমলের চেয়েও আল্লাহর কাছে প্রিয়।

১০. মসজিদের খাদেম/খাদেমাকে রাসূল (ছাঃ)-এর মূল্যায়ন : নবী করীম (ছাঃ) কাউকেই ভুলতেন না। হৌন না তিনি অন্যান্য ছাহাবীদের নিকট অতি তুচ্ছা বা নগণ্য। এমনও হয়েছে যে, নবী করীম (ছাঃ) একদিন ছালাত শেষে মসজিদে নববীর খাদেম বা খাদেমাকে দেখতে না পেয়ে তার খোঁজ নিলেন। নবীর হৃদয় সবসময় সেই মানুষদের দিকে ঝুঁকে থাকে, যাদের জন্য মৃত্যুর পরও স্নেহ ও যত্ন অপরিহার্য।

আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, কালোবর্ণের একজন মহিলা অথবা যুবক মসজিদ ঝাড়ু দিত। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে (একদিন) দেখতে পেলেন না। সুতরাং তিনি তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। ছাহাবীগণ বললেন, সে মারা গেছে। তিনি বললেন, তোমরা আমাকে সংবাদ দিলে না কেন? তারা যেন তার ব্যাপারটাকে নগণ্য ভেবেছিলেন। তিনি বললেন, আমাকে তার কবরটা দেখিয়ে দাও। সুতরাং তারা তার কবরটি দেখিয়ে দিলেন এবং তিনি তার কবরের উপর জানাযার ছালাত পড়লেন’।[12]

ছাহাবায়ে কেরাম মসজিদের ঝাড়ুদারকে নগণ্য মনে করে রাসূল (ছাঃ)-এর উপস্থিতি খুব যরূরী মনে করেননি। রাতেই তারা তার জানাযা সম্পন্ন করেন। কিন্তু পরবর্তীতে রাসূল (ছাঃ) তার কবরের পাশে গিয়ে জানাযার ছালাত পড়ে ফিরিয়ে দিলেন সেই অবহেলিত মর্যাদা। তার শব্দহীন বার্তা ছিল, সে ভুলে যাওয়ার যোগ্য নয়; আল্লাহ ও আমার কাছে সে মহিমান্বিত।

শিক্ষা : কোনো গোপন আমল বা লোকজনের দৃষ্টিতে ছোট কাজ কখনো হালকা ভাববেন না। আবার কোনো সাধারণ প্রচেষ্টা বা কাজকারীকেও অবমূল্যায়ন করবেন না। আল্লাহ যার মূল্য দেন, তা কখনো বৃথা যায় না। হ’তে পারে আপনি আল্লাহর চোখে মহান, যদিও কেউ তা না বোঝে। তাই আল্লাহর সঙ্গে সততা রাখুন, নিষ্ঠার সাথে সার্বিক কাজ করে যান। কারণ তিনি এমন এক সময় আপনাকে স্মরণীয় করবেন, যখন কেউ তা ভুলতে পারবে না।

(ক্রমশঃ)

[কেন্দ্রীয় অর্থ সম্পাদক, বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ]

 

[1]. তিরমিযী হা/৩৮৯৪; মিশকাত হা/৬১৮৩।

[2]. আহমাদ হা/১২৬৬৯, ছহীহ-শো‘আইব আরনাউত্ব; মুসনাদু আবী ইয়া‘লা হা/৩৪৫৬, ছহীহ-হোসাইন সালীম আসাদ।

[3]. শারহুস্ সুন্নাহ হা/৩৬০৬; মিশকাত হা/৫৪৮৮; ছহীহাহ হা/২৯৮৭।

[4]. বুখারী হা/৬৫৬৭; আহমাদ হা/১৩৮১৩।

[5]. আহমাদ হা/৩৯৯১; মুসনাদ আবু ইয়া‘লা হা/৫৩১০; ছহীহাহ হা/৩১৯২।

[6]. বুখারী হা/৬২৪৬; মুসিলম হা/২৪৫০; মিশকাত হা/৬১২৯।

[7]. বুখারী হা/৬১৬৯; মুসিলম হা/২৬৪০; মিশকাত হা/৫০০৮।

[8]. মুসিলম হা/২৬৩৯; আহমাদ হা/১৩৩৯৫।

[9]. মুসিলম হা/১৬৯৬।

[10]. মুসিলম হা/১৬৯৫।

[11]. বুখারী হা/৬৭৮০; মিশকাত হা/৩৬২৫ ‘দন্ডবিধি’ অধ্যায়।

[12]. বুখারী হা/৪৫৮; মুসলিম হা/৯৫৬; মিশকাত হা/১৬৫৯।



আরও