প্রফেসর ড. শহীদ নকীব ভূঁইয়া
তাওহীদের ডাক ডেস্ক
তাওহীদের ডাক ডেস্ক 167 বার পঠিত
[সভাপতি, বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ, দিনাজপুর-পূর্ব সাংগঠনিক যেলা]
[মুহাম্মাদ আনোয়ারুল হক (৬৩) ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ’-এর কেন্দ্রীয় অফিস সহকারী। ১৯৯৩-১৯৯৫ সেশনে তিনি ‘যুবসংঘে’র কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ছিলেন। তার পর থেকে সুদীর্ঘ প্রায় ৩০ বছর যাবৎ তিনি কেন্দ্রীয় অফিসে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তাঁর জীবন ঘনিষ্ঠ এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ‘তাওহীদের ডাক’ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক আসাদুল্লাহ আল-গালিব]
১. তাওহীদের ডাক : আপনি কেমন আছেন?
মুহাম্মাদ আনোয়ারুল হক : আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ তা‘আলার অশেষ রহমতে ভালো আছি।
২. তাওহীদের ডাক : আপনার জন্ম ও পরিবার সম্পর্কে যদি বলতেন।
মুহাম্মাদ আনোয়ারুল হক : দাখিল পরীক্ষার সনদ অনুযায়ী আমার জন্ম তারিখ ১লা ফেব্রুয়ারী ১৯৬৪। তবে প্রকৃত বয়স আরও প্রায় দু’বছর বেশী হবে। আমার পিতা মরহূম আফসার আলী মুন্সী। আমাদের গ্রামের নাম ইটাপোতা, ডাকঘর মোগলহাট, লালমণিরহাট সদর। আমরা মোট চার ভাই ও পাঁচ বোন। ভাইবোনদের মধ্যে আমি তৃতীয়।
৩. তাওহীদের ডাক : আপনাদের এলাকা কি আহলেহাদীছ অধ্যুষিত?
মুহাম্মাদ আনোয়ারুল হক : লালমণিরহাট সদর থানাধীন মোগলহাট ও কুলাঘাট ইউনিয়নের ইটাপোতা, খারুয়া, বনগ্রাম, কুলাঘাট ও ভোলাবাড়ী এই ৫টি এলাকার মোট ১৯টি মসজিদকে ঘিরে আমাদের অঞ্চলে একটি বৃহত্তর আহলেহাদীছ জামা‘আত ছিল। আমার আববা আফসার আলী মুন্সী এই জামা‘আতের অত্যন্ত শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। তিনি আজীবন গ্রামের জামে মসজিদ ও বৃহত্তর ঈদের মাঠের ইমাম ছিলেন।
উল্লেখ্য যে, এই আহলেহাদীছ জামা‘আতের ঈদের ছালাত ইটাপোতা মাঠে আদায়ের একটি ঐতিহ্য ছিল। বিগত করোনা মহামারীর সময় সরকারীভাবে মসজিদ ভিত্তিক ঈদের ছালাতের নির্দেশ দেওয়া হয়। এর ফলে দীর্ঘ দিনের সেই ঐতিহ্য, সেই বহু বছরের ঐক্য ভেঙ্গে যায় এবং একাধিক ঈদের মাঠের সূচনা হয়। পরবর্তীতে তা আর একত্রিত করা সম্ভব হয়নি। তবে পাঁচটি মসজিদের জনগণ এখনও একত্রে ঈদের ছালাত আদায় করে।
৪. তাওহীদের ডাক : আপনার পিতা কি আলেম ছিলেন?
মুহাম্মাদ আনোয়ারুল হক : তিনি কোন মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে ডিগ্রী অর্জন করেননি। তবে মক্তবেই দাওরা ফারেগ এক চাচার নিকট থেকেই আরবী, উর্দূ ও বাংলার হাতে খড়ি হয়। পরবর্তীতে একাডেমিক পড়াশুনার সুযোগ হয়নি। ফলে তিনি স্ব ইচ্ছায় কুরআন-হাদীছ অধ্যয়ন এবং ওলামায়ে কেরামের সঙ্গে যোগাযোগ রাখায় শরী‘আতের মোটামুটি জ্ঞান রাখতেন। তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ইটাপোতা মাদ্রাসায় সহকারী শিক্ষক ছিলেন। এছাড়াও আহলেহাদীছদের পত্র-পত্রিকা এবং বিশিষ্ট ওলামায়ে কেরামের লেখা বই-পুস্তক তার কাছে সবসময় মওজূদ থাকত। যেমন- (ক) জমঈয়তে আহলেহাদীস-এর তৎকালীন সভাপতি মাওলানা আব্দুল্লাহেল কাফী আল-কোরায়েশীর লেখা আহলেহাদীছ পরিচিতি, আহলে কিবলার পিছনে নামায, তর্জুমানুল হাদীছ ইত্যাদি। (খ) মুহতারাম আমীরে জামা‘আত প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব স্যারের সম্মানিত পিতা প্রখ্যাত আলেম, সমাজসেবক ও সাহিত্যিক মাওলানা আহমাদ আলীর লেখা আক্বীদায়ে মোহাম্মদী বা মযহাবে আহলেহাদীছ, কুরআন ও কলেমাখানী ও স্বশব্দে আমীন ইত্যাদি বই তার কাছে ছিল।
আববার কাছে মাওলানা আহমাদ আলীর হাতে লেখা ৪৮-৫২ লাইনের একটি পোস্টকার্ড ছিল। হাতের লেখা ছিল অত্যন্ত সুন্দর ও পরিষ্কার। ছোট ছোট অক্ষর, তবু সবই স্পষ্ট বুঝা যেত। একদিন স্যারের সঙ্গে আলাপে এই প্রসঙ্গ উঠলে তিনি বললেন, ‘পোস্টকার্ডটি এনে ফটোকপি করে দাও’। আমি ফটোকপি স্যারকে দিয়েছিলাম। সম্ভবত আজও সেটা স্যারের সংরক্ষণে আছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমার কাছে সেই মূল পোস্টকার্ডটি আর নেই। আববার সংগ্রহে থাকা অনেক কিতাব ধরলা নদীর ভয়াবহ বন্যায় নষ্ট হয়ে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমার রাজশাহীতে একাধিকবার বাসা পরিবর্তনের দুর্ভোগ।
এছাড়াও ১৯৭৯ সালে ড. আব্দুল বারী ছাহেবের একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে আমি আমীরে জামা‘আত স্যারের নিকট একটি পত্র লিখেছিলাম। জবাবে তিনি ‘যুবসংঘে’র প্যাডে উত্তর লিখে দিয়েছিলেন। এখন সেটিও আর আমার কাছে নেই।
৫. তাওহীদের ডাক : আপনার শিক্ষাজীবন কীভাবে শুরু ও শেষ হয়েছিল?
মুহাম্মাদ আনোয়ারুল হক : আমার শিক্ষাজীবনের সূচনা হয়েছিল আববার হাত ধরেই। আরবী, উর্দূ ও বাংলা ভাষার প্রথম পাঠ আমি তার কাছ থেকেই গ্রহণ করি। আমাদের বাড়ীর পাশের ইটাপোতা ইসলামিয়া মাদ্রাসা-ই ছিল আমার প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হ’লে আমার পড়াশোনা থেমে যায়। আমি তখন পঞ্চম শ্রেণীতে উঠেছিলাম। দেশের অস্থির পরিস্থিতির কারণে পুরো বছরটাই লেখাপড়া বন্ধ থাকে। অতঃপর ১৯৭২ সালে আববা আমাকে মহিষখোচা চৌরাহা ইশা‘আতুল কিতাব ও সুন্নাহ মাদ্রাসায় ভর্তি করে দেন। সেখানে আমি ফার্সী পেহলী, ছফওয়াতুল মাছাদির, মাছদার ফিউজ ইত্যাদি বই পড়ি। তবে যাতায়াতের কষ্টের কারণে সেখানে থাকা সম্ভব হয়নি।
এরপর ১৯৭৩ সালে আমাকে ভর্তি করা হয় লালমণিরহাট নেছারিয়া সিনিয়র মাদ্রাসায় (বর্তমানে কামিল মাদ্রাসা)। আমাদের বাড়ী থেকে শহর পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন মাইল পথ প্রতিদিন হেঁটে যাওয়া-আসার মাধ্যমেই আমার পড়াশোনা চলত। এই মাদ্রাসা থেকেই আমি ১৯৭৮ সালে দাখিল এবং পরবর্তীতে আলিম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই। আলিম সম্পন্ন করার পর আমি গাইবান্ধা যেলার গোবিন্দগঞ্জ থানার ফুলবাড়ীতে মাওলানা শিহাবুদ্দীন সুন্নী ছাহেবের ইশা‘আতে ইসলাম কওমী মাদ্রাসায় ভর্তি হই। সেখানে এক বছরের মধ্যে তিন ক্লাস শেষ করি এবং দাওরায়ে হাদীছ পর্যন্ত পড়াশোনা করি। আলহামদুলিল্লাহ পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হই। ফুলবাড়ীতে অবস্থানকালেই আমি ফাযিল ও কামিল পরীক্ষাও দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করি।
অতঃপর রাজশাহী কলেজ থেকে ১৯৯৭ সালে বি.এ. এবং ২০০০ সালে এম.এ. পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হই। এভাবেই আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শেষ হয়।
৬. তাওহীদের ডাক : শিক্ষা জীবনে আপনার কোন স্মরণীয় ঘটনা আছে কি?
মুহাম্মাদ আনোয়ারুল হক : লালমণিরহাট নেছারিয়া সিনিয়র মাদ্রাসায় পড়াকালে একদিন ভাইস প্রিন্সিপাল আমাকে ডেকে বললেন, তোমাকে প্রথম এভাবে ছালাত পড়তে দেখলাম। অথচ তিনি ছিলেন কামিল শেষ করে হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে দাওরায়ে হাদীছ ফারেগ। আরেক দিন আরবী সাহিত্যের এক শিক্ষক প্রশ্ন করলেন, তোমরা যে ছালাতে রাফ‘ঊল ইয়াদায়েন করো, এটি কি হাদীছে আছে? আমি তখন হেসে উত্তর দিলাম, আপনি কামিল পাশ করেও জানেন না?
সেসময় আমি মাদ্রাসার এক শিক্ষকের বাসায় লজিং থাকতাম। এলাকাটিতে চারজন মাওলানা ছিলেন। তাদের মধ্যে দু’জন আমার আমলকে সমর্থন করতেন। যার একজন আমার লজিং মাস্টার। আমার দেখাদেখি এলাকার অনেক তরুণ-যুবকও ছালাতে সশব্দে আমীন এবং রাফ‘ঊল ইয়াদায়েন করতে শুরু করে। এতে বিরোধী পক্ষের দুই মাওলানা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। পরিস্থিতি এতদূর গড়ায় যে, একদিন আছরের ছালাত পড়তে গিয়ে দেখি মসজিদে তালা ঝুলছে! বাধ্য হয়ে আমরা শিক্ষকের বাড়ীর আঙিনায় ছালাত আদায় করি।
দু’দিন পর শুক্রবার সকালে বৈঠক বসে। সেখানে ক্ষুব্ধ জনতা জানতে চান, কেন মসজিদে তালা দেওয়া হ’ল? তখন এলাকার প্রভাবশালী ও সম্মানিত এক ব্যক্তি, যিনি বিচারক ছিলেন, হাত জোড় করে পরিস্থিতি শান্ত করেন। তিনি সবার উদ্দেশ্যে বলেন, আমার জামাই ডাবল কামিল পাশ করলেও এখনো জ্ঞান ও হিকমত হয়নি। আপনারা মাফ করে দিন। এরপর তিনি আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আনোয়ার! তুমিও মনে কষ্ট রেখো না। এভাবেই আপাতত বিরোধের অবসান হয়।
তবে বৈঠকে আমি স্পষ্টভাবে আমার অবস্থান তুলে ধরে বলেছিলাম, ‘যদি বলা হয় আহলেহাদীছের কোনো ভিত্তি নেই, তবে তা কুরআন-হাদীছ অস্বীকার করার শামিল হবে। কারণ আহলেহাদীছ মানে হ’ল কুরআন ও হাদীছের অনুসারী। আর যে ব্যক্তি হাদীছকে অস্বীকার করে, সে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে অস্বীকার করে। আর যে রাসূলকে অস্বীকার করে, তারা আল্লাহকেও অস্বীকার করে।
এছাড়াও আমাদেরকে মসজিদে আসতে নিষেধ করলে আমি বলেছিলাম, তাহ’লে মুওয়াযযিন যেন হাইয়া আলাছ ছালাহ বলার সাথে সাথে ইল্লা মুহাম্মাদী বা আহলেহাদীছ বলেন। এতে তারা লা-জাওয়াব হয়ে যায়। সেই মুহূর্তে এই দৃঢ় বক্তব্য আজও আমার জীবনের এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি হয়ে আছে।
৭. তাওহীদের ডাক : আমীরে জামা‘আতের সাথে আপনার প্রথম সাক্ষাৎ কখন হয়েছিল?
মুহাম্মাদ আনোয়ারুল হক : ১৯৭৯ সালের ঘটনা। আমি তখন লালমণিরহাট নেছারিয়া সিনিয়র মাদ্রাসায় আলিম দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনা করতাম। মাদ্রাসার সেকেন্ড মাওলানা মুহাম্মাদ আবুল হাসান ছাহেবের বাড়ীতে লজিং থাকতাম। তার বাড়ীটি শহরের উত্তরে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে। একদিন মাদ্রাসা ছুটির পর শহরে গিয়েছিলাম। ফেরার পথে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে রিকশায় যাচ্ছিলাম। হঠাৎ রাস্তায় আববার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। আববা হেঁটে হেঁটে সেই ইটাপোতা থেকে আসছেন, আর আমি মাত্র দেড় কিলোমিটার পথ রিকশায় উঠেছি! লজ্জা পেলাম। আববার সঙ্গে কথা হ’ল। তিনি জানালেন, রংপুরে ‘বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলেহাদীসে’র কনফারেন্স হবে, সেখানে আমাকে যেতে হবে। আমি বললাম, ঠিক আছে যাব ইনশাআল্লাহ।
নির্দিষ্ট দিনে আববাসহ আমাদের এলাকার প্রায় বিশ-পঁচিশজন রওনা দিলাম কনফারেন্সের উদ্দেশ্যে। দুপুরের পর রংপুরে পৌঁছলাম। পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ময়দানে আছরের পর থেকে কনফারেন্স শুরু হ’ল। চলল দুই দিনব্যাপী। প্রথম বা দ্বিতীয় দিনের মাগরিবের ছালাত শেষে সঞ্চালক ঘোষণা করলেন, মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, সভাপতি, বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ।
স্যার ঢাকা থেকে এসেছেন, সময় ছিল মাত্র দশ মিনিট। কিন্তু সেই অল্প সময়ে তার প্রাণবন্ত বক্তৃতা আমাকে গভীরভাবে মুগ্ধ করল। বক্তৃতা শেষ হতেই আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না। দাঁড়িয়ে সোজা মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেলাম। সালাম দিয়ে স্যারের সঙ্গে মুছাফাহা করলাম। শীতকাল। তার হাত ছিল শীতল। চেহারা উজ্জ্বল ও দীপ্তিময়। সংক্ষেপে নিজের পরিচয় দিলাম। স্যার শুধু বললেন ‘যুবসংঘ’ করতে হবে। আমি উত্তর দিলাম, ঠিক আছে করব ইনশাআল্লাহ। এইভাবেই স্যারের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় এবং সংগঠনের দাওয়াত লাভ। তবে তখনও সক্রিয়ভাবে সংগঠনের কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ হয়নি।
৮. তাওহীদের ডাক : আপনি কখন ‘যুবসংঘে’র সাথে যুক্ত হন?
মুহাম্মাদ আনোয়ারুল হক : আশির দশকে গাইবান্ধা যেলার গোবিন্দগঞ্জ থানার ফুলবাড়ী ইশা‘আতে ইসলাম মাদ্রাসায় (প্রধান শিক্ষক : মাওলানা শিহাবুদ্দীন সুন্নী) অধ্যয়নরত অবস্থায় সংগঠনের কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেলাম। মাদ্রাসার সিলেবাসেই ‘যুবসংঘ’-এর পরিচিতি সংযুক্ত ছিল। আমি সেই পরিচিতি দু’টি সম্পূর্ণ মুখস্থ করেছিলাম। পরিচিতিতে শপথ থাকায় সুন্নী ছাহেব আমাদেরকে যুবসংঘ করতে বলেন। কারণ উনি নিজে ছিলেন বায়‘আতপন্থী এবং জামা‘আতে গোরাবায়ে আহলেহাদীছের অনুসারী। পক্ষান্তরে জমঈয়তে কোন শপথ বা বায়‘আত ছিল না। সেই সময় একবার যুবসংঘের প্রশিক্ষণে স্যার প্রশিক্ষক হিসাবে এসেছিলেন। আরেকবার আমাদের মাদ্রাসায় বার্ষিক পরীক্ষার সময় তিনি হঠাৎ চলে আসেন। তখন তিনি থিসিস করছিলেন। তিনি রংপুর থেকে মোটরসাইকেল যোগে এসে পরীক্ষার হলে প্রবেশ করেছিলেন। ঐ সময় আমরা লিখিত পরীক্ষা দিচ্ছিলাম। সেই মুহূর্তটা আমার এখনো মনে আছে।
৯. তাওহীদের ডাক : আপনি বিভিন্ন সম্মেলনে যেতেন। সম্মেলন কেন্দ্রিক আপনার স্মরণীয় কিছু মনে পড়ে কি?
মুহাম্মাদ আনোয়ারুল হক : স্যারের সঙ্গে আবার দেখা হ’ল বগুড়ার আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠের সম্মেলনে। আমি তখন সোকানিয়ায় থাকি। ভেলোরপাড়া স্টেশন থেকে ট্রেনে বগুড়া যাচ্ছিলাম। কিন্তু ট্রেন লেট থাকায় যথাসময়ে কনফারেন্সে পৌঁছতে পারিনি। মাগরিবের আগে মাঠে পৌঁছে জানতে পারি কিছু সংকীর্ণমনা নামধারী মুছল্লী জুম‘আর পর মিছিল করে এসে সামিয়ানার খুঁটি ভেঙ্গে দিয়েছে। বাধ্য হয়ে পুলিশ লাঠিপেটা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ফলে মাগরিবের পর সম্মেলন শুরু হয়। স্যার সূরা লাহাবের আলোকে জোরালো বক্তব্য রাখেন।
স্যারের ভাষণের পর জমঈয়ত সভাপতি ড. বারী ছাহেব গরম হয়ে ভাষণ শুরু করলেন। তিনি বললেন, গত বছর ঝড়ে আমাদের সম্মেলন লন্ডভন্ড হয়ে গেল। আর আমাদের মেহমান হাইজ্যাক হয়ে গেল। এবারও বগুড়া থেকে ফোনে আমাকে বলা হ’ল আমি যেন না আসি। আমি কি এত সহজেই ভীত হয়ে যাব? আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার বাসার বারান্দায় সারারাত পায়চারী করেছি। এখান থেকে সাত মাইল দূরে শিবগঞ্জ, সেখানে আমার নাড়ী পোতা, আমার মায়ের নাড়ী পোতা। এত সহজে কি আমি নির্বাসন মেনে নেব? বরং তাদের লজ্জা করা উচিত, তওবা করা উচিত। এরপর তিনি তার মূল বক্তব্যে ফিরে গেলেন।
একবার বগুড়ার শাহনগর ময়দানে মহাসম্মেলনে গিয়েছিলাম। সেখানে আবারও আমীরে জামা‘আত স্যার ও আব্দুল্লাহ ইবনে ফযলের সঙ্গে দেখা হয়। সেদিন ইবনে ফযলের একটি কথা আমার মনে পড়ে। তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশে লাফাইয়া লাফাইয়া বক্তব্য দিলাম, দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া বক্তব্য দিলাম, এখন বসে বসে দিচ্ছি। আর কয়দিন পর শুয়ে শুয়ে বক্তব্য দিব। আমি বাংলাদেশে ২৭ বছর বক্তব্য দিলাম, আর বাংলার মানুষ আমাকে এর বিনিময়ে ২৭ মাস জেল দিল। সে-ই ছিল তার সঙ্গে আমার শেষ সাক্ষাৎ।
১০. তাওহীদের ডাক : আপনি কখন ‘যুবসংঘে’র কেন্দ্রীয় দায়িত্ব পালন করেছেন?
মুহাম্মাদ আনোয়ারুল হক : ১৯৯৩ সালে লালমণিরহাট যেলা ‘যুবসংঘে’র সভাপতি ছিলেন আমার বন্ধু দক্ষিণ বালাপাড়া সিনিয়র মাদ্রাসার এবতেদায়ী বিভাগের প্রধান শিক্ষক মুহাম্মাদ মানছূরুর রহমান। তিনি ‘যুবসংঘে’র মাসিক বৈঠক উপলক্ষ্যে রাজশাহীতে এসেছিলেন। সে সময় স্যার আমার খোঁজ-খবর নেন এবং তার মাধ্যমে আমাকে ডেকে পাঠান। স্যারের ডাকে আমি রাজশাহীতে যাই। সেখানে ‘যুবসংঘে’র কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়। তখন আমাকে প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং অফিসে রাখা হয়। ঐ সময় মুফাক্ষার ভাইও অফিসে থাকতেন সাংগঠনিক সম্পাদক হিসাবে। ১৯৯৩-১৯৯৫ সেশনে সাধ্যমতো দায়িত্ব পালন করি। ইতিমধ্যে ১৯৯৪ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ’ গঠিত হয়। তখন ১০ই মে ১৯৯৫ তারিখে আমাকে ‘আন্দোলন’-এর কেন্দ্রীয় অফিসে অফিস সহকারী হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কাজকর্মে অনেক দুর্বলতা ও অযোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অদ্যাবধি সাধ্যানুযায়ী আমি সেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। ফালিল্লাহিল হাম্দ।
১১. তাওহীদের ডাক : শিহাবুদ্দীন সুন্নী ছাহেবের সাথে আপনার কী ধরণের সম্পর্ক ছিল?
মুহাম্মাদ আনোয়ারুল হক : আমি তখন ফুলবাড়ী মাদ্রাসায় দাওরায়ে হাদীছের ছাত্র। ওই বছর কামিল পরীক্ষার ফরম পূরণের জন্য বাড়ী ফিরে দেখি আখ মাড়াই চলছে। আমিও কাজে যোগ দিলাম। কারণ গুড় বিক্রি করে ফরমের টাকা যোগাড় করতে হবে। একদিন বাদ আছর, চাচাতো ভাই এসে জানাল, দুইজন মেহমান এসেছেন, তোমাকে ডাকছেন। একজন ছিলেন শিহাবুদ্দীন সুন্নী উস্তাদজী, আরেকজন মানছূর ভাই।
রাতের খাওয়া ও আলোচনা শেষে তিনি আববার নিকট আমার বিবাহের প্রস্তাব দিলেন। আববা এই প্রস্তাবে সম্মতি দিলেও আমার সিদ্ধান্তের উপর ছেড়ে দিলেন। তবে ভাইবোনদের বিবাহ, আবাসন সংকট ও ঋণের কারণে আমি প্রস্তাবটি নাকচ করলাম। পরের দিন আমি তাদের দু’জনকে নিয়ে লালমণিরহাট বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে দিলাম। তখন বাস সার্ভিস শুরু হয়েছে মাত্র।
কয়েকদিন পর আমি আবার কামিলের ফরম পূরণের জন্য ফুলবাড়ী মাদ্রাসায় চলে যাই। ফুলবাড়ীতে মুহাম্মাদ আব্দুস সালাম ছাহেবের বাড়ীতে লজিং থাকতাম। লজিং বাড়ীতে থাকাবস্থায় মানছূর ভাই আমাকে ডেকে প্রথমে গোবিন্দগঞ্জ এবং পরে উস্তাদজীর বাড়ীতে নিয়ে যান। সেখানে উস্তাদজীর পীড়াপীড়িতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঐদিন বাদ আছর সুন্নী ছাহেবের শ্যালিকার সাথে প্রথম বিবাহ সম্পন্ন হয়। সেই সুবাদে তিনি আমার ভায়রা ছিলেন। পরে বুঝলাম, মেয়েটি মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন ছিল। ফলে দু’বছরের মধ্যেই ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। এরপর ২য় বিয়ে অর্থাৎ বর্তমান স্ত্রীর সাথে আমার বিয়ে হয় ২০শে জানুয়ারী ১৯৯৫ সালে। ঐদিন স্যার মহিষখোচা চৌরাহা মাদ্রাসায় বার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসাবে যোগদান করেন। সম্মেলন শেষে গাড়ীতে করে তিনি আমার শ্বশুর বাড়ীতে আসেন এবং নিজে বিবাহ পড়ান। পরে আমার ছেলেমেয়েদের নামও তিনি রাখেন।
১২. তাওহীদের ডাক : শিহাবুদ্দীন সুন্নী ছাহেবের সংগঠন বিমুখতার কারণ সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?
তার সংগঠন বিমুখতার কারণ : তার সংগঠন বিমুখতার প্রথম কারণ ছিল বগুড়ার অধ্যাপক মুহাম্মাদ রেযাউল করীমের ধূর্ত ব্রেনের কাছে তার সহজ-সরল আত্মসমর্পণ। স্যারের পক্ষ থেকে উত্তর বঙ্গের ১৫টি যেলায় মসজিদ-মাদ্রাসা করার সুবাদে রেযাউল করীম নানা সময়ে সুন্নী ছাহেবকে তার মোটরসাইকেলে নিয়ে ঘুরেছেন। সেই সময় স্যারের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও উল্টা-পাল্টা কথাবার্তা লাগিয়ে তাকে নষ্ট করেছে।
দ্বিতীয়ত সময়ের বিচারে আর্থিক সাহায্যের মাধ্যমে তাকে দুর্বল করা হয়েছিল। তৃতীয়ত বগুড়া আজিজুল হক কলেজে মাত্র ৫২০০ টাকা বেতন পাওয়া সত্ত্বেও রেযাউল করীম যখন বগুড়া শহরের নারুলীতে ১০ শতক জমি কিনে ৪ কামরা বিশিষ্ট পাকা বাড়ী করেন, তখন স্যার হিসাব চাইলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার চালিয়ে পরিবেশ ঘোলাটে করার চেষ্টা করেন। সুন্নী ছাহেব তাতে আটকা পড়েন। পরে তদন্ত কমিটির রিপোর্টে তার তাওহীদ ট্রাস্টের অর্থ আত্মসাৎ-এর প্রমাণ পাওয়া গেলে স্যার তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করেন। আমি নিজে সেই চিঠি নিয়ে তার কাছে যাই এবং রিসিভ কপি নিয়ে আসি।
১৩. তাওহীদের ডাক : ২০০৫ সালে আমীরে জামা‘আত মিথ্যা মামলায় গ্রেফতারের সময় আপনার অবস্থা কেমন ছিল? তখনকার স্মৃতি মনে পড়ে কি?
মুহাম্মাদ আনোয়ারুল হক : ২০০৫ সালের ২৪ ও ২৫ ফেব্রুয়ারী, বৃহস্পতি ও শুক্রবার, আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ-এর ১৫তম বার্ষিক তাবলীগী ইজতেমার তারিখ ধার্য ছিল। ইজতেমার প্রস্ত্ততি চলছিল। কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল হিসাবে ২২ তারিখ মঙ্গলবার ‘আন্দোলন’-এর সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মাওলানা নূরুল ইসলাম ছাহেব উপস্থিত হন। অন্যান্য দায়িত্বশীলরাও চলে আসেন। আমরা সবাই ইজতেমার কাজে ব্যস্ত ছিলাম।
কিন্তু বিকেল থেকেই পুলিশের অস্বাভাবিক উপস্থিতি চোখে পড়ছিল। মাসিক আত-তাহরীকের সম্মানিত সম্পাদক ড. মুহাম্মাদ সাখাওয়াত ছাহেবের অফিসে গিয়ে দেখি, স্থানীয় থানার ওসি সহ কয়েকজন অফিসার বসে আছেন এবং বলছেন, তারা স্যারকে নিরাপত্তা দিতে এসেছেন। মাগরিবের পর পুলিশ আরও বড় পরিসরে উপস্থিত হ’ল।
রাত্রি ১-টার পর বাসায় ফেরার সময় দেখি অফিসের চারপাশে অসংখ্য পুলিশ অবস্থান করছে। কেউ কেউ বুঝতে পারছিলেন, হয়তো আজ স্যারকে গ্রেফতার করা হবে। সালাফী ছাহেব স্যারকে বললেন, আপনি বাসা থেকে চলে যান, আত্মগোপনে থাকুন। স্যার বলিষ্ঠ কণ্ঠে জবাব দিলেন, আমার মতো লোক কোথায় পালাবে! আমি এখানেই থাকব।
রাত ১টার পর আমি বাসায় পৌঁছালাম। সারাদিন পরিশ্রমে ক্লান্ত থাকায় গভীর ঘুমে রাত কেটে গেল। কখন ফজরের আযান হয়েছে, ফজরের ছালাতের জামা‘আত শেষ হয়েছে কিছুই জানি না। ঘুম থেকে জাগার সাথে সাথেই ফজরের ছালাত আদায় করলাম। ছালাতের পর ইজতেমা ময়দান দেখতে বাসা থেকে বের হ’লাম। সঙ্গে আমার বড় ছেলে তাক্বী, তখন তার বয়স মাত্র সাত বছর।
বাসা থেকে বের হতেই রাস্তায় পুলিশের গাড়ি নযরে পড়ে। পশ্চিম দিকে তাকালে দেখি পুলিশ আসা-যাওয়া করছে। আমচত্বর অতিক্রম করে মাদ্রাসার দিকে তাকালাম। মাদ্রাসার গেট ও রাস্তার চারপাশে অনেক পুলিশ। আমি মাছের আড়তের পশ্চিম পার্শ্বে পৌঁছলে দেখি ড. মুহাম্মাদ সাখাওয়াত হোসাইন, মারকাযের শিক্ষক শামসুল আলম ভাই এবং ডা. সিরাজুল হক পশ্চিম দিক থেকে পূর্ব দিকে আসছেন। মুহূর্তেই সাক্ষাৎ ও কথা হয়। সাখাওয়াত ভাই বললেন, স্যারকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে। সালাফী ছাহেব, অধ্যাপক নূরুল ইসলাম ভাই ও আযীযুল্লাহকেও নিয়ে গেছে। আপনি সাবধানে থাকুন। কথা বলতে বলতে তিনি মাছের আড়তের মোড় থেকে দক্ষিণ দিকে চলে গেলেন।
আমি ওখান থেকেই ইউ-টার্ন নিয়ে বাসায় এলাম। তাক্বীর মা রুটি তৈরি করেছে। দু’টো রুটি খেয়ে কাপড় পরে অফিসের দিকে রওনা হলাম। অথচ তখনও অফিসের সময় হয়নি। মাদ্রাসার গেটে গিয়ে দেখি, পুলিশ বসে আছে। তাদের সামনে দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলাম, তারা কিছুই বলল না। এরপর আমি আন্দোলন অফিসে এসে অফিস শুরু করি। তখন থেকে অফিস একদিনও বন্ধ হয়নি। এ সময়ে কিছু দিন ‘আন্দোলন’-এর অনেক দায়িত্বশীল ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য ফোন করলে, কথা হ’ত। কিন্তু তারা কোথায় আছেন তা জানাতেন না।
(ক্রমশঃ)