পাপীদের চক্রান্ত বনাম আল্লাহর কৌশল

তাওহীদের ডাক ডেস্ক 46 বার পঠিত

আল-কুরআনুল কারীম :

১- وَمَكَرُوْا وَمَكَرَ اللهُ وَاللهُ خَيْرُ الْمَاكِرِيْنَ-

(১) ‘তখন অবিশ্বাসীরা ষড়যন্ত্র করল এবং আল্লাহও কৌশল করলেন। আর আল্লাহ হ’লেন শ্রেষ্ঠ কৌশলী’ (আলে ইমরান ৩/৫৪)

২- وَإِذْ يَمْكُرُ بِكَ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا لِيُثْبِتُوْكَ أَوْ يَقْتُلُوْكَ أَوْ يُخْرِجُوْكَ وَيَمْكُرُوْنَ وَيَمْكُرُ اللهُ وَاللهُ خَيْرُ الْمَاكِرِيْنَ-

(২) ‘আর (স্মরণ কর,) যখন (মক্কার) কাফেররা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিল তোমাকে বন্দী করার জন্য অথবা হত্যা করার জন্য অথবা বের করে দেবার জন্য। বস্ত্ততঃ তারা চক্রান্ত করে আর আল্লাহ্ও কৌশল করেন। আর আল্লাহ্ই হ’লেন শ্রেষ্ঠ কৌশলী’ (আনফাল ৮/৩০)। 

৩- وَقَدْ مَكَرُوْا مَكْرَهُمْ وَعِنْدَ اللهِ مَكْرُهُمْ وَإِنْ كَانَ مَكْرُهُمْ لِتَزُوْلَ مِنْهُ الْجِبَالُ-

(৩) ‘তারা ভীষণ চক্রান্ত করেছিল। আর তাদের চক্রান্তসমূহ আল্লাহর নিকট ভালভাবেই জানা ছিল। যদিও তাদের চক্রান্ত এমন ছিল না, যার দ্বারা পাহাড়গুলি অপসারিত হয়ে যায়’ (ইব্রাহীম ১৪/৪৬)

৪- وَمَكَرُوْا مَكْرًا وَمَكَرْنَا مَكْرًا وَهُمْ لَا يَشْعُرُوْنَ- فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ مَكْرِهِمْ أَنَّا دَمَّرْنَاهُمْ وَقَوْمَهُمْ أَجْمَعِيْنَ-

(৪) ‘তারা ভয়ংকর চক্রান্ত করেছিল এবং আমরাও কৌশল করেছিলাম। অথচ তারা তা বুঝতে পারেনি’। ‘অতএব দেখ তাদের চক্রান্তের পরিণাম কি হয়েছিল। আমরা তাদেরকে ও তাদের সম্প্রদায়ের সকলকে ধ্বংস করে দিয়েছি’ (নাহল ২৭/৫০-৫১)

৫- فَلَمَّا جَاءَهُمْ نَذِيْرٌ مَا زَادَهُمْ إِلَّا نُفُوْرًا- اسْتِكْبَارًا فِي الْأَرْضِ وَمَكْرَ السَّيِّئِ وَلَا يَحِيْقُ الْمَكْرُ السَّيِّئُ إِلَّا بِأَهْلِهِ فَهَلْ يَنْظُرُوْنَ إِلَّا سُنَّتَ الْأَوَّلِيْنَ فَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّتِ اللهِ تَبْدِيْلًا وَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّتِ اللهِ تَحْوِيْلًا-

(৫) ‘যখন তাদের কাছে সতর্ককারী এল, তখন তাদের বিমুখতাই কেবল বৃদ্ধি পেল’। ‘জনপদে প্রাধান্য লাভের জন্য এবং কূট চক্রান্তের জন্য। অথচ কূট চক্রান্ত কেবল চক্রান্তকারীকেই বেষ্টন করে। তবে কি তারা তাদের পূর্ববর্তীদের ধ্বংস রীতির অপেক্ষা করছে? বস্ত্তত তুমি কখনো আল্লাহর রীতির পরিবর্তন পাবে না এবং তুমি কখনো আল্লাহর রীতির ব্যতিক্রম পাবে না’ (ফাতির ৩৫/৪২-৪৩)

৬- إِنْ تَمْسَسْكُمْ حَسَنَةٌ تَسُؤْهُمْ وَإِنْ تُصِبْكُمْ سَيِّئَةٌ يَفْرَحُوْا بِهَا وَإِنْ تَصْبِرُوْا وَتَتَّقُوْا لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا إِنَّ اللَّهَ بِمَا يَعْمَلُوْنَ مُحِيْطٌ-

(৬) ‘তোমাদের কোন কল্যাণ স্পর্শ করলে তারা নাখোশ হয়। আর তোমাদের কোন অকল্যাণ হ’লে তারা খুশী হয়। কিন্তু যদি তোমরা ধৈর্যধারণ কর ও আল্লাহভীরু হও, তাহ’লে ওদের চক্রান্ত তোমাদের কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। নিশ্চয়ই তারা যা কিছু করে, সবই আল্লাহ বেষ্টন করে আছেন’ (আলে ইমরান ৩/১২০)

৭- وَإِذَا أَذَقْنَا النَّاسَ رَحْمَةً مِنْ بَعْدِ ضَرَّاءَ مَسَّتْهُمْ إِذَا لَهُمْ مَكْرٌ فِيْ آيَاتِنَا قُلِ اللهُ أَسْرَعُ مَكْرًا إِنَّ رُسُلَنَا يَكْتُبُوْنَ مَا تَمْكُرُوْنَ-

(৭) ‘আর যখন আমরা মানুষকে কষ্টের পর রহমতের স্বাদ আস্বাদন করাই, তখন তারা আমাদের আয়াতসমূহে চক্রান্ত শুরু করে। বলে দাও, আল্লাহ আরও দ্রুত তোমাদের চক্রান্তের বদলা নিতে পারেন। নিশ্চয়ই আমাদের ফেরেশতারা তোমাদের সমস্ত চক্রান্ত লিপিবদ্ধ করছে’ (ইউনুস ১০/২১)

৮- الَّذِيْنَ آمَنُوْا يُقَاتِلُوْنَ فِيْ سَبِيْلِ اللهِ وَالَّذِيْنَ كَفَرُوْا يُقَاتِلُوْنَ فِيْ سَبِيْلِ الطَّاغُوْتِ فَقَاتِلُوْا أَوْلِيَاءَ الشَّيْطَانِ إِنَّ كَيْدَ الشَّيْطَانِ كَانَ ضَعِيْفًا-

(৮) ‘যারা ঈমানদার তারা লড়াই করে আল্লাহর পথে। আর যারা কাফের তারা লড়াই করে ত্বাগূতের পথে। অতএব তোমরা লড়াই কর শয়তানের বন্ধুদের বিরুদ্ধে। নিশ্চয়ই শয়তানের কৌশল অতীব দুর্বল’ (নিসা ৪/৭৬)

৯- ذَلِكَ لِيَعْلَمَ أَنِّي لَمْ أَخُنْهُ بِالْغَيْبِ وَأَنَّ اللهَ لَا يَهْدِيْ كَيْدَ الْخَائِنِيْنَ-

(৯) ‘এটা এজন্য বলছি, যাতে তিনি (গৃহস্বামী) জানতে পারেন যে, তার অগোচরে আমি তার প্রতি কোনরূপ বিশ্বাসঘাতকতা করিনি। বস্ত্তত আল্লাহ বিশ্বাসঘাতকদের ষড়যন্ত্র সফল করেন না’ (ইউসুফ ১২/৫২)

হাদীছের বাণী :

১০- عَنْ قَيْسِ بْنِ سَعْدٍ قَالَ: لَوْلَا أَنِّيْ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ صَــالْمَكْرُ وَالْخَدِيْعَةُ فِي النَّارِ لَكُنْتُ مِنْ أَمْكَرِ النَّاسِ-

(১০) ক্বায়েস বিন সা‘দ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি যদি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে এই কথা বলতে না শুনতাম যে, ‘কূটকৌশল এবং প্রতারণার পরিণাম জাহান্নাম’ তবে

আমি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কৌশলী হ’তাম’।[1]

১১- عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: الْمُؤْمِنُ غِرٌّ كَرِيْمٌ، وَالْفَاجِرُ خِبٌّ لَئِيْمٌ-

(১১) আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘মুমিন ব্যক্তি সরল ও ভদ্র প্রকৃতির হয়ে থাকে, কিন্তু পাপীষ্ঠ ব্যক্তি ধোঁকাবাজ ও নির্লজ্জ হয়’।[2]

১২- عَنْ عِيَاضِ بْنِ حِمَارٍ الْمُجَاشِعِيِّ، أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ ذَاتَ يَوْمٍ فِيْ خُطْبَتِهِ: ...وَأَهْلُ النَّارِ خَمْسَةٌ: ...وَرَجُلٌ لَا يُصْبِحُ وَلَا يُمْسِي إِلَّا وَهُوَ يُخَادِعُكَ عَنْ أَهْلِكَ وَمَالِكَ-

(১২) ইয়ায বিন হিমার আল-মুজাশিয়ী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁর এক ভাষণে বলেন,...‘আর জাহান্নামী হ’ল পাঁচ প্রকার। ... সেই ব্যক্তি যার সকাল ও সন্ধ্যা কাটে এই চিন্তায় যে, কীভাবে সে তোমার পরিবার এবং তোমার সম্পদ নিয়ে তোমার সাথে চক্রান্ত বা ধোঁকাবাজি করবে’।[3]

১৩- عَنْ عَبْدِ اللهِ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لِكُلِّ غَادِرٍ لِوَاءٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يُعْرَفُ بِهِ يُقَالُ: هَذِهِ غَدْرَةُ فُلَانٍ-

(১৩) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতক বা অঙ্গীকার ভঙ্গকারীর জন্য ক্বিয়ামত দিবসে একটা পতাকা স্থাপন করা হবে। আর বলা হবে যে, এটা অমুকের বিশ্বাসঘাতকতার নিদর্শন’।[4]

১৪- عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ سَمِعْتُ سَعْدًا رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ سَمِعْتُ النَّبِىَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُوْلُ لاَ يَكِيْدُ أَهْلَ الْمَدِيْنَةِ أَحَدٌ إِلاَّ انْمَاعَ كَمَا يَنْمَاعُ الْمِلْحُ فِى الْمَاءِ-

(১৪) হযরত আয়েশা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি সা‘দ (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, তিনি নবী করীম (করীম)-কে বলতে শুনেছেন, ‘মদীনাবাসীদের বিরুদ্ধে যে কেউই কোনো ষড়যন্ত্র করবে, সে অবশ্যই সেভাবে গলে নিঃশেষ হয়ে যাবে; যেভাবে পানির মধ্যে লবণ গলে বিলীন হয়ে যায়’।[5]

(১৫) আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইব্রাহীম (আঃ) তিনবার ব্যতীত কখনও কথাকে ঘুরিয়ে পেচিয়ে বলেন নি।... এরপর (অত্যাচারী রাজা) সারাকে আনার জন্য লোক পাঠালো। তিনি (সারা) যখন তার (রাজার) কাছে প্রবেশ করলেন এবং রাজা তাঁর দিকে হাত বাড়ালো তখনই সে (আল্লাহর গযবে) পাকড়াও হ’ল। তখন অত্যাচারী রাজা সারাকে বলল, আমার জন্য আল্লাহর নিকট দো‘আ কর, আমি তোমার কোন ক্ষতি করব না। তখন সারা আল্লাহর নিকট দো‘আ করলেন। ফলে সে মুক্তি পেয়ে গেল। এরপর দ্বিতীয়বার তাকে ধরতে চাইল। এইবার সে পূর্বের ন্যায় বা তার চেয়ে কঠিনভাবে (আল্লাহর গযবে) পাকড়াও হ’ল। এবারও সে বলল, আল্লাহর কাছে আমার জন্য দো‘আ কর। আমি তোমার কোন ক্ষতি করব না। আবারও তিনি দো‘আ করলেন, ফলে সে মুক্তি পেয়ে গেল। তারপর রাজা তার কোন এক দারোয়ানকে ডাকল। সে তাকে বলল, তুমি তো আমার কাছে কোন মানুষ নিয়ে আসোনি। বরং এনেছ এক শয়তান।

তারপর রাজা সারার খেদমতের জন্য হাযেরাকে দান করল। এরপর তিনি (সারা) তাঁর (ইব্রাহীম) কাছে আসলেন, তিনি দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করছিলেন। যখন তিনি (ছালাত রত অবস্থায়) হাত দ্বারা ইশারা করে সারাকে বললেন, কী ঘটেছে? তখন সারা বললেন, আল্লাহ কাফের বা ফাসেকের চক্রান্ত তারই বক্ষে ফিরিয়ে দিয়েছেন। (অর্থাৎ তাঁর চক্রান্ত নস্যাৎ করে দিয়েছেন।) আর সে হাযেরাকে খেদমতের জন্য দান করেছেন’।[6]

মনীষীদের বক্তব্য :

১. মুহাম্মাদ ইবনু কা‘ব আল-কুরাযী (রহঃ) বলেছেন, ‘তিনটি কাজ এমন রয়েছে, যে ব্যক্তি তা করবে, সে ততক্ষণ পর্যন্ত নিষ্কৃতি পাবে না, যতক্ষণ না তার ওপর তার কর্মের ফল আপতিত হয়। (১) চক্রান্ত করা (২) সীমালঙ্ঘন করা এবং (৩) প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা’।[7]

২. রাগেব ইস্ফাহানী জনৈক মনীষী থেকে বর্ণনা করেন, যাকে দুনিয়াবী নে‘মত ও প্রাচুর্য বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, অথচ সে বুঝতে পারছে না যে এটি তার বিরুদ্ধে আল্লাহর একটি সূক্ষ্ম কৌশল বা পরীক্ষা, সে মূলত তার নিজের বিবেক-বুদ্ধি দ্বারা প্রতারিত হয়েছে’।[8]

৩. ইবনুল কাইয়িম (রহঃ) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই যে মুমিন আল্লাহর ওপর ভরসা করে, সৃষ্টিকুল যদি তার বিরুদ্ধে কোনো চক্রান্ত করে, তবে আল্লাহ স্বয়ং তার পক্ষে পাল্টা কৌশল অবলম্বন করেন এবং তাকে সাহায্য করেন। যেখানে মুমিনের নিজস্ব কোনো ক্ষমতা বা শক্তির প্রয়োজন পড়ে না’।[9]

সারবস্ত্ত : ১. কুট চক্রান্ত বা ষড়যন্ত্র শেষ পর্যন্ত চক্রান্তকারীর নিজের ওপরই ফিরে আসে এবং তাকে ধ্বংস করে। ২. বাহ্যিক দৃষ্টিতে চক্রান্ত বা ষড়যন্ত্র পাহাড় নাড়িয়ে দেওয়ার মতো শক্তিশালী মনে হ’লেও আল্লাহর শক্তির সামনে তা অত্যন্ত দুর্বল। মুমিন ব্যক্তি যদি ধৈর্য ও তাক্বওয়া অবলম্বন করে, তবে কোন ষড়যন্ত্রই তার ক্ষতি করতে পারে না। ৩. পরের অনিষ্ট করার ফন্দি আঁটা মানুষের জীবন কখনোই প্রশান্তির হয় না। কারণ ষড়যন্ত্রের বিষ তাকে সারাক্ষণ ভেতর থেকে কুরে কুরে খায়। আল্লাহ আমাদেরকে যাবতীয় অনিষ্ট থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দান করুন।-আমীন!


[1]. বায়হাক্বী, শো‘আবুল ঈমান হা/১০৫৯৫; ছহীহাহ হা/১০৫৭।

[2]. আবুদাঊদ হা/৪৭৯০; তিরমিযী হা/১৯৬৪; মিশকাত হা/৫০৮৫।

[3]. মুসলিম হা/২৮৬৫; মিশকাত হা/৪৯৬০।

[4]. বুখারী হা/৬৯৬৬; মুসলিম হা/১৬৩৬; মিশকাত হা/৩৭২৬।

[5]. বুখারী হা/১৮৭৭; মুসলিম হা/১৩৮৭।

[6]. বুখারী হা/৩৩৫৮; মুসলিম হা/২৩৭১।

[7]. তাফসীর ইবনু কাছীর ৩/৫৬৩ পৃ.।

[8]. রাগেব, আল-মুফরাদাত ৪৭১ পৃ.।

[9]. ই‘লামুল মুওয়াক্কি‘ঈন ৩/১৭৩ পৃ.।



বিষয়সমূহ: পাপ
আরও