যেভাবে প্রশান্তি ছড়িয়ে দিতেন নবী (ছাঃ)
আসাদুল্লাহ আল-গালিব
আসাদুল্লাহ আল-গালিব 4 বার পঠিত
(১৮) আবুবকরের প্রতি রাসূল (ছাঃ)-এর ভালবাসা : বিদায়ের মুহূর্ত সবসময় গভীর ও ভারী হয়। বিশেষ করে তাদের জন্য, যারা সত্যিকারের ভালবাসা ও আনুগত্যের বন্ধনে বাঁধা থাকে। নবী করীম (ছাঃ) জানতেন আবুবকর (রাঃ)-এর বিচক্ষণতা ও তার প্রতি গভীর ভালবাসা রয়েছে। আর সেকারণেই তো অচিরেই ঘটতে যাওয়া তাঁর ইঙ্গিতবহ অস্পষ্ট কথাগুলো আবুবকর উপলদ্ধি করতে পেরে কান্না জড়িত অবস্থায় রাসূলের জন্য নিজের পিতা-মাতাকে উৎসর্গ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অন্যান্য ছাহাবীরা এই গূঢ়ার্থ না বুঝে আবুবকরকে অবজ্ঞা করে। এমন পরিস্থিতিতে রাসূল (ছাঃ) আবুবকরের অবদান, সততা ও ত্যাগের স্বীকৃতি স্বরূপ তার উচ্চ মর্যাদা স্থাপন করলেন।
আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মিম্বরে বসলেন এবং বললেন, আল্লাহ তার এক বান্দাকে দু’টি বিষয়ের একটি বেছে নেয়ার অধিকার দিয়েছেন। তার একটি হ’ল দুনিয়ার ভোগ-বিলাস। আর একটি হ’ল আল্লাহর নিকট যা রক্ষিত রয়েছে। তখন সে বান্দা আল্লাহর কাছে যা রয়েছে তাই পসন্দ করলেন। একথা শুনে আবুবকর (রাঃ) কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, আমাদের পিতা-মাতাকে আপনার জন্য কুরবানী করলাম। তার অবস্থা দেখে আমরা বিস্মিত হলাম। লোকেরা বলতে লাগল, এ বৃদ্ধের অবস্থা দেখ, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এক বান্দা সম্বন্ধে খবর দিলেন যে, তাকে আল্লাহ ভোগ-বিলাস দেওয়ার এবং তার কাছে যা রয়েছে, এ দু’য়ের মধ্যে বেছে নিতে বললেন। আর এই বৃদ্ধ বলছে, আপনার জন্য আমাদের পিতা-মাতা উৎসর্গ করলাম। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-ই হলেন সেই এখতিয়ার প্রাপ্ত বান্দা। আর আবুবকরই হলেন আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বিজ্ঞ ব্যক্তি। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি তার সঙ্গ ও সম্পদ দিয়ে আমার প্রতি সবচেয়ে ইহসান করেছেন, তিনি হলেন আবুবকর। যদি আমি আমার উম্মতের কোন ব্যক্তিকে অন্তরঙ্গ হিসাবে গ্রহণ করতাম, তাহ’লে আবুবকরকেই গ্রহণ করতাম। তবে তার সঙ্গে আমার ইসলামী ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক রয়েছে। মসজিদের দিকে আবুবকর (রাঃ) এর দরজা ছাড়া অন্য কারো দরজা খোলা থাকবে না’।[1]
নবী করীম (ছাঃ)-এর এই কথাগুলো কেবল অস্থায়ী মন্তব্য ছিল না; এটি ছিল কৃতজ্ঞতা, মানুষের সামনে স্বীকৃতি এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি চিরন্তন বার্তা। আবুবকর সাধারণ ব্যক্তি নয়। সে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযাত্রী ও বিশ্বস্ত বন্ধু। তিনি রাসূলের কথার মর্মার্থ বুঝতে পেরেছিলেন যে, তিনি অতি সত্বর পরপারে পাড়ি জমাবেন।
শিক্ষা : যারা অতীতে আপনার পাশে ছিল তাদেরকে সান্তনা দিন, ভালবাসুন ও সম্মান দেখান। কারণ কখনো কখনো একটি শব্দ বা প্রশংসা বছরের পরিশ্রম, সংগ্রাম ও ত্যাগের কষ্ট ভুলিয়ে দেওয়ার মতো শক্তিশালী সান্তনা হ’তে পারে। যা নবী করীম (ছাঃ) আমাদের দেখিয়েছেন।
(১৯)পিতৃহারা ভারাক্রান্ত জাবের বিন আব্দুল্লাহকে সান্তনা : ছোটদের অনুভূতিকে কখনো ছোট মনে করা উচিত নয়। তাদের হৃদয় জেতার জন্য কোনো অর্থের প্রয়োজন নেই। অনেক সময় একটি আন্তরিক নযর, হৃদয় থেকে আসা কিছু কোমল কথা বা স্নেহময় হাসিই যথেষ্ট। নবী করীম (ছাঃ)-এর জীবন আমাদের দেখিয়েছে, কিভাবে এমন মমতা ও সহানুভূতি দিয়ে অন্যদের মনকে আলোকিত করেছেন এবং স্থায়ী প্রভাব ফেলেছেন।
জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমার সাথে সাক্ষাৎ করে আমাকে বললেন, হে জাবের! কি ব্যাপার, আমি তোমাকে ভগ্নহৃদয় দেখছি কেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার আববা (ওহোদের যুদ্ধে) শহীদ হয়েছেন এবং অসহায় পরিবার-পরিজন ও ঋণ রেখে গেছেন। তিনি বললেন, আল্লাহ তা‘আলা কিভাবে তোমার আববার সাথে মিলিত হয়েছেন আমি কি তোমাকে সেই সুসংবাদ দিব না? আমি বললাম, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, আল্লাহ কখনো কারো সাথে তার পর্দার অন্তরাল ব্যতীত (সরাসরি) কথা বলেননি। কিন্তু তিনি তোমার বাবাকে জীবন দান করে তার সাথে সরাসরি কথা বলেছেন। তাকে তিনি বললেন, তুমি আমার নিকট (যা ইচ্ছা) চাও, আমি তোমাকে তা দান করব। সে বলল, হে প্রভু! আপনি আমাকে জীবন দান করুন, যাতে আমি আবার আপনার রাহে নিহত হ’তে পারি। বরকতময় আল্লাহ বললেন, আমার পক্ষ থেকে আগে হতেই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়ে আছে যে, তারা আবার (দুনিয়ায়) ফিরে যাবে না। এ প্রসঙ্গে নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়,وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللهِ أَمْوَاتًا بَلْ أَحْيَاءٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ- ‘যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়, তাদেরকে মৃত ভেবো না। বরং তারা জীবিত। তারা তাদের প্রতিপালকের নিকট হ’তে জীবিকাপ্রাপ্ত হয়’ (আলে ইমরান ৩/১৬৯)।[2]
নবী করীম (ছাঃ) জাবেরকে তার দুঃখের ভেলায় ডুবে থাকতে দেননি। জাবেরকে দেখে পাশ কাটিয়েও চলে যাননি। বরং কোমলভাবে কাছে গিয়ে বললেন, مَا لِي أَرَاكَ مُنْكَسِرًا؟ ‘কেন আমি তোমাকে মনমরা দেখছি? তার দুঃখের কারণ জানতে চাওয়া এই একটি বাক্যই ছিল হৃদয়ের সান্তনা, মনের প্রশান্তি ও আশার আলো। অতঃপর নবী করীম (ছাঃ) তার ব্যথা অস্বীকার করেননি। বরং তাকে শক্তি দিলেন, নিশ্চিত করলেন যে, তুমি যা হারিয়েছ তা আল্লাহর কাছে নষ্ট হয়নি। বরং লাভ হয়েছে। এটি এমন এক সান্তনা যা সবকিছুকে ছাপিয়ে যায়।
শিক্ষা : আমরা সবাই হ’তে পারি নবী করীম (ছাঃ)-এর মতো। কাউকে দুঃখী বা মন খারাপ দেখে তার পাশ কাটিয়ে যাবেন না। তাকে বলুন, কেন আমি আপনাকে মনমরা দেখছি? হয়তো এই একটি বাক্যই হবে তার ভেঙে পড়া হৃদয়ে সান্তনার প্রলেপ। একটি মাত্র কোমল শব্দের স্পর্শেই হাহাকার লোপ পেতে পারে, আর নতুন আশা জন্মাতে পারে।
(২০)অবমূল্যায়িতজুলায়বীবকেউচ্চমর্যাদাপ্রদান : জুলায়বীব (রাঃ) ছিলেন দরিদ্র, খাটো ও অপ্রত্যাশিত একজন ব্যক্তি। সমাজের অনেকেই তাকে অবমূল্যায়ন করত। কেউ তাকে গণ্য করত না। কিন্তু নবী করীম (ছাঃ) প্রথম সাক্ষাৎ থেকেই তার হৃদয়কে সম্মান ও সাহস দিয়ে ভরিয়ে দিলেন।
একদিন নবী করীম (ছাঃ) বললেন, হে জুলায়বীব, তুমি কি বিয়ে করবে না? জুলায়বীব বিনীতভাবে উত্তর দিলেন, হে আল্লাহর রাসূল, কে আমাকে বিয়ে করবে? তিনি তার হাত ধরে আনছারদের একটি বাড়িতে নিয়ে গেলেন, একটি মেয়ের সাথে তার বিবাহের প্রস্তাব রাখলেন এবং জুলায়বীবকে বিবাহ করালেন। এটি ছিল প্রকাশ্যভাবে তার মর্যাদা ও স্বীকৃতি দেয়ার প্রথম মুহূর্ত।
পরবর্তীতে জুলায়বীব নবী করীম (ছাঃ)-এর সঙ্গে জিহাদে অংশ নিলেন এবং শাহাদত বরণ করলেন। যুদ্ধ শেষে নবী করীম (ছাঃ) ছাহাবীদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, কে কি হারিয়েছে? ছাহাবারা বললেন, অমুক, অমুক। আবার জিজ্ঞাসা করলেন, আর কেউ? ছাহাবীরা বললেন, না। তিনি বললেন, কিন্তু আমি জুলায়বীবকে হারিয়েছি, তাকে খুঁজো। খুঁজে বের করে দেখা গেল, সে ৭ জনকে হত্যা করে শাহাদত বরণ করেছে। নবী করীম (ছাঃ) তার পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘সে ৭ জনকে হত্যা করে শাহাদত বরণ করেছে’। তারপর বললেন, هو مني وأنا منه ‘সে আমার একজন এবং আমিও তার একজন’। তার মরদেহ নবী করীম (ছাঃ)-এর বাহুর উপর রাখা হ’ল। নবী করীম (ছাঃ)-এর বাহু ছাড়া আর কিছু ছিল না। অতঃপর তার জন্য কবর খনন করা হ’ল এবং গোসল ছাড়াই তাকে কবরে দাফন করা হ’ল’।[3]
নবী করীম (ছাঃ) জুলায়বীবকে সান্তনা দিয়েছিলেন, যখন সে মানুষের চোখে উপেক্ষিত ও অবহেলিত ছিলেন। নবী করীম (ছাঃ) তাকে জীবনের প্রান্ত থেকে তুলে ধরলেন, মর্যাদা ও সম্মান দিলেন। তাকে বিবাহ দিয়ে একটি প্রকাশ্য সম্মান দিলেন। যেন জুলায়বীব নিজে ও অন্য ছাহাবায়ে কেরাম জুলায়বীবের মর্যাদা বুঝতে পারেন।
দ্বিতীয়ত যুদ্ধের পর সবাই জুলায়বীবকে ভুলে গেলেও নবী করীম (ছাঃ) তখনও তাকে স্মরণ করলেন। চিরন্তন প্রশংসা করলেন। নিজ হাতে মরদেহ বহন করে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিলেন এবং বললেন, এটি আমার পক্ষ থেকে এবং আমি তার সঙ্গে আছি। এই বাক্য তার মর্যাদা ও কৃতিত্বকে চিরকাল জীবন্ত রাখল।
শিক্ষা : কখনও কাউকে তার রূপ, অবস্থা বা দারিদ্র দেখে অবমূল্যায়ন করবেন না। মানুষের অন্তর হ’ল অমূল্য রত্ন। যা শুধু দয়ার চোখই দেখতে পারে। ভুলে যাওয়া বা অবহেলিত হৃদয়কে সান্তনা দেওয়া এমন কাজ, যা আল্লাহ ভালবাসেন। নবী করীম (ছাঃ) আমাদের দেখিয়েছেন, কীভাবে কোমলতা, মমতা ও আন্তরিক সহানুভূতির মাধ্যমে মানুষের হৃদয় জয় করা যায় এবং তাদেরকে আত্মবিশ্বাসী ও সাহসী করে তোলা যায়।
(২১)ভগ্ন হৃদয়ের আলীকে সান্তনা : আলী (রাঃ) যখন মনমরা ও দুঃখী অবস্থায় ছিলেন, নবী করীম (ছাঃ) তাকে তার মেয়ের সাথে কি হয়েছে এজন্য তিরস্কার করলেন না। না কোনো ভুলের দায় জানতে চাইলেন। বরং নিজে তার কাছে গিয়ে বসলেন, কোমলভাবে হাত দিয়ে ধূলিকণা ঝেড়ে দিলেন এবং হালকা মজার মাধ্যমে তার হৃদয় ভরিয়ে দিলেন। এক মুহূর্তেই ভাঙা হৃদয় পুনর্জীবিত হ’ল।
সাহল ইবনু সা‘দ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত আলী (রাঃ)-এর কাছে আবু তুরাব-এর চেয়ে প্রিয় কোন নাম ছিল না। এ নামে ডাকা হলে তিনি খুবই খুশী হতেন। কারণ একবার রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ফাতেমার কাছে আসলেন। তখন আলীকে ঘরে না পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আলী কোথায়? ফাতেমা বললেন, আমার ও তার মাঝে কিছু ঘটে যাওয়ায় তিনি আমার সঙ্গে রাগ করে বেরিয়ে গেছেন। আমার কাছে কায়লুলাহ করেননি। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) জনৈক লোককে বললেন, দেখতো সে কোথায়? লোকটি এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি তো মসজিদে ঘুমিয়ে আছেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এসে দেখতে পেলেন যে, তিনি কাত হয়ে শুয়ে আছেন। আর তার চাদরখানা পার্শ্ব থেকে পড়ে গেছে। ফলে তার গায়ে মাটি লেগে গেছে। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তার গায়ের মাটি ঝাড়তে লাগলেন এবং বলতে লাগলেন, ওঠো, আবু তুরাব (মাটির বাপ) ওঠো, আবু তুরাব! এ কথাটা তিনি দু’বার বললেন’।[4]
এই কথা কেবল হাস্যরস ছিল না; এটি ছিল গভীর সান্তনা, এমন একটি স্পর্শ যা অভ্যন্তরীণ উদ্বেগ ও মানসিক চাপকে ভুলিয়ে দেয়। আলী (রাঃ) সেই মুহূর্তেই আবু তুরাব নামে ডাকা ভালবেসেছিলেন। কারণ এই নামের সাথে জড়িয়ে ছিল নবী করীম (ছাঃ)-এর অশেষ মমতা, কোমলতা ও হৃদয় জাগানো সমবেদনা।
শিক্ষা : আপনি যখন কাউকে দেখেন, সে কারু সাথে দ্বন্দ্বের পর মনমরা বা দুঃখী হয়ে আছে, তখন তাকে জিজ্ঞাসা করবেন না কার ভুল? বরং তার কাছে গিয়ে, হৃদয়ের ধূলিকণা ঝেড়ে দিয়ে বলুন, উঠো! আমি তোমার সঙ্গে আছি। নবী করীম (ছাঃ) আমাদের দেখিয়েছেন, প্রথমে হৃদয়কে সান্তনা দেওয়া, তারপর শিক্ষা। এটাই প্রকৃত সহানুভূতি। কখনও কখনও একটি কোমল শব্দ, একটি আন্তরিক হাসি, বা এক মুহূর্তের মমতা পুরো দুঃখকে মুছে দিতে পারে এবং ভাঙা হৃদয়কে নতুন আশা ও শক্তি দিয়ে ভরিয়ে দিতে পারে।
(২২)তওবাকারীকে ক্ষমার সুসংবাদ প্রদান : নবী করীম (ছাঃ) তওবাকারীর ব্যথিত হৃদয়কে প্রশান্ত করতেন। তিনি তাকে লজ্জিত করতেন না। এমনকি অতিরিক্ত প্রশ্নে ক্লান্ত করতেন না। বরং তার তওবাকে সম্মান ও উৎসাহের সঙ্গে স্বাগত জানাতেন। অতীতের ভুলের দরজা বন্ধ করে দিতেন এবং নিশ্চিন্তভাবে তাকে প্রস্থান করার সুযোগ দিতেন বিশ্বাসের সঙ্গে যে, আল্লাহ তার তওবা গ্রহণ করেছেন, ক্ষমা করেছেন, কোনো অপমান বা কঠোরতার ছাপ ছাড়াই।
আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, এক লোক এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি হদযোগ্য (অপরাধ) করে ফেলেছি। আমার ওপর তা প্রয়োগ করুন। বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তার অপরাধ সম্পর্কে কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না। বরং ছালাতের ওয়াক্ত হয়ে গেলে তিনি ছালাত আদায় করলেন। লোকটিও রাসূলের সাথে ছালাত আদায় করল। ছালাত শেষে লোকটি দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি হদযোগ্য কাজ করেছি। আমার ওপর আল্লাহর কিতাবে নির্দিষ্ট হদ জারী করুন। উত্তরে তিনি বললেন, তুমি কি আমাদের সাথে ছালাত আদায় করনি। লোকটি বলল, হ্যাঁ, করেছি। তিনি বললেন, এ ছালাতের মাধ্যমে আল্লাহ তোমার গুনাহ বা হদ মাফ করে দিয়েছেন’।[5]
ওই ব্যক্তি কোনো দন্ড বা শাস্তি চেয়েছিল তার হৃদয় অপরাধবোধ থেকে। তাই সে নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট শাস্তি প্রাপ্ত হয়ে পাপমুক্ত হওয়ার প্রার্থনা করে। অতঃপর রাসূল তাকে এমন একটি কোমল সান্তনার কথা শুনালেন, যা তার আত্মসম্মান ও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস দৃঢ় প্রতিষ্ঠা করে।
শিক্ষা : যদি কেউ আপনার কাছে আসে এবং তার ভুল স্বীকার করে, তাকে অতিরিক্ত প্রশ্নে ডুবিয়ে দিবেন না। বরং তার ভুল গ্রহণ করুন, তার ফিরে আসাকে প্রশংসা করুন, তার হৃদয়কে সান্তনা দিন। এটাই হ’তে পারে সেই আলোর হাত যা তার জন্য আল্লাহর দয়ার দরজা খুলে দেয়। মনে রাখবেন, একটি কোমল শব্দ এক চুম্বক সদৃশ মমতা, কখনও কখনও মানুষের হৃদয়কে সৃষ্টিকর্তার কাছে ফিরিয়ে আনে, পুনর্জীবিত করে এবং আশা দিয়ে ভরে তোলে।
(২৩)ব্যভিচারের অনুমতি চাওয়া যুবকের প্রতি রাসূলের সহমর্মিতা : এক যুবক নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকটে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে ব্যভিচারের অনুমতি দিন। এ কথা শুনে ছাহাবীগণ তার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং তাকে ধমকালেন। তখন নবী করীম (ছাঃ) বললেন, তাকে কাছে আসতে দাও। যুবক কাছে এল এবং বসে পড়ল। তিনি কোমল কণ্ঠে তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কি চাইবে, এটি তোমার মায়ের সঙ্গে হোক? সে বলল, না, আল্লাহর কসম! আল্লাহ যেন আমাকে আপনার জন্য ফিদইয়া করেন। তিনি বললেন, তেমনি অন্য মানুষও তাদের মায়ের জন্য এটি চায় না।
তুমি কি চাইবে, এটি তোমার মেয়ের সঙ্গে হোক? সে বলল, না, আল্লাহর কসম! আল্লাহ যেন আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করেন। নবী করীম (ছাঃ) বললেন, তেমনি অন্য মানুষও তাদের মেয়ের সাথে এটি চায় না।
তুমি কি চাইবে, এটি তোমার বোনের সঙ্গে হোক? সে বলল, না, আল্লাহর কসম! আল্লাহ যেন আমাকে আপনার জন্য ফিদইয়া করেন। নবী করীম (ছাঃ) বললেন, তেমনি অন্য মানুষও তাদের বোনদের জন্য এটি চায় না। তুমি কি চাইবে, এটি তোমার ফুফুর সঙ্গে হোক? সে বলল না, আল্লাহর কসম! আল্লাহ যেন আমাকে আপনার জন্য ফিদইয়া করেন। নবী করীম (ছাঃ) বললেন, তেমনি অন্য মানুষও তাদের ফুফুর জন্য এটি চায় না।
তুমি কি চাইবে, এটি তোমার খালার সঙ্গে হোক? সে বলল, না, আল্লাহর কসম! আল্লাহ যেন আমাকে আপনার জন্য ফিদইয়া করেন। তিনি বললেন, তেমনি অন্য মানুষও তাদের খালাদের জন্য এটি চায় না। এরপর নবী করীম (ছাঃ) তার বুকে হাত রেখে দো‘আ করলেন, হে আল্লাহ! এর গুনাহ ক্ষমা করে দাও, এর অন্তরকে পবিত্র করে দাও এবং এর লজ্জাস্থানকে হেফাযত করে দাও। আবু উমামা বাহেলী (রাঃ) বলেন, এরপর থেকে ঐ যুবক আর কখনো কোনো নাজায়েয বিষয়ে মনোযোগই দেয়নি’।[6]
নবী করীম (ছাঃ) কখনোই ঐ যুবককে ধমক দেননি বা তাকে অপমান করেননি। বরং তাকে একজন দুর্বল মানুষ হিসাবে দেখেছিলেন। যার প্রয়োজন ছিল বুঝানোর, সহানুভূতির এবং স্নেহের। তিনি তাকে বসালেন, কথা বললেন তার বিবেকের সাথে, সুন্দরভাবে যুক্তি দিলেন এবং শেষে এমন এক দো‘আ করলেন, যা তার গুনাহের দুয়ার বন্ধ করে পবিত্রতা ও রহমতের দুয়ার খুলে দিল।
সেই যুবক নবী করীম (ছাঃ) এর দরবার থেকে ফিরে গেল একেবারে বদলে গিয়ে পরিষ্কার হৃদয় নিয়ে, দেহ-মন পবিত্র হয়ে, দৃঢ় সংকল্প নিয়ে। এটা কোনো কঠিন শাস্তির কারণে হয়নি; বরং এজন্য হয়েছিল যে, সে এমন একজন মহান ব্যক্তিকে পেল, যিনি তার ভুলকে আলিঙ্গন করলেন, পথ দেখালেন, তাকে দূরে ঠেলে বা লজ্জা দিয়ে ভেঙে দেননি।
শিক্ষা : যখন আপনি কোনো তরুণকে গোনাহের দিকে ছুটতে দেখেন, তখন প্রথমেই ধমক দিবেন না, তাকে লজ্জিত করবেন না। বরং কোমলভাবে ডাকুন, প্রজ্ঞা দিয়ে বুঝান, আর তার জন্য দো‘আ করুন। হয়তো আপনার সেই এক মুহূর্তের আন্তরিকতা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিবে, হয়ে উঠবে তার নতুন জীবনের সূচনা।
(২৩)এক পাগলী মেয়েকে সান্তনা প্রদান : নবী করীম (ছাঃ) কোন পাগলী নারীর কথা শোনা হ’তে তাকে অবজ্ঞা করেননি। তিনি তাকে লজ্জিত করেননি, পিছিয়ে দেননি, কিংবা অজুহাত দেখাননি। বরং ভালবাসা ও মর্যাদার সাথে সময় দিলেন। সম্মানজনক কথা বললেন, শুধু এ অনুভূতি দেওয়ার জন্য যে, তার প্রয়োজন ছোট নয়, তার অস্তিত্ব অবহেলার নয়।
আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত একদিন এমন একটি মহিলা যার মাথায় কিছুটা সমস্যা ছিল, সে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার সাথে আমার একটু প্রয়োজন আছে। উত্তরে তিনি বললেন, হে অমুকের মা! যে গলিতেই তুমি আমাকে নিয়ে যেতে চাও, আমি তোমার কাজের জন্য সেথায় যেতে প্রস্ত্তত আছি। অতঃপর রাসূল (ছাঃ) মহিলাটির সাথে কোন এক পথের পার্শ্বে নিরালায় কথাবার্তা বললেন, এমনকি সে তার কথা শেষ করে চলে গেল’।[7]
নবীজী (ছাঃ)-এর বিনয় ও মহানুভবতা তার মর্যাদাকে কমায়নি, বরং আরও উঁচুতে তুলেছে। আর সেই নারী ফিরে গেল প্রশান্ত হৃদয়ে।
শিক্ষা : আমাদের চারপাশেও অনেক দুর্বল ও অভাবী মানুষ আছে। তারা টাকা-পয়সা চায় না; চায় শুধু একটুখানি মনোযোগ, একটুখানি স্নেহভরা কথা, আর তার দিকে একটু সম্মানের ও মমতার দৃষ্টি। আপনি তাদের পাশে দাঁড়ান, যেমন দাঁড়াতেন নবী করীম (ছাঃ)। তাদের কথা মনোযোগ সহকারে শুনুন, তাদের প্রয়োজন মেটাতে হাত বাড়িয়ে দিন।
(২৪) সাথীর ভয়কে দুর্বলতা মনে না করে তাকে সান্তনা : সবচেয়ে কঠিন ও অন্ধকারময় মুহূর্তেও নবী করীম (ছাঃ) আল্লাহর প্রতি সুদৃঢ় আশা রাখতেন। তিনি তার সাথীকে শিক্ষা দিতেন আল্লাহর নৈকট্যই প্রকৃত নিরাপত্তা। এমনকি যদি তরবারি পিছু নেয়, আর গুহার অন্ধকারে আশ্রয় নেয়।
আবুবকর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, (হিজরতের সময়) আমরা যখন গুহায় আত্মগোপন করেছিলাম, তখন আমি নবী করীম (ছাঃ)-কে বললাম, যদি কাফেররা তাদের পায়ের নীচের দিকে দৃষ্টিপাত করে, তবে আমাদেরকে দেখে ফেলবে। তিনি বললেন, ‘হে আবুবকর, ঐ দুই ব্যক্তি সম্পর্কে তোমার কী ধারণা আল্লাহ যাদের তৃতীয় জন?’।[8]
যেই মুহূর্তে নবী করীম (ছাঃ) তার প্রিয় সাথীর মুখে ভয় ও উৎকণ্ঠার ছাপ দেখলেন, তখনই তিনি এমন একটি বাক্য উচ্চারণ করলেন যা হৃদয়কে শান্ত করল, বিশ্বাসকে দৃঢ় করল। তিনি ভয়কে দোষারোপ করলেন না; বরং ঈমানকে উঁচুতে তুললেন এবং তার সাথীর হৃদয়কে আল্লাহর সাথে বেঁধে দিলেন, যিনি তার ওপর ভরসাকারী কাউকে কখনো পরিত্যাগ করেন না। ফলে, যে ভয় ছিল তা ভরসাতে রূপ নিল। আর দুশ্চিন্তা পরিণত হ’ল অটল বিশ্বাসে।
শিক্ষা : যখন আপনি দেখবেন কোনো মানুষ ভয়, দুঃখ কিংবা উদ্বেগে ভেঙে পড়েছে, তখন তার দুর্বলতা ও হীনম্মন্যতাকে তার উপর বোঝা হিসাবে চাপিয়ে দিবেন না। বরং কোমল ভালবাসায় তার হৃদয় ছুঁয়ে দিন। হ্যাঁ, একটি সত্যনিষ্ঠ ও আল্লাহর স্মরণে ভরা বাক্য অস্থির হৃদয়কে শান্তির নীড়ে পৌঁছে দিতে পারে। উদ্বিগ্ন আত্মাকে ভরসার আলোয় ভরে তুলতে পারে।
উপসংহার : প্রিয় পাঠক! আপনি যদি ‘যেভাবে প্রশান্তি ছড়িয়ে দিতেন নবী (ছাঃ)’ প্রবন্ধটি প্রথম থেকে পড়ে থাকেন, তাহ’লে মানবজাতির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম হৃদয়ের স্পন্দন অনুভব করেছেন। এই দৃশ্যগুলো আমাদের দেখিয়েছে কীভাবে আমাদের প্রিয় নবীজী দয়া ও মমতাকে যাপন করতেন। কীভাবে তিনি মানুষের ভাঙা মন জোড়া দিতেন এবং এক অবিস্মরণীয় কোমলতায় হৃদয়ের ক্ষত সারিয়ে তুলতেন।
প্রিয় পাঠক! এই প্রবন্ধের শিক্ষাগুলো কেবল পড়ার জন্য নয়, বরং জীবনের পাতায় প্রয়োগ করার জন্য। আসুন, প্রতিটি সাধারণ মুহূর্তকে আমরা দয়ার সুযোগে পরিণত করি। প্রতিটি সাধারণ সাক্ষাৎকে কারো জীবনে এক অদৃশ্য পরম মমতা হিসাবে উপহার দিই। যদি কোথাও বিষণনতা দেখেন, তবে তার প্রতিকার করুন। যদি কারো মনের ভাঙন অনুভব করেন, তবে তা মুছে দিন। যদি কারো আর্তনাদ শোনেন, তবে তার পাশে গিয়ে দাঁড়ান। আপনার হৃদয়কে এই পৃথিবীতে এমনভাবে পরিচালিত করুন, যেভাবে রাসূল (ছাঃ)-এর হৃদয় চলত। একটি কথা মনে রাখবেন, কারো হৃদয়ে এক চিলতে হাসির কারণ হওয়া, কিংবা কৃতজ্ঞতায় কারো চোখের কোণে এক ফোঁটা পানি এনে দেওয়াটাই হ’ল নবুয়তের আসল উত্তরাধিকার।
-আসাদুল্লাহ আল-গালিব
[কেন্দ্রীয় অর্থ সম্পাদক, বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ]
[1]. বুখারী হা/৩৯০৪।
[2]. তিরমিযী হা/৩০১০; ইবনু মাজাহ হা/১৯০; মিশকাত হা/৬২৩৭।
[3]. আহমাদ হা/১২৪১৬, ১৯৭৯৯; মুসলিম হা/২৪৭২; তাফসীর ইবনু কাছীর, তাফসীর কুরতুবী।
[4]. বুখারী হা/৪৪১, ৬২৮০।
[5]. বুখারী হা/৬৮২৩; মুসলিম হা/১৬৯৬; মিশকাত হা/৫৬৭।
[6]. আহমাদ হা/২২২৬৫; ছহীহাহ হা/৩৭০।
[7]. মুসলিম হা/২৩২৬; মিশকাত হা/৫৮১০।
[8]. বুখারী হা/৩৬৫৩; মুসলিম হা/২৩৮১।
(শেষ কিস্তি)
(১৮) আবুবকরের প্রতি রাসূল (ছাঃ)-এর ভালবাসা : বিদায়ের মুহূর্ত সবসময় গভীর ও ভারী হয়। বিশেষ করে তাদের জন্য, যারা সত্যিকারের ভালবাসা ও আনুগত্যের বন্ধনে বাঁধা থাকে। নবী করীম (ছাঃ) জানতেন আবুবকর (রাঃ)-এর বিচক্ষণতা ও তার প্রতি গভীর ভালবাসা রয়েছে। আর সেকারণেই তো অচিরেই ঘটতে যাওয়া তাঁর ইঙ্গিতবহ অস্পষ্ট কথাগুলো আবুবকর উপলদ্ধি করতে পেরে কান্না জড়িত অবস্থায় রাসূলের জন্য নিজের পিতা-মাতাকে উৎসর্গ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অন্যান্য ছাহাবীরা এই গূঢ়ার্থ না বুঝে আবুবকরকে অবজ্ঞা করে। এমন পরিস্থিতিতে রাসূল (ছাঃ) আবুবকরের অবদান, সততা ও ত্যাগের স্বীকৃতি স্বরূপ তার উচ্চ মর্যাদা স্থাপন করলেন।
আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মিম্বরে বসলেন এবং বললেন, আল্লাহ তার এক বান্দাকে দু’টি বিষয়ের একটি বেছে নেয়ার অধিকার দিয়েছেন। তার একটি হ’ল দুনিয়ার ভোগ-বিলাস। আর একটি হ’ল আল্লাহর নিকট যা রক্ষিত রয়েছে। তখন সে বান্দা আল্লাহর কাছে যা রয়েছে তাই পসন্দ করলেন। একথা শুনে আবুবকর (রাঃ) কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, আমাদের পিতা-মাতাকে আপনার জন্য কুরবানী করলাম। তার অবস্থা দেখে আমরা বিস্মিত হলাম। লোকেরা বলতে লাগল, এ বৃদ্ধের অবস্থা দেখ, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এক বান্দা সম্বন্ধে খবর দিলেন যে, তাকে আল্লাহ ভোগ-বিলাস দেওয়ার এবং তার কাছে যা রয়েছে, এ দু’য়ের মধ্যে বেছে নিতে বললেন। আর এই বৃদ্ধ বলছে, আপনার জন্য আমাদের পিতা-মাতা উৎসর্গ করলাম। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-ই হলেন সেই এখতিয়ার প্রাপ্ত বান্দা। আর আবুবকরই হলেন আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বিজ্ঞ ব্যক্তি। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি তার সঙ্গ ও সম্পদ দিয়ে আমার প্রতি সবচেয়ে ইহসান করেছেন, তিনি হলেন আবুবকর। যদি আমি আমার উম্মতের কোন ব্যক্তিকে অন্তরঙ্গ হিসাবে গ্রহণ করতাম, তাহ’লে আবুবকরকেই গ্রহণ করতাম। তবে তার সঙ্গে আমার ইসলামী ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক রয়েছে। মসজিদের দিকে আবুবকর (রাঃ) এর দরজা ছাড়া অন্য কারো দরজা খোলা থাকবে না’।[1]
নবী করীম (ছাঃ)-এর এই কথাগুলো কেবল অস্থায়ী মন্তব্য ছিল না; এটি ছিল কৃতজ্ঞতা, মানুষের সামনে স্বীকৃতি এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি চিরন্তন বার্তা। আবুবকর সাধারণ ব্যক্তি নয়। সে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযাত্রী ও বিশ্বস্ত বন্ধু। তিনি রাসূলের কথার মর্মার্থ বুঝতে পেরেছিলেন যে, তিনি অতি সত্বর পরপারে পাড়ি জমাবেন।
শিক্ষা : যারা অতীতে আপনার পাশে ছিল তাদেরকে সান্তনা দিন, ভালবাসুন ও সম্মান দেখান। কারণ কখনো কখনো একটি শব্দ বা প্রশংসা বছরের পরিশ্রম, সংগ্রাম ও ত্যাগের কষ্ট ভুলিয়ে দেওয়ার মতো শক্তিশালী সান্তনা হ’তে পারে। যা নবী করীম (ছাঃ) আমাদের দেখিয়েছেন।
(১৯)পিতৃহারা ভারাক্রান্ত জাবের বিন আব্দুল্লাহকে সান্তনা : ছোটদের অনুভূতিকে কখনো ছোট মনে করা উচিত নয়। তাদের হৃদয় জেতার জন্য কোনো অর্থের প্রয়োজন নেই। অনেক সময় একটি আন্তরিক নযর, হৃদয় থেকে আসা কিছু কোমল কথা বা স্নেহময় হাসিই যথেষ্ট। নবী করীম (ছাঃ)-এর জীবন আমাদের দেখিয়েছে, কিভাবে এমন মমতা ও সহানুভূতি দিয়ে অন্যদের মনকে আলোকিত করেছেন এবং স্থায়ী প্রভাব ফেলেছেন।
জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমার সাথে সাক্ষাৎ করে আমাকে বললেন, হে জাবের! কি ব্যাপার, আমি তোমাকে ভগ্নহৃদয় দেখছি কেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার আববা (ওহোদের যুদ্ধে) শহীদ হয়েছেন এবং অসহায় পরিবার-পরিজন ও ঋণ রেখে গেছেন। তিনি বললেন, আল্লাহ তা‘আলা কিভাবে তোমার আববার সাথে মিলিত হয়েছেন আমি কি তোমাকে সেই সুসংবাদ দিব না? আমি বললাম, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, আল্লাহ কখনো কারো সাথে তার পর্দার অন্তরাল ব্যতীত (সরাসরি) কথা বলেননি। কিন্তু তিনি তোমার বাবাকে জীবন দান করে তার সাথে সরাসরি কথা বলেছেন। তাকে তিনি বললেন, তুমি আমার নিকট (যা ইচ্ছা) চাও, আমি তোমাকে তা দান করব। সে বলল, হে প্রভু! আপনি আমাকে জীবন দান করুন, যাতে আমি আবার আপনার রাহে নিহত হ’তে পারি। বরকতময় আল্লাহ বললেন, আমার পক্ষ থেকে আগে হতেই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়ে আছে যে, তারা আবার (দুনিয়ায়) ফিরে যাবে না। এ প্রসঙ্গে নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়,وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللهِ أَمْوَاتًا بَلْ أَحْيَاءٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ- ‘যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়, তাদেরকে মৃত ভেবো না। বরং তারা জীবিত। তারা তাদের প্রতিপালকের নিকট হ’তে জীবিকাপ্রাপ্ত হয়’ (আলে ইমরান ৩/১৬৯)।[2]
নবী করীম (ছাঃ) জাবেরকে তার দুঃখের ভেলায় ডুবে থাকতে দেননি। জাবেরকে দেখে পাশ কাটিয়েও চলে যাননি। বরং কোমলভাবে কাছে গিয়ে বললেন, مَا لِي أَرَاكَ مُنْكَسِرًا؟ ‘কেন আমি তোমাকে মনমরা দেখছি? তার দুঃখের কারণ জানতে চাওয়া এই একটি বাক্যই ছিল হৃদয়ের সান্তনা, মনের প্রশান্তি ও আশার আলো। অতঃপর নবী করীম (ছাঃ) তার ব্যথা অস্বীকার করেননি। বরং তাকে শক্তি দিলেন, নিশ্চিত করলেন যে, তুমি যা হারিয়েছ তা আল্লাহর কাছে নষ্ট হয়নি। বরং লাভ হয়েছে। এটি এমন এক সান্তনা যা সবকিছুকে ছাপিয়ে যায়।
শিক্ষা : আমরা সবাই হ’তে পারি নবী করীম (ছাঃ)-এর মতো। কাউকে দুঃখী বা মন খারাপ দেখে তার পাশ কাটিয়ে যাবেন না। তাকে বলুন, কেন আমি আপনাকে মনমরা দেখছি? হয়তো এই একটি বাক্যই হবে তার ভেঙে পড়া হৃদয়ে সান্তনার প্রলেপ। একটি মাত্র কোমল শব্দের স্পর্শেই হাহাকার লোপ পেতে পারে, আর নতুন আশা জন্মাতে পারে।
(২০)অবমূল্যায়িতজুলায়বীবকেউচ্চমর্যাদাপ্রদান : জুলায়বীব (রাঃ) ছিলেন দরিদ্র, খাটো ও অপ্রত্যাশিত একজন ব্যক্তি। সমাজের অনেকেই তাকে অবমূল্যায়ন করত। কেউ তাকে গণ্য করত না। কিন্তু নবী করীম (ছাঃ) প্রথম সাক্ষাৎ থেকেই তার হৃদয়কে সম্মান ও সাহস দিয়ে ভরিয়ে দিলেন।
একদিন নবী করীম (ছাঃ) বললেন, হে জুলায়বীব, তুমি কি বিয়ে করবে না? জুলায়বীব বিনীতভাবে উত্তর দিলেন, হে আল্লাহর রাসূল, কে আমাকে বিয়ে করবে? তিনি তার হাত ধরে আনছারদের একটি বাড়িতে নিয়ে গেলেন, একটি মেয়ের সাথে তার বিবাহের প্রস্তাব রাখলেন এবং জুলায়বীবকে বিবাহ করালেন। এটি ছিল প্রকাশ্যভাবে তার মর্যাদা ও স্বীকৃতি দেয়ার প্রথম মুহূর্ত।
পরবর্তীতে জুলায়বীব নবী করীম (ছাঃ)-এর সঙ্গে জিহাদে অংশ নিলেন এবং শাহাদত বরণ করলেন। যুদ্ধ শেষে নবী করীম (ছাঃ) ছাহাবীদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, কে কি হারিয়েছে? ছাহাবারা বললেন, অমুক, অমুক। আবার জিজ্ঞাসা করলেন, আর কেউ? ছাহাবীরা বললেন, না। তিনি বললেন, কিন্তু আমি জুলায়বীবকে হারিয়েছি, তাকে খুঁজো। খুঁজে বের করে দেখা গেল, সে ৭ জনকে হত্যা করে শাহাদত বরণ করেছে। নবী করীম (ছাঃ) তার পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘সে ৭ জনকে হত্যা করে শাহাদত বরণ করেছে’। তারপর বললেন, هو مني وأنا منه ‘সে আমার একজন এবং আমিও তার একজন’। তার মরদেহ নবী করীম (ছাঃ)-এর বাহুর উপর রাখা হ’ল। নবী করীম (ছাঃ)-এর বাহু ছাড়া আর কিছু ছিল না। অতঃপর তার জন্য কবর খনন করা হ’ল এবং গোসল ছাড়াই তাকে কবরে দাফন করা হ’ল’।[3]
নবী করীম (ছাঃ) জুলায়বীবকে সান্তনা দিয়েছিলেন, যখন সে মানুষের চোখে উপেক্ষিত ও অবহেলিত ছিলেন। নবী করীম (ছাঃ) তাকে জীবনের প্রান্ত থেকে তুলে ধরলেন, মর্যাদা ও সম্মান দিলেন। তাকে বিবাহ দিয়ে একটি প্রকাশ্য সম্মান দিলেন। যেন জুলায়বীব নিজে ও অন্য ছাহাবায়ে কেরাম জুলায়বীবের মর্যাদা বুঝতে পারেন।
দ্বিতীয়ত যুদ্ধের পর সবাই জুলায়বীবকে ভুলে গেলেও নবী করীম (ছাঃ) তখনও তাকে স্মরণ করলেন। চিরন্তন প্রশংসা করলেন। নিজ হাতে মরদেহ বহন করে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিলেন এবং বললেন, এটি আমার পক্ষ থেকে এবং আমি তার সঙ্গে আছি। এই বাক্য তার মর্যাদা ও কৃতিত্বকে চিরকাল জীবন্ত রাখল।
শিক্ষা : কখনও কাউকে তার রূপ, অবস্থা বা দারিদ্র দেখে অবমূল্যায়ন করবেন না। মানুষের অন্তর হ’ল অমূল্য রত্ন। যা শুধু দয়ার চোখই দেখতে পারে। ভুলে যাওয়া বা অবহেলিত হৃদয়কে সান্তনা দেওয়া এমন কাজ, যা আল্লাহ ভালবাসেন। নবী করীম (ছাঃ) আমাদের দেখিয়েছেন, কীভাবে কোমলতা, মমতা ও আন্তরিক সহানুভূতির মাধ্যমে মানুষের হৃদয় জয় করা যায় এবং তাদেরকে আত্মবিশ্বাসী ও সাহসী করে তোলা যায়।
(২১)ভগ্ন হৃদয়ের আলীকে সান্তনা : আলী (রাঃ) যখন মনমরা ও দুঃখী অবস্থায় ছিলেন, নবী করীম (ছাঃ) তাকে তার মেয়ের সাথে কি হয়েছে এজন্য তিরস্কার করলেন না। না কোনো ভুলের দায় জানতে চাইলেন। বরং নিজে তার কাছে গিয়ে বসলেন, কোমলভাবে হাত দিয়ে ধূলিকণা ঝেড়ে দিলেন এবং হালকা মজার মাধ্যমে তার হৃদয় ভরিয়ে দিলেন। এক মুহূর্তেই ভাঙা হৃদয় পুনর্জীবিত হ’ল।
সাহল ইবনু সা‘দ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত আলী (রাঃ)-এর কাছে আবু তুরাব-এর চেয়ে প্রিয় কোন নাম ছিল না। এ নামে ডাকা হলে তিনি খুবই খুশী হতেন। কারণ একবার রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ফাতেমার কাছে আসলেন। তখন আলীকে ঘরে না পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আলী কোথায়? ফাতেমা বললেন, আমার ও তার মাঝে কিছু ঘটে যাওয়ায় তিনি আমার সঙ্গে রাগ করে বেরিয়ে গেছেন। আমার কাছে কায়লুলাহ করেননি। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) জনৈক লোককে বললেন, দেখতো সে কোথায়? লোকটি এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি তো মসজিদে ঘুমিয়ে আছেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এসে দেখতে পেলেন যে, তিনি কাত হয়ে শুয়ে আছেন। আর তার চাদরখানা পার্শ্ব থেকে পড়ে গেছে। ফলে তার গায়ে মাটি লেগে গেছে। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তার গায়ের মাটি ঝাড়তে লাগলেন এবং বলতে লাগলেন, ওঠো, আবু তুরাব (মাটির বাপ) ওঠো, আবু তুরাব! এ কথাটা তিনি দু’বার বললেন’।[4]
এই কথা কেবল হাস্যরস ছিল না; এটি ছিল গভীর সান্তনা, এমন একটি স্পর্শ যা অভ্যন্তরীণ উদ্বেগ ও মানসিক চাপকে ভুলিয়ে দেয়। আলী (রাঃ) সেই মুহূর্তেই আবু তুরাব নামে ডাকা ভালবেসেছিলেন। কারণ এই নামের সাথে জড়িয়ে ছিল নবী করীম (ছাঃ)-এর অশেষ মমতা, কোমলতা ও হৃদয় জাগানো সমবেদনা।
শিক্ষা : আপনি যখন কাউকে দেখেন, সে কারু সাথে দ্বন্দ্বের পর মনমরা বা দুঃখী হয়ে আছে, তখন তাকে জিজ্ঞাসা করবেন না কার ভুল? বরং তার কাছে গিয়ে, হৃদয়ের ধূলিকণা ঝেড়ে দিয়ে বলুন, উঠো! আমি তোমার সঙ্গে আছি। নবী করীম (ছাঃ) আমাদের দেখিয়েছেন, প্রথমে হৃদয়কে সান্তনা দেওয়া, তারপর শিক্ষা। এটাই প্রকৃত সহানুভূতি। কখনও কখনও একটি কোমল শব্দ, একটি আন্তরিক হাসি, বা এক মুহূর্তের মমতা পুরো দুঃখকে মুছে দিতে পারে এবং ভাঙা হৃদয়কে নতুন আশা ও শক্তি দিয়ে ভরিয়ে দিতে পারে।
(২২)তওবাকারীকে ক্ষমার সুসংবাদ প্রদান : নবী করীম (ছাঃ) তওবাকারীর ব্যথিত হৃদয়কে প্রশান্ত করতেন। তিনি তাকে লজ্জিত করতেন না। এমনকি অতিরিক্ত প্রশ্নে ক্লান্ত করতেন না। বরং তার তওবাকে সম্মান ও উৎসাহের সঙ্গে স্বাগত জানাতেন। অতীতের ভুলের দরজা বন্ধ করে দিতেন এবং নিশ্চিন্তভাবে তাকে প্রস্থান করার সুযোগ দিতেন বিশ্বাসের সঙ্গে যে, আল্লাহ তার তওবা গ্রহণ করেছেন, ক্ষমা করেছেন, কোনো অপমান বা কঠোরতার ছাপ ছাড়াই।
আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, এক লোক এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি হদযোগ্য (অপরাধ) করে ফেলেছি। আমার ওপর তা প্রয়োগ করুন। বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তার অপরাধ সম্পর্কে কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না। বরং ছালাতের ওয়াক্ত হয়ে গেলে তিনি ছালাত আদায় করলেন। লোকটিও রাসূলের সাথে ছালাত আদায় করল। ছালাত শেষে লোকটি দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি হদযোগ্য কাজ করেছি। আমার ওপর আল্লাহর কিতাবে নির্দিষ্ট হদ জারী করুন। উত্তরে তিনি বললেন, তুমি কি আমাদের সাথে ছালাত আদায় করনি। লোকটি বলল, হ্যাঁ, করেছি। তিনি বললেন, এ ছালাতের মাধ্যমে আল্লাহ তোমার গুনাহ বা হদ মাফ করে দিয়েছেন’।[5]
ওই ব্যক্তি কোনো দন্ড বা শাস্তি চেয়েছিল তার হৃদয় অপরাধবোধ থেকে। তাই সে নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট শাস্তি প্রাপ্ত হয়ে পাপমুক্ত হওয়ার প্রার্থনা করে। অতঃপর রাসূল তাকে এমন একটি কোমল সান্তনার কথা শুনালেন, যা তার আত্মসম্মান ও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস দৃঢ় প্রতিষ্ঠা করে।
শিক্ষা : যদি কেউ আপনার কাছে আসে এবং তার ভুল স্বীকার করে, তাকে অতিরিক্ত প্রশ্নে ডুবিয়ে দিবেন না। বরং তার ভুল গ্রহণ করুন, তার ফিরে আসাকে প্রশংসা করুন, তার হৃদয়কে সান্তনা দিন। এটাই হ’তে পারে সেই আলোর হাত যা তার জন্য আল্লাহর দয়ার দরজা খুলে দেয়। মনে রাখবেন, একটি কোমল শব্দ এক চুম্বক সদৃশ মমতা, কখনও কখনও মানুষের হৃদয়কে সৃষ্টিকর্তার কাছে ফিরিয়ে আনে, পুনর্জীবিত করে এবং আশা দিয়ে ভরে তোলে।
(২৩)ব্যভিচারের অনুমতি চাওয়া যুবকের প্রতি রাসূলের সহমর্মিতা : এক যুবক নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকটে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে ব্যভিচারের অনুমতি দিন। এ কথা শুনে ছাহাবীগণ তার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং তাকে ধমকালেন। তখন নবী করীম (ছাঃ) বললেন, তাকে কাছে আসতে দাও। যুবক কাছে এল এবং বসে পড়ল। তিনি কোমল কণ্ঠে তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কি চাইবে, এটি তোমার মায়ের সঙ্গে হোক? সে বলল, না, আল্লাহর কসম! আল্লাহ যেন আমাকে আপনার জন্য ফিদইয়া করেন। তিনি বললেন, তেমনি অন্য মানুষও তাদের মায়ের জন্য এটি চায় না।
তুমি কি চাইবে, এটি তোমার মেয়ের সঙ্গে হোক? সে বলল, না, আল্লাহর কসম! আল্লাহ যেন আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করেন। নবী করীম (ছাঃ) বললেন, তেমনি অন্য মানুষও তাদের মেয়ের সাথে এটি চায় না।
তুমি কি চাইবে, এটি তোমার বোনের সঙ্গে হোক? সে বলল, না, আল্লাহর কসম! আল্লাহ যেন আমাকে আপনার জন্য ফিদইয়া করেন। নবী করীম (ছাঃ) বললেন, তেমনি অন্য মানুষও তাদের বোনদের জন্য এটি চায় না। তুমি কি চাইবে, এটি তোমার ফুফুর সঙ্গে হোক? সে বলল না, আল্লাহর কসম! আল্লাহ যেন আমাকে আপনার জন্য ফিদইয়া করেন। নবী করীম (ছাঃ) বললেন, তেমনি অন্য মানুষও তাদের ফুফুর জন্য এটি চায় না।
তুমি কি চাইবে, এটি তোমার খালার সঙ্গে হোক? সে বলল, না, আল্লাহর কসম! আল্লাহ যেন আমাকে আপনার জন্য ফিদইয়া করেন। তিনি বললেন, তেমনি অন্য মানুষও তাদের খালাদের জন্য এটি চায় না। এরপর নবী করীম (ছাঃ) তার বুকে হাত রেখে দো‘আ করলেন, হে আল্লাহ! এর গুনাহ ক্ষমা করে দাও, এর অন্তরকে পবিত্র করে দাও এবং এর লজ্জাস্থানকে হেফাযত করে দাও। আবু উমামা বাহেলী (রাঃ) বলেন, এরপর থেকে ঐ যুবক আর কখনো কোনো নাজায়েয বিষয়ে মনোযোগই দেয়নি’।[6]
নবী করীম (ছাঃ) কখনোই ঐ যুবককে ধমক দেননি বা তাকে অপমান করেননি। বরং তাকে একজন দুর্বল মানুষ হিসাবে দেখেছিলেন। যার প্রয়োজন ছিল বুঝানোর, সহানুভূতির এবং স্নেহের। তিনি তাকে বসালেন, কথা বললেন তার বিবেকের সাথে, সুন্দরভাবে যুক্তি দিলেন এবং শেষে এমন এক দো‘আ করলেন, যা তার গুনাহের দুয়ার বন্ধ করে পবিত্রতা ও রহমতের দুয়ার খুলে দিল।
সেই যুবক নবী করীম (ছাঃ) এর দরবার থেকে ফিরে গেল একেবারে বদলে গিয়ে পরিষ্কার হৃদয় নিয়ে, দেহ-মন পবিত্র হয়ে, দৃঢ় সংকল্প নিয়ে। এটা কোনো কঠিন শাস্তির কারণে হয়নি; বরং এজন্য হয়েছিল যে, সে এমন একজন মহান ব্যক্তিকে পেল, যিনি তার ভুলকে আলিঙ্গন করলেন, পথ দেখালেন, তাকে দূরে ঠেলে বা লজ্জা দিয়ে ভেঙে দেননি।
শিক্ষা : যখন আপনি কোনো তরুণকে গোনাহের দিকে ছুটতে দেখেন, তখন প্রথমেই ধমক দিবেন না, তাকে লজ্জিত করবেন না। বরং কোমলভাবে ডাকুন, প্রজ্ঞা দিয়ে বুঝান, আর তার জন্য দো‘আ করুন। হয়তো আপনার সেই এক মুহূর্তের আন্তরিকতা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিবে, হয়ে উঠবে তার নতুন জীবনের সূচনা।
(২৩)এক পাগলী মেয়েকে সান্তনা প্রদান : নবী করীম (ছাঃ) কোন পাগলী নারীর কথা শোনা হ’তে তাকে অবজ্ঞা করেননি। তিনি তাকে লজ্জিত করেননি, পিছিয়ে দেননি, কিংবা অজুহাত দেখাননি। বরং ভালবাসা ও মর্যাদার সাথে সময় দিলেন। সম্মানজনক কথা বললেন, শুধু এ অনুভূতি দেওয়ার জন্য যে, তার প্রয়োজন ছোট নয়, তার অস্তিত্ব অবহেলার নয়।
আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত একদিন এমন একটি মহিলা যার মাথায় কিছুটা সমস্যা ছিল, সে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার সাথে আমার একটু প্রয়োজন আছে। উত্তরে তিনি বললেন, হে অমুকের মা! যে গলিতেই তুমি আমাকে নিয়ে যেতে চাও, আমি তোমার কাজের জন্য সেথায় যেতে প্রস্ত্তত আছি। অতঃপর রাসূল (ছাঃ) মহিলাটির সাথে কোন এক পথের পার্শ্বে নিরালায় কথাবার্তা বললেন, এমনকি সে তার কথা শেষ করে চলে গেল’।[7]
নবীজী (ছাঃ)-এর বিনয় ও মহানুভবতা তার মর্যাদাকে কমায়নি, বরং আরও উঁচুতে তুলেছে। আর সেই নারী ফিরে গেল প্রশান্ত হৃদয়ে।
শিক্ষা : আমাদের চারপাশেও অনেক দুর্বল ও অভাবী মানুষ আছে। তারা টাকা-পয়সা চায় না; চায় শুধু একটুখানি মনোযোগ, একটুখানি স্নেহভরা কথা, আর তার দিকে একটু সম্মানের ও মমতার দৃষ্টি। আপনি তাদের পাশে দাঁড়ান, যেমন দাঁড়াতেন নবী করীম (ছাঃ)। তাদের কথা মনোযোগ সহকারে শুনুন, তাদের প্রয়োজন মেটাতে হাত বাড়িয়ে দিন।
(২৪) সাথীর ভয়কে দুর্বলতা মনে না করে তাকে সান্তনা : সবচেয়ে কঠিন ও অন্ধকারময় মুহূর্তেও নবী করীম (ছাঃ) আল্লাহর প্রতি সুদৃঢ় আশা রাখতেন। তিনি তার সাথীকে শিক্ষা দিতেন আল্লাহর নৈকট্যই প্রকৃত নিরাপত্তা। এমনকি যদি তরবারি পিছু নেয়, আর গুহার অন্ধকারে আশ্রয় নেয়।
আবুবকর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, (হিজরতের সময়) আমরা যখন গুহায় আত্মগোপন করেছিলাম, তখন আমি নবী করীম (ছাঃ)-কে বললাম, যদি কাফেররা তাদের পায়ের নীচের দিকে দৃষ্টিপাত করে, তবে আমাদেরকে দেখে ফেলবে। তিনি বললেন, ‘হে আবুবকর, ঐ দুই ব্যক্তি সম্পর্কে তোমার কী ধারণা আল্লাহ যাদের তৃতীয় জন?’।[8]
যেই মুহূর্তে নবী করীম (ছাঃ) তার প্রিয় সাথীর মুখে ভয় ও উৎকণ্ঠার ছাপ দেখলেন, তখনই তিনি এমন একটি বাক্য উচ্চারণ করলেন যা হৃদয়কে শান্ত করল, বিশ্বাসকে দৃঢ় করল। তিনি ভয়কে দোষারোপ করলেন না; বরং ঈমানকে উঁচুতে তুললেন এবং তার সাথীর হৃদয়কে আল্লাহর সাথে বেঁধে দিলেন, যিনি তার ওপর ভরসাকারী কাউকে কখনো পরিত্যাগ করেন না। ফলে, যে ভয় ছিল তা ভরসাতে রূপ নিল। আর দুশ্চিন্তা পরিণত হ’ল অটল বিশ্বাসে।
শিক্ষা : যখন আপনি দেখবেন কোনো মানুষ ভয়, দুঃখ কিংবা উদ্বেগে ভেঙে পড়েছে, তখন তার দুর্বলতা ও হীনম্মন্যতাকে তার উপর বোঝা হিসাবে চাপিয়ে দিবেন না। বরং কোমল ভালবাসায় তার হৃদয় ছুঁয়ে দিন। হ্যাঁ, একটি সত্যনিষ্ঠ ও আল্লাহর স্মরণে ভরা বাক্য অস্থির হৃদয়কে শান্তির নীড়ে পৌঁছে দিতে পারে। উদ্বিগ্ন আত্মাকে ভরসার আলোয় ভরে তুলতে পারে।
উপসংহার : প্রিয় পাঠক! আপনি যদি ‘যেভাবে প্রশান্তি ছড়িয়ে দিতেন নবী (ছাঃ)’ প্রবন্ধটি প্রথম থেকে পড়ে থাকেন, তাহ’লে মানবজাতির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম হৃদয়ের স্পন্দন অনুভব করেছেন। এই দৃশ্যগুলো আমাদের দেখিয়েছে কীভাবে আমাদের প্রিয় নবীজী দয়া ও মমতাকে যাপন করতেন। কীভাবে তিনি মানুষের ভাঙা মন জোড়া দিতেন এবং এক অবিস্মরণীয় কোমলতায় হৃদয়ের ক্ষত সারিয়ে তুলতেন।
প্রিয় পাঠক! এই প্রবন্ধের শিক্ষাগুলো কেবল পড়ার জন্য নয়, বরং জীবনের পাতায় প্রয়োগ করার জন্য। আসুন, প্রতিটি সাধারণ মুহূর্তকে আমরা দয়ার সুযোগে পরিণত করি। প্রতিটি সাধারণ সাক্ষাৎকে কারো জীবনে এক অদৃশ্য পরম মমতা হিসাবে উপহার দিই। যদি কোথাও বিষণনতা দেখেন, তবে তার প্রতিকার করুন। যদি কারো মনের ভাঙন অনুভব করেন, তবে তা মুছে দিন। যদি কারো আর্তনাদ শোনেন, তবে তার পাশে গিয়ে দাঁড়ান। আপনার হৃদয়কে এই পৃথিবীতে এমনভাবে পরিচালিত করুন, যেভাবে রাসূল (ছাঃ)-এর হৃদয় চলত। একটি কথা মনে রাখবেন, কারো হৃদয়ে এক চিলতে হাসির কারণ হওয়া, কিংবা কৃতজ্ঞতায় কারো চোখের কোণে এক ফোঁটা পানি এনে দেওয়াটাই হ’ল নবুয়তের আসল উত্তরাধিকার।
[কেন্দ্রীয় অর্থ সম্পাদক, বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ]
[1]. বুখারী হা/৩৯০৪।
[2]. তিরমিযী হা/৩০১০; ইবনু মাজাহ হা/১৯০; মিশকাত হা/৬২৩৭।
[3]. আহমাদ হা/১২৪১৬, ১৯৭৯৯; মুসলিম হা/২৪৭২; তাফসীর ইবনু কাছীর, তাফসীর কুরতুবী।
[4]. বুখারী হা/৪৪১, ৬২৮০।
[5]. বুখারী হা/৬৮২৩; মুসলিম হা/১৬৯৬; মিশকাত হা/৫৬৭।
[6]. আহমাদ হা/২২২৬৫; ছহীহাহ হা/৩৭০।
[7]. মুসলিম হা/২৩২৬; মিশকাত হা/৫৮১০।
[8]. বুখারী হা/৩৬৫৩; মুসলিম হা/২৩৮১।